Popular Post

আবার যদি ইচ্ছে কর / চার

By : Sayantari Ghosh
dsw.jpg

চার
“পারো’টা বেশ বদলে গেছে, বল?”
প্রশ্ন’টা হেম করল আমাকে।
ডিপার্টমেন্ট অফ স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ারের পাশ দিয়ে যে রাস্তা’টা জঙ্গলের দিকে নেমে গেছে, তার মুখেই একটা বাঁধানো বেঞ্চে বসে আছি আমরা দু’জন। পাশটাতেই সেই কবেকার শিশুগাছ’টা… রাস্তায় মেঘ ফেটে ফালি ফালি রোদ এসে পড়েছে এখন। আমরা ছায়াতে, পায়ের কাছে গোল গোল রোদের মোজাইক করা ধূলোমাটি…
সামনে, একটু দূরে, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পারো ফোনে কথা বলছে আলোকের সাথে। আগের সাথে অনেক তফাত্ এখন… এস.টি.ডি.ও সস্তা হয়ে গেছে আগের চেয়ে আর ব্যালান্সও অনেক বেড়ে গেছে মোবাইলে…
পারোর কাছে তার বিবাহ অভিযানের লাইল-বাই-লাইন বর্ণনা শুনছিলাম গত ঘন্টাখানেক ধরে; গল্প শেষ হয়েছে এইমাত্র। বুঝতে পারলাম হেমের প্রশ্ন’টা সেই সূত্র ধরেই। সত্যি সত্যি গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল আমারো।
ভাবতেই পারছিলাম না…!
যে মেয়েটাকে কোনোদিন তার বাবার কাছে ফোনে 'আচ্ছা' আর 'হ্যাঁ' ছাড়া কিছু বলতে শুনিনি, যে মেয়েটা চুপ করে বসে থাকতে থাকতে কি জানি কিসের ভয়ে হঠাত্‌ কেঁদে ফেলত মাঝেমাঝে, বাড়িতে আলোকের কথা জানলে কি হবে, একথা যেদিন ভাবতে বসতো, সেদিন মাঝরাত পেরিয়ে যাওয়ার পর টের পেতাম চুপিচুপি নিজের বিছানা ছেড়ে আমার পাশে এসে শুয়ে ঘুমিয়েছে কোনোমতে… ভাবতেই পারছিলাম না যে এ গল্প’টার মুখ্য চরিত্র’টি সে! ইউনিভার্সিটির পর গুরগাঁও’এ চাকরি, সেই চাকরির ভরসায় বাড়িতে সবাইকে বিয়েতে রাজি করানো, তারপর কতদূরে বীরভূমের কোন গ্রামে এসে আলোকের বাড়িতে সবার সাথে আলাপ করা, আর আজ সগর্বে বলা যে ‘কার্ড এখন প্রেসে…’… টুকরো টুকরো এ গল্প আমরা জানতাম বটে, কিন্তু, এইভাবে, এক তোড়ে, একটানা শুনে মনেই হচ্ছিল না যে এই পারো নিজেকেই সামলাতে পারত না একসময়ে… আর এখন…
“বদলে গেছে বলিস না…” হেম’কে বললাম হেসে, “বল, বড় হয়ে গেছে মেয়ে’টা…”
তা নয়তঃ কি? নিজেই বলে চললাম মনে মনে... বড় হওয়া মানে নিজেকেই চেনা বেশী করে...
আর নিজেকে শুধরে নেওয়া পদে পদে শুধু... খুব প্রিয় ভুল’দের মুছে দেওয়া ইরেজার ঘষে... কত দাবী জন্মায়, আর কত অজস্র মরে যায় এই পথে... বড় হতে গিয়ে...
হেম'ও হাসল আমার কথা’টা শুনে। আসলে আমরা দুজনেই জানি যে পারো আর আলোকের গল্প’টাতে যে এরকম একটা দিন আসতে পারে, আমরা ভাবিনি। ভেবেছিলাম, এভাবেই দশ মিনিটের ফোন, গোটা রাতজাগা, কান্নাকাটি, ভয়, অভিমান আর না-বলে ওঠা গুচ্ছের এক্সপেকটেশন নিয়েই গল্প’টা ফুরিয়ে যাবে একদিন। পরিনতি’টা আমাদের চোখে স্পষ্ট ছিল জলের মত। খারাপ লাগত খুব পারো’টার জন্যে। কিন্তু ওকে দোষ দিতে পারতাম না একটুও। আলোক’কে তো কখনও দেখিনি আমরা। তারই একরকম সুযোগ নিয়ে এই খারাপ লাগার সমস্ত দায়, নিজেদের এই হাত-পা-বাঁধা অবস্থার সবটুকু ফ্রাস্ট্রেশন সোজা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতাম।কখনও আমি বলিনি হেম’কে, হেমও বলেনি কখনও… কিন্তু দুজনে’ই বুঝতে পারতাম যে এ কাহিনীর শেষ নিয়ে আমরা মনে মনে মোটামুটি একমত। আমাদের ভোলামন বান্ধবী’টি যে এইভাবে আমাদের ভুল প্রমাণ করে দেবে কক্ষনো ভাবিনি।
ফোন শেষ। পারো ফিরছে। রাস্তার সোনা-সোনা রোদে ওকে আলোর পুতুল মনে হচ্ছে একটা। আলোয় আলো পারো… চোখে আলো, কপালে আলো, বুকে আলো, পায়ের তলাতে আলো… প্রতিটি চলাতে আলো…
“তোর কথাই হচ্ছিল মিস”, হেম বলল পারো’কে, “ঠিক কি বললে যে তোকে একটা যুত্সই ‘ব্রাভো’ বলা হবে ভেবে পাচ্ছি না আমরা…”
“কিছু বলতে হবে না”, হাসিতে আরেকচোট রোদ ছড়িয়ে পারো বলল, “একটা কাজ করে দ্যাখা দেখিনি… মেক আ লাভ স্টোরি অফ ইয়োর ওন টু কমপিট উইথ মি…”
হো হো করে হেসে উঠলাম তিনজনেই, হেম বলে উঠল, “আরে আমি আট লিস্ট ট্রাই তো করেছি… রিনিটা কে দ্যাখ… কাম অন সুইটি, গেট ইন্সপাইয়ার্ড…”
“শোন শোন”, পারো বলে উঠল আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে, “দ্যাখ এই মেয়ে আমায় কি মেসেজ করেছিল হোয়েন আই টোল্ড হার দ্য সেম থিং… হিয়ার ইট ইস… লিস্‌ন্‌…”, খচখচ করে মোবাইলের ইনবক্স খুলে একটা মেসেজ পড়তে লাগল পারো, বাধা দিলাম, বারণ করলাম, শুনলোই না…
….. মেসেজটায় লিখেছিলাম কোনো এক অস্থির বিকেলে,
“জানিনা রে! আসলে খুব অনেস্টলি বলতে গেলে, যখন ভাবা যেত, যখন সুযোগ ছিল, তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা’টা কেন জরুরি, বুঝিনি আমি। ভেবেছিলাম, যে পাশে আছে, আর থাকবে জীবনভর এমন দাবীও করে, কেন সে সম্পর্কের নাম এক্ষুনি ভেবে ফেলতে হবে? কি দরকার? সারা’টা জীবন তো রয়েছে পড়ে… পরে দেখলাম, সে যখন উত্তর চেয়েছিল, নিজের জীবনের ভাগ বাঁটোয়ারা করছিল তখন আসলে। আমিও ঘাড় নেড়ে দিয়েছি আর সেও আমার ভাগের তার জীবনটাকে কেটেছেঁটে এত্তটুকু করে দিয়েছে…”
“উফফফ… আ লঅঅঅং বাউন্সার…” মেসেজ পড়া শেষ করে ফোন’টা ব্যাগে পুরলো পারো।
বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি। চোখদুটো বন্ধ করে ফেললাম। কানদুটোতে হাত চাপা দিতে ইচ্ছে করল খুব! মনে হল মাথার ভেতরের ঘরটার সমস্ত জানলার শাটারগুলো ভীষণ শব্দ করে কেউ বন্ধ করে দিচ্ছে একে একে, অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে চারদিক… আর আমি একটা দেওয়ালজোড়া ফ্রেমে-বাঁধা ছবির সামনে একা দাঁড়িয়ে আছি… নর্মদা আর সাবরমতির মাঝের সেই ঝুপসি অন্ধকার, আকাশে মৃতপ্রায় চাঁদ মেঘঢাকা দিয়ে শুয়ে, জংলা ফুলের গন্ধে মাতাল রাস্তা… হাতের কব্জি’তে মোচড়… ‘লাগছে রুদ্র, লাগছে!’… … ‘ভালবাসিস না রিনি? বল??’… … ‘বলেছি তো না... না, না, না’ … … জোরালো প্রশ্ন আর গোয়ার্তুমির উত্তর… …
মাথা নিচু করে বসে রইলাম চুপ করে। পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, একজোড়া চোখ আমার পাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে… সোজা, একদৃষ্টে… সে দৃষ্টি’তে আবিষ্কারের বিহ্বলতা… আমার বুকের ভেতর এতদিন ধরে লুকিয়ে রাখা ঘরটার খোলনলচে নেড়েচেড়ে দেখছে যেন সে তার সব কৌতূহল দিয়ে…
তোকে যা নির্দ্বিধায় বলা যায়, শুধু একটু শ্বাস নিতে গিয়ে, তুই বুঝবি না, কষ্ট পাবি না এই ভরসায়, হেম’কে কি সে সঅঅব বলতে আছে, পারো? সে যে অভিমানে মরে যাবে তাকে জানাইনি বলে?
জঙ্গলের কোন এক না-দেখা পাখিরও বুঝি মন-আনচান করে উঠল খুব… আকাশ ভাসিয়ে বলে উঠল, ‘পিউ কাঁহা… পিউ কাঁহা… পিউ কাঁহা…’
[ক্রমশঃ]

