Showing posts with label একটু বড় গল্প. Show all posts
ফেরা / শেষ কিস্তি
By : Sayantari Ghosh
পাঁচ
পার্কিং প্লেসের ছাতিম গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে চুপ করে বসেছিল টুপুর। মাঝেমাঝে এক-একটা পুরোনো বৃষ্টির ফোঁটা গাছের পাতাকে ছুঁয়ে থাকতে থাকতে হঠাত্ সব ভুলে গিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল ওর গায়ে... রাত আড়াইটে অব্দি ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি হয়েছে টানা... প্রথমে গুমরে গুমরে... তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে... শেষে ডুকরে ভিজিয়েছে সারা রাত ধরে... এখন থেমে গেছে... সব... সব থেমে গেছে...
পার্কিং প্লেসের ছাতিম গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে চুপ করে বসেছিল টুপুর। মাঝেমাঝে এক-একটা পুরোনো বৃষ্টির ফোঁটা গাছের পাতাকে ছুঁয়ে থাকতে থাকতে হঠাত্ সব ভুলে গিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল ওর গায়ে... রাত আড়াইটে অব্দি ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি হয়েছে টানা... প্রথমে গুমরে গুমরে... তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে... শেষে ডুকরে ভিজিয়েছে সারা রাত ধরে... এখন থেমে গেছে... সব... সব থেমে গেছে...
এরকম মেঘলা ফ্যাকাশে ভোর আগে কোনোদিন হয় নি কখনও! আকাশে থোক থোক কালি... মেঘেদের গায়ে আর মেঘেদের ওপারে যে থাকে, তার গায়েও... এ কালি কি যাবে কোনোদিন...? এ ক’দিনে কতবার কতভাবে একটিমাত্র প্রার্থনার বদলে সবকিছু সঅবকিছু বন্ধক রেখে দিতে চেয়েছে টুপুর... এটুকু দেওয়া যেত না...না?
বসে বসে ভাবছিল টুপুর। ছকে বাঁধা ভাবনা নয়... জিগেস করলে গুছিয়ে বলাও যাবে না যে কি ভাবা হল... ছন্নছাড়া টুকরো চিন্তা সব... অপ্রয়োজনীয়... হয়তঃ এখন অপ্রাসঙ্গিকও... কিন্তু অপ্রতিরোধ্য...
পাঁচদিন পাঁচরাত বাদে আজ বাড়ি ফিরবে টুপুর... প্রতিদিনের মত মা আর হাত ধরে টানাটানি করবে না আজ সন্ধ্যেয়... রাতে কে কে থাকবে এখানে, সেই নিয়ে হিসেব হবে না বিকেলের চায়ের সাথে... মিতুলদা গম্ভীর হয়ে বলবে না, “আচ্ছা, তাহলে আমিই...”
সারাদিনটা আজ অন্যরকম হবে... বাড়ি ফেরার দিনটা অন্যরকম হবে, সেটা অবশ্য জানতো টুপুর... কিন্তু এই নতুন ‘অন্যরকম’টার কথা কখখনো ভাবা হয় নি...
কেন...? সাহস হয় নি বলে...? কে জানে...
অন্যরকম ভোর দিয়ে শুরু... ভয়-জড়ানো টেলিফোন, ছমছমে কান্না আর ভোরের আলো একসাথে এসেছে আজ... তারপর থেকে এখনও চলছে কান্নার থেমে যাওয়া আর আবার করে কালবৈশাখীর মত ফিরে আসা... আর সাথে চলছে অপেক্ষা... কলকাতা, ধানবাদ, মেদিনীপুর থেকে রাত-থাকতে বেরিয়ে পড়া কিছু উদভ্রান্ত মানুষের অপেক্ষা... এরপর আরও অন্যরকম... এখান থেকে বেরিয়ে বাড়ি... পাড়া... তারপর দাদুমনির স্কুল... তারপর..............................
উফ! কোথাও আর তিলমাত্র জোর নেই মনে হচ্ছে... এখন যদি ঘুমিয়ে পড়া যেত? বা যদি ঘুম ভেঙে গিয়ে দেখা যেত যে এসবকিছু মারাত্মক দুঃস্বপ্ন একটা...? এখন অন্ধকার হয়ে যেত যদি? জমাট অন্ধকার... কারো মুখ দ্যাখা যাবে না... কোন কান্নার শব্দ কানে আসবে না... এই পাঁচদিনের গায়ে জড়িয়ে থাকা বৃষ্টির গন্ধটাও দূর হয়ে যাবে... নিঝুম অন্ধকার... যাতে একটাও কুরে কুরে খাওয়া প্রশ্ন থাকবে না... শুধু আশ্রয় থাকবে... স্বস্তির... শান্তির...
ধোঁয়াশার মত করে ক্লান্তি জমছে চোখের পাতার ওপর... ফ্যাকাশে কালির ভোর ফিকে হয়ে যাচ্ছে... বৃষ্টিধোয়া আকাশে কাচের মতন রোদ্দুর... বাঁক দেওয়া চন্দনা ওই তো কাছেই... ধাপ কেটে ঘাট নেমে গেছে দালান বাড়ির পাশ থেকে... বোধন বেলগাছটায় কতদিন ধূপ দ্যাখায় না কেউ... কালিতলা খালি... পাটমহাদেব এক্কেবারে একলা...
আচ্ছা, খালকুলার আমের বাগানে কি এখনও ওভাবেই সত্যি সত্যি গাছ ভেঙে পড়ে ফলের ভারে...? সাইকেলের স্পোক দিয়ে তৈরী ক্যাঁটা দিয়ে আকাশভাঙা বৃষ্টিতে আজো বুঝি কেউ অকারনেই রাশি রাশি শোল মাছ ধরে.....................?
আচ্ছা, খালকুলার আমের বাগানে কি এখনও ওভাবেই সত্যি সত্যি গাছ ভেঙে পড়ে ফলের ভারে...? সাইকেলের স্পোক দিয়ে তৈরী ক্যাঁটা দিয়ে আকাশভাঙা বৃষ্টিতে আজো বুঝি কেউ অকারনেই রাশি রাশি শোল মাছ ধরে.....................?
—“এই!”
হাতে একটা আলতো ছোঁয়া সবজেটে নীল স্বপ্নটার মাঝখান থেকে টেনে নামিয়ে আনল হাসপাতালের পার্কিংপ্লেসে।
হাতে একটা আলতো ছোঁয়া সবজেটে নীল স্বপ্নটার মাঝখান থেকে টেনে নামিয়ে আনল হাসপাতালের পার্কিংপ্লেসে।
শুভ!
এই এতক্ষনে প্রথমবার মনে হল যেন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাবার পুরো স্বাধীনতা আছে টুপুরের। সেই ভোররাত থেকে সবাই এসে ওকে জড়িয়ে ধরে কতবার কেঁদেছে... কতবার...
আর ও.......? ওর বুঝি কষ্ট হয় না...........? ওর বুঝি কাঁদতে নেই...........?
আর ও.......? ওর বুঝি কষ্ট হয় না...........? ওর বুঝি কাঁদতে নেই...........?
ওর হাতটাকে নিজের হাতদুটোর মধ্যে টেনে নিল শুভ... আর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হেরে যেতে বসা অভিমানেরা নিঃশব্দে দু’চোখ ভাসিয়ে দিল মূহুর্তে...
বুকের সব জ্বালার ঘোর কাটিয়ে দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি নামল... আর তার মাঝে রোদের মত আলতো করে উঁকি দিয়ে গেল কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দ,
বুকের সব জ্বালার ঘোর কাটিয়ে দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি নামল... আর তার মাঝে রোদের মত আলতো করে উঁকি দিয়ে গেল কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দ,
—“......... আমি............ আমি ফিরব শুভ... আমি যাবো. . . . . . ”
[শেষ]
Tag :
একটু বড় গল্প,
আবার যদি ইচ্ছে কর / পাঁচ
By : Sayantari Ghoshপাঁচ
“উইশ পয়েন্ট…!!!”
হাতদুটো হাওয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে, চোখ বন্ধ করে, একটা লম্বাআআ শ্বাস নিয়ে ঘোষণা করলো পারো।
হাতদুটো হাওয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে, চোখ বন্ধ করে, একটা লম্বাআআ শ্বাস নিয়ে ঘোষণা করলো পারো।
কোমর-অব্দি উঁচু শুকনো ঘাসের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেইই পাথরটায় এসে পড়েছি ততক্ষণে… সেই যে এক পূর্ণিমায় হেম আমাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছিল এই এক্কেবারে নিজেদের স্বপ্নরাজ্যের, তারপর থেকে এখানটা হয়েগেছিল আমাদের আলো-আঁধারের নিশ্চিন্ত আশ্রয়। রাস্তা’টা যে একেবারে আমাদের নিজেদের আবিষ্কার, সেটা বুঝেছিলাম সেইরাতের কিছুদিন বাদেই; আমরা ছাড়া এ পথের ঘাস আর কেউ মাড়াতো না। এই পাথরের ওপরে বসে দেখা প্রতিটা সূর্যাস্ত, বলা প্রতিটা কথা, প্রতিটি হাসির ঝর্ণা, প্রতিটি চোখের জলের ফোঁটা, রাগ-ঝগড়া-খুনসুটির জিগস পাজলের প্রতিটি ব্লক ছিল শুধু আমাদের। চোখের সামনে শুধু গালে হাত দিয়ে বসে দূঊঊর থেকে সব শুনতো লোহিত হস্টেল আর কোল ছুঁয়ে বিছিয়ে রাখত তার সবুজে সবুজ আঁচল। সন্ধ্যে হতে হতে রাত হয়ে যেত এখানে এলেই; লোহিতে আলো জ্বলত ধীরে ধীরে, আমরা ফিরতি পথ ধরতাম তখন।
আজো সুর্য ঢলে পড়েছে প্রায় আলিস্যি’তে। সকাল থেকেই তো তার চোখ ঢুলুঢুলু। এখানে আসার মানেই আগে ছিল নিখাদ আড্ডার ইচ্ছে বা সবার থেকে সরে এসে চিত্কার করে কিছু বলবার প্রয়োজন… আজো তেমনি ভেবেছিলাম সকালে। কিন্তু এখানে পৌঁছে খেয়াল করলাম, একা পারো ছাড়া কেউ যেন কথা বলছে না কিছু। পাথরটার উপরে উঠে বসলাম তিনজনে, মেঘে মেঘ পশ্চিম আকাশে, হাজারো রঙ মাখামাখি লোহিতের গায়ে… পড়ন্ত আলো আমাদের মুখে পড়ছিল, পারো বলছিল, “মনে আছে, ফেয়ারওয়েলের আগের দিন এখানে এসেছিলাম? আর আই টোল্ড ইউ টু উইশ সামথিং…? মনে আছে?”
আজো সুর্য ঢলে পড়েছে প্রায় আলিস্যি’তে। সকাল থেকেই তো তার চোখ ঢুলুঢুলু। এখানে আসার মানেই আগে ছিল নিখাদ আড্ডার ইচ্ছে বা সবার থেকে সরে এসে চিত্কার করে কিছু বলবার প্রয়োজন… আজো তেমনি ভেবেছিলাম সকালে। কিন্তু এখানে পৌঁছে খেয়াল করলাম, একা পারো ছাড়া কেউ যেন কথা বলছে না কিছু। পাথরটার উপরে উঠে বসলাম তিনজনে, মেঘে মেঘ পশ্চিম আকাশে, হাজারো রঙ মাখামাখি লোহিতের গায়ে… পড়ন্ত আলো আমাদের মুখে পড়ছিল, পারো বলছিল, “মনে আছে, ফেয়ারওয়েলের আগের দিন এখানে এসেছিলাম? আর আই টোল্ড ইউ টু উইশ সামথিং…? মনে আছে?”
ও বলতে মনে পড়লো বটে। সেদিনই ও এখানটাকে উইশ পয়েন্ট নাম দিয়েছিল; পাথরের উপরটায় দাঁড়িয়ে চিত্কার করেছিল, “আ-ই............ ল-ভ.......... আ-লো-ও-ক................!!!”
আমি আর হেম পারতপক্ষে খালি হাসাহাসি করেছিলাম ওর পাগলামিতে… তারমাঝে তেমন কোন ইচ্ছেবর চেয়েছিলাম বলে মনে পড়লো না।
আমি আর হেম পারতপক্ষে খালি হাসাহাসি করেছিলাম ওর পাগলামিতে… তারমাঝে তেমন কোন ইচ্ছেবর চেয়েছিলাম বলে মনে পড়লো না।
হঠাত্ হেম মাথা রাখল আমার কাঁধে...
ভাবছিলাম ঝগড়া করবে, রাগ করবে, এমন পাগলামি করবে ভাবিনি একেবারে। তাহলে কি আর কিছু ভেবে চুপ ছিল এতক্ষণ? তাহলে কি হেম বোঝেনি সেভাবে?
ভাবছিলাম ঝগড়া করবে, রাগ করবে, এমন পাগলামি করবে ভাবিনি একেবারে। তাহলে কি আর কিছু ভেবে চুপ ছিল এতক্ষণ? তাহলে কি হেম বোঝেনি সেভাবে?
“রিনি”, খুব ধীরে ধীরে বলল হেম, “পারো…”
“হুম্ম্…?”, পারো বলল…
“আই নীড টু সে সামথিং... আবাউট দ্যাট অঙ্কুর ইন্সিডেন্ট…”
“হুম্ম্…?”, পারো বলল…
“আই নীড টু সে সামথিং... আবাউট দ্যাট অঙ্কুর ইন্সিডেন্ট…”
নিশ্চিন্তি…! একটা চূড়ান্ত নিশ্চিন্তিতে যেন জুড়িয়ে এল ভিতরটা… হেম বোঝেনি!
হাত বাড়িয়ে ওর মাথায় হাত’টা রাখলাম, বললাম, “কি রে?”
হাত বাড়িয়ে ওর মাথায় হাত’টা রাখলাম, বললাম, “কি রে?”
“রিনি, আমি… আমি অঙ্কুরকে যেটা বলেছিলাম… দ্যাট আই লাভ সামওয়ান এলস… দ্যাট থিং… দ্যাট ওয়াজ নট রং…”
“কি?!” অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। এরকম কিছু তো ছন্দে অংশেও ভাবিনি আমি, “কি বলছিস সোনা?সো দ্যাট ওয়াস ট্রু...?! হু ইস দ্যাট গাই…?”
আস্তে আস্তে কাঁধ থেকে মাথা’টা তুলে সোজা সামনে তাকাল হেম। সূর্য’টা পুরোপুরি মেঘের আড়ালে এখন; গাঢ় করে একটা নিশ্বাস নিল হেম, “জানিস, যখন সেদিন অঙ্কুরের সাথে দ্যাখা করতে গেছিলাম, ওর সব কথায়, সব প্রশ্নে, সব উত্তরে আমি যেন কিছু একটা খুঁজছিলাম… কি যে ছিল সেটা, তখন বুঝিনি… পরে মনে হল, তার উত্তর ছিল ইউনিভার্সিটির দিনগুলো’তে, সেই নিখাদ খুনসুটিগুলোতে, পার্টির মিটিংগুলোতে, একই দাবী নিয়ে গলা ফাটানো’তে… র্যালি বা স্ট্রাইকের সময়, যখন নিশুতি রাত হয়ে যেত, কিম্বা পুলিশ আসত ধর্ণা তুলে দিতে, কিম্বা কেউ এসে সাস্পেনশন লেটার ছুঁড়ে দিত মুখের ওপর... ভয় লাগত, কাউকে বলতে-না-পারা ভয়... তোরা দু’জন থাকতি না তো সেই মূহুর্তে... তখন জানিস না কি সাঙ্ঘাতিক ভাবে ওকে ফিল করতাম... মনে হত কিরকম যেন আলগোছে আগলে রাখতো ও আমায়… …”
“কি?!” অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। এরকম কিছু তো ছন্দে অংশেও ভাবিনি আমি, “কি বলছিস সোনা?সো দ্যাট ওয়াস ট্রু...?! হু ইস দ্যাট গাই…?”
