Popular Post

অন্যরকম

By : Sayantari Ghosh
কলেজের পর সেই যে শহর ছেড়েছি, তারপর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলিয়ে অন্ততঃ খান তিরিশেক বিয়েবাড়ি মিস্‌ করেছি। তারজন্য অন্তরটিপুনিও খেয়েছি ঢের! খারাপও লেগেছে অনেকবার, ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারিনি অনেকের বিয়েতে নানা কারণে। কিন্তু, চূর্ণির বিয়েতে কে জানে কি করে ছুটি’টা ম্যানেজ হয়ে গেল।
চূর্ণি আমার আজন্মকালের ক্লাসমেট। আমাদের ঠিক প্রিয়তম বান্ধবী বলা যায় না, তবে বয়সের হিসেবে আমাদের বন্ধুত্ব প্রায় আমাদেরই সমবয়সী। আমি চিরকালীন বইমুখো, মুখচোরা আর চূর্ণি দূর্ধর্ষ ডাকাবুকো, সুন্দরীও বটে। আর বিজ্ঞানে তো বলেই যে ‘বিপরীতে বন্ধুত্ব অবশ্যম্ভাবী...!’ আসলে সত্যি বলতে আমি ছিলাম চূর্ণির গুণপণায় মুগ্ধ। ওর বিশেষত্ব ছিল সব্বার থেকে আলাদা হয়ে থাকায়, মানে যাকে বলে অন্যরকম... ‘হট্‌কে!’
তখন আমরা স্কুলে। যে বয়েস’টা থেকে ছেলেদের সাইকেলগুলো ভিড় জমাতে শুরু করে গার্লস স্কুলের বাসস্টপে, সেই তেরো-চোদ্দ’র কাছাকাছি। ওইসময়টায় মেয়েদের আড্ডাতেও কিন্তু চুপিসারে ঢুকে পড়ে কিছু আপাত-সেন্সর্‌ড্‌ প্রশ্ন... “কেমন ছেলে ভালো লাগে?” “কেমন বর চাই?” “ফর্সা?” “টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম?”
পঁচিশ-ছাব্বিশ আসতে আসতে এইসব প্রশ্নের উত্তরে পালিশ পড়ে যায় প্রচুর, চোদ্দ’র সেই আনকোরা, ছিমছাম, টাটকা ভাব’টা থাকে না তখন আর। বছর এগারো বারো পেরিয়েও কারো উত্তর একতারার মত একসুরে বাজে চিরকাল, কারো উত্তর মাঝপথে আঘাত খেয়ে বিপ্রতীপ হয়ে দাঁড়ায় হঠাত্‌ কখনো, কারো উত্তরে আবার বয়েসের ছাপ পড়ে; ছেলেমানুষী কাটিয়ে ‘ম্যাচিউওর্‌ড্‌’ হয় সেগুলো। খুব হাতেগোনা কেউ কেউ এরকমও থাকে যাদের উত্তর’টা প্রথমদিন থেকেই পাকাপোক্ত, তাদের ম্যাচিউরিটির আর কিছু বাকি নেই! চূর্ণি ছিল এরকম একজন। প্রেমবিষয়ে তার এ’সব চোস্ত উত্তরের সৃষ্টিরহস্য কোনোকালেই আবিষ্কার করে উঠতে পারিনি বলেই বোধহয় ওর প্রতি মুগ্ধতা’টাও কাটিয়ে উঠতে পারিনি কখনও। স্কুল কিম্বা কলেজ, চিরকাল ওর “কেমন বর চাই” এর উত্তর ছিল ঝরঝরে, চাঁচাছোলা আর সাঙ্ঘাতিক ‘ম্যাচিউওর্‌ড্‌’, “ওসব লম্বা, ফর্সা, কোঁকড়ানো চুল নিয়ে কি চলবে সারাজীবন? চিরদিন থাকবে নাকি ওসব? আমি তো বলবো আমার বর কালো হোক, ভূঁড়িওয়ালা হোক, একমাথা টাক হোক... এমন হোক যাতে তোদের কারোর পছন্দ না হয়... কিছু পেটে কিছু বিদ্যে থাক, বুদ্ধি থাক কিছু ঘটে, একটা ঠিকঠাক চাকরি আর একটা ভালো মন... ব্যাস, আর কিচ্ছু চাই না!” ক্লাস এইটে ওর এইসব ধারালো জবাব শুনে শুধু আমি নই (আমি তো না হয় ক্লাসের চিরকালীন শ্রীমতি হাঁদাগঙ্গারাম) অনেক চোখা-বাক্যবাগীশও বেশ খানিকটা থমকে যেত বই কি!
সেভেন-এইটে ‘বর’ সংক্রান্ত আলোচনার বসবাস ছিল কানাঘুষোয় আর ফিস্‌ফিসানিতে; বছর তিনেক পেরোতে না পেরোতেই সে সব আড্ডা ‘রে রে’ করে ফ্রন্ট পেজে এসে পড়লো। টিউশনের খাতা দেওয়া-নেওয়ার গল্পগুলোই তখন হল মুখ্য সমাচার! অনেকেই সগৌরবে প্রেমে পড়ার খবর দিল, দু’একজন মনের আনন্দে চকোলেটও খাওয়ালো! আর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে কোচিং সেন্টারের মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলার, যাকে দেখে ক্লাসের অনেকেই “কী ভীষওওওণ কিউউউট...!!” বলতে গিয়ে দম আটকে ফেলত, কে জানে কি করে, চূর্ণির সাইকেল জুড়ি বেঁধেছে সেই শাহনওয়াজ হুসেনের সাইকেলের সাথে। এক্কেরে অবাক হয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, শাহনওয়াজের বিদ্যেবুদ্ধির বহর, কই, নজরে তো পড়ে নি আমার সে ভাবে... ইলেভেনে একবার ফেল করে আমাদের সাথে পড়েছে যদ্দূর জানি... হ্যাঁ, সে লম্বা বটে, ফর্সাও বটে, খানিকটা ‘কিউট্‌’ও হয়তো... কিন্তু... চূর্ণির পছন্দ তো অন্যরকম!
একদিন আর থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলেছিলাম চূর্ণি’কে। শুনে সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, “আর বলিস না, ভালোবাসি না বলতেই ব্লেড দিয়ে হাতের পাতায় কেটে কেটে আমার নাম লিখেছে...”
-“অ্যাঁ...! সে কি রে?” আমি বরাবরই ভীতু, দৃশ্য’টা কল্পনা করেই আঁতকে উঠেছিলাম!
-“তাহলে আর বলছি কি? ‘হ্যাঁ’ বলতেই হয়েছে বাধ্য হয়ে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।
বছর দুয়েকের মধ্যে স্কুলের ব্যাকড্রপ বদলে হল কলেজ। প্রেমের ছবিও বদলালো আরো। আমি যথারীতি দর্শকের ভূমিকায়। প্র্যাক্টিকালের রীডিং আর ক্লাসনোটের খাতা থেকে মুখ তোলার সুযোগ হলেই চলমান লাভস্টোরি’গুলোর খবর নিই। ব্যাপারটা অনেকটা মেগাসিরিয়াল দ্যাখার মত। সাধারণতঃ দিন সাতেকের এপিসোড মিস করে গেলেও বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয় না।