আবার যদি ইচ্ছে কর / তিন

By : Sayantari Ghosh
tapti.jpg

তিন
“এই যে পোস্টম্যানের বউ, তুই কি খাবি লাঞ্চে?” খোঁচা মারলাম হেম’কে, “তোর’ও ওই মিক্সড চাউমিন’ই তো?”
“অঙ্কুর শাহ, হি হ্যাস আ নেম… ও.কে.?” আচমকা বলল হেম, মুখে আলতো হাসি! পারো লাফিয়ে উঠলো কথাটা শুনেই, “উফফফ… জিও! শিগগির লাঞ্চ অর্ডার’টা দিয়ে ছুট্টে আয় রিনি, সামওয়ান ওয়ান্টস টু শেয়ার সাম সিক্রেটস্‌ আট লাস্ট!!!”
এক্কেবারে চমকে গেছিলাম আমিও; চিরকাল জানতাম, হেম যে ছেলেটির সাথে চ্যাট করত ক্লাস ফাঁকি দিয়ে, আসাইনমেন্ট ডুব মেরে, তার নাম-ধাম-কাজকাম কিছুই সে জানেনা। আরও অবাক হতাম এটা দেখে যে ও জানতেও চায় না! ছেলেটির চ্যাট আই.ডি. ছিল ‘দ্য পোস্টম্যান’… ব্যাস! আর কোন পরিচয় ছিল না তার আমাদের কাছে।
কিন্তু কি নিয়ে না কথা হত ওদের? সকালের চায়ে চিনি কম থেকে বিকেলে লোহিতের ছাদ থেকে সূর্যাস্ত, পরীক্ষায় দ্যাখাদেখি করে লেখা থেকে ভি.সি. কে ঘেরাও করতে গিয়ে হেম আর রুদ্র’র সাসপেন্ড হওয়া… যাবতীয় গল্প হেম করতো তার সাথে। মনখারাপ, মনভালো, অভিমান, স্বপ্ন কিচ্ছু বাদ যেত না।বাদ যেত খালি স্থান-কাল-পাত্রের পরিচয়গুলো। সে ছেলেও নাকি বহু কিছু বলত খোলামনে আর হেমের কাছে এই ‘খোলামন’ শব্দ’টা বরাবর খুব গুরুত্ব রাখত; ও বলত, দুটো মানুষের ‘স্ফিয়ার অফ ইনফ্লুয়েন্স’-এ থাকা চরিত্রগুলো যদি একটুও না মেলে, তাহলে সেই দুটি মানুষের বন্ধুত্বে কোন রাখঢাক থাকে না… আর সেই বিশ্বাস থেকে একটা অদ্ভূত ভরসা পাওয়া যায়… পরস্পরের প্রতিটি মতামত’কে গুরুত্ব না দিয়ে, না ভেবে বাতিল করা যায় না কিছুতেই।
ইউনিভার্সিটি’তে, ক্লাসে বা রাজনীতির সূত্রে অনেকের সাথে হেম’কে মিশতে দেখেছি; কিন্তু ‘পোস্টম্যান’ ছাড়া কাউকে নিয়ে ওকে এত’টা গভীরভাবে ভাবতে দেখিনি, সেটা সত্যি। ওর কথা শুনে মনে হত, যে ওর মত একটি মেয়ের উচ্ছ্বলতা বা স্পর্ধা’টাকে খোলাখুলি প্রশ্র্য় দিত ছেলেটি; সে সাহস সবার থাকেনা। কিন্তু ওদের এই আড়াল রাখা, পর্দানশীন ফিলোসফিকাল বন্ধুত্ব’টা একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কেন, তার কোন ব্যাখ্যা পেতাম না কিছুতেই। ফলে এতদিন পর পোস্টম্যানের অঙ্কুর শাহ পদে উত্তরণের খবর শুনে ঠিক কত’টা খুশি হলাম আর কতটা অবাক, নিজেই মেপে উঠতে পারলাম না ঠিকমত।
ঝপ করে লাঞ্চ’টা অর্ডার করে এসে, বেশ জমিয়ে বসে পড়ে বললাম, “ফাটাফাটি একটা গল্প শোনা হবে মনে হচ্ছে!”
“শুরু কর, মিস ছুপা রূস্তম”, পারো বলল খুনসুটি করে।
এক গাল হেসে হেম শুরু করল, “গল্প’টা কিন্তু একেবারেই তেমন কিছু না…”
“আর ভূমিকা করতে হবে না, বলে ফ্যাল তাড়াতাড়ি” সমস্বরে বললাম আমরা।
“ওহহো”, হাসতে হাসতে বলল হেম, “শোন, এখান থেকে বেরিয়ে যখন মুম্বাই গেলাম প্রথম চাকরি’টা নিয়ে এই নামধাম জানা’টা মোটামুটি সেই সময়ের কথা…”
“ঝুঠি, ঝুঠি”, পারো বলে উঠল মাঝপথে, “এত্তদিন ধরে মিথ্যে বলে যাচ্ছে…”
“আরে শেষ তো করতে দে”, বলল হেম, “তা… যখন জানলাম যে অঙ্কুরের বাড়িও মুম্বাইয়ে, তখন ভাবলাম ইট ইস আ নাইস কোইন্সিডেন্স। দ্যাখা করার দিন’টা ঠিকই করে ফেললাম অনেক ভেবেচিন্তে…”
“উফফফফ… কি রোম্যান্টিক…!” পারো টিপ্পনি কাটল।
একটুও পাত্তা না দিয়ে হেম বলে চলল, “একটা গোটা দিন একসাথে স্পেন্ড করার প্ল্যান করা হল। ফাইনালি দ্য ডে কেম আর যখন দশ’টা নাগাদ গেটওয়ে অব ইন্ডিয়াতে আই ফার্স্ট স হিম… আমার একদম ইনিশিয়াল রিয়াকশন কি ছিল বল ত?”
“কি?”
“কি??”
“……… যে হি ইস নট দ্য গাই…”
“হোয়াআ…?!”
“মানে??!!”
আমরা দুজনেই হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম হেমের দিকে!! বলে কি মেয়ে’টা? এতদিন এত কথা, এও গল্প… আর শেষকালে ‘দেখে’ মনে হল যে এ সে নয়…?! হেম অন্ততঃ ঠিক এরকম না… হেম’কে যা চিনি…
“মানে আমায় মিস আন্ডারস্ট্যান্ড করিস না প্লিস…” আমাদের অবস্থাটা বুঝে সামাল দিতে চাইল হেম, “মানে দ্যাখ আমি বোঝাবার চেষ্টা করছি… আমি ওর আপিয়ারেন্সের কথা এক্কেবারে বলছি না… ওর আপ্রোচ… খুব খুব অন্যরকম… মানে আমি এরকম ভাবিনি… সারা’টা দিন কাটালাম আর বারবার আমার এটাই মনে হল যে হয়তঃ আমার সাথে মিশতে গিয়ে আমার যে অংশ’টাকে ও মেনে নিয়েছে, সেটাকে ও নিজের মলাট হিসেবে সাজিয়ে নিয়েছে… আমায় ও পছন্দ করত বলে সেটাকে গায়ে তুলতে ওর সমস্যা হয়নি… ওকে দোষ দিচ্ছিনা আমি; কিন্তু গোলমাল হল যে আমি তো ভুল বুঝেছি পুরোপুরি… আমি তো সেই মলাট’টাকেই পুরো বই’টা ভেবে ফেলেছি… মানে… বুঝতে পারছিস আমি কি বলছি?” সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে হেম বলল; কেমন যেন অসহায় দ্যাখাচ্ছিল ওকে… আর ভীষণ ডেস্পারেট!
“হু, হু, বুঝতে পারছি তো…” খুব পরিষ্কার বুঝলেও সায় দিলাম আমি, “নিজেকে চাপে ফেলিস না হেম, ভালো লাগেনি নিশ্চয়ই কিছু… কি হয়েছে তাতে? হতেই তো পারে…”
পারো’ও মাথা নাড়িয়ে বলল, “বুঝতে পারছি আমরা…”
“থ্যাঙ্কস”, একটু যেন ঠান্ডা হল হেম, “মানে খুউউব ছোট ছোট ব্যাপার থেকে অনেক বড় বড় ব্যাপার অব্দি… ধর, এই যে আমার ফিল্ম ক্রিটিকের ট্রেনির চাকরিটা, এটা যে এম্নিই, আমি যে এরপর সিরিয়াসলি লেখালিখি’টা করতে চাই… মানুষের কথা লিখতে চাই, সারা দেশ বেড়াতে চাই, মানুষের সাথে মিশতে চাই… বা ধর আমাদের ইউনিভার্সিটির মশাল র্যা লি বা হাঙ্গার স্ট্রাইক, তার দাবীগুলো, যা ন্যায্য, যা প্রাপ্য, তার কথা জোর গলায় বলা, যেমন আমি বলতাম, রুদ্র বলত… অঙ্কুর এ’সব খুব মন দিয়ে শোনে, কিন্তু সেগুলো ভুলতে ওর কয়েক’টা সেকেন্ড লাগে মাত্র… চ্যাটে, ও যে শুনছে সেটা বুঝতে পারতাম ভীষণভাবে, মন’টা ভরে যেত ভালোলাগায়, জানিস? কিন্তু সামনে থেকে ওর ভুলে যাওয়া’টাই যেন খালি খালি চোখে পড়তে লাগল…”
পারো আস্তে করে হাত’টা রাখল হেমের মাথায়, বলল, “আমরা বুঝতে পারছি সোনা…”
একমিনিট চুপ করে চোখ বন্ধ করে রইল হেম; তারপর হঠাত্ ঝিলিক দেওয়া হাসি হেসে চোখদুটো মুছে নিল একবার, বলল, “সো… দ্যাটস দ্য স্টোরি… আর দেয়ার ইস নাথিং স্যাডি স্যাডি ইন ইট রাইট নাও…”
“গ্রেট!”, পারো বলল, “আরে কিঁউ সোচে ইয়ে দিল কে আগে কয়া হোগা, ’গর কুছ নহি হোগা তো তজর্বা হোগা…”
সব্বাই হেসে ফেললাম। হেম’কে হাসতে দেখে ভাল্লাগছিল। ওকে যেটুকু চিনি, হাসিটা দেখে এটুকু বুঝছিলাম যে, কান্না-চাপা-হাসি এটা নয় অন্ততঃ, বললাম, “হ্যাঁ রে, অঙ্কুর জিগেস করেনি পরে কিছু?”
হেম চোখদুটোয় একটা দুস্টুমি খেলিয়ে বলল, “আই টোল্ড হিম দ্যাট আই লাভ সাম ওয়ান এলস…”
“যা তা…” হাসতে হাসতে বললাম আমি।
“উফফফ, আই আম রিয়েলি মিসিং রুদ্র নাও”, হাসতে হাসতে চোখে জল এনে ফেলে বলল পারো, “হেমের পিছনে লাগার ব্যাপারটাতে কিন্তু ও বরাবরের চ্যাম্পিয়ন… হি মিস্ড্ আ ফ্যাবিউলাস চান্স টুডে…”
দু’হাতে মুখ ঢাকল হেম।
“মিক্সড চাউমিন, চিক্কেন মাঞ্চুরিয়ন, গুলাব জামুন… টেবিল নাম্বার বাইইইস…” হাঁক পাড়লো ক্যান্টিনের ছোটু।
[ক্রমশঃ]