আস্তে আস্তে কাঁধ থেকে মাথা’টা তুলে সোজা সামনে তাকাল হেম। সূর্য’টা পুরোপুরি মেঘের আড়ালে এখন; গাঢ় করে একটা নিশ্বাস নিল হেম, “জানিস, যখন সেদিন অঙ্কুরের সাথে দ্যাখা করতে গেছিলাম, ওর সব কথায়, সব প্রশ্নে, সব উত্তরে আমি যেন কিছু একটা খুঁজছিলাম… কি যে ছিল সেটা, তখন বুঝিনি… পরে মনে হল, তার উত্তর ছিল ইউনিভার্সিটির দিনগুলো’তে, সেই নিখাদ খুনসুটিগুলোতে, পার্টির মিটিংগুলোতে, একই দাবী নিয়ে গলা ফাটানো’তে… র্যালি বা স্ট্রাইকের সময়, যখন নিশুতি রাত হয়ে যেত, কিম্বা পুলিশ আসত ধর্ণা তুলে দিতে, কিম্বা কেউ এসে সাস্পেনশন লেটার ছুঁড়ে দিত মুখের ওপর... ভয় লাগত, কাউকে বলতে-না-পারা ভয়... তোরা দু’জন থাকতি না তো সেই মূহুর্তে... তখন জানিস না কি সাঙ্ঘাতিক ভাবে ওকে ফিল করতাম... মনে হত কিরকম যেন আলগোছে আগলে রাখতো ও আমায়… …”
চোখের সামনে’টা এক্কেবারে ঝাপসা হয়ে গেল সাথে সাথে; বৃষ্টিধোয়া ফেডেড সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা বি-শা-ল হোর্ডিঙের মত দুলতে লাগল সাবরমতির সেই শিরশিরে রাতের ছবিটা আবার... ছবির পিছনে একটা আলো যেন খ্যাপার মত জ্বলছে আর নিভছে... ফ্ল্যাশ... ব্লার... ফ্ল্যাশ, ফ্ল্যাশ... ব্লার...
“আমি কাউকে বলতে পারিনি, রিনি…”, গরম এক ফোঁটা নোনতা জল হেমের গাল বেয়ে এসে পড়ল আমার হাতে, “আমার বুঝতে খুব দেরি হয়ে গেছিল রে… অঙ্কুরের কথা ভাবতে গিয়ে কি মনে হল জানিস? যে রুদ্র আমায় পেরিয়ে কবে চলে গেছে, কিন্তু আমি এখনও ওর পিছনে পড়ে থাকা ছায়া’টার ভেতরে খুব আরামে বসে আছি এখনও… সে ছায়াটুকু যদ্দিন না পেরিয়ে যাচ্ছে, যদ্দিন না কড়া রোদ এসে পড়ছে আমার গায়ে, আমার মনেই হবে না যে আমার আর কাউকে দরকার… সবকিছু এমন নিটোল ভাবে সামলে নিতো ও… …”
আবার অন্ধকার ঘর; আবার দেওয়ালজোড়া স্ন্যাপশট… চলন্ত ট্রেনে, কাঁপা কাঁপা হাতের লেখায় লেখা একখানা ডায়েরির পাতা, যা গত আড়াই বছরে কে জানে কতবার, কত অজস্রবার পড়েছি…
“ছেলেটাকে যত চিনেছি দিনে দিনে, মনে হয়েছে, যত ভরসা ওকে করেছি এতদিন, সে আমার ইচ্ছে হয়েছে বলে করেছি। যতবার ভেবেছি আমায় বুঝছে, সে'সব আমার কল্পনা করার সখ বই আর কিছুনা! কোনোদিন, আমায় ভরসা দেওয়ার মত কিছু কি করেছে ও?
ও যে কত কেঁদেছে কে জানে আমার চেয়ে বেশি? তবু যখন সেই খুব চেনা হাসিমুখগুলো ভাবি, বিজয়ার প্রণাম আর অবাধ স্বাধীনতার প্রশ্রয় ভাবি, পিঠে-গড়ার জরুরী ফরমায়েশে ওদের রান্নাঘরে আমার রান্নায় হাতেখড়ি ভাবি, একটা কথাই খালি দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে চিত্কার করে ফেরে ঘর জুড়ে… একটাই ইকো… ‘ও সামলাতে পারবে না…’ …”
ও যে কত কেঁদেছে কে জানে আমার চেয়ে বেশি? তবু যখন সেই খুব চেনা হাসিমুখগুলো ভাবি, বিজয়ার প্রণাম আর অবাধ স্বাধীনতার প্রশ্রয় ভাবি, পিঠে-গড়ার জরুরী ফরমায়েশে ওদের রান্নাঘরে আমার রান্নায় হাতেখড়ি ভাবি, একটা কথাই খালি দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে চিত্কার করে ফেরে ঘর জুড়ে… একটাই ইকো… ‘ও সামলাতে পারবে না…’ …”
“আমি তোদের তারপরেও বলতে পারতাম, রিনি”, কান্না চাপতে গিয়ে কথাগুলো ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে এবার হেমের, “… পারিনি… খালি এটা ভেবে... এটা ভেবে... যে হয়তঃ… তুই হয়তঃ… ...”
“চুপ, চুপ, সোনা”, আর পারলাম না ওকে এসব বলতে দিতে, আর সইল না আমার। আমায় জড়িয়ে ধরে সবটুকু চাপাকান্না বাইরে এনে ফেললো হেম। আমারো চোখের জল আগুনের মতন গরম মনে হল। আগুনও হতে পারে... বালির মতন ধূ ধূ থেকে জল নইলে আসবে কি করে?
পারো কতটা কি বুঝলো জানি না, হেম’কে দেখলাম ছুঁয়ে আছে আলতো করে।
পারো কতটা কি বুঝলো জানি না, হেম’কে দেখলাম ছুঁয়ে আছে আলতো করে।
কতক্ষণ এভাবে পেরিয়ে গেল জানিনা। হেম কাঁদতে কাঁদতে চুপ করে গেছে একসময়। আমার মাথার ভেতর’টা বাংলা ক্লাসের খাতার শেষপাতার মত হিজিবিজি’তে ভর্তি মনে হচ্ছিল… কিছু পোর্ট্রেট, খাপছাড়া… তার ওপর লেখা কিছু নাম… কয়েকটা তারিখ… কিছু গানের লিরিক্স… কিছু টুকরো টুকরো করে ছেঁড়া ছবি… তার ওপরে পেন দিয়ে আঁকা কারো মুখের শুধু আদলটুকু… আরো নাম... একই নাম... বারবার...
“তোরা সেদিন কোনো উইশ করিস নি, না?”
আচমকা প্রশ্ন’টাতে কোন কূলকিনারা করে উঠতে পারলাম না… পারো কিছু বলছে। কি বলছে? কি নিয়ে? বোকার মত তাকালাম ওর দিকে… ওর কথাগুলো মাথার ভেতর অব্দি পৌঁছায়নি যেন এখনও…
“সেদিন… ফেয়ারওয়েলের আগের দিন…”, আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন ভীষণ অভিমানী মুখ করে পারো বলল।
হেম’কে দেখলাম চুপ করে গেছে; কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে শুধু, ও খাপছাড়া ভাবে বলল, “সেদিন…?”
হেম’কে দেখলাম চুপ করে গেছে; কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে শুধু, ও খাপছাড়া ভাবে বলল, “সেদিন…?”
পারো রাগ করে মুখ ঘুরিয়ে নিল জঙ্গলের দিকে। বুঝলাম আমাদের এই কান্নাকাটি খুব একটা বোধগম্য হয়নি ওর।
হেমের দিকে তাকিয়ে দেখি চোখের কোল ফুলে ফুলে উঠেছে ওর; খুব গাঢ় করে চোখের বাইরে দিয়ে কাজল পরে ও, সঅঅব ধেবড়ে গেছে... তবু খুব মিষ্টি দ্যাখাচ্ছে ওকে, বললাম, “ঠিক লাগছে একটু? হুম?”
“হুমম…”, সায় দিল হেম, তারপর খুব ধীরে ধীরে বলল, “রিনি... তুই কখনও ভেবেছিলি যে পারো আর আলোকের রিলেশন’টা বিয়ে অব্দি গড়াবে?”
“হুমম…”, সায় দিল হেম, তারপর খুব ধীরে ধীরে বলল, “রিনি... তুই কখনও ভেবেছিলি যে পারো আর আলোকের রিলেশন’টা বিয়ে অব্দি গড়াবে?”
কে জানে কেন একথা’টা মনে এল ওর! একটু হেসে বললাম, “আমরা কি ভেবেছি তাতে কি আসে যায় ডিয়ার? আমি ভাবিনি, তুই ভাবিস নি, পারো তো ভেবেছে… শী উইশড ফর দ্যাট সো সিনসিয়ারলি… আর সবচে’ বড় কথা কি বল ত? শী হ্যাড দ্য ট্রাস্ট…”
বলতেই কেমন যেন লাগল হঠাত… যেন কথাটা ঘুরে এসে আমারই সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বলছে, ‘দ্যাখো তো, চিনতে পারো...?’
নির্জলা এই সত্যি’টা ভাবিনি যেন এভাবে আগে… আর কিছু তো ছিল না ত্রিসীমানায়… যা যা লাগে বলে ভেবেছিলাম আমরা... কিচ্ছু তো ছিল না...
নির্জলা এই সত্যি’টা ভাবিনি যেন এভাবে আগে… আর কিছু তো ছিল না ত্রিসীমানায়… যা যা লাগে বলে ভেবেছিলাম আমরা... কিচ্ছু তো ছিল না...
পারো খালি বিশ্বাসটুকু রেখেছিল সামলিয়ে… খালি বিশ্বাসটুকু... আমরা পেরেছি কই?
দেখলাম হেম’ও হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে, একই কথা ভাবছে নিশ্চয়ই…
ডানহাত’টা দিয়ে ওর চোখদুটো ঢাকা দিয়ে দিলাম, আর বাঁ হাতের তালুর নিচে রেখে বন্ধ করলাম নিজের চোখদুটো…
তারপর আস্তে আস্তে বললাম, “লেটস ট্রাই এগেন… মেক আ উইশ… …”
তারপর আস্তে আস্তে বললাম, “লেটস ট্রাই এগেন… মেক আ উইশ… …”
[শেষ]
Tag :
একটু বড় গল্প,
ফেরা / চার
By : Sayantari Ghosh
চার
হাসপাতালটা জুড়ে একটি মেয়ের মোলায়েম গলা মাঝেমধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে... একতলার রিসেপসন থেকে সেই কন্ঠস্বর অনাগত অনাহুত ভবিতব্যের কথা ইঙ্গিতে বলে দেয় প্রায়শই...
—“রিলেটভ্স্ অফ দ্য পেশেন্ট ইন বেড নাম্বার ‘দিস’ অফ আই.সি.ইউ আর রিকোয়েস্টেড টু কাম অ্যাট দ্য রিসেপসন। দ্য ডক্টর নিড্স্ টু টক... ইট্স্ অ্যান এমারজেন্সি...”
তিনতলার লাউঞ্জে বসে কান পেতে থাকে দিনরাত-জাগা একদল মানুষ... বুকে শুধু প্রার্থনা... “কোনোভাবে ওই কন্ঠস্বরে যেন ওর নাম না থাকে!!” লাউঞ্জটা বদলায় না... পাঁচদিনে এ ব্যাপারটা খেয়াল করেছে টুপুর... মুখগুলো পালটে যায় খালি... চোখের ক্লান্তি দিনে দিনে বাড়ে... কথাকে সরিয়ে দিয়ে নীরবতা জিতে যায়... তারপর হুট করে একদল মানুষের কালিপড়া মুখ একদিন অদৃশ্য হয়ে যায় লাউঞ্জের ক’টা চেয়ার খালি করে দিয়ে... গল্পের বাকিটুকু বাকিরা বুঝে নেয় বিনা চেষ্টায়... দীর্ঘশ্বাস বলে দেয়, কোন একটি গল্প চিরতরে ফুরিয়ে গেছে...!
টুপুর আর শুভ হাসপাতালে পা রাখা মাত্র ভীষণ শব্দ করে একটা বাজ পড়ল কোথাও... একেবারে ভিতরে কোথাও একটা রিন্রিনে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল যেন... আর সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নেমে গেল... যেন ওদের জন্যই পুরো ব্যাপারটা থেমে ছিল এতক্ষণ।
এগিয়ে গিয়ে একটা খালি চেয়ারে বসল টুপুর। শুভকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিলেন প্রভাসকাকু; বোধহয় বিলিং সেকশনে যেতে হবে! এদিকে তিনটে থেকে ভিজিটিং আওয়ার। পুরো সময়টাতে জাস্ট একজনকে ঢুকতে দেয়... কথা নয়, ছোঁয়া নয়, শুধু এককোনে দাঁড়িয়ে দেখা আর ফিরে আসা... তবুও... দেখতে ইচ্ছে টুপুরেরও করেছে, বার বার। কিন্তু............ হয় নি!
মাথাটাকে দুহাত দিয়ে ধরে মেঝের টাইল্সে চোখ রাখল টুপুর। আজ আবার হয়তঃ বড়পিসি যেতে চাইবে। দেখে এসে আবার কান্নাকাটি করবে। কাউকে ওভাবে কাঁদতে দেখলে ভয়ানক অসহায় লাগে নিজেকে... খুব খুব রাগ হয়... অথচঃ কার ওপরে রাগ, সেটাই ঠিক বোঝা যায় না!
কাঁধে একটা ছোঁয়া পেয়ে চোখ খুলল টুপুর। বাপি।
—“কিছু বলবে বাপি?”
আস্তে আস্তে হাতটা ওর মাথায় দিল বাপি, “আজ যাবি তুই ভিতরে? দেখে আসবি একবার?”
চুপ করে বাপির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল টুপুর; তারপর হাত বাড়িয়ে বাপির হাতটা শক্ত করে ধরল...
মাঝেমাঝে কি করে কে জানে বাপি এত বোঝে ওকে? কি করে কে জানে এত হিসেবের মাঝেও ওর মনের এতটুকু ভালোলাগার কথা মনে রাখে...? এখনও মাঝে মাঝে তাই ছোট্টবেলার মত বলে উঠতে ইচ্ছে করে, “আমি আমার বাপির মতন হব!” মনে মনে নয়... জোরে বলে উঠতে ইচ্ছে করে...!
মাঝেমাঝে কি করে কে জানে বাপি এত বোঝে ওকে? কি করে কে জানে এত হিসেবের মাঝেও ওর মনের এতটুকু ভালোলাগার কথা মনে রাখে...? এখনও মাঝে মাঝে তাই ছোট্টবেলার মত বলে উঠতে ইচ্ছে করে, “আমি আমার বাপির মতন হব!” মনে মনে নয়... জোরে বলে উঠতে ইচ্ছে করে...!