চূর্ণি-শাহনওয়াজের কাহিনী খুব ‘প্রেডিক্টেবল টার্নিং’ নিল যখন চূর্ণি ফিলোসফি অনার্স নিয়ে আমার সাথেই কলেজে ঢুকলো আর শাহনওয়াজ দ্বিতীয়বার উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘এ তো হওয়ারই ছিল... চূর্ণির তো পছন্দ’টাই অন্যরকম!’
সুতরাং এমনটা যে হবে আমি খানিকটা আশা’ই করেছিলাম। তবে যেটা মোটেই আশা করিনি সেটা হল চূর্ণি এতজন প্রতিযোগিনীকে টেক্কা দিয়ে মিলন আগরওয়ালের ঝাঁ-চকচকে স্পোর্টস বাইকের পিছনের সিট’টা দখল করে ফেলবে! অনেক মেয়ে দুঃখ পেল, অনেকে চোখ টাটালো, সন্দেহ নেই। অনেকে অবাকও হল, কিন্তু আমি যে কারণে অবাক হলাম, সেটি ছিল সক্কলের চেয়ে আলাদা। আমার মনে মনে আশা ছিল, শাহনওয়াজের ফাঁড়া কাটানোর পর গোলগাল, চশমাপরা, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট সিনিয়র রূপক সান্যালের সাথেই বোধহয় চূর্ণি পাকাপাকিভাবে সব বন্দোবস্ত করে ফেলবে। রূপকের সাথে চূর্ণির ভাব’ও খুব... বই নেওয়া, খাতা নেওয়া… তবে? মিলন কোত্থেকে ঢুকে পড়ে মাঝখান থেকে?
কৌতূহলের তাড়নায় একদিন চূর্ণিকে পাকড়াও করা গেল। সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো, “মাইরি! সব্বাই ভাবছে ভাবুক... তুইও?!”
ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম, “ম্‌ম্‌... মানে?”
-“মধু, উই আর জাস্ট গুড ফ্রেন্ডস্‌... মি অ্যান্ড মিলন... দু’দিন আমাকে বাসস্টপে কি ড্রপ করেছে, সব্বাই ভাবছে যেন... ... এরকম কিচ্ছু নয়”, শেষ শব্দক’টায় বাড়তি জোর দিয়ে বলল চূর্ণি, “আর আমি এনগেজ হলে তোকে বলবো না মধু? আশ্চর্য্য, তুই তো জানিস আমার কেমন ছেলে পছন্দ...”
মনে মনে বলেছিলাম, “জানি হে জানি, রূপক সান্যাল”, মুখে কিছু বলিনি, হেসেছিলাম খালি।
কলেজের পর খাপছাড়া অরকুট-চিরকুট ছাড়া চূর্ণির সাথে যোগাযোগ তেমন ছিল না। তারপর একদিন হঠাত্‌ ই-মেলে ওর বিয়ের চিঠি পেলাম। মন’টা ভালো হয়ে গেল যখন শুনলাম ছেলে সেরা কলেজের ইঞ্জিনিয়ার, সেরা সরকারি সংস্থার উঁচুপদে ভালো চাকরি করে। রূপক সান্যালের নাম’টা মনে পড়ে হাসি পেল খানিকটা; যাক গে, সে না হোক, মনের মত ছেলে পেয়েছে শেষ অব্দি চূর্ণি।
বহুদিন বাদে শহরে ফেরা, তাও বন্ধুর বিয়েতে। স্কুল কলেজের বন্ধুদের সাথে দ্যাখা, রাতজাগা, ধুন্ধুমার আনন্দ- খুনসুটি-ছেলেমানুষি ঠাট্টায় আর আড্ডায় সন্ধ্যেটা চমত্‌কার কাটলো। চূর্ণিকে দারুণ দেখাচ্ছিল মেরুন বেনারসী’তে। একটা অদ্ভূত আলগা-বিষন্নতা, আলগা-কৌতূহলে, খানিক ক্লান্তি, খানিক টেনশনে আর কনের সাজে মিশ খেয়েছিল বেশ। মনে হচ্ছিল, সে রকম কোনো ফোটোগ্রাফার থাকলে চিরকালীন-বাঙালী-বধূ’র কনসেপ্টে কয়েকটা দূর্দান্ত ছবি তুলতে পারতো!
বিয়ের আসরও ভালো করেই মিটলো। তবে বন্ধুদের অনেকেই যে ঠোঁট টিপে হাসছিল, তা খেয়াল করলাম। খারাপ লাগলো। হ্যাঁ, মানছি, চূর্ণির বর তেমন রাজপুত্তুরটির মত দেখতে হয় নি। গায়ের রঙ হয়তঃ বা একটু বেশিই কালো, মাথার চুল না হয় একটু বেশিই পাতলা, চোখের চশমার কাঁচ না হয় একটু বেশিই পুরু... কিন্তু তাতে কি? চূর্ণির পছন্দ’টা তো অন্যরকম বরাবরই... সব্বাই জানে সেটা।
আজ ফিরছি আমার প্রাণের শহর ছেড়ে আমার কাজের শহরে। চূর্ণির ছোঁয়া লেগে থাকা স্মৃতিগুলো তাই একসাথে মনে আসছে কোলাজের মত। খুব ভালো লাগছিল ভেবে... ওই শাহনওয়াজ, ওই মিলন আগরওয়াল... কোনোভাবেই ওরা চূর্ণির মনোমত ছিল না। সুন্দরী মেয়ে মানেই কি তার ‘সুন্দর বর চাই’ হতে হবে না কি? ভালো লাগছিল, ওর ওই ক্লাস এইট থেকে চলে আসা ধারালো, স্মার্ট, হবু-বরের সংজ্ঞা’টার শেষ অব্দি মানরক্ষা হল বলে। মনে পড়ে গেল, বিয়ের চিঠি পেয়ে যেদিন ওকে ফোন করেছিলাম চূর্ণিকে, হাসতে হাসতে বলেছিল, “বিদ্যে-বুদ্ধি, চাকরি-বাকরির কথাটা যদি বাদ’ও দিই, মানুষটাও কিন্তু খুব ভালো, জানিস তো?”
আমিও হাসিমুখে বলেছিলাম, “কেমন এক্স্যাক্টলি মিলে গেছে... বল্‌?”
ভেবে ভালো লাগলো আবার; আর তখুনি একটা অদ্ভূত ব্যাপারও মনে পড়ে গেল। কথাক’টা শুনেই কে জানে কেন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল চূর্ণি... চুপ করাতে গেছিলাম, কিছুতেই চুপ করেই নি, কতবার জিগেস করেছিলাম, “কেন কাঁদছিস, চূর্ণি?" "কি হয়েছে?" "মন খারাপ করছে কিছু নিয়ে?”
কিচ্ছু বলে নি, কোনো কিচ্ছু বলে নি, শুধু অঝোরে কেঁদেছিল মিনিট তিনেক... তারপর হঠাত্‌ কান্না থামিয়ে ফেলেছিল নিজের থেকেই, থেমে থেমে বলেছিল, “সত্যি, এক্স্যাক্টলি মিলে গেল কেমন... বলা-কথা এভাবেও সত্যি হয়? ভাবতেই পারছি না জানিস... আনন্দে জল এসে গেছে চোখে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।