ফেরা / তিন

By : Sayantari Ghosh


তিন

থালার ভাতগুলো কে নিয়ে খালি নাড়াচাড়া করছিল টুপুর; আজ যে কেন খেতে ইচ্ছে করছে না কে জানে... হঠাত্ টেবিলের ওপাশে চোখ পড়তেই দেখল শুভ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও তাকাতেই থেমে থেমে বলল, “একদানা খেলি না কিন্তু! কি হয়েছে বলতো? দাদুমনি তো অনেক ঠিক আছে আজ... মুড ঠিক কর, টুপুর... খা!”
এক গ্রাস ভাত তুলে মুখে দিল টুপুর; গোটা গা-টা গুলিয়ে উঠল যেন... নাঃ! পারা যাচ্ছে না! জলের গ্লাসটা তুলে দু-ঢোঁক জল খেল ও...
—“কি রে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”, এবার শাসনের জায়গায় উদ্বেগ শুভর গলায়, “থাক, জোর করিস না!অন্য কিছু খাবি? কোল্ডড্রিঙ্কস? বা আখের রস...? আনব?”
—“না রে... জাস্ট খিদেটা নেই এখন... খিদে পেলে পরে খেয়ে নেব আমি...”
শুভ আবার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে; তারপর বলল, “বেশ... চল, উঠি তাহলে... তুই বেরিয়ে দাঁড়া, আমি দামটা মিটিয়ে আসছি...”
দোকানটার থেকে বেরিয়ে এল টুপুর। হাসপাতাল থেকে এটা ওই মিনিট কুড়ির হাঁটা পথ।
পিছন ফিরে দেখল, ক্যাশ কাউন্টারের সামনের ভিড়টায় শুভকে দেখা যাচ্ছে। ও এসেছে আজ ভোরে। ভোর না বলে অবশ্য ভোররাত বলা উচিত... পৌনে চারটে-টাকে বোধহয় তাই-ই বলে। কাল রাত সাড়ে বারোটায় শহরে ফিরেছে ও... দিল্লি গেছিল... ইন্টারভিউ ছিল একটা...।
দাদুমনির খবরটা একরকম ইচ্ছে করেই শুভকে জানাতে দেয় নি টুপুর। প্রভাসকাকুকে নিজে গিয়ে বলেছিল, “কাকু, শুভকে জানিও না, প্লিজ... একেবারে ডিস্টার্বড হয়ে যাবে...”
টুপুর জানত, শুভ ফিরে এসে বাইরে বাইরে রাগ করবে, মেজাজ দেখাবে আর ভিতরে গুমরে মরবে... ভীষণ ভীষণ মনখারাপ করবে... কিন্তু ওকে তো আর এই আজ হঠাত্ করে দেখছে না টুপুর! সেই যখন ও ক্লাস ফাইভে, তখন প্রভাসকাকু ঝাঁঝা থেকে বদলি হয়ে এখানে এলেন বাপির অফিসে। সেই থেকে একসাথে ওরা... ক্লাসগুলো বদলে গেছে... ফাইভ, সেভেন, নাইন, ইলেভন... তারপর স্কুল বদলে গেছে কলেজে... কমেডি-ট্র্যাজেডি সবের আদল বদলে গেছে ধীরে ধীরে... মুখ আর নাম বার বার বদলেছে... সব পেরিয়ে একসাথে ওরা...
টুপুর জানে, শুভ পারত না, সব ফেলে ছুটে চলে আসত...! যেমন আজ ভোরে এল!
আজ সারা সকালটা শুভ ছিল এখানেই। বাপিরা আসার পর ডাক্তারের সাথে যা কথা হল তাতে ওদের হিসেবে দাদুমনি ইমপ্রুভ করছে...
—“চ!” পার্সটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে ওর পাশে এসে বলল শুভ, “আরেব্বাবা!! যা সেজেছে আকাশটা... আবার নামাবে মনে হচ্ছে...! চ জলদি! ভিজবো না আমি...”
দুজনে হাঁটা লাগালো। চুপচাপ। আজ সকাল থেকেই কে জানে কেন সেরকম কথাই হয় নি! টুপুর কত ভেবেছিল যে একবার শুভ আসুক... ব্যাস,তাহলে অন্ততঃ আর এই কথা জমিয়ে, দম বন্ধ করে থাকতে হবে না... কিন্তু কোথায়? কথাগুলোর কথা জড়িয়ে গেছে!
আকাশের একটা কোনা বেয়ে ধাপে ধাপে গাঢ় কালচে নীল মেঘ বড় হচ্ছে আস্তে আস্তে... রাস্তার ধুলোয় ছোট্ট ছোট্ট ঘূর্নি... একখানা খবরের কাগজ মাতাল হাওয়ার বেতালা ঘুড়ি হয়ে গেছে যেন... ঝড় উঠবে মনে হচ্ছে... কে জানে তাহলে আর বৃষ্টি হবে কি না...
—“সেই মাছধরা গুলো মনে পড়ছে বল!”, বলল শুভ, “আমি, তুই আর দাদুমনি...উফফফ! কি মজাটাই না হত!”
মনে পড়ছিল টুপুরেরও! তালপুকুরিয়ার ধারে ছিপ হাতে নিয়ে দুখানা কালো ছাতা খুলে উন্মুখ মেঘের দিকে পিছন ফিরে কাটানো সেই লম্বাআআ দুপুরগুলো... গোটা গরমের ছুটিটার প্রায় প্রতিটি দুপুর এভাবেই কেটে যেত সেসময়... তখন শুভরা প্রথম প্রথম এসছে এখানে...
—“হ্যাঁ... আমিও ভাবছিলাম”, হেসে বলল টুপুর, “তবে মাছ ধরা তো নামেই... সব মিলিয়ে কটা মাছ ধরতাম আমরা?”
—“ আররে!? থাকলে তো ধরবি? তালপুকুরিয়ায় মাছ ছিল? থাকার মধ্যে খালি পুঁটি ছিল... সে ত ধরতাম!”
—“যাঃ... রুই-এর পোনা ছিল... আমরা ধরেছি... আর তুই কিছু বলিস না... তুই কোনোকালেই কিছু ধরিসনি... ওই পুঁটি ছাড়া...” বলতে বলতেই হেসে ফেলল টুপুর
—“আমরা মানে কি? অমনি দাদুমনি কে নিজের দলে...না?” ঝুটমুট চোখ পাকিয়ে বলল শুভ।
—“সে তো দাদুমনি আমার দলেই... আর তাছাড়াও আমি ধরেছি... চারাপোনা ধরিনি আমি?”
কথার হারিয়ে যাওয়া খেই আবার ফিরে এল যেন... একযুগ আগের সেইসব দুপুরের বোকাবোকা স্মৃতি মেঘের সাথে মিশে আকাশ ভরাতে লাগল... কেঁচো দিয়ে তৈরি চার... তিন নম্বর বঁড়শি... ফাত্‌নার আলতো নাচন... আর ঘন্টার পর ঘন্টা সেই নিষ্পলক প্রতীক্ষা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র গল্প... এদেশের বর্ষা আর ওদেশের বর্ষার গল্প... রাতদুপুরে পাগার উপছে আসা জলের তোড়ে কইজালা ফেলে রাশি রাশি কইমাছ ধরার গল্প... সিঙ্গি মাছের কাঁটায় জাল ছেঁড়া আর বোয়াল মাছের গায়ের জোরে হাতে বাঁধা ক্যাঁটার দড়ি সমেত জেলে কে টেনে নিয়ে যাবার গল্প... আর বর্ষা শেষ হলে পর ধানখেত ভর্তি হয়ে ছড়িয়ে থাকা মাছের কাঁটায় পা কেটে যাবার গল্প...
আকাশে মেঘের ওপর মেঘ জমছিল... গল্পের ওপর গল্পও জমে উঠছিল খুব...
ওরা খেলছিল, তর্ক করছিল নাকি ভুলে থাকার চেষ্টা... কে জানে! তবু বুকের ভিতর অব্দি ঢুকে যাওয়া হাসপাতালের ফিনাইলের আর ওষুধের গন্ধটাকে ছাপিয়ে উঠছিল ভেজা হাওয়া আর সোঁদা মাটির একটা সুবাস... সে সুগন্ধ খানিক আজকের... খানিক কে জানে কবেকার... দীর্ঘশ্বাসের গরম হলকা দূর হয়ে যেতে লাগল অজান্তেই...!

আবার যদি ইচ্ছে কর / দুই

By : Sayantari Ghosh
ps.jpg

দুই
লোহিতের সামনে বসেছিলাম। আকাশ ভর্তি মাখাসন্দেশের মত মেঘ, সূর্য আছে না নেই টের’ই পাওয়া যায় না। সামনের বাগানটায় ছবি তুলছে হেম আর পারো। প্রথম আলাপ’ও আমাদের এই বাগানের সামনেটাতেই, হস্টেলে ঘরের চাবি পাওয়ার দিন’টায়। পশ্চিম বাংলার বাইরে প্রথম পা রেখে এই দূরশহরে এসে দক্ষিণের মেয়ে হেমাক্সি আর অসম থেকে আসা পার্বতি যে আমার নিঃশ্বাস আর প্রশ্বাসের নামান্তর হয়ে যাবে এমন’টা ভাবার কথাও ভাবিনি কোনোদিন! অবশ্য রুদ্র’কে বাদ দেবো না আমি। প্রথমবার এখানে আসার ট্রেন যেইই ছাড়লো, প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বাবার মুখ’টা আবছা হয়ে গেল কিছু কুয়াশায়, কিছু’টা চোখ উপচানো জলে, সেই থেকে ওই দু’বছর যার চোখদুটোতে রাজ্যের আশ্বাস দেখতে পেতাম সারাক্ষন, ভিড়ে, ভয়ে, নির্দ্বিধায় যার হাত ধরতে পারতাম সুরক্ষা চেয়ে... সে রুদ্র। ও ছিল তাই এই অবাক-দুনিয়া দ্যাখা হয়েছে আমার। ও ছিল তাই কত কি শেখা হয়েছে.........
হেম বলত, ‘আমাদের ভেতর গ্লুয়িং রিয়েজেন্ট হল পারো’... আপনভোলার চূড়ান্ত মেয়ে! ওকে সামলাতে সামলাতেই আমাদের তিনজনের বন্ধুত্ব’টা কখন যেন ‘কভি টুটেগা নেহি’ মার্কা হয়ে গেছিল। আদ্ধেকদিন ঘর তালা দিতে ভুলে যেত, সাইকেল বাজারে স্ট্যান্ড করে হস্টেল চলে আসত নিশ্চিন্তে, অন্ততঃ একহাজার বার দরজায় টোকা দিয়ে ভুলে গেছে যে ঠিক কি বলতে এসেছিল...
কিন্তু অবাক কান্ড হল, যে এমন ভুলোমন মেয়ে্টা আশ্চর্য রকম খেয়াল করে সামলে রাখত একখানি জিনিস। তার মোবাইল! সাদামাটা পুরোনো হ্যান্ডসেট’টাকে হেম মজা করে বলত ‘সতীন’! মোবাইল’টি ছিল পারোর প্রাণ! তার যত্নের, আদরের, পরিচর্যার শেষ ছিল না কোন! আর সেইসব কিছুর কারণ ছিল মাত্র একটি। সেই ফোনে ঠিক রাত সাড়ে দশটায় একজন ফোন করত সুদূর গুয়াহাটি থেকে... সে তার সারামাসের বরাদ্দ থেকে অতিকষ্টে বাঁচিয়ে রাখত এস.টি.ডি. ফোনের রিচার্জের দামটুকু। গুনে গুনে দশমিনিট কথা হত সাধারণতঃ... আর অসাধারণ কিছু হলে কথা ফুরাতো না, ব্যালান্স ফুরিয়ে যেত তার আগে... সেসব রাত্রিগুলোয় যতক্ষণ ঘুম আসত না আমার, একটা খুব আবছা কান্না ঘরজুড়ে ঘুরঘুর করছে টের পেতাম। অতি রক্ষণশীল অসমিয়া পুরোহিত-বাড়ির মেয়ে পার্বতি গোস্বামী তার চরম ভুলোমনের সবটুকু দিয়ে গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির পড়ুয়া আর আপাদমস্তক বাঙালি আলোক ঘোষ’কে ভালোবাসত!
ভালোবাসা-টাসা’কে আবার এক্কেবারে পাত্তা দিত না হেম। সাঙ্ঘাতিক ডাকাবুকো মেয়ে। অন্ধ্রপ্রদেশের এলুরু থেকে কলকাতা এসেছিল যাদবপুরে ফিল্ম স্টাডি নিয়ে পড়াশুনো করতে। তারপর এখানে। এমন ঝরঝরে বাঙলা বলতো যে ওকে বাঙালি বলে ভুল হবে। জমিয়ে রাজনীতি করত, সারারাত জেগে একতলা বাড়ির সমান উঁচু অসাধারণ সব পোস্টার আঁকতো, একখানা স্‌প্লেন্ডার বাইক নিয়ে রিং রোড চষে বেড়াত রাতে-দিনে। হস্টেল থেকে স্কুল, প্রফেসর থেকে দারোয়ান সব্বাই তার প্রতাপে তটস্থ ছিল! কারোর তোয়াক্কা করত না এক কথায়!
মনে আছে একবার রাত্রি বারোটার পর খালি একটা ঢাউস টর্চ হাতে নিয়ে আমাদের সঞ্জয়-বনের গহনে ঢুকিয়ে নিয়ে গেছিল। ভয়ে আমাদের প্রান প্রায় ওষ্ঠাগত, গলা শুকিয়ে গেছে, হারিয়ে যাবো, আর ফিরতে পারবো না, আরো যা যা কুডাক ডাকা সম্ভব, মন সব ডেকে ফেলেছে... জানিনা কতদূর হেঁটে শেষে একখানি উঁচু পাথরের ওপর এনে বসালো আমাদের... সামনে খাদ, ঝুপসি জঙ্গল সেদিকটায়... আকাশে কানাউঁচু থালার মত পূর্ণিমার চাঁদ, কিন্তু সে আলো ওই আঁধারে নামার চেষ্টাও করে না... পাথরে, পাহাড়ে পিছলানো জ্যোত্‌স্না... আর জঙ্গলের ওপাশে, অনেক দূরে জ্বলজ্বল করছে ঘুমন্ত লোহিত হস্টেলের দু’শো ঘরের ছড়ানোছিটানো রাত-আলো... আবছা দ্যাখা যাচ্ছে সামলের রাস্তার হলুদ হয়ে আসা স্ট্রিটলাইটগুলো... মনে হল যেন স্বর্গ থেকে কেউ আমাকে আমার বাড়ির উঠোন দেখিয়ে দিয়েছে! কথা সরেনি কোন, আমি আর পারো চুপ... হেম শুধু বলেছিল, “আমরা খালি ওই ছাদ থেকে এই পাহাড়, এই জঙ্গল দেখি, বল? এখান থেকে এই জঙ্গল পেরিয়ে ওওওওই অব্দি যাওয়ার রাস্তা বানানোর কথা ভাবি না কেন?”
উত্তরে কি বলতে হত আজো জানি না।
একটু থেমে হেম বলেছিল, “আমি বানাবো, দেখিস...”
[ক্রমশঃ]