—“এখন তো সবে দেড়টা... একটু রেস্ট করে নে... চুপ করে চোখ বন্ধ করে থাক একটু... ঘুম এলে ঘুমিয়ে নে... আমি ডেকে দেব ঠিক সময়ে...”, বলে আলতো করে একটু হাসলো বাপি।
কোণের চেয়ারটায় বসে দেয়ালজোড়া কাঁচটার দিকে চোখ ফেরালো টুপুর... গোটা দেয়ালটা জুড়ে আল্পনার খেলায় মেতেছে বৃষ্টি... বাকি সব ভুলে গিয়ে, স্মৃতি হাতড়িয়ে, কারো খুব চেনা মুখ আঁকতে চাইছে যেন জলছবি করে... এরকম বৃষ্টি দেখলেই ছুটে গিয়ে ভিজতে ইচ্ছে করে... মনে হয় সবটুকু কালি মুছে যাবে তাহলেই... অপেক্ষা, দুশ্চিন্তা, হিসেব, প্রমাণ— এসব কালো শব্দগুলো সব ধুয়ে যাবে... কাঁচের ওপার থেকেই চোখের ওপর দিয়ে ভেজা হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো... একটা শান্তি আস্তে আস্তে পেয়ে বসছিল যেন... শান্তি না কি ক্লান্তি কে জানে... কিন্তু বেশ লাগছিল ডুবে যেতে...
চোখ বন্ধ করল টুপুর... দাদুমনি ঠিক আছে আজ... আজই ও দেখে আসবে একবার... কে জানে দাদুমনি জেগে থাকবে কি না... ওকে দেখলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে... যদি কিছু বলা যায়, কি বলবে টুপুর...? কি বললে দাদুমনি আরও জোর পাবে মনে...? নাঃ থাক... কিছু বলবে না... শুধু থাম্বস্ আপ... একবার...
ভেবেই ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি খেলে গেল... একটা অকারণ ভালোলাগা মনের দখল নিয়ে নিল আস্তে আস্তে... আর বহুযুগ ধরে নির্বাসনে থাকার পর একটুকরো ঘুম কোত্থেকে এসে জড়িয়ে ধরল চোখদুটোকে...
ভেবেই ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি খেলে গেল... একটা অকারণ ভালোলাগা মনের দখল নিয়ে নিল আস্তে আস্তে... আর বহুযুগ ধরে নির্বাসনে থাকার পর একটুকরো ঘুম কোত্থেকে এসে জড়িয়ে ধরল চোখদুটোকে...
......................................................................................................................
—“দিদিভাই!”, কে যেন ঝাঁকুনি দিল টুপুরের ডানহাতটা ধরে, “সি.সি.ইউ, বারো নম্বরের বাড়ির লোককে ডাকছে নিচে রিসেপশনে... বাপি একা চলে গেল... তুই যা দিদিভাই...”
নূপুরের চোখ জুড়ে খালি উদ্বেগ আর উদ্বেগ... যন্ত্রচালিতের মত উঠে দাঁড়াল টুপুর... নূপুরকে দেখে মনে হল ভরসা, শুধু একটু ভরসা ও খুঁজছে বেপরোয়া হয়ে... কি বলা যায়? কিছু কি বলা যায়? গলা কেঁপে গেলে.........?
হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরল টুপুর...
—“ভয় পাস না... কিচ্ছু হবে না... যাচ্ছি আমি...”
—“ভয় পাস না... কিচ্ছু হবে না... যাচ্ছি আমি...”
ছুট! ছুট! ছুট!
লিফটটা ছয় আর সাততলার মাঝামাঝি কোথাও ঘুরপাক খাচ্ছে...
সিঁড়ি...??? সিঁড়িটা যেন কোনদিকে...?!
লিফটটা ছয় আর সাততলার মাঝামাঝি কোথাও ঘুরপাক খাচ্ছে...
সিঁড়ি...??? সিঁড়িটা যেন কোনদিকে...?!
রিসেপসনের সামনে বাপিকে দেখা গেল বটে... সামনে থমথমে মুখে ডক্টর পারেখ্... তিনতলা থেকে নেমে আসতে তিন মিনিটও লাগেনি টুপুরের... অথচঃ এই কুড়ি পা দূর,বহু বহু দূর মনে হচ্ছিল যেন...
দু-চার পা দূর থেকেই টুকরো কিছু কথা উড়ে আসতে লাগল কানে, “... আণ্ড দেন সাড্নলি হি ওয়াস স্ট্রাগলিং...... উই ট্রায়েড আওয়ার লেভেল বেস্ট... বাট উনি পারছিলেন না... তাই ফাইনালি আমরা বাধ্য হয়েই... উই নেভার প্রেফার দিস ওভার এনি আদার অপ্শন... বাট...”
আর পারা গেল না...
—“কি হয়েছে বাপি? কি...?”
—“কি হয়েছে বাপি? কি...?”
কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে একটা মাত্র শব্দ বলল বাপি,
—“ভেন্টিলেশন!”
—“ভেন্টিলেশন!”
...........................................................................................
ভীষণ শব্দ করে একটা বাজ পড়ল কোথাও... একেবারে ভিতরে কোথাও একটা রিন্রিনে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল যেন... !!
Tag :
একটু বড় গল্প,
আবার যদি ইচ্ছে কর / চার
By : Sayantari Ghoshচার
“পারো’টা বেশ বদলে গেছে, বল?”
প্রশ্ন’টা হেম করল আমাকে।
ডিপার্টমেন্ট অফ স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ারের পাশ দিয়ে যে রাস্তা’টা জঙ্গলের দিকে নেমে গেছে, তার মুখেই একটা বাঁধানো বেঞ্চে বসে আছি আমরা দু’জন। পাশটাতেই সেই কবেকার শিশুগাছ’টা… রাস্তায় মেঘ ফেটে ফালি ফালি রোদ এসে পড়েছে এখন। আমরা ছায়াতে, পায়ের কাছে গোল গোল রোদের মোজাইক করা ধূলোমাটি…
সামনে, একটু দূরে, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পারো ফোনে কথা বলছে আলোকের সাথে। আগের সাথে অনেক তফাত্ এখন… এস.টি.ডি.ও সস্তা হয়ে গেছে আগের চেয়ে আর ব্যালান্সও অনেক বেড়ে গেছে মোবাইলে…
ডিপার্টমেন্ট অফ স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ারের পাশ দিয়ে যে রাস্তা’টা জঙ্গলের দিকে নেমে গেছে, তার মুখেই একটা বাঁধানো বেঞ্চে বসে আছি আমরা দু’জন। পাশটাতেই সেই কবেকার শিশুগাছ’টা… রাস্তায় মেঘ ফেটে ফালি ফালি রোদ এসে পড়েছে এখন। আমরা ছায়াতে, পায়ের কাছে গোল গোল রোদের মোজাইক করা ধূলোমাটি…
সামনে, একটু দূরে, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পারো ফোনে কথা বলছে আলোকের সাথে। আগের সাথে অনেক তফাত্ এখন… এস.টি.ডি.ও সস্তা হয়ে গেছে আগের চেয়ে আর ব্যালান্সও অনেক বেড়ে গেছে মোবাইলে…
পারোর কাছে তার বিবাহ অভিযানের লাইল-বাই-লাইন বর্ণনা শুনছিলাম গত ঘন্টাখানেক ধরে; গল্প শেষ হয়েছে এইমাত্র। বুঝতে পারলাম হেমের প্রশ্ন’টা সেই সূত্র ধরেই। সত্যি সত্যি গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল আমারো।
ভাবতেই পারছিলাম না…!
যে মেয়েটাকে কোনোদিন তার বাবার কাছে ফোনে 'আচ্ছা' আর 'হ্যাঁ' ছাড়া কিছু বলতে শুনিনি, যে মেয়েটা চুপ করে বসে থাকতে থাকতে কি জানি কিসের ভয়ে হঠাত্ কেঁদে ফেলত মাঝেমাঝে, বাড়িতে আলোকের কথা জানলে কি হবে, একথা যেদিন ভাবতে বসতো, সেদিন মাঝরাত পেরিয়ে যাওয়ার পর টের পেতাম চুপিচুপি নিজের বিছানা ছেড়ে আমার পাশে এসে শুয়ে ঘুমিয়েছে কোনোমতে… ভাবতেই পারছিলাম না যে এ গল্প’টার মুখ্য চরিত্র’টি সে! ইউনিভার্সিটির পর গুরগাঁও’এ চাকরি, সেই চাকরির ভরসায় বাড়িতে সবাইকে বিয়েতে রাজি করানো, তারপর কতদূরে বীরভূমের কোন গ্রামে এসে আলোকের বাড়িতে সবার সাথে আলাপ করা, আর আজ সগর্বে বলা যে ‘কার্ড এখন প্রেসে…’… টুকরো টুকরো এ গল্প আমরা জানতাম বটে, কিন্তু, এইভাবে, এক তোড়ে, একটানা শুনে মনেই হচ্ছিল না যে এই পারো নিজেকেই সামলাতে পারত না একসময়ে… আর এখন…
যে মেয়েটাকে কোনোদিন তার বাবার কাছে ফোনে 'আচ্ছা' আর 'হ্যাঁ' ছাড়া কিছু বলতে শুনিনি, যে মেয়েটা চুপ করে বসে থাকতে থাকতে কি জানি কিসের ভয়ে হঠাত্ কেঁদে ফেলত মাঝেমাঝে, বাড়িতে আলোকের কথা জানলে কি হবে, একথা যেদিন ভাবতে বসতো, সেদিন মাঝরাত পেরিয়ে যাওয়ার পর টের পেতাম চুপিচুপি নিজের বিছানা ছেড়ে আমার পাশে এসে শুয়ে ঘুমিয়েছে কোনোমতে… ভাবতেই পারছিলাম না যে এ গল্প’টার মুখ্য চরিত্র’টি সে! ইউনিভার্সিটির পর গুরগাঁও’এ চাকরি, সেই চাকরির ভরসায় বাড়িতে সবাইকে বিয়েতে রাজি করানো, তারপর কতদূরে বীরভূমের কোন গ্রামে এসে আলোকের বাড়িতে সবার সাথে আলাপ করা, আর আজ সগর্বে বলা যে ‘কার্ড এখন প্রেসে…’… টুকরো টুকরো এ গল্প আমরা জানতাম বটে, কিন্তু, এইভাবে, এক তোড়ে, একটানা শুনে মনেই হচ্ছিল না যে এই পারো নিজেকেই সামলাতে পারত না একসময়ে… আর এখন…
“বদলে গেছে বলিস না…” হেম’কে বললাম হেসে, “বল, বড় হয়ে গেছে মেয়ে’টা…”
তা নয়তঃ কি? নিজেই বলে চললাম মনে মনে... বড় হওয়া মানে নিজেকেই চেনা বেশী করে...
আর নিজেকে শুধরে নেওয়া পদে পদে শুধু... খুব প্রিয় ভুল’দের মুছে দেওয়া ইরেজার ঘষে... কত দাবী জন্মায়, আর কত অজস্র মরে যায় এই পথে... বড় হতে গিয়ে...
আর নিজেকে শুধরে নেওয়া পদে পদে শুধু... খুব প্রিয় ভুল’দের মুছে দেওয়া ইরেজার ঘষে... কত দাবী জন্মায়, আর কত অজস্র মরে যায় এই পথে... বড় হতে গিয়ে...
হেম'ও হাসল আমার কথা’টা শুনে। আসলে আমরা দুজনেই জানি যে পারো আর আলোকের গল্প’টাতে যে এরকম একটা দিন আসতে পারে, আমরা ভাবিনি। ভেবেছিলাম, এভাবেই দশ মিনিটের ফোন, গোটা রাতজাগা, কান্নাকাটি, ভয়, অভিমান আর না-বলে ওঠা গুচ্ছের এক্সপেকটেশন নিয়েই গল্প’টা ফুরিয়ে যাবে একদিন। পরিনতি’টা আমাদের চোখে স্পষ্ট ছিল জলের মত। খারাপ লাগত খুব পারো’টার জন্যে। কিন্তু ওকে দোষ দিতে পারতাম না একটুও। আলোক’কে তো কখনও দেখিনি আমরা। তারই একরকম সুযোগ নিয়ে এই খারাপ লাগার সমস্ত দায়, নিজেদের এই হাত-পা-বাঁধা অবস্থার সবটুকু ফ্রাস্ট্রেশন সোজা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতাম।কখনও আমি বলিনি হেম’কে, হেমও বলেনি কখনও… কিন্তু দুজনে’ই বুঝতে পারতাম যে এ কাহিনীর শেষ নিয়ে আমরা মনে মনে মোটামুটি একমত। আমাদের ভোলামন বান্ধবী’টি যে এইভাবে আমাদের ভুল প্রমাণ করে দেবে কক্ষনো ভাবিনি।
ফোন শেষ। পারো ফিরছে। রাস্তার সোনা-সোনা রোদে ওকে আলোর পুতুল মনে হচ্ছে একটা। আলোয় আলো পারো… চোখে আলো, কপালে আলো, বুকে আলো, পায়ের তলাতে আলো… প্রতিটি চলাতে আলো…
“তোর কথাই হচ্ছিল মিস”, হেম বলল পারো’কে, “ঠিক কি বললে যে তোকে একটা যুত্সই ‘ব্রাভো’ বলা হবে ভেবে পাচ্ছি না আমরা…”
“কিছু বলতে হবে না”, হাসিতে আরেকচোট রোদ ছড়িয়ে পারো বলল, “একটা কাজ করে দ্যাখা দেখিনি… মেক আ লাভ স্টোরি অফ ইয়োর ওন টু কমপিট উইথ মি…”
হো হো করে হেসে উঠলাম তিনজনেই, হেম বলে উঠল, “আরে আমি আট লিস্ট ট্রাই তো করেছি… রিনিটা কে দ্যাখ… কাম অন সুইটি, গেট ইন্সপাইয়ার্ড…”
“শোন শোন”, পারো বলে উঠল আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে, “দ্যাখ এই মেয়ে আমায় কি মেসেজ করেছিল হোয়েন আই টোল্ড হার দ্য সেম থিং… হিয়ার ইট ইস… লিস্ন্…”, খচখচ করে মোবাইলের ইনবক্স খুলে একটা মেসেজ পড়তে লাগল পারো, বাধা দিলাম, বারণ করলাম, শুনলোই না…
“কিছু বলতে হবে না”, হাসিতে আরেকচোট রোদ ছড়িয়ে পারো বলল, “একটা কাজ করে দ্যাখা দেখিনি… মেক আ লাভ স্টোরি অফ ইয়োর ওন টু কমপিট উইথ মি…”
হো হো করে হেসে উঠলাম তিনজনেই, হেম বলে উঠল, “আরে আমি আট লিস্ট ট্রাই তো করেছি… রিনিটা কে দ্যাখ… কাম অন সুইটি, গেট ইন্সপাইয়ার্ড…”
“শোন শোন”, পারো বলে উঠল আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে, “দ্যাখ এই মেয়ে আমায় কি মেসেজ করেছিল হোয়েন আই টোল্ড হার দ্য সেম থিং… হিয়ার ইট ইস… লিস্ন্…”, খচখচ করে মোবাইলের ইনবক্স খুলে একটা মেসেজ পড়তে লাগল পারো, বাধা দিলাম, বারণ করলাম, শুনলোই না…
….. মেসেজটায় লিখেছিলাম কোনো এক অস্থির বিকেলে,
“জানিনা রে! আসলে খুব অনেস্টলি বলতে গেলে, যখন ভাবা যেত, যখন সুযোগ ছিল, তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা’টা কেন জরুরি, বুঝিনি আমি। ভেবেছিলাম, যে পাশে আছে, আর থাকবে জীবনভর এমন দাবীও করে, কেন সে সম্পর্কের নাম এক্ষুনি ভেবে ফেলতে হবে? কি দরকার? সারা’টা জীবন তো রয়েছে পড়ে… পরে দেখলাম, সে যখন উত্তর চেয়েছিল, নিজের জীবনের ভাগ বাঁটোয়ারা করছিল তখন আসলে। আমিও ঘাড় নেড়ে দিয়েছি আর সেও আমার ভাগের তার জীবনটাকে কেটেছেঁটে এত্তটুকু করে দিয়েছে…”
“জানিনা রে! আসলে খুব অনেস্টলি বলতে গেলে, যখন ভাবা যেত, যখন সুযোগ ছিল, তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা’টা কেন জরুরি, বুঝিনি আমি। ভেবেছিলাম, যে পাশে আছে, আর থাকবে জীবনভর এমন দাবীও করে, কেন সে সম্পর্কের নাম এক্ষুনি ভেবে ফেলতে হবে? কি দরকার? সারা’টা জীবন তো রয়েছে পড়ে… পরে দেখলাম, সে যখন উত্তর চেয়েছিল, নিজের জীবনের ভাগ বাঁটোয়ারা করছিল তখন আসলে। আমিও ঘাড় নেড়ে দিয়েছি আর সেও আমার ভাগের তার জীবনটাকে কেটেছেঁটে এত্তটুকু করে দিয়েছে…”
“উফফফ… আ লঅঅঅং বাউন্সার…” মেসেজ পড়া শেষ করে ফোন’টা ব্যাগে পুরলো পারো।
বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি। চোখদুটো বন্ধ করে ফেললাম। কানদুটোতে হাত চাপা দিতে ইচ্ছে করল খুব! মনে হল মাথার ভেতরের ঘরটার সমস্ত জানলার শাটারগুলো ভীষণ শব্দ করে কেউ বন্ধ করে দিচ্ছে একে একে, অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে চারদিক… আর আমি একটা দেওয়ালজোড়া ফ্রেমে-বাঁধা ছবির সামনে একা দাঁড়িয়ে আছি… নর্মদা আর সাবরমতির মাঝের সেই ঝুপসি অন্ধকার, আকাশে মৃতপ্রায় চাঁদ মেঘঢাকা দিয়ে শুয়ে, জংলা ফুলের গন্ধে মাতাল রাস্তা… হাতের কব্জি’তে মোচড়… ‘লাগছে রুদ্র, লাগছে!’… … ‘ভালবাসিস না রিনি? বল??’… … ‘বলেছি তো না... না, না, না’ … … জোরালো প্রশ্ন আর গোয়ার্তুমির উত্তর… …
মাথা নিচু করে বসে রইলাম চুপ করে। পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, একজোড়া চোখ আমার পাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে… সোজা, একদৃষ্টে… সে দৃষ্টি’তে আবিষ্কারের বিহ্বলতা… আমার বুকের ভেতর এতদিন ধরে লুকিয়ে রাখা ঘরটার খোলনলচে নেড়েচেড়ে দেখছে যেন সে তার সব কৌতূহল দিয়ে…
তোকে যা নির্দ্বিধায় বলা যায়, শুধু একটু শ্বাস নিতে গিয়ে, তুই বুঝবি না, কষ্ট পাবি না এই ভরসায়, হেম’কে কি সে সঅঅব বলতে আছে, পারো? সে যে অভিমানে মরে যাবে তাকে জানাইনি বলে?