পথচলতি / এক

By : Sayantari Ghosh


তখন দিল্লীতে থাকি। চাকরির খোঁজে এদিকওদিক উঁকিঝুঁকি মারছি। এমন সময় একদিন চিঠি এসে পৌঁছালো যে গুজরাতের এক শিল্পশহরে চাকরির খোঁজ পাওয়া গেছে, ডাক পড়েছে ইন্টারভিউয়ের। তখন ক্যাম্পাসে থাকতাম; এসব জায়গায় দরখাস্ত পাঠানো হত সব বন্ধু’রা মিলে দল বেঁধে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, চিঠি এসেছে তিনজনের নামে। সবচে’ মজা হল এইটে দেখে যে আসা-যাওয়ার খরচখরচাও সব নাকি তাঁদের। থাকার ব্যবস্থাটুকু খালি নিজেদের করতে হবে! আনন্দে উত্‌ফুল্ল হয়ে উঠলাম। চাকরি যে সক্কলে পাবো না তা দিব্বি বোঝা গেলেও অন্যের খরচায় সদলবলে দেশভ্রমণের সুযোগ কি আর সবসময় মেলে? সাত্তাড়াতাড়ি ট্রেনে টিকিট বুক করে ফেললাম।
দিল্লী সরাই থেকে ট্রেন ছাড়ার দিন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সবাই বলে দিল্লী নাকি এম্নিতে বৃষ্টির দেশ নয়, কিন্তু এখন কলকাতায় যা বৃষ্টি হয়, তারচে’ ঢের বেশী বৃষ্টি হত দিল্লীতে তখন, এখনও হয় নিশ্চয়ই। ভূগোলের মানুষেরা তার কি কারণ দেখাবেন জানিনা, তবে ঘটনাটি শতকরা একশভাগ সত্যি। সে যা হোক গে, কোনরকমে ইন্টারভিউয়ের চিঠি আর সার্টিফিকেটের গোছাটিকে ছাতায় আড়াল করে আপাদমস্তক ভিজে ট্রেনে উঠলাম। বৃষ্টির চোটে যাত্রীদের সাথে সাথে তাদের সঙ্গে আসা যাত্রীপিছু চারজন করে আত্মীয়স্বজনও ট্রেনে উঠে পড়ায় পোরবন্দর এক্সপ্রেস পৃথিবীর সর্বাধিক ঘন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিনত হয়েছে ততক্ষণে! মানুষজনের হাতের নিচ দিয়ে, ঘাড়ের ওপর দিয়ে একহাত গলা বাড়িয়ে দিয়ে আমরা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স নিজেদের বার্থ খোঁজার চেষ্টা করছি প্রাণপণে... তখনই... পাশের লোয়ার বার্থটি থেকে এক অতি মোলায়েম আদুরে গলায় কে যেন বলে উঠল, “হুইচ্‌ বার্থ...?”
আমি কন্ঠস্বরের উত্‌সটিকে ঠিকমত খুঁজে ওঠার আগেই সিধু মরিয়ার মত চেঁচাল পিছন থেকে, “থার্টি টু টু থার্টি ফোর...!!”
“দিস ওয়ে দেন... নেক্সট টু মি...”
ফাইলপত্রদের বুকে আগলে আদুরে গলার ভদ্রলোকের পাশের বার্থে গুছিয়ে বসতে আরো মিনিট দশেক লাগল।
“থ্যাঙ্কস...” রুমাল দিয়ে চুলের জল মোছার বৃথা চেষ্টা করতে করতে মিত বলল।
“বাঙালি...?” একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন!
আমরা তো অবাক! সমস্ত বাঙালিই বাঙলার বাইরে জাতভাই দেখলে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। ট্রেন ছাড়ার আগেই দিল্লীর বৃষ্টি, আত্মীয়দের ভালোবাসা আর সুটকেসে চেন লাগিয়ে রাখা নিয়ে আড্ডা শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু ট্রেন ছাড়ার পর, ব্যাপারটা ঠিক অত সহজ রইল না আর। একঘন্টার মধ্যে আমরা বেশ বুঝতে পারলাম যে এই ভদ্রলোকের সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলার মত ক্ষমতায় পৌঁছাতে আমাদের অন্ততঃ সাড়ে পাঁচবছর একনিষ্ঠভাবে চেষ্টা করতে হবে!! ভদ্রলোকের নাম গোপাল বাগচি, থাকেন বেরসরাইয়ের কাছে, বইয়ের দোকান আছে, তাঁর দুই মেয়ে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গোয়ালিয়রে, কিন্তু তিনি যাচ্ছেন আমেদাবাদে... কেন? কারণ আহমেদাবাদে তাঁর দিদির বাড়ি, দিদির মেয়ের এইবারে বিয়ে দেওয়া উচিত, সেজন্যে সে স্পোকেন ইংলিশের কোর্স করছে, ইংরেজি ভাষাটাকে আমাদের দেশে অতিরিক্ত পাত্তা দেওয়া হয়, দেশের ভবিষ্যত্‌ একেবারেই সুবিধের নয় ইত্যাদি এবং প্রভৃতি এবং ইত্যাদি... ভয় পাওয়ার মত কথা হল যে এই প্রতিটি ব্যাপার নিয়ে বেশ বিস্তারিতভাবেই বলতে উনি ঘন্টাখানেকের কিছু বেশি সময় নিয়েছিলেন! ভদ্রলোক অন্ততঃ জাপানিজ বুলেট ট্রেনের গতিবেগে কথা বলতে পারেন, শব্দের তীব্রতা ১০০ ডেসিবেলের কাছাকাছি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল যে এত শক্তিব্যয়েও উনি মোট্টেই ক্লান্ত হন না, বরং এই কাজটিকে দিব্বি উপভোগ করেন!
ফলতঃ দুপুরনাগাদ আমরা যখন যে যার বার্থে কোনোরকমে একটু ঘুমিয়ে কানদুটিকে রেহাই দেওয়ার কথা ভাবছি তখন “রাত্তিরে নামা কিন্তু... রাত’টা বরং আজ আমরা আড্ডা মেরেই পার করে দেবো, কি বল?” এই প্রস্তাব শুনে আমার অন্ততঃ বুকের ভেতর অব্দি কেঁপে গেছিল স্বীকার করতে আপত্তি নেই! ততক্ষণে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেছে যে ইন্টারভিউয়ের একটি প্রশ্নও আমি আর শুনতে পাবোনা আর শুনতে পেলেও তার উত্তর দিতে গিয়ে হয়তঃ গোপালবাবুর কাজের লোক বা পড়শির নিন্দে করে ফেলব!
টাইমটেবিল বলছে আমাদের স্টেশন আসবে সাড়ে বারোটায়, আর রাত দুটোয় ট্রেন আহমেদাবাদ পৌঁছানোর কথা। কিন্তু ইতিমধ্যে ট্রেন প্রায় ঘন্টাদেড়েক লেট করে গেছে। ঘুমানো একটু যেত, কিন্তু গোপালবাবু দায়িত্ব নিয়ে আমাদের পৌনে বারোটায় উঠিয়ে দিলেন। আমরা থম মেরে বসে আছি পাশাপাশি, ঘুম ভালো কাটেনি, তখন হঠাত বলে উঠলেন, “আহমেদাবাদে তো আমি মাঝেমধ্যেই যাতায়াত করি, আমার এক-দুটো চেনা হোটেল আছে, তোমরা বরং আহমেদাবাদ'ই চল, এই তো সোয়া ঘন্টার রাস্তা... ওখানে তোমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবো বরং... আমার দিদির বাড়ির কাছাকাছিই কত হোটেল...! তোমরা তো দু’দিন থাকবে বলছ... এইটুকুনি রাস্তা এসে ইন্টারভিউ দিয়ে যাবে না হয়... আহমেদাবাদে থাকলে দেখাসাক্ষাত্‌ হবে আবার... দিদির বাড়িতে বসে জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে...”
‘আড্ডা’ শব্দ’টা শুনলেই তখন মাথা ঘুরে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন সাঙ্ঘাতিক লো-প্রেসার হয়ে গেছে! ইনারশিয়ার বশে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “না না...”
মিত আমার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “না... মানে আমাদের বুকিং হয়ে গেছে... আমরা... মানে...”
“বুকিং করেই এসেছি আমরা... হ্যাঁ...” মিথ্যে কথাটায় বেমালুম সায় দিল সিধু। এই ব্যাপারটায় আমরা এককাট্টা দেখে মন’টা ভালো হয়ে গেল। আসলে সবাই নিজের কানদুটিকে ভালোবাসে...
গোপালবাবু আড্ডার সম্ভাবনা ভেস্তে যাওয়ায় দুঃখ পেলেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের তো হাত পা (কান?) বাঁধা... তাই স্টেশনে নেমে গোপালবাবুকে ‘বাই বাই’ করে আমরা নিঝ্‌ঝুম স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ধরে পা বাড়ালাম। তখন ভোররাত, মিটমিটে আলো দপদপ করছে প্ল্যাটফর্মে, দোকানগুলোর সব ঝাঁপ বন্ধ, হালকা শীতের আমেজে জড়সড় হয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে কয়েকটা কুকুর, কোনো মানুষের হদিস কোথাও নেই। 
স্টেশনচত্বরেই আমাদের তিনজনের ব্যাগগুলোকে জড়ো করা হল এক জায়গায়... আমাদের ইন্টারভিউ দুপুর একটায়, ইচ্ছে ছিল হোটেলে উঠে একরাউন্ড ঘুম দিয়ে বেরিয়ে পড়ব... ঠিক হল সিধু মালপত্র পাহারা দেবে, আর আমি মিতের সাথে যাবো হোটেলের খোঁজে। সিধুর টাকাপয়সার ব্যাপারে খুঁতখুঁতুনিটা পুরোনো। সে পইপই করে বলে দিল যে দালালের খপ্পরে পড়া চলবে না কোনোমতে, তাতে হোটেলে ডবল ভাড়া লেগে যাবে!!