ফেরা / দুই

By : Sayantari Ghosh



দুই
“ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?"
দখিনদুয়োরী বড় ঘরটার মেঝের ঠিক মাঝখানে বড় করে আলপনা দিচ্ছে টুপুর—চারদিক কেমন ধোঁয়াটে—আর একটানা কেউ যেন পাঁচালি পড়ছে—
"....আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর......”
কোথায় যেন শোনা এই ছড়াটা? খুব,খুউব চেনা...তবু যেন ঠিক ঠিক চিনে নিতে অসুবিধে হচ্ছে—ওই তো দিদুন...খাটের ওপর বসে...এক্ষুনি স্নান সেরে এসেছে...এই অ্যাত্তো লম্বা ভেজা চুল গোটা পিঠে এলো হয়ে আছে...ছোট্টো কপালে ছোট্টো সিদুঁরের টিপ...
-“ম্যাডাম...!”
আচমকা তন্দ্রাটা কেটে গেল ডাকটায়—চোখ খুলতে হাসপাতালের রিসেপশনের মেয়েটির ব্যাতিব্যস্ত মুখটা পরিষ্কার হয়ে এল আস্তে আস্তে—বুকের ধুকপুকুনিটা অজান্তেই বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে ততক্ষণে...
-“আপনি কি ICU-এর ছয় নম্বর পেশেন্টের বাড়ির লোক?”
মাথার বাঁ-দিকটা দপদপ করছে ক্রমাগত—কথাটা শোনার পর বুঝতে একটু সময় লাগল টুপুরের—তারপর ধীরে ধীরে উত্তর দিল ও—
-“না...না,আমার পেশেন্ট CCU-তে আছেন...বারো নম্বর...”
-“ওহ...সরি!” আর কথা না বাড়িয়ে মেয়েটি চলে গেল।
ঘুম এসে গেছিল একটুখানি—মাথাটা ভীষণ ব্যাথা করছে—একটু চা খেতে হবে—হাসপাতালের ক্যান্টিন এই রাত আড়াইটের সময় খোলা থাকবে না—রাস্তার মোড়ের দোকানটা ছাড়া গতি নেই...
পায়ে পায়ে লাউঞ্জটা থেকে বেরিয়ে এল টুপুর—ভীষণ গুমোট করেছে আজ—আকাশে একটাও তারা নেই—খুউব হালকা হাওয়া দিচ্ছে একটা—আলগোছে ছুঁয়ে যাচ্ছে—জোর করে বুঝতে চাইলে তবে বোঝা যায়—!
দাদুমনি নাকি এখন একটু ভাল—সাড়ে ন’টায় ডাক্তারের সাথে শেষ কথা হয়েছে—ব্লাড প্রেশার অনেকটা স্টেবল—কিন্তু হার্টবিট নাকি খুব উইক—কে জানে...? এদের কথায় আজকাল আর ভরসা করতেও সাহস হয় না—
আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আগুন ছুটে গেল—বৃষ্টি হবে কি...?
চা-টা হাতে নিয়ে হাসপাতালের সিঁড়িতে বসল টুপুর—কি যেন একটা স্বপ্ন দেখছিল ও এখুনি? কি যেন...? যত ধরার চেষ্টা করছে,তত যেন পিছলে পালিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নে-দেখা দৃশ্যগুলো...দিদুন ছিল এটুকু মনে আসছে...আর......
‘ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?’
-“না না...শ্রবণকুমারেরটা নয়...ওটা বিচ্ছিরি...আজ পুণ্যিপুকুরের গল্পটা বল না,দিদুন...!”
-“আআ মল যা...পুণ্যিপুকুরেরটা আবার গল্প নাকি? কতবার শুনিচিস ওটা...সেই যে চারকোনা পুকুর কেটে...”
-“না না...অম্নি করে না...ভালো করে বলো না...!”
প্রতিদিন প্রাইমারি স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে যাবার পর দিদুনের খাটটায় পাশাপাশি শুয়ে পড়তো ওরা দুইবোন...টানটান উত্তেজনায়...নতুন গল্পের দুরন্ত আকর্ষনে...বা সাতপুরোনো গল্পের কানাঘুঁজিতে একটু নতুন আবিষ্কারের আশায়...
-“ভালো করে আবার কি? সব মনে আছে তোদের...এই ত সেদিন শুনলি...”
-“না,না...বলো না দিদুন... ‘ভাটি-খালকুলায় বোশেখ মাসটা জুড়ে...’...বলো না...!”
-“বেশ,বেশ..শোন তবে....তা আমাদের গ্রাম ভাটি-খালকুলায় গোটা বোশেখ মাসটা জুড়ে নানাআআন রকম উত্সব-মচ্ছব লেগেই থাকত...গ্রামটার পাশ দিয়ে গোল করে বাঁক নেওয়া চন্দনা তখন এই প্যাকাটির মতন শুকিয়ে যেত...অথচ বর্ষায় তার সে কি আস্ফালন...! জলে আর মাছে থৈ থৈ করত তখন!
যা হোক বোশেখের কথা বলছিলাম...পয়লায় দয়ালের আসন থেকে একখানা নগরকীত্তন বার হত...সারা গ্রাম ঘুরে তারা সংক্রান্তির মেলার জন্য দান-দক্ষিণে নিত...সে কীত্তন ভাটি-খালকুলা আর মাদুলি-খালকুলার সব দরজায় ঘুরতো...
তারপর বোশেখের পত্থম ব্রত করতাম আমরা...পুণ্যিপুকুরের ব্রত...ঘর-লাগোয়া বিশাল দীঘি ছিল আমাদের...তার পাড়েই চারকোণা পুকুর গড়তাম...”
-“কত বড় পুকুর দিদুন...?”
-“ছোট্ট...! এই ধর এইটুকুনি...”, খাটের ওপর আঙ্গুল দিয়ে দাগ টেনে পুকুরের আয়তনটা বুঝিয়ে দিত দিদুন, “সেই পুকুরভর্তি করে জল দিতাম আর পুকুরের মাঝখানে একখানা বেলের ডাল লাগিয়ে দিতাম...”
-“বেলের ডাল কোত্থেকে নিতে...? দয়াল আসনের পাশের বোধন-বেলগাছটা থেকে বুঝি...?”
-“সে অত মনে নেই...বেলের কি আর অভাব ছিল নাকি...?”
-“তারপর...?”
-“তারপর পুজো করতাম...! হাত জোড় করে, কোষাকুষিতে সব সাজিয়ে নিয়ে...”
-“মন্ত্র বলতে না...?”
-“হ্যাঁ...বলতাম বই কি...সব্বাই মিলে বলতাম,
‘পুণ্যিপুকুর ব্রতমালা/কে করে গো সকালবেলা
আমি সতী,লীলাবতী/সাতভায়ের বোন,ভাগ্যবতী
হবে পুত্র,মরবে না/ধান সে গোলায় ধরবে না
পুত্র তুলে স্বামীর কোলে/আমার মরণ হয় যেন এক গলা গঙ্গাজলে...’...”
ছড়াটা শেষ হতেই হাততালি দিয়ে উঠত নুপূর...দিদুনের কোল ঘেঁষে বসে বলত, “আর শিবরাত্রির মন্ত্রটা......?”
-“ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?
আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর।
আসনং পাশনং পাত সিংহাসন
হরগৌরী ব্রত করে শিব হরধন
কালো ফুল তুলতে গেলাম শুধু লতাপাতা
শিব-চরনে দেখা হল, শিবের মাথায় জটা...”
-“তারপর...?”
-“তারপর আর কি? চেয়ে নিবি...”
-“কি চেয়ে নেব...?”
-“বর...! এই টকটকে ফরসা রং, টানাটানা চোখ, টলটলে হাসি...রাজপুত্তুরের মতন বর চেয়ে নিবি...”
-“চাইলেই পাওয়া যাবে।তাই না দিদুন...?”, নুপূর জিগেস করত অনেক আগ্রহ নিয়ে...
-“কিন্তু এতো একেবারে দাদুমণির মতন...”, বলত টুপুর, “আমার তো দাদুমনি আছে...আমি আর চাইবো কি করতে...?”
আকাশে আরেকখানা বিদ্যুতের ঝলক...শুধু আলো...কোনো শব্দ হলনা...দিদুন বুঝি মুচকি হাসল ওই ওপরে বসে বসে...আর তক্ষুনি টুপুর হঠাত্ খেয়াল করলো দু-গাল ভিজিয়ে দিয়েছে বাধ-না-মানা চোখের জল...দুহাতে মুখ ঢাকলো ও...সেইদিন থেকে সব্বাই কেঁদেছে...সব্বাই...শুধু ও ছাড়া...সুযোগ পেয়ে সবটুকু কান্না উছলে পড়তে চাইছে এখন...অঝোরে...
এই একা-রাত গুলো এরকমই অবাধ্য হয়...একগুঁয়ে...জেদি...কাঁদিয়ে তবে ছাড়ে...!