জঙ্গলের কোন এক না-দেখা পাখিরও বুঝি মন-আনচান করে উঠল খুব… আকাশ ভাসিয়ে বলে উঠল, ‘পিউ কাঁহা… পিউ কাঁহা… পিউ কাঁহা…’
[ক্রমশঃ]
Tag :
একটু বড় গল্প,
আবার যদি ইচ্ছে কর / তিন
By : Sayantari Ghoshতিন
“এই যে পোস্টম্যানের বউ, তুই কি খাবি লাঞ্চে?” খোঁচা মারলাম হেম’কে, “তোর’ও ওই মিক্সড চাউমিন’ই তো?”
“অঙ্কুর শাহ, হি হ্যাস আ নেম… ও.কে.?” আচমকা বলল হেম, মুখে আলতো হাসি! পারো লাফিয়ে উঠলো কথাটা শুনেই, “উফফফ… জিও! শিগগির লাঞ্চ অর্ডার’টা দিয়ে ছুট্টে আয় রিনি, সামওয়ান ওয়ান্টস টু শেয়ার সাম সিক্রেটস্ আট লাস্ট!!!”
“অঙ্কুর শাহ, হি হ্যাস আ নেম… ও.কে.?” আচমকা বলল হেম, মুখে আলতো হাসি! পারো লাফিয়ে উঠলো কথাটা শুনেই, “উফফফ… জিও! শিগগির লাঞ্চ অর্ডার’টা দিয়ে ছুট্টে আয় রিনি, সামওয়ান ওয়ান্টস টু শেয়ার সাম সিক্রেটস্ আট লাস্ট!!!”
এক্কেবারে চমকে গেছিলাম আমিও; চিরকাল জানতাম, হেম যে ছেলেটির সাথে চ্যাট করত ক্লাস ফাঁকি দিয়ে, আসাইনমেন্ট ডুব মেরে, তার নাম-ধাম-কাজকাম কিছুই সে জানেনা। আরও অবাক হতাম এটা দেখে যে ও জানতেও চায় না! ছেলেটির চ্যাট আই.ডি. ছিল ‘দ্য পোস্টম্যান’… ব্যাস! আর কোন পরিচয় ছিল না তার আমাদের কাছে।
কিন্তু কি নিয়ে না কথা হত ওদের? সকালের চায়ে চিনি কম থেকে বিকেলে লোহিতের ছাদ থেকে সূর্যাস্ত, পরীক্ষায় দ্যাখাদেখি করে লেখা থেকে ভি.সি. কে ঘেরাও করতে গিয়ে হেম আর রুদ্র’র সাসপেন্ড হওয়া… যাবতীয় গল্প হেম করতো তার সাথে। মনখারাপ, মনভালো, অভিমান, স্বপ্ন কিচ্ছু বাদ যেত না।বাদ যেত খালি স্থান-কাল-পাত্রের পরিচয়গুলো। সে ছেলেও নাকি বহু কিছু বলত খোলামনে আর হেমের কাছে এই ‘খোলামন’ শব্দ’টা বরাবর খুব গুরুত্ব রাখত; ও বলত, দুটো মানুষের ‘স্ফিয়ার অফ ইনফ্লুয়েন্স’-এ থাকা চরিত্রগুলো যদি একটুও না মেলে, তাহলে সেই দুটি মানুষের বন্ধুত্বে কোন রাখঢাক থাকে না… আর সেই বিশ্বাস থেকে একটা অদ্ভূত ভরসা পাওয়া যায়… পরস্পরের প্রতিটি মতামত’কে গুরুত্ব না দিয়ে, না ভেবে বাতিল করা যায় না কিছুতেই।
ইউনিভার্সিটি’তে, ক্লাসে বা রাজনীতির সূত্রে অনেকের সাথে হেম’কে মিশতে দেখেছি; কিন্তু ‘পোস্টম্যান’ ছাড়া কাউকে নিয়ে ওকে এত’টা গভীরভাবে ভাবতে দেখিনি, সেটা সত্যি। ওর কথা শুনে মনে হত, যে ওর মত একটি মেয়ের উচ্ছ্বলতা বা স্পর্ধা’টাকে খোলাখুলি প্রশ্র্য় দিত ছেলেটি; সে সাহস সবার থাকেনা। কিন্তু ওদের এই আড়াল রাখা, পর্দানশীন ফিলোসফিকাল বন্ধুত্ব’টা একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কেন, তার কোন ব্যাখ্যা পেতাম না কিছুতেই। ফলে এতদিন পর পোস্টম্যানের অঙ্কুর শাহ পদে উত্তরণের খবর শুনে ঠিক কত’টা খুশি হলাম আর কতটা অবাক, নিজেই মেপে উঠতে পারলাম না ঠিকমত।
কিন্তু কি নিয়ে না কথা হত ওদের? সকালের চায়ে চিনি কম থেকে বিকেলে লোহিতের ছাদ থেকে সূর্যাস্ত, পরীক্ষায় দ্যাখাদেখি করে লেখা থেকে ভি.সি. কে ঘেরাও করতে গিয়ে হেম আর রুদ্র’র সাসপেন্ড হওয়া… যাবতীয় গল্প হেম করতো তার সাথে। মনখারাপ, মনভালো, অভিমান, স্বপ্ন কিচ্ছু বাদ যেত না।বাদ যেত খালি স্থান-কাল-পাত্রের পরিচয়গুলো। সে ছেলেও নাকি বহু কিছু বলত খোলামনে আর হেমের কাছে এই ‘খোলামন’ শব্দ’টা বরাবর খুব গুরুত্ব রাখত; ও বলত, দুটো মানুষের ‘স্ফিয়ার অফ ইনফ্লুয়েন্স’-এ থাকা চরিত্রগুলো যদি একটুও না মেলে, তাহলে সেই দুটি মানুষের বন্ধুত্বে কোন রাখঢাক থাকে না… আর সেই বিশ্বাস থেকে একটা অদ্ভূত ভরসা পাওয়া যায়… পরস্পরের প্রতিটি মতামত’কে গুরুত্ব না দিয়ে, না ভেবে বাতিল করা যায় না কিছুতেই।
ইউনিভার্সিটি’তে, ক্লাসে বা রাজনীতির সূত্রে অনেকের সাথে হেম’কে মিশতে দেখেছি; কিন্তু ‘পোস্টম্যান’ ছাড়া কাউকে নিয়ে ওকে এত’টা গভীরভাবে ভাবতে দেখিনি, সেটা সত্যি। ওর কথা শুনে মনে হত, যে ওর মত একটি মেয়ের উচ্ছ্বলতা বা স্পর্ধা’টাকে খোলাখুলি প্রশ্র্য় দিত ছেলেটি; সে সাহস সবার থাকেনা। কিন্তু ওদের এই আড়াল রাখা, পর্দানশীন ফিলোসফিকাল বন্ধুত্ব’টা একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কেন, তার কোন ব্যাখ্যা পেতাম না কিছুতেই। ফলে এতদিন পর পোস্টম্যানের অঙ্কুর শাহ পদে উত্তরণের খবর শুনে ঠিক কত’টা খুশি হলাম আর কতটা অবাক, নিজেই মেপে উঠতে পারলাম না ঠিকমত।
ঝপ করে লাঞ্চ’টা অর্ডার করে এসে, বেশ জমিয়ে বসে পড়ে বললাম, “ফাটাফাটি একটা গল্প শোনা হবে মনে হচ্ছে!”
“শুরু কর, মিস ছুপা রূস্তম”, পারো বলল খুনসুটি করে।
এক গাল হেসে হেম শুরু করল, “গল্প’টা কিন্তু একেবারেই তেমন কিছু না…”
“আর ভূমিকা করতে হবে না, বলে ফ্যাল তাড়াতাড়ি” সমস্বরে বললাম আমরা।
“শুরু কর, মিস ছুপা রূস্তম”, পারো বলল খুনসুটি করে।
এক গাল হেসে হেম শুরু করল, “গল্প’টা কিন্তু একেবারেই তেমন কিছু না…”
“আর ভূমিকা করতে হবে না, বলে ফ্যাল তাড়াতাড়ি” সমস্বরে বললাম আমরা।
“ওহহো”, হাসতে হাসতে বলল হেম, “শোন, এখান থেকে বেরিয়ে যখন মুম্বাই গেলাম প্রথম চাকরি’টা নিয়ে এই নামধাম জানা’টা মোটামুটি সেই সময়ের কথা…”
“ঝুঠি, ঝুঠি”, পারো বলে উঠল মাঝপথে, “এত্তদিন ধরে মিথ্যে বলে যাচ্ছে…”
“আরে শেষ তো করতে দে”, বলল হেম, “তা… যখন জানলাম যে অঙ্কুরের বাড়িও মুম্বাইয়ে, তখন ভাবলাম ইট ইস আ নাইস কোইন্সিডেন্স। দ্যাখা করার দিন’টা ঠিকই করে ফেললাম অনেক ভেবেচিন্তে…”
“উফফফফ… কি রোম্যান্টিক…!” পারো টিপ্পনি কাটল।
“ঝুঠি, ঝুঠি”, পারো বলে উঠল মাঝপথে, “এত্তদিন ধরে মিথ্যে বলে যাচ্ছে…”
“আরে শেষ তো করতে দে”, বলল হেম, “তা… যখন জানলাম যে অঙ্কুরের বাড়িও মুম্বাইয়ে, তখন ভাবলাম ইট ইস আ নাইস কোইন্সিডেন্স। দ্যাখা করার দিন’টা ঠিকই করে ফেললাম অনেক ভেবেচিন্তে…”
“উফফফফ… কি রোম্যান্টিক…!” পারো টিপ্পনি কাটল।
একটুও পাত্তা না দিয়ে হেম বলে চলল, “একটা গোটা দিন একসাথে স্পেন্ড করার প্ল্যান করা হল। ফাইনালি দ্য ডে কেম আর যখন দশ’টা নাগাদ গেটওয়ে অব ইন্ডিয়াতে আই ফার্স্ট স হিম… আমার একদম ইনিশিয়াল রিয়াকশন কি ছিল বল ত?”
“কি?”
“কি??”
“……… যে হি ইস নট দ্য গাই…”
“হোয়াআ…?!”
“মানে??!!”
“কি?”
“কি??”
“……… যে হি ইস নট দ্য গাই…”
“হোয়াআ…?!”
“মানে??!!”
আমরা দুজনেই হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম হেমের দিকে!! বলে কি মেয়ে’টা? এতদিন এত কথা, এও গল্প… আর শেষকালে ‘দেখে’ মনে হল যে এ সে নয়…?! হেম অন্ততঃ ঠিক এরকম না… হেম’কে যা চিনি…
“মানে আমায় মিস আন্ডারস্ট্যান্ড করিস না প্লিস…” আমাদের অবস্থাটা বুঝে সামাল দিতে চাইল হেম, “মানে দ্যাখ আমি বোঝাবার চেষ্টা করছি… আমি ওর আপিয়ারেন্সের কথা এক্কেবারে বলছি না… ওর আপ্রোচ… খুব খুব অন্যরকম… মানে আমি এরকম ভাবিনি… সারা’টা দিন কাটালাম আর বারবার আমার এটাই মনে হল যে হয়তঃ আমার সাথে মিশতে গিয়ে আমার যে অংশ’টাকে ও মেনে নিয়েছে, সেটাকে ও নিজের মলাট হিসেবে সাজিয়ে নিয়েছে… আমায় ও পছন্দ করত বলে সেটাকে গায়ে তুলতে ওর সমস্যা হয়নি… ওকে দোষ দিচ্ছিনা আমি; কিন্তু গোলমাল হল যে আমি তো ভুল বুঝেছি পুরোপুরি… আমি তো সেই মলাট’টাকেই পুরো বই’টা ভেবে ফেলেছি… মানে… বুঝতে পারছিস আমি কি বলছি?” সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে হেম বলল; কেমন যেন অসহায় দ্যাখাচ্ছিল ওকে… আর ভীষণ ডেস্পারেট!