আমার এসব ব্যাপারে অনেক অভিজ্ঞতা... প্রচুর বেড়িয়েছি বাড়ির সবাইকে নিয়ে... চারটে বেজে গেছে দেখে আমরা দুইমূর্তি আত্মবিশ্বাসী পা রাখলাম স্টেশনের বাইরে। হোটেল ঠিক করে আধঘন্টার ভেতর ফিরব, সিধুকে এই আশ্বাস দিয়ে গেলাম যাবার আগে।
আমি ভুল ভাবিনি। হোটেল ঠিক করার অভিজ্ঞতা আমার কম না। কিন্তু এবারটায় কে জানে কেমন সব গোলমাল হয়ে গেল! যে হোটেলেই গিয়ে আমি আর মিত জিগেস করতে যাই, “রুম আছে নাকি দাদা...?” দেখি যে তারা ভয়ানক সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়... আমাদের আপাদমস্তক দেখে এবং গম্ভীরভাবে মাথা নিচু করে ঘাড় নেড়ে দেয়... এক জায়গায় এক বয়স্ক হোটেলমালিক তো আরেককাঠি ওপরে উঠে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে গুজরাটিতে চেঁচামেচি (গালাগালিও হতে পারে) করতে লাগলেন... মনে হল হাতের কাছে সের’ম কিছু পেলে ছুঁড়ে মারতেও বাধতো না ওনার...
মুশকিল’টা হয়েছিল অন্য জায়গায়। আমি হোটেল ঠিক করেছি দিনের বেলায়, ভদ্রস্থ সময়ে, বোন কিম্বা বাবার সাথে গিয়ে... বর্তমান পরিস্থিতি যে তারচে’ কত আলাদা সে আর ভাবিনি... ভোর চারটে বাজে... কিন্তু জায়গাটা তো গুজরাত...! আলো ফোটেইনি প্রায়... স্টেশনের বাইরেটা এম্নিতেই যথেষ্ট ঘিঞ্জি... খুপরি খুপরি ছোট ছোট দোকান... ফুটপাথে ছড়ানো গৃহস্থালি... আমাদের শিয়ালদার আশপাশের মত কতক’টা... তখনও রাতের স্ট্রিটলাইট জ্বলছে... রাস্তায় এখানে সেখানে সারাদিন সারারাতের ধকলে ক্লান্ত মাতাল রিক্সাওয়ালা আর কুলিরা মনমৌজি হয়ে গান ধরেছে... হোটেলওয়ালারাও ব্যাতিক্রম না... তারা হয় ঘুমন্ত, না হয় রাতজাগা... পরে সিধু বলেছিল, যে এই রকম পরিস্থিতিতে মালপত্রহীন দুটি ছেলেমেয়ে'কে হোটেলের খোঁজ করতে দেখে অজস্র গোলমেলে কথা ভাবার অগাধ সুযোগ ছিল (ও আসলে যে শব্দ’টা বলেছিল সেটা হল ‘রসালো’, আরো অনেককিছুই বলেছিল সে’সব আমি আর লিখলুম না)...
হোটেল পেতে পেতে সেদিন ঘন্টাদুয়েক লেগেছিল প্রায়। শেষ অব্দি আমাদের জে.এন.ইউএর আই-কার্ড আর ইণ্টারভিউএর চিঠি নিয়ে হোটেলের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়েছিল, মনে আছে। আর ততক্ষণে সিধুর ‘প্রাণের ধন’ দালালের দল ওর কানের কাছে শ'খানেক হোটেলের খবর আর ভাড়ার ফিরিস্তি শুনিয়ে গেছে। দালালবিদ্বেষের চূড়ান্ত প্রমাণ রেখে সে হতচ্ছাড়া একবারও আমাদের ফোন করে ডাকেনি... আর আমরা পাগলের মত হোটেলমালিকদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে আমরা ‘খালি’ ইন্টারভিউ দিতেই এসেছি...
সত্যি বলতে কি, সেইসময়টাতে গোপালবাবুকে খুব মিস করছিলাম... মনে হচ্ছিল, ভদ্রলোকের চেনা হোটেলে গেলে মন্দ হত না, তাই না...? এতক্ষণে বেশ আরাম করে ঘুমিয়ে পড়তাম... আর বিকেলে, ইন্টারভিউ থেকে ফিরে... আড্ডা...?