স্বীকারোক্তি, আমি আর একরাশ বাজে-বকা

By : Sayantari Ghosh


জানেন ত, আজকে স্বীকারোক্তি দিবস...? (কি যেন একটা ইংরিজি নামও ছিল...ভুলে গেছি!)
একখানা সিরিয়াস স্বীকারোক্তি করা নাকি আজকের দিনে যাকে বলে একেবারে মাস্ট! “সিরিয়াস স্বীকারোক্তি” বুঝলেন না? মানে ওই ধরুন “ছোটবেলায় আমি ধুলোবালি, মাটি, ছাই এসব হাতে পেলেই বেমালুম খেয়ে ফেলতাম” বা “গতকাল আমি ২১৫ নয়,৭১ নম্বর বাসে উঠেছিলাম আসলে” কিম্বা “ওই কাঁচের ফুলদানিটা... মানে আমারই হাত থেকে পড়ে...” এই জাতীয় অ-সিরিয়াস স্বীকারোক্তি সব বাতিলের খাতায়... বুঝলেন এইবারে?
এখন আপনারা ত জানেন (?) এসব দিনক্ষণ আমি কি নিষ্ঠার সাথে মেনে চলি! অনেক ভেবে দেখলাম, কাজটা যখন করতেই হবে তখন ব্লগটাই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা... আমার ভ্যাজর-ভ্যাজরে চূড়ান্ত বিরক্ত হলেও কেউ আমায় চাঁদা তুলে গণপিটুনি অন্ততঃ দিতে পারবে না এখানে!
অতএব......শুরু করি তাহলে...!
শুরু'টা করবো একটা প্রশ্ন দিয়ে। আচ্ছা, মনে করুন, আপনাকে জিগেস করলুম যে একখানা এরকম টপিক বলুন দেখি, যেটা নিয়ে আপনার বেসিকালি কিচ্ছু এসে যায় না, কিন্তু তবু  কেউ সেই নিয়ে গল্প শোনাতে চাইলে আপনি নন্দলালের মালাই চমচম খাওয়ার অফার'ও হেলায় উপেক্ষা করে বসে পড়বেন? নিশ্চয়ই এরকম পছন্দের বিষয় কিছু আছে... যেমন ধরুন ভূত? বা ভিন গ্রহের প্রাণী...? বা ধরুন, দাম্পত্য-কলহ? আছে নিশ্চয়ই...? আমার তেমনই বহুদিনের আকর্ষণ একটি শব্দের প্রতি ... শব্দটি হল “ক্রাশ”! এই সব গল্পের চুম্বকে আমি এক্কেবারে বাঁধা, সে মায়া বোধহয় এ-জন্মে আর কাটিয়ে উঠতে পারব না!!! আমি ক্রাশের আড্ডা বড্ড ভালোবাসি, আর সে সব আড্ডা বসলেই আমার মনের অন্ধকার আউটহাউসের বাসিন্দা আমারই অংশবিশেষ কোনো এক দুরাত্মা (তার কদমছাঁট চুল, মারাত্মক লালচে চোখ আর মাথায় দুখানা ছোট্ট ছোট্ট শিং!! তাকে আমি মাঝেমধ্যেই মানসচক্ষে দেখতে পাই!) বসে বসে বিচ্ছিরিভাবে দাঁত বের করে হাসে আর বলে, “ভাবছিস কি?? সবাই এখানে ক্রাশের গল্প শোনাবে...?! খুব মজা, না? খ্যাঁক খ্যাঁক, খোঁক খোঁক...”
আজ বড় ভালো দিন— মিথ্যে বলব না— ওই শিংওয়ালা শয়তানটার কথার পুরোপরি সত্যি— ক্রাশ-টাশের গল্প আমার ভাই বেজায় ভাল লাগে— আপনারা হয়তঃ বিশ্বাস করবেন না, ভাববেন বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছি, কিন্তু সেরকম গল্প বলার লোক পেলে আমি সারাজীবনটা খাটের ওপর এলিয়ে বসে, বাদামভাজা খেয়ে আর ক্রাশের গল্প শুনে মজাসে কাটিয়ে দিতে পারি— এসব রোমাঞ্চকর কাহিনীর আমি চিরন্তন একনিষ্ঠ শ্রোতা!
কিন্তু ভাল শ্রোতা হওয়ার একটা গুরুতর অসুবিধা আছে। তাতে আপনি চিরকাল শুনতেই থাকেন, কেউ আর আপনার কাছে কখনো কিচ্ছুটি শুনতে চায় না!
আমারও সেই একই ঝামেলা! রাজ্যের লোকজন এসে আমাকে রকমারি গল্প শুনিয়ে যায়, আমিও শোনার আনন্দে সেসব গোগ্রাসে গিলে ফেলি... কিন্তু তাই বলে বুঝি আমার বলার মত কিছু থাকেনা? আমার বুঝি এক-দুটো ক্রাশের গল্প থাকতে নেই? যাচ্ছেতাই একেবারে...!
সে যাই হোক, আজ তাই আমার সিরিয়াস স্বীকারোক্তিটি আমার প্রথম ক্রাশ বিষয়ক একখানি দূর্লভ কাহিনী। দীর্ঘকাল যাবত্ পুরনো গল্পের বস্তায় পড়ে থাকার দরুন পচে-টচে গেলে অবিশ্যি জানিনে...!(শুনেছি স্বীকারোক্তি ব্যাপারটা নাকি বেশ কষ্টকর; আমার এরকম ভয়ানক আনন্দ হচ্ছে কেন, কে জানে!)
প্রথম ক্রাশ জিনিসটা আমার বান্ধবীদের মধ্যে ঘটে গেছিল ওই ক্লাস সেভেন-টেভেন নাগাদ। আমি সেই সময় ঠিক কি করছিলাম অনেক চেষ্টা করেও কখনও সেটা মনে পড়েনা! ওই সবার গপ্পোগাছা শুনতে গিয়েই কাল হয়েছিল হয়তঃ...
আমার বাবার ইস্কুলের ছাত্র'রা সকাল-বিকেল দঙ্গল বেঁধে আমাদের বাড়ি আসত মাঝে মাঝেই। সেদিকেও আমার তেমন উত্সাহ ছিল না। কিন্তু...... ব্যাতিক্রমী ঘটনাটি ঘটল! তখন আমি ক্লাস নাইন। এক শনিবারে স্কুলের পর ঘন্টাদেড়েক গানের রিহার্সাল করে, খিঁচড়ানো মেজাজে, স্কুলড্রেসের হলুদ শাড়িতে হোঁচট খেতে খেতে বাড়ি ফিরছি। মাথায় তখন খালি ঘুরছে পরদিনের টিউশনের পরীক্ষাটার কথা...

হঠাত্ রাস্তার পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, “আচ্ছা, সুজনস্যারের বাড়িটা কোনদিকে?”
গলার স্বরের মালিকের দিকে চোখ পড়তেই আমি থ! বুকের মধ্যে একসাথে হাজারখানা কাঁসর-ঘন্টা বাজতে শুরু করল হঠাত্! একি দেবদূত নাকি রে বাবা? কিছুক্ষন হাঁ করে তাকিয়ে থাকার পর বুঝলাম যে, না, এ দেবদূত নয়; দেবদূতরা CBZ বাইক চালায় না!
সে আমার এই বিহ্বলতা লক্ষ্য করেছিল কিনা জানিনা। সে আবার বলল, “আমি সুজনস্যারের বাড়িটা খুঁজছিলাম; আপনি চেনেন?”
কোনোক্রমে হাত উঠিয়ে বাড়ির দরজাটা দেখিয়ে দিলাম। এটুকুও বলা গেল না যে সেতো আমাদেরই বাড়ি..! যাকে বলে একেবারে দর্শন এবং সম্মোহন... কয়েক ন্যানোসেকেন্ড সময় লেগেছিল হয়তঃ...
পরে জেনেছিলাম বাপির কোন এক চেনা ডাক্তারবাবু তাঁর তনয়রতনটির জয়েন্টের স্পেশাল কোচিং-এর জন্য বাপিকে রিকোয়েস্ট করেছেন। বাপিকে সাধারণতঃ এ ধরনের অনুরোধের ফাঁদে ফেলা যায় না; এবারেই কি করে না জানি অঘটনটা ঘটে গেছে। ব্যাপারটা শোনামাত্র আমার উত্তেজিত প্রাণের মধ্যে একটা দৈব-নির্দেশিত ঘটনার ইঙ্গিত আরো স্পষ্ট হয়ে গেল এক্কেবারে! আর তার ওপরে যখন শুনলাম যে প্রতি শনিবারই সাড়ে তিনটে নাগাদ তার আগমন ঘটবে, তখন এত আনন্দ রাখব কোথায়, এই নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম!
এরপর থেকে শুরু হল এক অদ্ভুত রুটিন! বাড়ির সবাইকে দিবানিদ্রার সুযোগ দিয়ে স্বার্থত্যাগী (?) আমি শনিবারের ভর দুপুরগুলো অঙ্ক খাতা নিয়ে দিন-জাগা শুরু করলাম! মা তো মহাখুশি! মাধ্যমিকের বছর মেয়ে দুপুরে টানটান পাঁচঘন্টা না ঘুমিয়ে অঙ্ক খাতা নিয়ে বসলে মায়ের খুশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর আমি? সেই “পাপা কেহতে হ্যায়...” গানের স্টাইলে সারা দুপুর “চমকিত মন, চকিত শ্রবণ, তৃষিত আকুল আঁখি” নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে বসে থাকতাম— অপেক্ষা— কখন সে আসবে আর আমি দরজাটা খুলে দেব! সে রোমাঞ্চ ভাষায় বলার মতন অত বাংলা আমি শিখিনি এখনও...!
এতদূর শুনে যদি আপনি একটা দারুন প্রেমের গল্পের গন্ধ পাচ্ছেন, তাহলে মহাভুল করছেন মশাই! গল্পের মুখ্য পাত্রীটি যে আমি সেটা বুঝি নির্ঘাত ভুলে মেরে দিয়েছেন? মাসছয়েক ধরে আমি ওই দরজা খোলার কাজটি বড় দায়িত্ব নিয়ে, ভীষণ নিপুণতার সাথে করে গেলাম আর তারপর...? 
তারপর আর কি? জয়েন্ট পেয়ে গিয়ে সে যথারীতি বিদায় নিল!
সেই দুঃখে মাসখানেক মুহ্যমান হয়ে ছিলাম। আমার বন্ধুরা বলে সেসময় নাকি আমার মধ্যে বেশ একটা বৈরাগ্য-গোছের ভাব এসছিল; ওদের নাকি ভয় হয়েছিল যে তার নামের মালা জপ করেই বোধহয় আমার বাকি জীবনটা কেটে যাবে... যাই হোক, ঘাড়ের ওপর হুড়মুড়িয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষাটা এসে গিয়ে আমার বৈরাগ্য-টৈরাগ্যের সব্বোনাশ করে দিলে... নইলে আমায় নিয়েও কত্তো কবিতা-উপন্যাস লেখা হত, দেখতেন!
শেষমেশ আর একটা কথা বলি। মাধ্যমিকে অঙ্কে সঅঅব ঠিক করে এসছিলাম; তবু একশ হয়নি। প্রথমে দুঃখ পেলেও পরে বুঝেছিলাম এ আমারই পাপের ফল বই আর কিছু নয়। শনিবারের ওই দুপুরগুলো অঙ্ক করার ব্যাপারটা যে শুধুই গল্প, সে ত আর মা-বাপি কোনোদিন জানতে পারেনি! রীতিমত ভয় করত মাঝেমাঝে, যে কোনদিন মা এসে ক্যাঁক করে চেপে ধরবে, “প্রতি শনিবার অত্তো অত্তো অঙ্ক করলে তো দশ-বিশ কিলো খাতা জমে যাবার কথা! কোথায় সে সব? দেখি...” ইত্যাদি! যা হোক, সে দুর্দিন আমার আসেনি কখনও।
তা এই হল গিয়ে আমার আজকের স্বীকারোক্তি! আপনার কিন্তু অসাধারণ ‘ইয়ে’.... এখনো পড়ে যাচ্ছেন!! তো এতটা যখন পড়লেনই, আর একটা কাজও করে ফেলুন না! আজ দিনটা সত্যিই খুব ভালো। আপনিও একটা এই জাতের স্বীকারোক্তি করেই ফেলুন না বুকের সমস্ত সাহস একজোট করে...! বলছি শুনুন, কিউপিডের নেকনজরে থাকবেন! বিশ্বাস করুন...