“মানে আমায় মিস আন্ডারস্ট্যান্ড করিস না প্লিস…” আমাদের অবস্থাটা বুঝে সামাল দিতে চাইল হেম, “মানে দ্যাখ আমি বোঝাবার চেষ্টা করছি… আমি ওর আপিয়ারেন্সের কথা এক্কেবারে বলছি না… ওর আপ্রোচ… খুব খুব অন্যরকম… মানে আমি এরকম ভাবিনি… সারা’টা দিন কাটালাম আর বারবার আমার এটাই মনে হল যে হয়তঃ আমার সাথে মিশতে গিয়ে আমার যে অংশ’টাকে ও মেনে নিয়েছে, সেটাকে ও নিজের মলাট হিসেবে সাজিয়ে নিয়েছে… আমায় ও পছন্দ করত বলে সেটাকে গায়ে তুলতে ওর সমস্যা হয়নি… ওকে দোষ দিচ্ছিনা আমি; কিন্তু গোলমাল হল যে আমি তো ভুল বুঝেছি পুরোপুরি… আমি তো সেই মলাট’টাকেই পুরো বই’টা ভেবে ফেলেছি… মানে… বুঝতে পারছিস আমি কি বলছি?” সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে হেম বলল; কেমন যেন অসহায় দ্যাখাচ্ছিল ওকে… আর ভীষণ ডেস্পারেট!
“হু, হু, বুঝতে পারছি তো…” খুব পরিষ্কার বুঝলেও সায় দিলাম আমি, “নিজেকে চাপে ফেলিস না হেম, ভালো লাগেনি নিশ্চয়ই কিছু… কি হয়েছে তাতে? হতেই তো পারে…”
পারো’ও মাথা নাড়িয়ে বলল, “বুঝতে পারছি আমরা…”
পারো’ও মাথা নাড়িয়ে বলল, “বুঝতে পারছি আমরা…”
“থ্যাঙ্কস”, একটু যেন ঠান্ডা হল হেম, “মানে খুউউব ছোট ছোট ব্যাপার থেকে অনেক বড় বড় ব্যাপার অব্দি… ধর, এই যে আমার ফিল্ম ক্রিটিকের ট্রেনির চাকরিটা, এটা যে এম্নিই, আমি যে এরপর সিরিয়াসলি লেখালিখি’টা করতে চাই… মানুষের কথা লিখতে চাই, সারা দেশ বেড়াতে চাই, মানুষের সাথে মিশতে চাই… বা ধর আমাদের ইউনিভার্সিটির মশাল র্যা লি বা হাঙ্গার স্ট্রাইক, তার দাবীগুলো, যা ন্যায্য, যা প্রাপ্য, তার কথা জোর গলায় বলা, যেমন আমি বলতাম, রুদ্র বলত… অঙ্কুর এ’সব খুব মন দিয়ে শোনে, কিন্তু সেগুলো ভুলতে ওর কয়েক’টা সেকেন্ড লাগে মাত্র… চ্যাটে, ও যে শুনছে সেটা বুঝতে পারতাম ভীষণভাবে, মন’টা ভরে যেত ভালোলাগায়, জানিস? কিন্তু সামনে থেকে ওর ভুলে যাওয়া’টাই যেন খালি খালি চোখে পড়তে লাগল…”
পারো আস্তে করে হাত’টা রাখল হেমের মাথায়, বলল, “আমরা বুঝতে পারছি সোনা…”
পারো আস্তে করে হাত’টা রাখল হেমের মাথায়, বলল, “আমরা বুঝতে পারছি সোনা…”
একমিনিট চুপ করে চোখ বন্ধ করে রইল হেম; তারপর হঠাত্ ঝিলিক দেওয়া হাসি হেসে চোখদুটো মুছে নিল একবার, বলল, “সো… দ্যাটস দ্য স্টোরি… আর দেয়ার ইস নাথিং স্যাডি স্যাডি ইন ইট রাইট নাও…”
“গ্রেট!”, পারো বলল, “আরে কিঁউ সোচে ইয়ে দিল কে আগে কয়া হোগা, ’গর কুছ নহি হোগা তো তজর্বা হোগা…”
“গ্রেট!”, পারো বলল, “আরে কিঁউ সোচে ইয়ে দিল কে আগে কয়া হোগা, ’গর কুছ নহি হোগা তো তজর্বা হোগা…”
সব্বাই হেসে ফেললাম। হেম’কে হাসতে দেখে ভাল্লাগছিল। ওকে যেটুকু চিনি, হাসিটা দেখে এটুকু বুঝছিলাম যে, কান্না-চাপা-হাসি এটা নয় অন্ততঃ, বললাম, “হ্যাঁ রে, অঙ্কুর জিগেস করেনি পরে কিছু?”
হেম চোখদুটোয় একটা দুস্টুমি খেলিয়ে বলল, “আই টোল্ড হিম দ্যাট আই লাভ সাম ওয়ান এলস…”
“যা তা…” হাসতে হাসতে বললাম আমি।
“উফফফ, আই আম রিয়েলি মিসিং রুদ্র নাও”, হাসতে হাসতে চোখে জল এনে ফেলে বলল পারো, “হেমের পিছনে লাগার ব্যাপারটাতে কিন্তু ও বরাবরের চ্যাম্পিয়ন… হি মিস্ড্ আ ফ্যাবিউলাস চান্স টুডে…”
দু’হাতে মুখ ঢাকল হেম।
“মিক্সড চাউমিন, চিক্কেন মাঞ্চুরিয়ন, গুলাব জামুন… টেবিল নাম্বার বাইইইস…” হাঁক পাড়লো ক্যান্টিনের ছোটু।
হেম চোখদুটোয় একটা দুস্টুমি খেলিয়ে বলল, “আই টোল্ড হিম দ্যাট আই লাভ সাম ওয়ান এলস…”
“যা তা…” হাসতে হাসতে বললাম আমি।
“উফফফ, আই আম রিয়েলি মিসিং রুদ্র নাও”, হাসতে হাসতে চোখে জল এনে ফেলে বলল পারো, “হেমের পিছনে লাগার ব্যাপারটাতে কিন্তু ও বরাবরের চ্যাম্পিয়ন… হি মিস্ড্ আ ফ্যাবিউলাস চান্স টুডে…”
দু’হাতে মুখ ঢাকল হেম।
“মিক্সড চাউমিন, চিক্কেন মাঞ্চুরিয়ন, গুলাব জামুন… টেবিল নাম্বার বাইইইস…” হাঁক পাড়লো ক্যান্টিনের ছোটু।
[ক্রমশঃ]
Tag :
একটু বড় গল্প,
ফেরা / তিন
By : Sayantari Ghoshতিন
থালার ভাতগুলো কে নিয়ে খালি নাড়াচাড়া করছিল টুপুর; আজ যে কেন খেতে ইচ্ছে করছে না কে জানে... হঠাত্ টেবিলের ওপাশে চোখ পড়তেই দেখল শুভ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও তাকাতেই থেমে থেমে বলল, “একদানা খেলি না কিন্তু! কি হয়েছে বলতো? দাদুমনি তো অনেক ঠিক আছে আজ... মুড ঠিক কর, টুপুর... খা!”
এক গ্রাস ভাত তুলে মুখে দিল টুপুর; গোটা গা-টা গুলিয়ে উঠল যেন... নাঃ! পারা যাচ্ছে না! জলের গ্লাসটা তুলে দু-ঢোঁক জল খেল ও...
—“কি রে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”, এবার শাসনের জায়গায় উদ্বেগ শুভর গলায়, “থাক, জোর করিস না!অন্য কিছু খাবি? কোল্ডড্রিঙ্কস? বা আখের রস...? আনব?”
—“না রে... জাস্ট খিদেটা নেই এখন... খিদে পেলে পরে খেয়ে নেব আমি...”
শুভ আবার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে; তারপর বলল, “বেশ... চল, উঠি তাহলে... তুই বেরিয়ে দাঁড়া, আমি দামটা মিটিয়ে আসছি...”
দোকানটার থেকে বেরিয়ে এল টুপুর। হাসপাতাল থেকে এটা ওই মিনিট কুড়ির হাঁটা পথ।
পিছন ফিরে দেখল, ক্যাশ কাউন্টারের সামনের ভিড়টায় শুভকে দেখা যাচ্ছে। ও এসেছে আজ ভোরে। ভোর না বলে অবশ্য ভোররাত বলা উচিত... পৌনে চারটে-টাকে বোধহয় তাই-ই বলে। কাল রাত সাড়ে বারোটায় শহরে ফিরেছে ও... দিল্লি গেছিল... ইন্টারভিউ ছিল একটা...।
পিছন ফিরে দেখল, ক্যাশ কাউন্টারের সামনের ভিড়টায় শুভকে দেখা যাচ্ছে। ও এসেছে আজ ভোরে। ভোর না বলে অবশ্য ভোররাত বলা উচিত... পৌনে চারটে-টাকে বোধহয় তাই-ই বলে। কাল রাত সাড়ে বারোটায় শহরে ফিরেছে ও... দিল্লি গেছিল... ইন্টারভিউ ছিল একটা...।
দাদুমনির খবরটা একরকম ইচ্ছে করেই শুভকে জানাতে দেয় নি টুপুর। প্রভাসকাকুকে নিজে গিয়ে বলেছিল, “কাকু, শুভকে জানিও না, প্লিজ... একেবারে ডিস্টার্বড হয়ে যাবে...”
টুপুর জানত, শুভ ফিরে এসে বাইরে বাইরে রাগ করবে, মেজাজ দেখাবে আর ভিতরে গুমরে মরবে... ভীষণ ভীষণ মনখারাপ করবে... কিন্তু ওকে তো আর এই আজ হঠাত্ করে দেখছে না টুপুর! সেই যখন ও ক্লাস ফাইভে, তখন প্রভাসকাকু ঝাঁঝা থেকে বদলি হয়ে এখানে এলেন বাপির অফিসে। সেই থেকে একসাথে ওরা... ক্লাসগুলো বদলে গেছে... ফাইভ, সেভেন, নাইন, ইলেভন... তারপর স্কুল বদলে গেছে কলেজে... কমেডি-ট্র্যাজেডি সবের আদল বদলে গেছে ধীরে ধীরে... মুখ আর নাম বার বার বদলেছে... সব পেরিয়ে একসাথে ওরা...
টুপুর জানত, শুভ ফিরে এসে বাইরে বাইরে রাগ করবে, মেজাজ দেখাবে আর ভিতরে গুমরে মরবে... ভীষণ ভীষণ মনখারাপ করবে... কিন্তু ওকে তো আর এই আজ হঠাত্ করে দেখছে না টুপুর! সেই যখন ও ক্লাস ফাইভে, তখন প্রভাসকাকু ঝাঁঝা থেকে বদলি হয়ে এখানে এলেন বাপির অফিসে। সেই থেকে একসাথে ওরা... ক্লাসগুলো বদলে গেছে... ফাইভ, সেভেন, নাইন, ইলেভন... তারপর স্কুল বদলে গেছে কলেজে... কমেডি-ট্র্যাজেডি সবের আদল বদলে গেছে ধীরে ধীরে... মুখ আর নাম বার বার বদলেছে... সব পেরিয়ে একসাথে ওরা...
টুপুর জানে, শুভ পারত না, সব ফেলে ছুটে চলে আসত...! যেমন আজ ভোরে এল!
আজ সারা সকালটা শুভ ছিল এখানেই। বাপিরা আসার পর ডাক্তারের সাথে যা কথা হল তাতে ওদের হিসেবে দাদুমনি ইমপ্রুভ করছে...
—“চ!” পার্সটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে ওর পাশে এসে বলল শুভ, “আরেব্বাবা!! যা সেজেছে আকাশটা... আবার নামাবে মনে হচ্ছে...! চ জলদি! ভিজবো না আমি...”
দুজনে হাঁটা লাগালো। চুপচাপ। আজ সকাল থেকেই কে জানে কেন সেরকম কথাই হয় নি! টুপুর কত ভেবেছিল যে একবার শুভ আসুক... ব্যাস,তাহলে অন্ততঃ আর এই কথা জমিয়ে, দম বন্ধ করে থাকতে হবে না... কিন্তু কোথায়? কথাগুলোর কথা জড়িয়ে গেছে!
আকাশের একটা কোনা বেয়ে ধাপে ধাপে গাঢ় কালচে নীল মেঘ বড় হচ্ছে আস্তে আস্তে... রাস্তার ধুলোয় ছোট্ট ছোট্ট ঘূর্নি... একখানা খবরের কাগজ মাতাল হাওয়ার বেতালা ঘুড়ি হয়ে গেছে যেন... ঝড় উঠবে মনে হচ্ছে... কে জানে তাহলে আর বৃষ্টি হবে কি না...
—“সেই মাছধরা গুলো মনে পড়ছে বল!”, বলল শুভ, “আমি, তুই আর দাদুমনি...উফফফ! কি মজাটাই না হত!”
মনে পড়ছিল টুপুরেরও! তালপুকুরিয়ার ধারে ছিপ হাতে নিয়ে দুখানা কালো ছাতা খুলে উন্মুখ মেঘের দিকে পিছন ফিরে কাটানো সেই লম্বাআআ দুপুরগুলো... গোটা গরমের ছুটিটার প্রায় প্রতিটি দুপুর এভাবেই কেটে যেত সেসময়... তখন শুভরা প্রথম প্রথম এসছে এখানে...
—“হ্যাঁ... আমিও ভাবছিলাম”, হেসে বলল টুপুর, “তবে মাছ ধরা তো নামেই... সব মিলিয়ে কটা মাছ ধরতাম আমরা?”
—“ আররে!? থাকলে তো ধরবি? তালপুকুরিয়ায় মাছ ছিল? থাকার মধ্যে খালি পুঁটি ছিল... সে ত ধরতাম!”
—“যাঃ... রুই-এর পোনা ছিল... আমরা ধরেছি... আর তুই কিছু বলিস না... তুই কোনোকালেই কিছু ধরিসনি... ওই পুঁটি ছাড়া...” বলতে বলতেই হেসে ফেলল টুপুর
—“আমরা মানে কি? অমনি দাদুমনি কে নিজের দলে...না?” ঝুটমুট চোখ পাকিয়ে বলল শুভ।
—“সে তো দাদুমনি আমার দলেই... আর তাছাড়াও আমি ধরেছি... চারাপোনা ধরিনি আমি?”
—“ আররে!? থাকলে তো ধরবি? তালপুকুরিয়ায় মাছ ছিল? থাকার মধ্যে খালি পুঁটি ছিল... সে ত ধরতাম!”
—“যাঃ... রুই-এর পোনা ছিল... আমরা ধরেছি... আর তুই কিছু বলিস না... তুই কোনোকালেই কিছু ধরিসনি... ওই পুঁটি ছাড়া...” বলতে বলতেই হেসে ফেলল টুপুর
—“আমরা মানে কি? অমনি দাদুমনি কে নিজের দলে...না?” ঝুটমুট চোখ পাকিয়ে বলল শুভ।
—“সে তো দাদুমনি আমার দলেই... আর তাছাড়াও আমি ধরেছি... চারাপোনা ধরিনি আমি?”
কথার হারিয়ে যাওয়া খেই আবার ফিরে এল যেন... একযুগ আগের সেইসব দুপুরের বোকাবোকা স্মৃতি মেঘের সাথে মিশে আকাশ ভরাতে লাগল... কেঁচো দিয়ে তৈরি চার... তিন নম্বর বঁড়শি... ফাত্নার আলতো নাচন... আর ঘন্টার পর ঘন্টা সেই নিষ্পলক প্রতীক্ষা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র গল্প... এদেশের বর্ষা আর ওদেশের বর্ষার গল্প... রাতদুপুরে পাগার উপছে আসা জলের তোড়ে কইজালা ফেলে রাশি রাশি কইমাছ ধরার গল্প... সিঙ্গি মাছের কাঁটায় জাল ছেঁড়া আর বোয়াল মাছের গায়ের জোরে হাতে বাঁধা ক্যাঁটার দড়ি সমেত জেলে কে টেনে নিয়ে যাবার গল্প... আর বর্ষা শেষ হলে পর ধানখেত ভর্তি হয়ে ছড়িয়ে থাকা মাছের কাঁটায় পা কেটে যাবার গল্প...