ফ্রুটকেক

By : Sayantari Ghosh


খচখচানি’টার শুরু সেই পরশু দিন... অর্থাত তেইশ তারিখ।


তেইশ তারিখ সন্ধ্যেবেলা যখন অফিস থেকে বেরোলাম পার্কস্ট্রিট যাবো বলে তখনও কেক কেনার ব্যাপার’টা “আজ সন্ধ্যের কাজ”এর লিস্টে জ্বলজ্বল করছে মাথার ভেতরে। অথচঃ ঘন্টাদুয়েক মিতের সাথে বকবক করে তিনবার পার্কস্ট্রিট চক্কর দেওয়ার পর হিজিবিজি ভাবতে ভাবতে যখন মেট্রোয় উঠে পড়লাম, তখন ফ্রুটকেক চাপা পড়ে গেছে দেশ ও জাতির উন্নতি ও পিছিয়ে পড়া বিষয়ক সুদীর্ঘ আলোচনার নিচে!


পরদিন বাড়ি ফেরা! ভাবলুম পার্কস্ট্রিট হল না, কিছু একটা অফিসের পাশ থেকেই কিনে নেবো, ট্রেন ধরার তাড়াহুড়োয় সেটায় ভুলে গেলাম বেমালুম। সন্ধ্যে রাত্তিরে যখন বাড়ি ঢুকছি, মন খারাপ হয়ে গেল এক্কেবারে! এত করে ভেবে রেখেও বড়দিনের আগে একটা কেক আনতে পারলাম না!? মার্কামারা স্মৃতিশক্তি বটে!!


যা হোক গে, আমি ভুললেও মা ভুলে যায় নি মোটেই! এখন আমি আর বোন দু’জনেই হপ্তাবাবু হয়ে গেছি, মাসে বা সেমেস্টারে বাড়ি ফেরে যারা হপ্তাবাবু’দের দর তাদের থেকে কম যদিও, তবু মা উইকএন্ড উত্‌সবগুলো’কে চট করে মিস করেন না। দেখলাম, চার-পাঁচ রকমের বিভিন্ন স্বাদের কেক জড়ো করা হয়েছে বাজার ঘুরে। নানারকম রঙিন বাক্স, জড়ির ফিতে... বাড়ি ঢুকেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম একরকম!গপাগপ মুখে পুরে ফেললাম অনেকখানি। কিন্তু কেমন যেন একটা খচখচানি... কে জানে কেন, মনে হল, “কি যেন নেই-নেই... কেমন ”... সে’কথা আর মা’কে বললাম না!


পরদিন বোনের সাথে বাজার বেরিয়েছি। আরো কতগুলো “দ্য রিয়েল ফ্রুটকেক” ইত্যাদি লেখা, নামী কোম্পানীর সিল-মারা বাক্স কিনে বাড়ি ফিরলাম! মা চোখ পাকালেন, আমি অপরাধীর মত মুখ করে নতুন আনা বাক্সগুলো থেকে কোণা ভেঙ্গে মুখে দিলাম...
দুত্তেরি!! এ কি রে বাবা? রিয়েল ফ্রুটকেক?! রাশি রাশি টাকা নিলে এরজন্যে?! মাথা গরম হয়ে গেল!


বোন সেই কেক দু'খানা ঝপাঝপ সাবাড় করে ঘোষনা করল যে আমার কেকটেস্টিং’এর কাজ ছেড়ে ইমিডিয়েটলি তেলেভাজায় শিফট করা উচিত, আমার কিছু একটা সিভিয়ার প্রবলেম হয়েছে!


মন খারাপ করে বেরিয়ে পড়লাম। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে, আমাদের পাড়ার মোড় থেকে মিশনারি গার্লস স্কুলের চার্চ’টা দ্যাখা যায়, ইচ্ছে করলো ও’দিক থেকে ঘুরে আসি। গলি’র মুখের স্ট্রিটলাইট’টা ক’দিন থেকে খালি দপদপ করছে... আলোছায়া, ছায়া আলো... আমি কিছু একটা ভাবছিলাম, তবে খুব নিটোল কিছু নয়, অন্যমনস্ক’ই ছিলাম হয়তঃ... হঠাত একটা আচমকা ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ শব্দ শুনে বিচ্ছিরি রকম চমকে গেলাম! তাকিয়ে দেখি, আমাদের নয়ন পাউরুটিওয়ালা।