ফেরা / এক

By : Sayantari Ghosh


এক

হাসপাতালটার একটা দিকের দেওয়ালের জায়গায় সাততলা-জোড়া কাঁচ— তার মধ্যে দিয়ে দেখলে বাইরের উত্তপ্ত জ্যৈষ্ঠের দুপুরটাকেও সবজে ছায়ায় ঢাকা মনে হয়। তিনতলার সেইরকম একটা কাঁচের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল টুপুর। বাইরের গাছপালা,বাড়িঘর— নির্জন রাস্তায় মাঝেমাঝে হুশ করে ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া এক-একটা গাড়ি— সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা জড়তা— সময়টা খারাপ ক্যাসেটের রিলের মত জড়িয়ে গেছে যেন! এখান থেকে বোঝাই যায় না এটা ভোর, দুপুর নাকি বিকেল গড়িয়ে গেছে— ইচ্ছে করে এরকম কাঁচ লাগিয়েছে এরা— জোর করে সময়টাকে আটকে দিতে চায়। ভীষণ একটা ভাঁওতার মধ্যে রেখে দিতে চায়— একটা ধাঁধার মধ্যে।

এভাবেই তিনটে দিন কেটে গেল— দিনরাতের হিসেবটাও গোলমাল হয়ে যাচ্ছে এবারে—
একটু দূরে ওয়েটিং হলের বেঞ্চিতে মা-কে জড়িয়ে ধরে, চোখ বন্ধ করে নূপুরটা বসে আছে— মায়ের চোখ ফোলা, মুখ লাল— বাপি আর কাক্কা অনেকখন ধরে কথা বলছিল; এখন চুপ— বাপির চোখ বন্ধ; চোখের পাতাটা তিরতির করে কাঁপছে— কথা আর কান্না তে কিই বা আসে-যায়? হিসেব তো মনেমনে সব্বাই করছে!

টুপুর আবার রাস্তার দিকে তাকালো—গলার কাছটায় কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে—
দাদুমণির এই ভাবে অসুখে পড়াটা ঠিক মেনেই নেওয়া যাচ্ছে না। সেদিনও তো বিকেলে হাঁটতে বেরোলো— টুপুর স্কুল থেকে ফিরেছে তক্ষুনি— M.A.-এর রেসান্টটা বেরোয়নি—এই ফাঁকে একটু হাত পাকানো আর কি! 

সদরের কাছটাতে দাদুমণির সাথে দেখা, বলল, “কি বড়দি? মুখ গোমড়া কেন? ছাত্তররা কথা শুনছে না বুঝি?”
-“কি যে বল,দাদুমনি? আমার কথা শুনবে না?জানো, আমি সারাক্ষণ হাতে বেত রাখি!”,হেসে জবাব দিয়েছিল টুপুর, “দু-মিনিট দাঁড়াও না গো! এক কাপ চা খেয়ে নিই— দিয়ে আমিও তোমার সাথে ঘুরে আসি একটু...”
-“না ভাই, তুই বড় দেরি করে দিস!” মাথা নেড়ে বলেছিল দাদুমনি, “তোর সাথে আরেকদিন ঘুরতে যাব... যেদিন ব্যাগপত্তর কিনতে নিয়ে যাবি, সেইদিন... কবে যাবি বল তো?”
-“ইইইস!! ব্যাগপত্তর কেনার আর তর সইছে না,বলো?! রোববার যাব, দাদুমনি... পাক্কা...!”

আজ রোববার! ভাবতেই বুকের ভেতর'টা যেন দুলে উঠল একেবারে... বৃহস্পতিবার থেকে আজ রোববার— দাদুমনি কথাই বলছে না— সেইরাত থেকে আজ তিনদিন টানা এখানেই টুপুর— বাড়িমুখো হয়নি সে— মা আজ সকালে বলছিল,"বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নে মামনি, এবার শরীর খারাপ করবে কিন্তু...”

ঘুমিয়ে?! এই তিনদিনে বসে বসে মাঝেমাঝে ঝিমুনি এলেও একটা দারুণ ঝটকা দিয়ে উঠেছে ভিতর থেকে— ঘুমের মধ্যে মারাত্মক দুঃস্বপ্ন দেখে যেমন ঘুম ভেঙে যায়, সেইরকম— চমকে সোজা হয়ে উঠে বসেছে টুপুর প্রতিবার!

-“না ভাই, তুই বড় দেরি করে দিস!” বলেছিল বটে দাদুমনি— খুব দেরি হয়ে গেল কি? কে জানে... বেশী কিছু তো নয়— শুধু একবার ঘরে ফিরতে চায় মানুষটা—তারও কি অনুমতি মিলবে না?? ভগবান...!

ঘরে ফেরা। এই একটা ইচ্ছে নিয়ে প্রতিটি রাত স্বপ্ন দেখত দাদুমনি; প্রতিটা দিন স্বপ্ন লিখত! দু'বছর আগে সেপ্টেম্বরে যখন হুঠ করে দিদুন চলে গেল, তার পর থেকেই আস্তে আস্তে এই ছেলেমানুষিটা পেয়ে বসেছে দাদুমনিকে... ঘরে ফিরবে! একবার! সেই গ্রাম, সেই মাটি, সেই ঘাস, সেই নদী, সেই সঅঅব কিছু একবার, শুধু একবার আলতো করে ছুঁয়ে আসবে! একটিবারের জন্য বাংলাদেশ ফিরবে! “ছানি পড়া চোখ, তবু দেখবো রে... কালা কান, তবু যেটুক শোনা যায়!” যেটা বলেনি সেটা হল,এখনও জীবন্ত প্রাণ... তাই বাঁচবো রে, যেটুক বাঁচা যায়!!

হুজুগ?! বলা যায়। অনেকে বলেও ছিল— তোতোনপিসি, দীপ্তিবউদি এমনকি মিতুলদা অবদি!দাদুমনির বাংলাদেশে যাওয়ার এই পাগলপারা ইচ্ছেটাকে আশকারা দিতে মানাও করেছিল বাপিকে। বাপি কোনোদিন কারো কথায় কান দেয় না; এবারও দেয় নি। বলেছিল, “যেতে ইচ্ছে তো যাক না!”

সেই দেশভাগের সময় থেকে মাটিছাড়া দাদুমনি। তারপর কোনোদিন, কখখনো ফিরে যায় নি। ফিরতে চায়ও নি। কিন্তু স্মৃতিজুড়ে ছিল সেই মাটির সোঁদা গন্ধ। এখনও মনে পড়ে— সে কবেকার কথা— টুপুর তখন স্কুলে পড়ে— শীতকালে ওপরের বারান্দার রোদে-ভেজা খাটটায় বসে বসে কত গল্প বলে যেত দাদুমনি আর দিদুন— টুপুরের আপাদমস্তক শহুরে মনটার কাছে রূপকথার থেকেও অবিশ্বাস্য লাগত সেসব কথা— দেখতে দেখতে ওর মনটাও ছুটতে শুরু করত সবুজ ধানের শিষে হাত ছুঁইয়ে— সরু আল বেয়ে— নীল আকাশটা নুইয়ে পড়ছে ওকে দেখতে— দূরে একদল সাদাকাশ একসাথে হৈ হৈ করছে— ছুট, ছুট, ছুট— “রুপুউউউ...!! ওওওওওই বুড়ো অর্জুনতলা অবদি কিন্তু— আজ আবাআআআর তুই হেরে যাবি...!!!” —আআআর এই যে গাছ ছুঁয়ে দিয়েছি— জিতে গিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠত টুপুর— শুনতে শুনতে ভুলেই যেত যে স্মৃতিটা আসলে কার...! মনে হত কবেকার সেই জোড়া-বাংলার অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেমেয়ে রুপু, মদন, গীতা, নাজিম, সুজয়... এরা যেন ওরই ক্লাসে পড়ে, ওরই অভিন্নহৃদয় বন্ধু...

তাই যেচেই দায়িত্বটা নিয়েছিল ও। আর সবাই যখন সময়-সুযোগের অভাব-টভাব নিয়ে সাতপাঁচ ভাবছে, নিজেই বলেছিল, “আহা!কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে? আমিই যাবো সাথে...!”

মনে মনে হেসেছিল তখন। দিদুন টুপুরকে “সতীন” বলতো আদিখ্যেতা করে... দিদুন নেই, দায়িত্বটা ওরই ওপর বর্তায় বইকি!!

সেই ঘরে ফেরা। তার কত আয়োজন! রীতিমত পাগল হয়ে উঠেছিল দাদুমনি। কত কিছু গোছগাছ, কেনাকাটা... আজ রোববার... আজ বড় দেখে একটা ব্যাগ কিনে দেবে বলেছিল টুপুর... আর আজ...
-“মামনি!”