আকাশে মেঘের ওপর মেঘ জমছিল... গল্পের ওপর গল্পও জমে উঠছিল খুব...
ওরা খেলছিল, তর্ক করছিল নাকি ভুলে থাকার চেষ্টা... কে জানে! তবু বুকের ভিতর অব্দি ঢুকে যাওয়া হাসপাতালের ফিনাইলের আর ওষুধের গন্ধটাকে ছাপিয়ে উঠছিল ভেজা হাওয়া আর সোঁদা মাটির একটা সুবাস... সে সুগন্ধ খানিক আজকের... খানিক কে জানে কবেকার... দীর্ঘশ্বাসের গরম হলকা দূর হয়ে যেতে লাগল অজান্তেই...!
Tag :
একটু বড় গল্প,
আবার যদি ইচ্ছে কর / দুই
By : Sayantari Ghoshদুই
লোহিতের সামনে বসেছিলাম। আকাশ ভর্তি মাখাসন্দেশের মত মেঘ, সূর্য আছে না নেই টের’ই পাওয়া যায় না। সামনের বাগানটায় ছবি তুলছে হেম আর পারো। প্রথম আলাপ’ও আমাদের এই বাগানের সামনেটাতেই, হস্টেলে ঘরের চাবি পাওয়ার দিন’টায়। পশ্চিম বাংলার বাইরে প্রথম পা রেখে এই দূরশহরে এসে দক্ষিণের মেয়ে হেমাক্সি আর অসম থেকে আসা পার্বতি যে আমার নিঃশ্বাস আর প্রশ্বাসের নামান্তর হয়ে যাবে এমন’টা ভাবার কথাও ভাবিনি কোনোদিন! অবশ্য রুদ্র’কে বাদ দেবো না আমি। প্রথমবার এখানে আসার ট্রেন যেইই ছাড়লো, প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বাবার মুখ’টা আবছা হয়ে গেল কিছু কুয়াশায়, কিছু’টা চোখ উপচানো জলে, সেই থেকে ওই দু’বছর যার চোখদুটোতে রাজ্যের আশ্বাস দেখতে পেতাম সারাক্ষন, ভিড়ে, ভয়ে, নির্দ্বিধায় যার হাত ধরতে পারতাম সুরক্ষা চেয়ে... সে রুদ্র। ও ছিল তাই এই অবাক-দুনিয়া দ্যাখা হয়েছে আমার। ও ছিল তাই কত কি শেখা হয়েছে.........
হেম বলত, ‘আমাদের ভেতর গ্লুয়িং রিয়েজেন্ট হল পারো’... আপনভোলার চূড়ান্ত মেয়ে! ওকে সামলাতে সামলাতেই আমাদের তিনজনের বন্ধুত্ব’টা কখন যেন ‘কভি টুটেগা নেহি’ মার্কা হয়ে গেছিল। আদ্ধেকদিন ঘর তালা দিতে ভুলে যেত, সাইকেল বাজারে স্ট্যান্ড করে হস্টেল চলে আসত নিশ্চিন্তে, অন্ততঃ একহাজার বার দরজায় টোকা দিয়ে ভুলে গেছে যে ঠিক কি বলতে এসেছিল...
কিন্তু অবাক কান্ড হল, যে এমন ভুলোমন মেয়ে্টা আশ্চর্য রকম খেয়াল করে সামলে রাখত একখানি জিনিস। তার মোবাইল! সাদামাটা পুরোনো হ্যান্ডসেট’টাকে হেম মজা করে বলত ‘সতীন’! মোবাইল’টি ছিল পারোর প্রাণ! তার যত্নের, আদরের, পরিচর্যার শেষ ছিল না কোন! আর সেইসব কিছুর কারণ ছিল মাত্র একটি। সেই ফোনে ঠিক রাত সাড়ে দশটায় একজন ফোন করত সুদূর গুয়াহাটি থেকে... সে তার সারামাসের বরাদ্দ থেকে অতিকষ্টে বাঁচিয়ে রাখত এস.টি.ডি. ফোনের রিচার্জের দামটুকু। গুনে গুনে দশমিনিট কথা হত সাধারণতঃ... আর অসাধারণ কিছু হলে কথা ফুরাতো না, ব্যালান্স ফুরিয়ে যেত তার আগে... সেসব রাত্রিগুলোয় যতক্ষণ ঘুম আসত না আমার, একটা খুব আবছা কান্না ঘরজুড়ে ঘুরঘুর করছে টের পেতাম। অতি রক্ষণশীল অসমিয়া পুরোহিত-বাড়ির মেয়ে পার্বতি গোস্বামী তার চরম ভুলোমনের সবটুকু দিয়ে গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির পড়ুয়া আর আপাদমস্তক বাঙালি আলোক ঘোষ’কে ভালোবাসত!
কিন্তু অবাক কান্ড হল, যে এমন ভুলোমন মেয়ে্টা আশ্চর্য রকম খেয়াল করে সামলে রাখত একখানি জিনিস। তার মোবাইল! সাদামাটা পুরোনো হ্যান্ডসেট’টাকে হেম মজা করে বলত ‘সতীন’! মোবাইল’টি ছিল পারোর প্রাণ! তার যত্নের, আদরের, পরিচর্যার শেষ ছিল না কোন! আর সেইসব কিছুর কারণ ছিল মাত্র একটি। সেই ফোনে ঠিক রাত সাড়ে দশটায় একজন ফোন করত সুদূর গুয়াহাটি থেকে... সে তার সারামাসের বরাদ্দ থেকে অতিকষ্টে বাঁচিয়ে রাখত এস.টি.ডি. ফোনের রিচার্জের দামটুকু। গুনে গুনে দশমিনিট কথা হত সাধারণতঃ... আর অসাধারণ কিছু হলে কথা ফুরাতো না, ব্যালান্স ফুরিয়ে যেত তার আগে... সেসব রাত্রিগুলোয় যতক্ষণ ঘুম আসত না আমার, একটা খুব আবছা কান্না ঘরজুড়ে ঘুরঘুর করছে টের পেতাম। অতি রক্ষণশীল অসমিয়া পুরোহিত-বাড়ির মেয়ে পার্বতি গোস্বামী তার চরম ভুলোমনের সবটুকু দিয়ে গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির পড়ুয়া আর আপাদমস্তক বাঙালি আলোক ঘোষ’কে ভালোবাসত!
ভালোবাসা-টাসা’কে আবার এক্কেবারে পাত্তা দিত না হেম। সাঙ্ঘাতিক ডাকাবুকো মেয়ে। অন্ধ্রপ্রদেশের এলুরু থেকে কলকাতা এসেছিল যাদবপুরে ফিল্ম স্টাডি নিয়ে পড়াশুনো করতে। তারপর এখানে। এমন ঝরঝরে বাঙলা বলতো যে ওকে বাঙালি বলে ভুল হবে। জমিয়ে রাজনীতি করত, সারারাত জেগে একতলা বাড়ির সমান উঁচু অসাধারণ সব পোস্টার আঁকতো, একখানা স্প্লেন্ডার বাইক নিয়ে রিং রোড চষে বেড়াত রাতে-দিনে। হস্টেল থেকে স্কুল, প্রফেসর থেকে দারোয়ান সব্বাই তার প্রতাপে তটস্থ ছিল! কারোর তোয়াক্কা করত না এক কথায়!
মনে আছে একবার রাত্রি বারোটার পর খালি একটা ঢাউস টর্চ হাতে নিয়ে আমাদের সঞ্জয়-বনের গহনে ঢুকিয়ে নিয়ে গেছিল। ভয়ে আমাদের প্রান প্রায় ওষ্ঠাগত, গলা শুকিয়ে গেছে, হারিয়ে যাবো, আর ফিরতে পারবো না, আরো যা যা কুডাক ডাকা সম্ভব, মন সব ডেকে ফেলেছে... জানিনা কতদূর হেঁটে শেষে একখানি উঁচু পাথরের ওপর এনে বসালো আমাদের... সামনে খাদ, ঝুপসি জঙ্গল সেদিকটায়... আকাশে কানাউঁচু থালার মত পূর্ণিমার চাঁদ, কিন্তু সে আলো ওই আঁধারে নামার চেষ্টাও করে না... পাথরে, পাহাড়ে পিছলানো জ্যোত্স্না... আর জঙ্গলের ওপাশে, অনেক দূরে জ্বলজ্বল করছে ঘুমন্ত লোহিত হস্টেলের দু’শো ঘরের ছড়ানোছিটানো রাত-আলো... আবছা দ্যাখা যাচ্ছে সামলের রাস্তার হলুদ হয়ে আসা স্ট্রিটলাইটগুলো... মনে হল যেন স্বর্গ থেকে কেউ আমাকে আমার বাড়ির উঠোন দেখিয়ে দিয়েছে! কথা সরেনি কোন, আমি আর পারো চুপ... হেম শুধু বলেছিল, “আমরা খালি ওই ছাদ থেকে এই পাহাড়, এই জঙ্গল দেখি, বল? এখান থেকে এই জঙ্গল পেরিয়ে ওওওওই অব্দি যাওয়ার রাস্তা বানানোর কথা ভাবি না কেন?”
উত্তরে কি বলতে হত আজো জানি না।
একটু থেমে হেম বলেছিল, “আমি বানাবো, দেখিস...”
[ক্রমশঃ]
মনে আছে একবার রাত্রি বারোটার পর খালি একটা ঢাউস টর্চ হাতে নিয়ে আমাদের সঞ্জয়-বনের গহনে ঢুকিয়ে নিয়ে গেছিল। ভয়ে আমাদের প্রান প্রায় ওষ্ঠাগত, গলা শুকিয়ে গেছে, হারিয়ে যাবো, আর ফিরতে পারবো না, আরো যা যা কুডাক ডাকা সম্ভব, মন সব ডেকে ফেলেছে... জানিনা কতদূর হেঁটে শেষে একখানি উঁচু পাথরের ওপর এনে বসালো আমাদের... সামনে খাদ, ঝুপসি জঙ্গল সেদিকটায়... আকাশে কানাউঁচু থালার মত পূর্ণিমার চাঁদ, কিন্তু সে আলো ওই আঁধারে নামার চেষ্টাও করে না... পাথরে, পাহাড়ে পিছলানো জ্যোত্স্না... আর জঙ্গলের ওপাশে, অনেক দূরে জ্বলজ্বল করছে ঘুমন্ত লোহিত হস্টেলের দু’শো ঘরের ছড়ানোছিটানো রাত-আলো... আবছা দ্যাখা যাচ্ছে সামলের রাস্তার হলুদ হয়ে আসা স্ট্রিটলাইটগুলো... মনে হল যেন স্বর্গ থেকে কেউ আমাকে আমার বাড়ির উঠোন দেখিয়ে দিয়েছে! কথা সরেনি কোন, আমি আর পারো চুপ... হেম শুধু বলেছিল, “আমরা খালি ওই ছাদ থেকে এই পাহাড়, এই জঙ্গল দেখি, বল? এখান থেকে এই জঙ্গল পেরিয়ে ওওওওই অব্দি যাওয়ার রাস্তা বানানোর কথা ভাবি না কেন?”
উত্তরে কি বলতে হত আজো জানি না।
একটু থেমে হেম বলেছিল, “আমি বানাবো, দেখিস...”
[ক্রমশঃ]
Tag :
একটু বড় গল্প,
ফেরা / দুই
By : Sayantari Ghosh
দুই
“ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?"
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?"
দখিনদুয়োরী বড় ঘরটার মেঝের ঠিক মাঝখানে বড় করে আলপনা দিচ্ছে টুপুর—চারদিক কেমন ধোঁয়াটে—আর একটানা কেউ যেন পাঁচালি পড়ছে—
"....আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর......”
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর......”
কোথায় যেন শোনা এই ছড়াটা? খুব,খুউব চেনা...তবু যেন ঠিক ঠিক চিনে নিতে অসুবিধে হচ্ছে—ওই তো দিদুন...খাটের ওপর বসে...এক্ষুনি স্নান সেরে এসেছে...এই অ্যাত্তো লম্বা ভেজা চুল গোটা পিঠে এলো হয়ে আছে...ছোট্টো কপালে ছোট্টো সিদুঁরের টিপ...
-“ম্যাডাম...!”
আচমকা তন্দ্রাটা কেটে গেল ডাকটায়—চোখ খুলতে হাসপাতালের রিসেপশনের মেয়েটির ব্যাতিব্যস্ত মুখটা পরিষ্কার হয়ে এল আস্তে আস্তে—বুকের ধুকপুকুনিটা অজান্তেই বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে ততক্ষণে...
-“আপনি কি ICU-এর ছয় নম্বর পেশেন্টের বাড়ির লোক?”
মাথার বাঁ-দিকটা দপদপ করছে ক্রমাগত—কথাটা শোনার পর বুঝতে একটু সময় লাগল টুপুরের—তারপর ধীরে ধীরে উত্তর দিল ও—
-“না...না,আমার পেশেন্ট CCU-তে আছেন...বারো নম্বর...”
-“ওহ...সরি!” আর কথা না বাড়িয়ে মেয়েটি চলে গেল।
-“ওহ...সরি!” আর কথা না বাড়িয়ে মেয়েটি চলে গেল।
ঘুম এসে গেছিল একটুখানি—মাথাটা ভীষণ ব্যাথা করছে—একটু চা খেতে হবে—হাসপাতালের ক্যান্টিন এই রাত আড়াইটের সময় খোলা থাকবে না—রাস্তার মোড়ের দোকানটা ছাড়া গতি নেই...
পায়ে পায়ে লাউঞ্জটা থেকে বেরিয়ে এল টুপুর—ভীষণ গুমোট করেছে আজ—আকাশে একটাও তারা নেই—খুউব হালকা হাওয়া দিচ্ছে একটা—আলগোছে ছুঁয়ে যাচ্ছে—জোর করে বুঝতে চাইলে তবে বোঝা যায়—!
দাদুমনি নাকি এখন একটু ভাল—সাড়ে ন’টায় ডাক্তারের সাথে শেষ কথা হয়েছে—ব্লাড প্রেশার অনেকটা স্টেবল—কিন্তু হার্টবিট নাকি খুব উইক—কে জানে...? এদের কথায় আজকাল আর ভরসা করতেও সাহস হয় না—
আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আগুন ছুটে গেল—বৃষ্টি হবে কি...?
চা-টা হাতে নিয়ে হাসপাতালের সিঁড়িতে বসল টুপুর—কি যেন একটা স্বপ্ন দেখছিল ও এখুনি? কি যেন...? যত ধরার চেষ্টা করছে,তত যেন পিছলে পালিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নে-দেখা দৃশ্যগুলো...দিদুন ছিল এটুকু মনে আসছে...আর......
‘ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?’
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?’
-“না না...শ্রবণকুমারেরটা নয়...ওটা বিচ্ছিরি...আজ পুণ্যিপুকুরের গল্পটা বল না,দিদুন...!”
-“আআ মল যা...পুণ্যিপুকুরেরটা আবার গল্প নাকি? কতবার শুনিচিস ওটা...সেই যে চারকোনা পুকুর কেটে...”
-“না না...অম্নি করে না...ভালো করে বলো না...!”