নয়ন পাউরুটিওয়ালার খালি নাম বললে পুরো’টা বলা হয় না। ওর সাথে আমার আলাপ তখন, যখন আমি ক্লাস ওয়ান। তখন এই পাড়া’টা নতুন, আমাদের বাড়ি’টা নতুন; পাউরুটিওয়ালার ঠেলাগাড়িটাও নতুন ছিল তখন। আমি আর বোন তখন একই রকম ফ্রক পরতাম দু’সাইজ ছোট-বড়। স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির সামনের খোলা চত্ত্বর’টায় ছোঁয়াছুয়ি... কুমীরডাঙা... তখন পাউরুটিওয়ালা আসতো। আমাদের প্রতিদিনের টিফিনের বরাদ্দ পাউরুটি নেওয়া হত তার কাছ থেকে। বাপি স্কুল থেকে ফিরে তিন টাকা রেখে দিত টি.ভি.’র টেবিলে। পাউরুটিওয়ালা ডোরবেল বাজালেই আমি আর বোন ছুট ছুট! কে আগে টাকা নিতে পারে, কে আগে দাম দিতে পারে, কারণ আড়াই টাকার পাউরুটি’র পর বাকি আট আনার প্রজাপতি বিস্কুট বা কাপ কেক প্রাথমিকভাবে তার পাওনা হত। সে দয়া করে অন্যজন’কে দিতে পারে (দয়া অবশ্য রোজ’ই করা হত, পরেরদিন যে কেউ জিততে পারে সেইটে মাথায় রেখে)! নয়ন পাউরুটিওয়ালা হাসতো আমাদের দেখে। ছোটখাটো চেহারা লোকটা’র, ভেবে অবাক লাগতো কি ভাবে ওই একটা গাড়ি ঠেলে ঠেলে গোটা শহর চক্কর মারে সে! জিগেস করতাম মাঝে মাঝে,
“তোমার খিদে পায় না? এত যে হাঁটো?”
“পাবে না কেন? তখন খেয়ে নি!”
“কি খাও? পাউরুটি? কেক?”
“না না!!” হো হো করে হাসতো নয়ন পাউরুটিওয়ালা, “ভাত খাই, দোকানে গিয়ে...”
“এত কেক থাকতেও ভাত খাও?”
“ওটা তো বেচার কেক, খেলে হবে?”
….
“আচ্ছা, তুমি চান করলে কোথায়?”
“পুকুরে!”
“জামা কই? গামছা কই?”
“গাড়ির ভেতর বাক্স আছে, তাতে জামা আছে, গামছা আছে, তেল সাবান সব আছে...”
“কোন পুকুরটার চান করো? সরকার কাকুদের পুকুরে?”
“ওখানে আমায় ঢুকতেই দিবে না...”
“ও... তাহলে?”
“কত পুকুর আছে...”


পাউরুটির দাম আড়াই থেকে তিন, সাড়ে তিন, চার, সাড়ে চার, পাঁচ, ছয়, সাত হয়ে গেল। আমিও পাউরুটিওয়ালার থেকে অনেক ছোট থেকে তার সমান হয়ে তার চেয়েও লম্বা হয়ে গেলাম! প্রথমে যখন পাউরুটিওয়ালা আসত আমরা কুমীরডাঙা খেলতাম... তারপর খেলতাম ব্যাডমিন্টন... তারপর কলেজ থেকে ফেরার পথে শুনতাম ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ অন্য পাড়ায় পাউরুটিওয়ালার গাড়ি ঘুরছে।  আমি তখন ক্যান্টিনে লাঞ্চ করি, বোন কলকাতায় চলে এসেছে, টিফিনে আর আমাদের বাড়িতে পাউরুটি খায় না কেউ।

লোকটার সাথে আমার পরিচয় বছর পনেরো’র। অবাক লাগতো ভেবে যে ওর নামটাও জানতাম না! নয়ন পাউরুটিওয়ালার নাম’টা হল বেকারির নাম... নয়ন বেকারি... পাউরুটিওয়ালার নাম’টা মো্টেই জানতাম না। ওর ব্যাপারে ব্যাক্তিগত খবর জানতাম দু’টো। এক, লোকটা মুসলমান, ঈদ আর মুহাররমে আসতো না, ঈদের আগের দিন “আমি তো কাল আসবো না” বলে দুটো পাউরুটি দিয়ে যেত... আর দুই, লোকটার একটা মেয়ে ছিল, আমাদের চেয়ে অনেক ছোট, তার জন্যে আমাদের পুরোনো বই, পুরোনো সোয়েটার মা দিত ওকে মাঝে মাঝে, দেখেছি। আর কিছু জানতাম না ওর ব্যাপারে, আর কে জানে কেন, জানার তাগিদও অনুভব করিনি কখনও...


আলোআঁধারির ভেতর হঠাত সেই খুব চেনা ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ শুনে নস্টালজিয়ায় ভেসে গেছিলাম ক’টা মুহুর্ত, নয়ন পাউরুটিওয়ালা একগাল হেসে বলল, “ভালো আছো? তোমাকে তো দেখিইনা আজকাল... অনেক দিন দেখি না...”


আমিও হাসলাম, “হ্যাঁ, এখন কলকাতা চলে গেছি গো... বছরতিনেক হল... চাকরি... তুমি ভালো আছো?”


হেসে ঘাড় হেলালো নয়ন পাউরুটিওয়ালা, ভালো আছে। আলো দপদপ করছে যদিও, তবু মনে হল যেন অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছে এক ঝটকায়, হয়তঃ অনেকদিন দেখিনি, তাই এরকম লাগছে... হতে পারে...


“কেক নেবে? বড়দিনের ভালো ফ্রুটকেক আছে...” জিগেস করল ও।
“দাও”, কতকটা ভদ্রতা রাখতেই বললাম... তেইশ তারিখ থেকে পাগলামি করে চলা খচখচানি’টা আবার হাত গোটাল যেন... কেক নিয়ে যা কান্ড চলছে কাল থেকে... নেব আবার?!

“ছোট একটা দাও...” যোগ করে দিলাম আমি।
“ছোট নেবে? বোন, মা... সবার হবে ছোট’তে?... এইটা নাও...” আমার হয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সে, “এটা ভালো হবে...”


দাম দিতে দিতে বললাম, “তোমার মেয়ে কেমন আছে?” এখন তো আর ছোটবেলার সেই অর্থহীন প্রশ্নগুলো করতে পারি না, তাই সামান্য যে ব্যাক্তিগত অংশটুকু তার জানি, তার থেকেই আদ্ধেকটা সম্বল করে জিগেস করলাম, “ভালো?”


একগাল হাসল নয়ন পাউরুটিওয়ালা, “ভালো আছে... ওকে বারাসতের কাছে একটা ইস্কুলে দিলাম, মাসে ন’শো টাকা লাগে, থাকা, খাওয়া, পড়া, টিউশনি... ইলেবেনে উঠলো তো... ভালো পাশ করেছে আগের বার...”


“বাহ্‌!!” আমিও হাসলাম, “ভালো হবে, দেখো...”


ঘাড় হেলিয়ে আরেকবার হেসে হাঁটা লাগালো লোকটা। মোড় ঘুরে গেল গাড়ি। খানিকবাদে শোনা গেল একবার, ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’


গার্লস স্কুলের দিকে আর গেলাম না। উলটো পথ ধরলাম বাড়ি ফেরার। নানারকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ডোরবেল বাজালাম। দরজা খুলেই আঁতকে উঠল বোন, “আবাআআআর...!?!”