চমকে উঠল টুপুর! মা কখন কে জানে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

-“ চল, আজ বাড়ি ফিরে চল তুই! টানা তিনদিন হল। মিতুল বলছে, ও না'হয় থেকে যাবে আজ রাতটা...!”

-“কি দরকার মা? আমিই থাকছি— মিতুল'দার আর কষ্ট করার দরকার নেই... বাড়ি গিয়ে আমার লাভ কিছুই হবে না”, কবজি উলটে ঘড়িটা দেখল টুপুর, “সাড়ে সাতটা বাজল। তোমরা বরং বেরিয়ে পড়ো!”

[চলবে]

আবার যদি ইচ্ছে কর...

By : Sayantari Ghosh
morning-jnu-light-way-road.jpeg

এক
অনেকদিন বাদে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ফিরলাম। জীবনের হিসেবে ফেললে ‘অনেক’ শব্দ’টা ভুল হয়ে যাবে অবশ্যই... তবে দূরত্ব আর গুরুত্বের হিসেবে কিন্তু একশ’ভাগ ঠিক! সেই যে অঝোর বৃষ্টি’তে চোখভর্তি ছেলেমানুষী জল নিয়ে শহর ছেড়েছিলাম... সে পাক্কা আড়াই বছর হল!
এবারেও ট্রেন থেকে নেমেছি ঝমঝমে বৃষ্টি’তে। ভাবা যায়? এই ফেব্রুয়ারির শেষে... ওই শুকনো দেশে...!? আসলে এ শহর জানে আমি বৃষ্টি ভালোবাসি। কারণে অকারণে সেই দু’বছরে কত যে বৃষ্টি নামিয়েছে আমায় অবাক করে দিয়ে, সে হিসেব ডায়েরিতে রাখতাম তখন... প্রতিবার নিখুঁত টাইমিং, নির্ভুল নিশানা!
হাঁটতে ইচ্ছে করছে... নর্থ গেটের সামনেটাতেই ছ’শো পনেরো থেকে নেমে পড়লাম... এখানে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি গাছ... একেবারে সবুজে সবুজ... দিন’টা মঙ্গলবার, উইক’ডে... সব্বাই ক্লাসে, বা হস্টেলে এই অসময় বৃষ্টি’তে নির্ঘাত... রিংরোড প্রায় শুনশান...
গঙ্গা হস্টেলের সামনের বাস স্টপ’টা পেরোলো... সেই ধূ ধূ গরম’টা ছুঁয়ে গেল যেন হলকা দিয়ে... মনে পড়ে গেল বাহান্ন না তিপ্পান্ন’র তর্ক আর মনে এল অজ্ঞান হয়ে গেলে মানুষের শরীর’টা ঠিক কত’টা ভারি হয়ে যায়...
নর্মদার সামনের সেই পাথর’টার ফাঁকে উঁকি দিলাম পেরোতে পেরোতে... ‘ইয়ং গান্‌স্‌ অফ ইন্ডিয়া’ জ্বলজ্বল করে উঠল আমাকে চমকে দিয়ে... আধ সেকেন্ড বাদে টের পেলাম হেসে ফেলেছি অজান্তেই...
নর্মদা আর সাবরমতির মাঝের শুঁড়িপথ ধরলাম... এই আলো’টা বুঝি এখনও রাতে দপদপ করে? কাবেরির দিকে যাওয়ার চোরারাস্তা’টার সামনে কারা যেন পাঁচিল তুলে দিয়েছে... এখানে সেই ঝামরঝুলোর মত নিচু হয়ে ঝুঁকে আসা জঙলা লতাগুলো আরো গাঢ় করে দিয়েছে অন্ধকার... হঠাত্‌ হাতের খুব কাছে মনে হল আর কারো হাত... ছিটকে সরে এলাম... গলার কাছে ভয় না কান্না কি যেন একটা ধাক্কা দিচ্ছে ক্রমাগত...
তাপ্তীর সামনের ওপেন এয়ার ক্যান্টিন’টা দ্যাখা যাচ্ছে। সবক’টা চেয়ার নিশ্চয়ই ভিজে সপসপে, ভাবতে ভাবতে যেই না ঢোকা, দুটি খুব পরিচিত কন্ঠ সমস্বরে ঘোষণা করল, “লেট! অ্যাস ইউসুয়াল...!” ইউসুয়াল’ই বটে। আড্ডায়, ওয়ার্কশপে, ক্লাসে বা অ্যাসাইনমেন্ট করার তলবে দেরি করে পৌঁছানোর কত বিশ্বরেকর্ড আমি করেছি, সে খবর ওরা ছাড়া আর কে’ই বা রাখে...?
হেম আর পারো!
পরের পঁচিশ’টা মিনিট পাগলামি’তে ভেসে গেল একেবারে। যা বলছিলাম তার মধ্যে আদৌ কোন বক্তব্য ছিল না। ছিল খালি নিখাদ উচ্ছ্বাস... এতদিন বাদে এত কাছ থেকে এই চেনা মুখগুলো চোখের সামনে দ্যাখার উন্মাদ উচ্ছ্বাস! ছবি নয়, ওয়েবক্যাম নয়... একেবারে লাইভ আর এক্সক্লুসিভ!!
রাজুদা’র বহুচর্চিত ম্যাগি (বহু-আস্বাদিত’ও বটে) অর্ডার দেওয়া হল, যা কিনা জমাটি আড্ডার শাশ্বত সঙ্গী!
“মিসিং রুদ্র, না?” পারো বলল, “চারজনের গ্রুপ’টা ইস সামহাউ ইনকমপ্লিট উইদাউট দ্য ওনলি গাই...”
“ওকে ছাড়... ও চিরকালের ব্যস্ত মানুষ”, আমি বললাম।
“শোন শোন, তুই বল আগে...”, পারোর দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়ে হেম বলল, “দুম করে এমন সাঙ্ঘাতিক কাজ’টা এক্সিকিউট করে ফেলার ডিসিশন নিয়েই ফেললি তাহলে? বিয়ে, হ্যাঁ? কান্ড করলি বটে মিস্‌...”
“দুম করে?!”, রে রে করে উঠল পারো, “কাম অন মিস হেমাক্সি আইয়ার... যে গল্প’টা গত পাঁচ বছর ধরে দিল্লি, হরিয়ানা, অসম আর বেঙ্গল চারটে স্টেট জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, যে’টা সল্‌ভ্‌ করতে গিয়ে আই ইউস্‌ড্‌ দ্য লাস্ট ড্রপ অফ মাই ইন্টেলিজেন্স আর টলারেন্স, সেটা ‘দুম করে’?! ইট অলমোস্ট রিচ্‌ড্‌ মাই ইলাস্টিক লিমিট ইয়ার... অন্য কেউ না লিখে থাকলে আমি পাক্কা একটা বই লিখে ফেলতাম...”
আমি আর হেম হো হো করে হাসছিলাম ওর ছটফটানি দেখে।
“আচ্ছা, তোর ব্যাপার’টা কি বলত হেম?”, পারো রেগে গিয়ে কথা ঘোরাতে চাইল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড উইথ ইয়োর ‘পোস্টম্যান’ গাই? জিগেস করলে বলিসও না ঠিক করে ফোনে... হোয়াট ইস দ্য প্রবলেম আকচুয়ালি, হাঁ? কি হয়েছে... এই রিনি, চেপে ধর তো ওকে...”
“কি হবে? নাথিং! উই আর ফ্রেন্ডস্‌...”, ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল হেম।
“স্টিল...” দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম, “ওই শব্দটা’ও বল্‌ সাথে করে... নইলে হয়?”
(ক্রমশঃ)