-“আআ মল যা...পুণ্যিপুকুরেরটা আবার গল্প নাকি? কতবার শুনিচিস ওটা...সেই যে চারকোনা পুকুর কেটে...”
-“না না...অম্নি করে না...ভালো করে বলো না...!”
প্রতিদিন প্রাইমারি স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে যাবার পর দিদুনের খাটটায় পাশাপাশি শুয়ে পড়তো ওরা দুইবোন...টানটান উত্তেজনায়...নতুন গল্পের দুরন্ত আকর্ষনে...বা সাতপুরোনো গল্পের কানাঘুঁজিতে একটু নতুন আবিষ্কারের আশায়...
-“ভালো করে আবার কি? সব মনে আছে তোদের...এই ত সেদিন শুনলি...”
-“না,না...বলো না দিদুন... ‘ভাটি-খালকুলায় বোশেখ মাসটা জুড়ে...’...বলো না...!”
-“বেশ,বেশ..শোন তবে....তা আমাদের গ্রাম ভাটি-খালকুলায় গোটা বোশেখ মাসটা জুড়ে নানাআআন রকম উত্সব-মচ্ছব লেগেই থাকত...গ্রামটার পাশ দিয়ে গোল করে বাঁক নেওয়া চন্দনা তখন এই প্যাকাটির মতন শুকিয়ে যেত...অথচ বর্ষায় তার সে কি আস্ফালন...! জলে আর মাছে থৈ থৈ করত তখন!
যা হোক বোশেখের কথা বলছিলাম...পয়লায় দয়ালের আসন থেকে একখানা নগরকীত্তন বার হত...সারা গ্রাম ঘুরে তারা সংক্রান্তির মেলার জন্য দান-দক্ষিণে নিত...সে কীত্তন ভাটি-খালকুলা আর মাদুলি-খালকুলার সব দরজায় ঘুরতো...
তারপর বোশেখের পত্থম ব্রত করতাম আমরা...পুণ্যিপুকুরের ব্রত...ঘর-লাগোয়া বিশাল দীঘি ছিল আমাদের...তার পাড়েই চারকোণা পুকুর গড়তাম...”
-“কত বড় পুকুর দিদুন...?”
-“ছোট্ট...! এই ধর এইটুকুনি...”, খাটের ওপর আঙ্গুল দিয়ে দাগ টেনে পুকুরের আয়তনটা বুঝিয়ে দিত দিদুন, “সেই পুকুরভর্তি করে জল দিতাম আর পুকুরের মাঝখানে একখানা বেলের ডাল লাগিয়ে দিতাম...”
-“বেলের ডাল কোত্থেকে নিতে...? দয়াল আসনের পাশের বোধন-বেলগাছটা থেকে বুঝি...?”
-“সে অত মনে নেই...বেলের কি আর অভাব ছিল নাকি...?”
-“তারপর...?”
-“তারপর পুজো করতাম...! হাত জোড় করে, কোষাকুষিতে সব সাজিয়ে নিয়ে...”
-“মন্ত্র বলতে না...?”
-“হ্যাঁ...বলতাম বই কি...সব্বাই মিলে বলতাম,
-“না,না...বলো না দিদুন... ‘ভাটি-খালকুলায় বোশেখ মাসটা জুড়ে...’...বলো না...!”
-“বেশ,বেশ..শোন তবে....তা আমাদের গ্রাম ভাটি-খালকুলায় গোটা বোশেখ মাসটা জুড়ে নানাআআন রকম উত্সব-মচ্ছব লেগেই থাকত...গ্রামটার পাশ দিয়ে গোল করে বাঁক নেওয়া চন্দনা তখন এই প্যাকাটির মতন শুকিয়ে যেত...অথচ বর্ষায় তার সে কি আস্ফালন...! জলে আর মাছে থৈ থৈ করত তখন!
যা হোক বোশেখের কথা বলছিলাম...পয়লায় দয়ালের আসন থেকে একখানা নগরকীত্তন বার হত...সারা গ্রাম ঘুরে তারা সংক্রান্তির মেলার জন্য দান-দক্ষিণে নিত...সে কীত্তন ভাটি-খালকুলা আর মাদুলি-খালকুলার সব দরজায় ঘুরতো...
তারপর বোশেখের পত্থম ব্রত করতাম আমরা...পুণ্যিপুকুরের ব্রত...ঘর-লাগোয়া বিশাল দীঘি ছিল আমাদের...তার পাড়েই চারকোণা পুকুর গড়তাম...”
-“কত বড় পুকুর দিদুন...?”
-“ছোট্ট...! এই ধর এইটুকুনি...”, খাটের ওপর আঙ্গুল দিয়ে দাগ টেনে পুকুরের আয়তনটা বুঝিয়ে দিত দিদুন, “সেই পুকুরভর্তি করে জল দিতাম আর পুকুরের মাঝখানে একখানা বেলের ডাল লাগিয়ে দিতাম...”
-“বেলের ডাল কোত্থেকে নিতে...? দয়াল আসনের পাশের বোধন-বেলগাছটা থেকে বুঝি...?”
-“সে অত মনে নেই...বেলের কি আর অভাব ছিল নাকি...?”
-“তারপর...?”
-“তারপর পুজো করতাম...! হাত জোড় করে, কোষাকুষিতে সব সাজিয়ে নিয়ে...”
-“মন্ত্র বলতে না...?”
-“হ্যাঁ...বলতাম বই কি...সব্বাই মিলে বলতাম,
‘পুণ্যিপুকুর ব্রতমালা/কে করে গো সকালবেলা
আমি সতী,লীলাবতী/সাতভায়ের বোন,ভাগ্যবতী
হবে পুত্র,মরবে না/ধান সে গোলায় ধরবে না
পুত্র তুলে স্বামীর কোলে/আমার মরণ হয় যেন এক গলা গঙ্গাজলে...’...”
আমি সতী,লীলাবতী/সাতভায়ের বোন,ভাগ্যবতী
হবে পুত্র,মরবে না/ধান সে গোলায় ধরবে না
পুত্র তুলে স্বামীর কোলে/আমার মরণ হয় যেন এক গলা গঙ্গাজলে...’...”
ছড়াটা শেষ হতেই হাততালি দিয়ে উঠত নুপূর...দিদুনের কোল ঘেঁষে বসে বলত, “আর শিবরাত্রির মন্ত্রটা......?”
-“ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?
আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর।
আসনং পাশনং পাত সিংহাসন
হরগৌরী ব্রত করে শিব হরধন
কালো ফুল তুলতে গেলাম শুধু লতাপাতা
শিব-চরনে দেখা হল, শিবের মাথায় জটা...”
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?
আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর।
আসনং পাশনং পাত সিংহাসন
হরগৌরী ব্রত করে শিব হরধন
কালো ফুল তুলতে গেলাম শুধু লতাপাতা
শিব-চরনে দেখা হল, শিবের মাথায় জটা...”
-“তারপর...?”
-“তারপর আর কি? চেয়ে নিবি...”
-“কি চেয়ে নেব...?”
-“বর...! এই টকটকে ফরসা রং, টানাটানা চোখ, টলটলে হাসি...রাজপুত্তুরের মতন বর চেয়ে নিবি...”
-“চাইলেই পাওয়া যাবে।তাই না দিদুন...?”, নুপূর জিগেস করত অনেক আগ্রহ নিয়ে...
-“কিন্তু এতো একেবারে দাদুমণির মতন...”, বলত টুপুর, “আমার তো দাদুমনি আছে...আমি আর চাইবো কি করতে...?”
-“তারপর আর কি? চেয়ে নিবি...”
-“কি চেয়ে নেব...?”
-“বর...! এই টকটকে ফরসা রং, টানাটানা চোখ, টলটলে হাসি...রাজপুত্তুরের মতন বর চেয়ে নিবি...”
-“চাইলেই পাওয়া যাবে।তাই না দিদুন...?”, নুপূর জিগেস করত অনেক আগ্রহ নিয়ে...
-“কিন্তু এতো একেবারে দাদুমণির মতন...”, বলত টুপুর, “আমার তো দাদুমনি আছে...আমি আর চাইবো কি করতে...?”
আকাশে আরেকখানা বিদ্যুতের ঝলক...শুধু আলো...কোনো শব্দ হলনা...দিদুন বুঝি মুচকি হাসল ওই ওপরে বসে বসে...আর তক্ষুনি টুপুর হঠাত্ খেয়াল করলো দু-গাল ভিজিয়ে দিয়েছে বাধ-না-মানা চোখের জল...দুহাতে মুখ ঢাকলো ও...সেইদিন থেকে সব্বাই কেঁদেছে...সব্বাই...শুধু ও ছাড়া...সুযোগ পেয়ে সবটুকু কান্না উছলে পড়তে চাইছে এখন...অঝোরে...
এই একা-রাত গুলো এরকমই অবাধ্য হয়...একগুঁয়ে...জেদি...কাঁদিয়ে তবে ছাড়ে...!
Tag :
একটু বড় গল্প,
ফেরা / এক
By : Sayantari Ghoshএক
হাসপাতালটার একটা দিকের দেওয়ালের জায়গায় সাততলা-জোড়া কাঁচ— তার মধ্যে দিয়ে দেখলে বাইরের উত্তপ্ত জ্যৈষ্ঠের দুপুরটাকেও সবজে ছায়ায় ঢাকা মনে হয়। তিনতলার সেইরকম একটা কাঁচের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল টুপুর। বাইরের গাছপালা,বাড়িঘর— নির্জন রাস্তায় মাঝেমাঝে হুশ করে ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া এক-একটা গাড়ি— সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা জড়তা— সময়টা খারাপ ক্যাসেটের রিলের মত জড়িয়ে গেছে যেন! এখান থেকে বোঝাই যায় না এটা ভোর, দুপুর নাকি বিকেল গড়িয়ে গেছে— ইচ্ছে করে এরকম কাঁচ লাগিয়েছে এরা— জোর করে সময়টাকে আটকে দিতে চায়। ভীষণ একটা ভাঁওতার মধ্যে রেখে দিতে চায়— একটা ধাঁধার মধ্যে।
এভাবেই তিনটে দিন কেটে গেল— দিনরাতের হিসেবটাও গোলমাল হয়ে যাচ্ছে এবারে—
একটু দূরে ওয়েটিং হলের বেঞ্চিতে মা-কে জড়িয়ে ধরে, চোখ বন্ধ করে নূপুরটা বসে আছে— মায়ের চোখ ফোলা, মুখ লাল— বাপি আর কাক্কা অনেকখন ধরে কথা বলছিল; এখন চুপ— বাপির চোখ বন্ধ; চোখের পাতাটা তিরতির করে কাঁপছে— কথা আর কান্না তে কিই বা আসে-যায়? হিসেব তো মনেমনে সব্বাই করছে!
টুপুর আবার রাস্তার দিকে তাকালো—গলার কাছটায় কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে—
দাদুমণির এই ভাবে অসুখে পড়াটা ঠিক মেনেই নেওয়া যাচ্ছে না। সেদিনও তো বিকেলে হাঁটতে বেরোলো— টুপুর স্কুল থেকে ফিরেছে তক্ষুনি— M.A.-এর রেসান্টটা বেরোয়নি—এই ফাঁকে একটু হাত পাকানো আর কি!
সদরের কাছটাতে দাদুমণির সাথে দেখা, বলল, “কি বড়দি? মুখ গোমড়া কেন? ছাত্তররা কথা শুনছে না বুঝি?”
-“কি যে বল,দাদুমনি? আমার কথা শুনবে না?জানো, আমি সারাক্ষণ হাতে বেত রাখি!”,হেসে জবাব দিয়েছিল টুপুর, “দু-মিনিট দাঁড়াও না গো! এক কাপ চা খেয়ে নিই— দিয়ে আমিও তোমার সাথে ঘুরে আসি একটু...”
-“না ভাই, তুই বড় দেরি করে দিস!” মাথা নেড়ে বলেছিল দাদুমনি, “তোর সাথে আরেকদিন ঘুরতে যাব... যেদিন ব্যাগপত্তর কিনতে নিয়ে যাবি, সেইদিন... কবে যাবি বল তো?”
-“ইইইস!! ব্যাগপত্তর কেনার আর তর সইছে না,বলো?! রোববার যাব, দাদুমনি... পাক্কা...!”
আজ রোববার! ভাবতেই বুকের ভেতর'টা যেন দুলে উঠল একেবারে... বৃহস্পতিবার থেকে আজ রোববার— দাদুমনি কথাই বলছে না— সেইরাত থেকে আজ তিনদিন টানা এখানেই টুপুর— বাড়িমুখো হয়নি সে— মা আজ সকালে বলছিল,"বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নে মামনি, এবার শরীর খারাপ করবে কিন্তু...”
ঘুমিয়ে?! এই তিনদিনে বসে বসে মাঝেমাঝে ঝিমুনি এলেও একটা দারুণ ঝটকা দিয়ে উঠেছে ভিতর থেকে— ঘুমের মধ্যে মারাত্মক দুঃস্বপ্ন দেখে যেমন ঘুম ভেঙে যায়, সেইরকম— চমকে সোজা হয়ে উঠে বসেছে টুপুর প্রতিবার!
-“না ভাই, তুই বড় দেরি করে দিস!” বলেছিল বটে দাদুমনি— খুব দেরি হয়ে গেল কি? কে জানে... বেশী কিছু তো নয়— শুধু একবার ঘরে ফিরতে চায় মানুষটা—তারও কি অনুমতি মিলবে না?? ভগবান...!
ঘরে ফেরা। এই একটা ইচ্ছে নিয়ে প্রতিটি রাত স্বপ্ন দেখত দাদুমনি; প্রতিটা দিন স্বপ্ন লিখত! দু'বছর আগে সেপ্টেম্বরে যখন হুঠ করে দিদুন চলে গেল, তার পর থেকেই আস্তে আস্তে এই ছেলেমানুষিটা পেয়ে বসেছে দাদুমনিকে... ঘরে ফিরবে! একবার! সেই গ্রাম, সেই মাটি, সেই ঘাস, সেই নদী, সেই সঅঅব কিছু একবার, শুধু একবার আলতো করে ছুঁয়ে আসবে! একটিবারের জন্য বাংলাদেশ ফিরবে! “ছানি পড়া চোখ, তবু দেখবো রে... কালা কান, তবু যেটুক শোনা যায়!” যেটা বলেনি সেটা হল,এখনও জীবন্ত প্রাণ... তাই বাঁচবো রে, যেটুক বাঁচা যায়!!
হুজুগ?! বলা যায়। অনেকে বলেও ছিল— তোতোনপিসি, দীপ্তিবউদি এমনকি মিতুলদা অবদি!দাদুমনির বাংলাদেশে যাওয়ার এই পাগলপারা ইচ্ছেটাকে আশকারা দিতে মানাও করেছিল বাপিকে। বাপি কোনোদিন কারো কথায় কান দেয় না; এবারও দেয় নি। বলেছিল, “যেতে ইচ্ছে তো যাক না!”