বুঝলাম, হাতে কেকের বাক্স, ও নিঃসন্দেহে আমায় পাগল ভাবছে। কি আর বলবো! বিড়বিড় করে বললাম, “নয়ন পাউরুটিওয়ালা ধরিয়ে দিল...”
বোন গজগজ করে বলল, “কিনছো কেনো, তু্মি খাবে সব...!”
তুই থেকে তুমি... মানে বোন সিরিয়াস!


আর কথা বাড়ালাম না। পড়ার টেবিলে বসলাম বই খুলে। ঝামেলার সময় এটাই আমার বাড়ির যাকে বলে 'সেফেস্ট কর্ণার', আমার একুশ বছরের অভিজ্ঞতা তাই বলে!


খানিক বাদে মা “জলখাবার!” বলে ঠকাস করে এক ডিশ ভর্তি আমার সদ্য কেনা কেকের টুকরো  রেখে গেল। আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে বলতে একটুকরো কেক মুখে ঢুকিয়েছি আর...

আর... কিছু বলতেই ইচ্ছে করল না! আমেজে চোখ বুজে এল যেন! আরেকখানা টুকরো মুখে ঢোকালাম তক্ষুনি... আহা...


মুখে যা ঢুকিয়েছি সেটা হল একটা টিপিক্যাল ফ্রুটকেক... সেটা প্রাথমিকভাবে একটা হলদেটে প্যাকেটে মোড়ানো ছিল, ‘নয়ন বেকারি’ লেখা একটা কাগজ প্যাকেটের গায়ে সাঁটা ছিল... কেকের ওপরটা শক্ত শক্ত, ভেতরে কালো কালো কিসমিস, বড় বড় মোরব্বা, একখানা কাজু আর খুব কপাল ভালো থাকলে নিচের কোণার দিকে আধখানা চেরি পাওয়া গেলেও যেতে পারে। কিন্তু সেই মূহুর্তে সেটা আমার কাছে অমৃতের বাড়া মনে হল আর প্যারালেলি মনে হল, এতক্ষণে ক্রিসমাস’টা বেশ ‘মেরি’ ক্রিসমাস হল!

মৌন দিয়ে ছোঁয়া / দুই

By : Sayantari Ghosh
অপব্যয়
এখনও কাগজ দিয়ে যায়নি...!
অন্যদিন হলে এক্ষুনি মেজাজটা খিঁচড়ে যেত দীপ্তাভ'র... কিন্তু আজ কিছু হল না... এম্নিই... অকারণে... আজ যেন কাগজ না দেখলেও চলে... দুনিয়ার খবরাখবর না জানলেও... অকারণে... অকারণে আজ ছুটি নেওয়া যায়...
এখুনি করা চা কাপে ঢেলে নিয়ে ব্যালকনিতে চলে এল ও... পাঁচতলার ওপর থেকে খুব বেপরোয়া লাগে নিচের রাস্তাটাকে... এটা চিরকালই লাগে ওর... এই ফ্ল্যাটে আসা থেকে... নিচের রাস্তাটা যেন সারাক্ষণ “আয় আয়” করে ডাকে... ঝাঁপিয়ে কোলে চলে আসতে বলে... আজও বলছে...আরও যেন বেশি করে বলছে... ভোরটা আজকে কেমন যেন অন্যরকম... ঝিম্‌ম্‌ ধরানো... ভোর বলে মনেই হয়না... যেন এখনও অনেএএক দেরি রাত্তিরের ঘুম ভাঙতে। ব্যালকনির বেতের চেয়ারে হিম-হিম ছোপ... কাল রাত্তিরে বৃষ্টি হয়েছে...? নাকি হবে... এখন......
চায়ের কাপের প্রথম চুমুকই জানান দিয়ে দিল, চিনি কম! ভালো... বয়স হচ্ছে না? চিনি কম খাওয়া ভালো... তনু কি ঘ্যানঘ্যান করতো এই নিয়ে...!! এলেই মিতাকে জড়িয়ে ধরে বলতো, “মণি, তেল মশলা মিষ্টি সবেতে রেস্ট্রিক্‌শন করে দাও দীপের... আররে বয়েস হচ্ছেনা না কি?”
একটা হাসি টুপ করে ছুঁয়ে গেল সকালের রাশভারি মেঘ সরিয়ে...
তনু...
রীতিমত যুদ্ধ করেও কোনোদিন 'দাদা' হতে পারা যায়নি ওর... 'দীপ' হয়ে গেছে দীপ্তাভ... “ছয়মাসের বড়, তায় আবার ক্লাসমেট... দাদা কিসের রে?” বলতো তনু... বললেই রাগারাগি... হাত ধরে মোচড়... কলাবেণীতে টান..... ওদের থামাতে না পেরে দিদু সিধে গিয়ে নালিশ ঠুকতো মামিমার দপ্তরে, “আরে অ তনুর মা... তর মাইয়ার একগাসি সুল রইবো না আর... কথা সনে না মুখপুড়ি...! বলি কি করে কি অ দুইটায় মিইল্যা সারাখন?!”
তনু...
একটা ছিমছাম একতারার সুরের মত... খালি ভালোবাসতে জানত... তার মানে আসলে তনু সঅঅব জানত..!! খুব আনন্দে আদরে ভাসিয়ে দেওয়া যায় এমন বোন হতে জানত... মনখারাপে স্বপ্ন-স্বপ্ন আলো-আলো রূপকথা হতে জানত... গোপন খবরের জাদুআয়না, বেস্টফ্রেন্ড হতে জানত... আর... আর অদ্ভূতভাবে, খুব অদ্ভূতভাবে দারুণ অন্ধকারে তনু একেবারে মায়ের মতন হয়ে যেতে জানত...
তনু খালি ভালোবাসতে জানত...
হাসির গায়ে জড়িয়ে জড়িয়ে স্বর্ণলতার মত দীর্ঘশ্বাস বাড়তে লাগল...
এককণা ভরসা হতে পারেনি দীপ্তাভ... বিশ্ব ওভাবে চলে গেল... হঠাত্‌...
কি বলতে হয়...?? কি বলতে হত তনুকে...? ঠিক কি দিলে ভালো রাখা যেতো ওকে? সব সঅঅব গুলিয়ে গেছিল মূহুর্তে...
দেরি হয়ে গেছিল খুব ডাকতে... সে বেচারি চেয়ে চেয়ে থেকে শেষকালে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল পথ থেকে...
“অপব্যয়...! তোর সময়ের অপব্যয়, দীপ...! আমি একেবারে ঠিক আছি রে...”
বুকের ঠিক মাঝখানে ঠং করে কাচ ভাঙলো একটা... কাচ না, আয়না ভাঙলো... কে জানে বাইরে শোনা গেল কি না... এখানে, ওখানে, ওইখানে... ওই মেঘ-অব্দি শোনা গেল? মেঘের ওপাশে...? গেল শোনা? একটা কি যেন পাখি টেনে টেনে সুর করে কত কি অভিযোগ করতে লাগলো চোখের আড়ালে থেকে... তারপর হঠাত থেমে গেল... শব্দ নেই...... কোনো শব্দ নেই...... শব্দ বলে কিচ্ছু হয়না এ সকালে......
দীপও হতে পারেনি দীপ্তাভ...
..................................................................
মৌনতা অপরাধ...?
মৌনতা শাস্তি।
[ক্রমশঃ]

মৌন দিয়ে ছোঁয়া... / এক

By : Sayantari Ghosh

শঙ্খলতা

.....................................................