অন্যরকম

By : Sayantari Ghosh
কলেজের পর সেই যে শহর ছেড়েছি, তারপর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলিয়ে অন্ততঃ খান তিরিশেক বিয়েবাড়ি মিস্‌ করেছি। তারজন্য অন্তরটিপুনিও খেয়েছি ঢের! খারাপও লেগেছে অনেকবার, ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারিনি অনেকের বিয়েতে নানা কারণে। কিন্তু, চূর্ণির বিয়েতে কে জানে কি করে ছুটি’টা ম্যানেজ হয়ে গেল।
চূর্ণি আমার আজন্মকালের ক্লাসমেট। আমাদের ঠিক প্রিয়তম বান্ধবী বলা যায় না, তবে বয়সের হিসেবে আমাদের বন্ধুত্ব প্রায় আমাদেরই সমবয়সী। আমি চিরকালীন বইমুখো, মুখচোরা আর চূর্ণি দূর্ধর্ষ ডাকাবুকো, সুন্দরীও বটে। আর বিজ্ঞানে তো বলেই যে ‘বিপরীতে বন্ধুত্ব অবশ্যম্ভাবী...!’ আসলে সত্যি বলতে আমি ছিলাম চূর্ণির গুণপণায় মুগ্ধ। ওর বিশেষত্ব ছিল সব্বার থেকে আলাদা হয়ে থাকায়, মানে যাকে বলে অন্যরকম... ‘হট্‌কে!’
তখন আমরা স্কুলে। যে বয়েস’টা থেকে ছেলেদের সাইকেলগুলো ভিড় জমাতে শুরু করে গার্লস স্কুলের বাসস্টপে, সেই তেরো-চোদ্দ’র কাছাকাছি। ওইসময়টায় মেয়েদের আড্ডাতেও কিন্তু চুপিসারে ঢুকে পড়ে কিছু আপাত-সেন্সর্‌ড্‌ প্রশ্ন... “কেমন ছেলে ভালো লাগে?” “কেমন বর চাই?” “ফর্সা?” “টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম?”
পঁচিশ-ছাব্বিশ আসতে আসতে এইসব প্রশ্নের উত্তরে পালিশ পড়ে যায় প্রচুর, চোদ্দ’র সেই আনকোরা, ছিমছাম, টাটকা ভাব’টা থাকে না তখন আর। বছর এগারো বারো পেরিয়েও কারো উত্তর একতারার মত একসুরে বাজে চিরকাল, কারো উত্তর মাঝপথে আঘাত খেয়ে বিপ্রতীপ হয়ে দাঁড়ায় হঠাত্‌ কখনো, কারো উত্তরে আবার বয়েসের ছাপ পড়ে; ছেলেমানুষী কাটিয়ে ‘ম্যাচিউওর্‌ড্‌’ হয় সেগুলো। খুব হাতেগোনা কেউ কেউ এরকমও থাকে যাদের উত্তর’টা প্রথমদিন থেকেই পাকাপোক্ত, তাদের ম্যাচিউরিটির আর কিছু বাকি নেই! চূর্ণি ছিল এরকম একজন। প্রেমবিষয়ে তার এ’সব চোস্ত উত্তরের সৃষ্টিরহস্য কোনোকালেই আবিষ্কার করে উঠতে পারিনি বলেই বোধহয় ওর প্রতি মুগ্ধতা’টাও কাটিয়ে উঠতে পারিনি কখনও। স্কুল কিম্বা কলেজ, চিরকাল ওর “কেমন বর চাই” এর উত্তর ছিল ঝরঝরে, চাঁচাছোলা আর সাঙ্ঘাতিক ‘ম্যাচিউওর্‌ড্‌’, “ওসব লম্বা, ফর্সা, কোঁকড়ানো চুল নিয়ে কি চলবে সারাজীবন? চিরদিন থাকবে নাকি ওসব? আমি তো বলবো আমার বর কালো হোক, ভূঁড়িওয়ালা হোক, একমাথা টাক হোক... এমন হোক যাতে তোদের কারোর পছন্দ না হয়... কিছু পেটে কিছু বিদ্যে থাক, বুদ্ধি থাক কিছু ঘটে, একটা ঠিকঠাক চাকরি আর একটা ভালো মন... ব্যাস, আর কিচ্ছু চাই না!” ক্লাস এইটে ওর এইসব ধারালো জবাব শুনে শুধু আমি নই (আমি তো না হয় ক্লাসের চিরকালীন শ্রীমতি হাঁদাগঙ্গারাম) অনেক চোখা-বাক্যবাগীশও বেশ খানিকটা থমকে যেত বই কি!
সেভেন-এইটে ‘বর’ সংক্রান্ত আলোচনার বসবাস ছিল কানাঘুষোয় আর ফিস্‌ফিসানিতে; বছর তিনেক পেরোতে না পেরোতেই সে সব আড্ডা ‘রে রে’ করে ফ্রন্ট পেজে এসে পড়লো। টিউশনের খাতা দেওয়া-নেওয়ার গল্পগুলোই তখন হল মুখ্য সমাচার! অনেকেই সগৌরবে প্রেমে পড়ার খবর দিল, দু’একজন মনের আনন্দে চকোলেটও খাওয়ালো! আর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে কোচিং সেন্টারের মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলার, যাকে দেখে ক্লাসের অনেকেই “কী ভীষওওওণ কিউউউট...!!” বলতে গিয়ে দম আটকে ফেলত, কে জানে কি করে, চূর্ণির সাইকেল জুড়ি বেঁধেছে সেই শাহনওয়াজ হুসেনের সাইকেলের সাথে। এক্কেরে অবাক হয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, শাহনওয়াজের বিদ্যেবুদ্ধির বহর, কই, নজরে তো পড়ে নি আমার সে ভাবে... ইলেভেনে একবার ফেল করে আমাদের সাথে পড়েছে যদ্দূর জানি... হ্যাঁ, সে লম্বা বটে, ফর্সাও বটে, খানিকটা ‘কিউট্‌’ও হয়তো... কিন্তু... চূর্ণির পছন্দ তো অন্যরকম!
একদিন আর থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলেছিলাম চূর্ণি’কে। শুনে সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, “আর বলিস না, ভালোবাসি না বলতেই ব্লেড দিয়ে হাতের পাতায় কেটে কেটে আমার নাম লিখেছে...”
-“অ্যাঁ...! সে কি রে?” আমি বরাবরই ভীতু, দৃশ্য’টা কল্পনা করেই আঁতকে উঠেছিলাম!
-“তাহলে আর বলছি কি? ‘হ্যাঁ’ বলতেই হয়েছে বাধ্য হয়ে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।
বছর দুয়েকের মধ্যে স্কুলের ব্যাকড্রপ বদলে হল কলেজ। প্রেমের ছবিও বদলালো আরো। আমি যথারীতি দর্শকের ভূমিকায়। প্র্যাক্টিকালের রীডিং আর ক্লাসনোটের খাতা থেকে মুখ তোলার সুযোগ হলেই চলমান লাভস্টোরি’গুলোর খবর নিই। ব্যাপারটা অনেকটা মেগাসিরিয়াল দ্যাখার মত। সাধারণতঃ দিন সাতেকের এপিসোড মিস করে গেলেও বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয় না।
চূর্ণি-শাহনওয়াজের কাহিনী খুব ‘প্রেডিক্টেবল টার্নিং’ নিল যখন চূর্ণি ফিলোসফি অনার্স নিয়ে আমার সাথেই কলেজে ঢুকলো আর শাহনওয়াজ দ্বিতীয়বার উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘এ তো হওয়ারই ছিল... চূর্ণির তো পছন্দ’টাই অন্যরকম!’
সুতরাং এমনটা যে হবে আমি খানিকটা আশা’ই করেছিলাম। তবে যেটা মোটেই আশা করিনি সেটা হল চূর্ণি এতজন প্রতিযোগিনীকে টেক্কা দিয়ে মিলন আগরওয়ালের ঝাঁ-চকচকে স্পোর্টস বাইকের পিছনের সিট’টা দখল করে ফেলবে! অনেক মেয়ে দুঃখ পেল, অনেকে চোখ টাটালো, সন্দেহ নেই। অনেকে অবাকও হল, কিন্তু আমি যে কারণে অবাক হলাম, সেটি ছিল সক্কলের চেয়ে আলাদা। আমার মনে মনে আশা ছিল, শাহনওয়াজের ফাঁড়া কাটানোর পর গোলগাল, চশমাপরা, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট সিনিয়র রূপক সান্যালের সাথেই বোধহয় চূর্ণি পাকাপাকিভাবে সব বন্দোবস্ত করে ফেলবে। রূপকের সাথে চূর্ণির ভাব’ও খুব... বই নেওয়া, খাতা নেওয়া… তবে? মিলন কোত্থেকে ঢুকে পড়ে মাঝখান থেকে?
কৌতূহলের তাড়নায় একদিন চূর্ণিকে পাকড়াও করা গেল। সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো, “মাইরি! সব্বাই ভাবছে ভাবুক... তুইও?!”
ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম, “ম্‌ম্‌... মানে?”
-“মধু, উই আর জাস্ট গুড ফ্রেন্ডস্‌... মি অ্যান্ড মিলন... দু’দিন আমাকে বাসস্টপে কি ড্রপ করেছে, সব্বাই ভাবছে যেন... ... এরকম কিচ্ছু নয়”, শেষ শব্দক’টায় বাড়তি জোর দিয়ে বলল চূর্ণি, “আর আমি এনগেজ হলে তোকে বলবো না মধু? আশ্চর্য্য, তুই তো জানিস আমার কেমন ছেলে পছন্দ...”
মনে মনে বলেছিলাম, “জানি হে জানি, রূপক সান্যাল”, মুখে কিছু বলিনি, হেসেছিলাম খালি।
কলেজের পর খাপছাড়া অরকুট-চিরকুট ছাড়া চূর্ণির সাথে যোগাযোগ তেমন ছিল না। তারপর একদিন হঠাত্‌ ই-মেলে ওর বিয়ের চিঠি পেলাম। মন’টা ভালো হয়ে গেল যখন শুনলাম ছেলে সেরা কলেজের ইঞ্জিনিয়ার, সেরা সরকারি সংস্থার উঁচুপদে ভালো চাকরি করে। রূপক সান্যালের নাম’টা মনে পড়ে হাসি পেল খানিকটা; যাক গে, সে না হোক, মনের মত ছেলে পেয়েছে শেষ অব্দি চূর্ণি।
বহুদিন বাদে শহরে ফেরা, তাও বন্ধুর বিয়েতে। স্কুল কলেজের বন্ধুদের সাথে দ্যাখা, রাতজাগা, ধুন্ধুমার আনন্দ- খুনসুটি-ছেলেমানুষি ঠাট্টায় আর আড্ডায় সন্ধ্যেটা চমত্‌কার কাটলো। চূর্ণিকে দারুণ দেখাচ্ছিল মেরুন বেনারসী’তে। একটা অদ্ভূত আলগা-বিষন্নতা, আলগা-কৌতূহলে, খানিক ক্লান্তি, খানিক টেনশনে আর কনের সাজে মিশ খেয়েছিল বেশ। মনে হচ্ছিল, সে রকম কোনো ফোটোগ্রাফার থাকলে চিরকালীন-বাঙালী-বধূ’র কনসেপ্টে কয়েকটা দূর্দান্ত ছবি তুলতে পারতো!
বিয়ের আসরও ভালো করেই মিটলো। তবে বন্ধুদের অনেকেই যে ঠোঁট টিপে হাসছিল, তা খেয়াল করলাম। খারাপ লাগলো। হ্যাঁ, মানছি, চূর্ণির বর তেমন রাজপুত্তুরটির মত দেখতে হয় নি। গায়ের রঙ হয়তঃ বা একটু বেশিই কালো, মাথার চুল না হয় একটু বেশিই পাতলা, চোখের চশমার কাঁচ না হয় একটু বেশিই পুরু... কিন্তু তাতে কি? চূর্ণির পছন্দ’টা তো অন্যরকম বরাবরই... সব্বাই জানে সেটা।
আজ ফিরছি আমার প্রাণের শহর ছেড়ে আমার কাজের শহরে। চূর্ণির ছোঁয়া লেগে থাকা স্মৃতিগুলো তাই একসাথে মনে আসছে কোলাজের মত। খুব ভালো লাগছিল ভেবে... ওই শাহনওয়াজ, ওই মিলন আগরওয়াল... কোনোভাবেই ওরা চূর্ণির মনোমত ছিল না। সুন্দরী মেয়ে মানেই কি তার ‘সুন্দর বর চাই’ হতে হবে না কি? ভালো লাগছিল, ওর ওই ক্লাস এইট থেকে চলে আসা ধারালো, স্মার্ট, হবু-বরের সংজ্ঞা’টার শেষ অব্দি মানরক্ষা হল বলে। মনে পড়ে গেল, বিয়ের চিঠি পেয়ে যেদিন ওকে ফোন করেছিলাম চূর্ণিকে, হাসতে হাসতে বলেছিল, “বিদ্যে-বুদ্ধি, চাকরি-বাকরির কথাটা যদি বাদ’ও দিই, মানুষটাও কিন্তু খুব ভালো, জানিস তো?”
আমিও হাসিমুখে বলেছিলাম, “কেমন এক্স্যাক্টলি মিলে গেছে... বল্‌?”
ভেবে ভালো লাগলো আবার; আর তখুনি একটা অদ্ভূত ব্যাপারও মনে পড়ে গেল। কথাক’টা শুনেই কে জানে কেন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল চূর্ণি... চুপ করাতে গেছিলাম, কিছুতেই চুপ করেই নি, কতবার জিগেস করেছিলাম, “কেন কাঁদছিস, চূর্ণি?" "কি হয়েছে?" "মন খারাপ করছে কিছু নিয়ে?”
কিচ্ছু বলে নি, কোনো কিচ্ছু বলে নি, শুধু অঝোরে কেঁদেছিল মিনিট তিনেক... তারপর হঠাত্‌ কান্না থামিয়ে ফেলেছিল নিজের থেকেই, থেমে থেমে বলেছিল, “সত্যি, এক্স্যাক্টলি মিলে গেল কেমন... বলা-কথা এভাবেও সত্যি হয়? ভাবতেই পারছি না জানিস... আনন্দে জল এসে গেছে চোখে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।

- Copyright © পাঁচমিশেলি - - Powered by Blogger - Designed by সায়ংতরী -