সেই দেশভাগের সময় থেকে মাটিছাড়া দাদুমনি। তারপর কোনোদিন, কখখনো ফিরে যায় নি। ফিরতে চায়ও নি। কিন্তু স্মৃতিজুড়ে ছিল সেই মাটির সোঁদা গন্ধ। এখনও মনে পড়ে— সে কবেকার কথা— টুপুর তখন স্কুলে পড়ে— শীতকালে ওপরের বারান্দার রোদে-ভেজা খাটটায় বসে বসে কত গল্প বলে যেত দাদুমনি আর দিদুন— টুপুরের আপাদমস্তক শহুরে মনটার কাছে রূপকথার থেকেও অবিশ্বাস্য লাগত সেসব কথা— দেখতে দেখতে ওর মনটাও ছুটতে শুরু করত সবুজ ধানের শিষে হাত ছুঁইয়ে— সরু আল বেয়ে— নীল আকাশটা নুইয়ে পড়ছে ওকে দেখতে— দূরে একদল সাদাকাশ একসাথে হৈ হৈ করছে— ছুট, ছুট, ছুট— “রুপুউউউ...!! ওওওওওই বুড়ো অর্জুনতলা অবদি কিন্তু— আজ আবাআআআর তুই হেরে যাবি...!!!” —আআআর এই যে গাছ ছুঁয়ে দিয়েছি— জিতে গিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠত টুপুর— শুনতে শুনতে ভুলেই যেত যে স্মৃতিটা আসলে কার...! মনে হত কবেকার সেই জোড়া-বাংলার অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেমেয়ে রুপু, মদন, গীতা, নাজিম, সুজয়... এরা যেন ওরই ক্লাসে পড়ে, ওরই অভিন্নহৃদয় বন্ধু...
তাই যেচেই দায়িত্বটা নিয়েছিল ও। আর সবাই যখন সময়-সুযোগের অভাব-টভাব নিয়ে সাতপাঁচ ভাবছে, নিজেই বলেছিল, “আহা!কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে? আমিই যাবো সাথে...!”
মনে মনে হেসেছিল তখন। দিদুন টুপুরকে “সতীন” বলতো আদিখ্যেতা করে... দিদুন নেই, দায়িত্বটা ওরই ওপর বর্তায় বইকি!!
সেই ঘরে ফেরা। তার কত আয়োজন! রীতিমত পাগল হয়ে উঠেছিল দাদুমনি। কত কিছু গোছগাছ, কেনাকাটা... আজ রোববার... আজ বড় দেখে একটা ব্যাগ কিনে দেবে বলেছিল টুপুর... আর আজ...
-“মামনি!”
চমকে উঠল টুপুর! মা কখন কে জানে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
-“ চল, আজ বাড়ি ফিরে চল তুই! টানা তিনদিন হল। মিতুল বলছে, ও না'হয় থেকে যাবে আজ রাতটা...!”
-“কি দরকার মা? আমিই থাকছি— মিতুল'দার আর কষ্ট করার দরকার নেই... বাড়ি গিয়ে আমার লাভ কিছুই হবে না”, কবজি উলটে ঘড়িটা দেখল টুপুর, “সাড়ে সাতটা বাজল। তোমরা বরং বেরিয়ে পড়ো!”
[চলবে]
Tag :
একটু বড় গল্প,
আবার যদি ইচ্ছে কর...
By : Sayantari Ghoshএক
অনেকদিন বাদে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ফিরলাম। জীবনের হিসেবে ফেললে ‘অনেক’ শব্দ’টা ভুল হয়ে যাবে অবশ্যই... তবে দূরত্ব আর গুরুত্বের হিসেবে কিন্তু একশ’ভাগ ঠিক! সেই যে অঝোর বৃষ্টি’তে চোখভর্তি ছেলেমানুষী জল নিয়ে শহর ছেড়েছিলাম... সে পাক্কা আড়াই বছর হল!
এবারেও ট্রেন থেকে নেমেছি ঝমঝমে বৃষ্টি’তে। ভাবা যায়? এই ফেব্রুয়ারির শেষে... ওই শুকনো দেশে...!? আসলে এ শহর জানে আমি বৃষ্টি ভালোবাসি। কারণে অকারণে সেই দু’বছরে কত যে বৃষ্টি নামিয়েছে আমায় অবাক করে দিয়ে, সে হিসেব ডায়েরিতে রাখতাম তখন... প্রতিবার নিখুঁত টাইমিং, নির্ভুল নিশানা!
হাঁটতে ইচ্ছে করছে... নর্থ গেটের সামনেটাতেই ছ’শো পনেরো থেকে নেমে পড়লাম... এখানে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি গাছ... একেবারে সবুজে সবুজ... দিন’টা মঙ্গলবার, উইক’ডে... সব্বাই ক্লাসে, বা হস্টেলে এই অসময় বৃষ্টি’তে নির্ঘাত... রিংরোড প্রায় শুনশান...
গঙ্গা হস্টেলের সামনের বাস স্টপ’টা পেরোলো... সেই ধূ ধূ গরম’টা ছুঁয়ে গেল যেন হলকা দিয়ে... মনে পড়ে গেল বাহান্ন না তিপ্পান্ন’র তর্ক আর মনে এল অজ্ঞান হয়ে গেলে মানুষের শরীর’টা ঠিক কত’টা ভারি হয়ে যায়...
নর্মদার সামনের সেই পাথর’টার ফাঁকে উঁকি দিলাম পেরোতে পেরোতে... ‘ইয়ং গান্স্ অফ ইন্ডিয়া’ জ্বলজ্বল করে উঠল আমাকে চমকে দিয়ে... আধ সেকেন্ড বাদে টের পেলাম হেসে ফেলেছি অজান্তেই...
নর্মদা আর সাবরমতির মাঝের শুঁড়িপথ ধরলাম... এই আলো’টা বুঝি এখনও রাতে দপদপ করে? কাবেরির দিকে যাওয়ার চোরারাস্তা’টার সামনে কারা যেন পাঁচিল তুলে দিয়েছে... এখানে সেই ঝামরঝুলোর মত নিচু হয়ে ঝুঁকে আসা জঙলা লতাগুলো আরো গাঢ় করে দিয়েছে অন্ধকার... হঠাত্ হাতের খুব কাছে মনে হল আর কারো হাত... ছিটকে সরে এলাম... গলার কাছে ভয় না কান্না কি যেন একটা ধাক্কা দিচ্ছে ক্রমাগত...
তাপ্তীর সামনের ওপেন এয়ার ক্যান্টিন’টা দ্যাখা যাচ্ছে। সবক’টা চেয়ার নিশ্চয়ই ভিজে সপসপে, ভাবতে ভাবতে যেই না ঢোকা, দুটি খুব পরিচিত কন্ঠ সমস্বরে ঘোষণা করল, “লেট! অ্যাস ইউসুয়াল...!” ইউসুয়াল’ই বটে। আড্ডায়, ওয়ার্কশপে, ক্লাসে বা অ্যাসাইনমেন্ট করার তলবে দেরি করে পৌঁছানোর কত বিশ্বরেকর্ড আমি করেছি, সে খবর ওরা ছাড়া আর কে’ই বা রাখে...?
হেম আর পারো!
পরের পঁচিশ’টা মিনিট পাগলামি’তে ভেসে গেল একেবারে। যা বলছিলাম তার মধ্যে আদৌ কোন বক্তব্য ছিল না। ছিল খালি নিখাদ উচ্ছ্বাস... এতদিন বাদে এত কাছ থেকে এই চেনা মুখগুলো চোখের সামনে দ্যাখার উন্মাদ উচ্ছ্বাস! ছবি নয়, ওয়েবক্যাম নয়... একেবারে লাইভ আর এক্সক্লুসিভ!!
রাজুদা’র বহুচর্চিত ম্যাগি (বহু-আস্বাদিত’ও বটে) অর্ডার দেওয়া হল, যা কিনা জমাটি আড্ডার শাশ্বত সঙ্গী!
“মিসিং রুদ্র, না?” পারো বলল, “চারজনের গ্রুপ’টা ইস সামহাউ ইনকমপ্লিট উইদাউট দ্য ওনলি গাই...”
“ওকে ছাড়... ও চিরকালের ব্যস্ত মানুষ”, আমি বললাম।
“শোন শোন, তুই বল আগে...”, পারোর দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়ে হেম বলল, “দুম করে এমন সাঙ্ঘাতিক কাজ’টা এক্সিকিউট করে ফেলার ডিসিশন নিয়েই ফেললি তাহলে? বিয়ে, হ্যাঁ? কান্ড করলি বটে মিস্...”
“দুম করে?!”, রে রে করে উঠল পারো, “কাম অন মিস হেমাক্সি আইয়ার... যে গল্প’টা গত পাঁচ বছর ধরে দিল্লি, হরিয়ানা, অসম আর বেঙ্গল চারটে স্টেট জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, যে’টা সল্ভ্ করতে গিয়ে আই ইউস্ড্ দ্য লাস্ট ড্রপ অফ মাই ইন্টেলিজেন্স আর টলারেন্স, সেটা ‘দুম করে’?! ইট অলমোস্ট রিচ্ড্ মাই ইলাস্টিক লিমিট ইয়ার... অন্য কেউ না লিখে থাকলে আমি পাক্কা একটা বই লিখে ফেলতাম...”
আমি আর হেম হো হো করে হাসছিলাম ওর ছটফটানি দেখে।
“আচ্ছা, তোর ব্যাপার’টা কি বলত হেম?”, পারো রেগে গিয়ে কথা ঘোরাতে চাইল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড উইথ ইয়োর ‘পোস্টম্যান’ গাই? জিগেস করলে বলিসও না ঠিক করে ফোনে... হোয়াট ইস দ্য প্রবলেম আকচুয়ালি, হাঁ? কি হয়েছে... এই রিনি, চেপে ধর তো ওকে...”
“কি হবে? নাথিং! উই আর ফ্রেন্ডস্...”, ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল হেম।
“স্টিল...” দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম, “ওই শব্দটা’ও বল্ সাথে করে... নইলে হয়?”
এবারেও ট্রেন থেকে নেমেছি ঝমঝমে বৃষ্টি’তে। ভাবা যায়? এই ফেব্রুয়ারির শেষে... ওই শুকনো দেশে...!? আসলে এ শহর জানে আমি বৃষ্টি ভালোবাসি। কারণে অকারণে সেই দু’বছরে কত যে বৃষ্টি নামিয়েছে আমায় অবাক করে দিয়ে, সে হিসেব ডায়েরিতে রাখতাম তখন... প্রতিবার নিখুঁত টাইমিং, নির্ভুল নিশানা!
হাঁটতে ইচ্ছে করছে... নর্থ গেটের সামনেটাতেই ছ’শো পনেরো থেকে নেমে পড়লাম... এখানে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি গাছ... একেবারে সবুজে সবুজ... দিন’টা মঙ্গলবার, উইক’ডে... সব্বাই ক্লাসে, বা হস্টেলে এই অসময় বৃষ্টি’তে নির্ঘাত... রিংরোড প্রায় শুনশান...
গঙ্গা হস্টেলের সামনের বাস স্টপ’টা পেরোলো... সেই ধূ ধূ গরম’টা ছুঁয়ে গেল যেন হলকা দিয়ে... মনে পড়ে গেল বাহান্ন না তিপ্পান্ন’র তর্ক আর মনে এল অজ্ঞান হয়ে গেলে মানুষের শরীর’টা ঠিক কত’টা ভারি হয়ে যায়...
নর্মদার সামনের সেই পাথর’টার ফাঁকে উঁকি দিলাম পেরোতে পেরোতে... ‘ইয়ং গান্স্ অফ ইন্ডিয়া’ জ্বলজ্বল করে উঠল আমাকে চমকে দিয়ে... আধ সেকেন্ড বাদে টের পেলাম হেসে ফেলেছি অজান্তেই...
নর্মদা আর সাবরমতির মাঝের শুঁড়িপথ ধরলাম... এই আলো’টা বুঝি এখনও রাতে দপদপ করে? কাবেরির দিকে যাওয়ার চোরারাস্তা’টার সামনে কারা যেন পাঁচিল তুলে দিয়েছে... এখানে সেই ঝামরঝুলোর মত নিচু হয়ে ঝুঁকে আসা জঙলা লতাগুলো আরো গাঢ় করে দিয়েছে অন্ধকার... হঠাত্ হাতের খুব কাছে মনে হল আর কারো হাত... ছিটকে সরে এলাম... গলার কাছে ভয় না কান্না কি যেন একটা ধাক্কা দিচ্ছে ক্রমাগত...
তাপ্তীর সামনের ওপেন এয়ার ক্যান্টিন’টা দ্যাখা যাচ্ছে। সবক’টা চেয়ার নিশ্চয়ই ভিজে সপসপে, ভাবতে ভাবতে যেই না ঢোকা, দুটি খুব পরিচিত কন্ঠ সমস্বরে ঘোষণা করল, “লেট! অ্যাস ইউসুয়াল...!” ইউসুয়াল’ই বটে। আড্ডায়, ওয়ার্কশপে, ক্লাসে বা অ্যাসাইনমেন্ট করার তলবে দেরি করে পৌঁছানোর কত বিশ্বরেকর্ড আমি করেছি, সে খবর ওরা ছাড়া আর কে’ই বা রাখে...?
হেম আর পারো!
পরের পঁচিশ’টা মিনিট পাগলামি’তে ভেসে গেল একেবারে। যা বলছিলাম তার মধ্যে আদৌ কোন বক্তব্য ছিল না। ছিল খালি নিখাদ উচ্ছ্বাস... এতদিন বাদে এত কাছ থেকে এই চেনা মুখগুলো চোখের সামনে দ্যাখার উন্মাদ উচ্ছ্বাস! ছবি নয়, ওয়েবক্যাম নয়... একেবারে লাইভ আর এক্সক্লুসিভ!!
রাজুদা’র বহুচর্চিত ম্যাগি (বহু-আস্বাদিত’ও বটে) অর্ডার দেওয়া হল, যা কিনা জমাটি আড্ডার শাশ্বত সঙ্গী!
“মিসিং রুদ্র, না?” পারো বলল, “চারজনের গ্রুপ’টা ইস সামহাউ ইনকমপ্লিট উইদাউট দ্য ওনলি গাই...”
“ওকে ছাড়... ও চিরকালের ব্যস্ত মানুষ”, আমি বললাম।
“শোন শোন, তুই বল আগে...”, পারোর দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়ে হেম বলল, “দুম করে এমন সাঙ্ঘাতিক কাজ’টা এক্সিকিউট করে ফেলার ডিসিশন নিয়েই ফেললি তাহলে? বিয়ে, হ্যাঁ? কান্ড করলি বটে মিস্...”
“দুম করে?!”, রে রে করে উঠল পারো, “কাম অন মিস হেমাক্সি আইয়ার... যে গল্প’টা গত পাঁচ বছর ধরে দিল্লি, হরিয়ানা, অসম আর বেঙ্গল চারটে স্টেট জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, যে’টা সল্ভ্ করতে গিয়ে আই ইউস্ড্ দ্য লাস্ট ড্রপ অফ মাই ইন্টেলিজেন্স আর টলারেন্স, সেটা ‘দুম করে’?! ইট অলমোস্ট রিচ্ড্ মাই ইলাস্টিক লিমিট ইয়ার... অন্য কেউ না লিখে থাকলে আমি পাক্কা একটা বই লিখে ফেলতাম...”
আমি আর হেম হো হো করে হাসছিলাম ওর ছটফটানি দেখে।
“আচ্ছা, তোর ব্যাপার’টা কি বলত হেম?”, পারো রেগে গিয়ে কথা ঘোরাতে চাইল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড উইথ ইয়োর ‘পোস্টম্যান’ গাই? জিগেস করলে বলিসও না ঠিক করে ফোনে... হোয়াট ইস দ্য প্রবলেম আকচুয়ালি, হাঁ? কি হয়েছে... এই রিনি, চেপে ধর তো ওকে...”
“কি হবে? নাথিং! উই আর ফ্রেন্ডস্...”, ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল হেম।
“স্টিল...” দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম, “ওই শব্দটা’ও বল্ সাথে করে... নইলে হয়?”
(ক্রমশঃ)
Tag :
একটু বড় গল্প,