........ তারপরে মনে হল যেন ছাদ থেকে নীলকালি ঢেলে দেওয়া হল এক শিশি... পরীক্ষার হলটা তাতে গুলে গুলে একটা রাস্তা হয়ে গেল... কোন রাস্তা? চেনা... সন্দেহ নেই, কিন্তু... কোন রাস্তা... মনে পড়ছে না...
“এই! চ ফুচকা খাবি...?” চমকে পিছন ফিরল তনু...
দীপ...!
“হ্যাঁ...” মাথা নাড়ালো তনু... “কিন্তু বিশ্ব...?”
“বিশ্ব তো চলে গেছে...”
“কোথায়...?” খুব অবাক হয়ে গেল তনু, “আমায় না বলে... এভাবে চলে গেল...?”
কেমন একটা হাসলো দীপ... আর ঝুপ্সি অন্ধকার হয়ে গেল চারদিকে... শিরশিরে ছায়াগুলো নড়তে লাগল কেমন... ভয় করছে... খুব ভয়... বিশ্ব কই...? কোথায় গেল ও...?
“বিশ্ব্‌...!!!” খুব জোরে ডাকতে গেল তনু... কিন্তু ডাকা যাচ্ছেনা কেন??
“বিশ্ব...!!!” আবার... আবার...

দলাদলা অন্ধকার হাতড়াতে লাগল তনু... একদিন কেটে গেল যেন... একযুগ... গলা শুকিয়ে আসছে... বিশ্ব কোথায়?... ওকে ছাড়া যে এক’পা হাঁটার অভ্যেস নেই তনুর... ওকে ছাড়া...

“বিশ্ব...!!!”
“খুঁজছিলি...?” খুব চেনা একটা হাত আঙ্গুল ছোঁয়ালো কনুইয়ে...
আর পিছন ফিরতেই...

“বৌদি গো!!! দাদা আর ফিরবে না... দাদা চলে গেছে...”

এক ঝটকায় ঘুম ভেঙে গেল তনুর... চোখে লেগে আছে ওর হাত ধরে থাকা দীপের মুখটা... বুকের ভিতর তিরতির করে কাঁপছে সুমির কান্নাডোবানো চিত্‌কার...

স্বপ্ন...!?! স্বপ্নই তো...?
হ্যাঁ...তাই। সব দিব্বি চেনা যাচ্ছে এখন। চেনা বালিশ, চেনা বিছানার চাদর, চেনা নীল নাইটল্যাম্প... ওর খুব চেনা শোবার ঘর ঝিমাচ্ছে... জানলার কাছে রাতের হাওয়া দুলে দুলে নতুন সুর বাঁধছে উইন্ডচিমারে... পাশে তুতাই অঘোরে ঘুমাচ্ছে... মাথার কাছের টেবিলে ঘড়িটা রাত্রি দু’টোর কাছাকাছি তিনখানা কাঁটার জটিল সমস্ত হিসেব সামলাচ্ছে... আর তার পাশে ওরই দিকে তাকিয়ে সেই দুষ্টু হাসিটা হাসছে বিশ্ব... জুঁইফুলের মালাটা আজ সন্ধ্যেতেই পরানো... সাদা ফুল ওর বড্ড প্রিয় তো...! এতরাতেও, কাঁচের ফ্রেমের ওপাশের দুনিয়া থেকেও ওর চোখদুটো ঠিক তেম্নিই ঝকঝক করছে... যেন এক্ষুনি কিছু বলবে...

“কিছু বলবে?” আপন মনেই খুব চাপাস্বরে বলল তনু
ওভাবেই ওর দিকে তাকিয়ে রইল বিশ্ব...
জানলার পর্দাটা খামখেয়ালে উড়ল একবার... জুঁইয়ের জমাট গন্ধ গোল করে ঘুরে নিল খাটের চারপাশ... আর উইন্ডচিমারের সাথে খুনসুটি করে নিল হাওয়া এই ফাঁকে... রিনরিন্‌ রিনরিন্‌...

হাওয়াঘন্টি / ২

By : Sayantari Ghosh




[শেষটুকু...]

ভয় করল ভীষণ! গলা শুকিয়ে গেল মূহুর্তে... এই ভরদুপুরে, দিনের আলোয় এ কিরকম পাগলামিতে পেয়ে বসল আমাকে...?

“কি রে?” চমকে পিছনে ফিরলাম রিদ্‌মের ডাকে, “রেস্ট নিতে বললাম তোকে... আর তুই...... এইইই, এরকমভাবে ঘেমেছিস কেন রে...? কি হল'টা কি তোর...? শরীর খারাপ করছে না কি?”

“না না, আয়াম ফাইন... আমি... আমি ঠিক আছি... জাস্ট টায়ার্ড...” বললাম, কিন্তু নিজের গলাটাই চিনতে পারলাম না নিজের বলে... গলার কাছে কি যেন দলা পাকিয়ে আটকে গেছে...!!

সারা দুপুর চুপটি করে বসে রইলাম... জেনের জার্মান স্পিত্‌জ্‌ চেরি আমার কোলে উঠে বসেছিল... আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম ওর মাথায়... ঠুন্‌ন্‌-ঠুন্‌ন্‌‌ করে উইন্ডচিমার বাজছে বারান্দায়... ফালি ফালি পড়ন্ত রোদ ঢুকে পড়ছে বাগানের ওক গাছটার ফাঁক দিয়ে... ঘরের হাওয়াটা কেমন যেন ভারি ঠেকছে আমার... যেন পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো হয়েছে হাওয়াটাকে... একটা ছায়া যেন ঘিরে ধরে আছে...

রিদ্‌ম বলল বিকেলে সেন্ট এডওয়ার্ড স্কুলের পাশের চার্চে যাবে। ওর লাগোয়া গোরস্থানটাও বেশ পুরোনো... এখন আর লোকজনের সেরকম যাতায়াতও নেই সেখানে...

“তুই যাবি...? না কি...... আই থিঙ্ক ইউ শুড টেক রেস্ট... ঘোরাঘুরি করতে হবে না আর...” বলল ও...
বুঝতে পারছিলাম না! বেরোতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু একা থাকার কথা ভাবতেই কেমন একটা বোকাবোকা ভয় চেপে ধরছে যেন। বললাম, “জেন কখন ফিরবে রে...?”

“আজ তাড়াতাড়ি ট্রাই করবে... মে বি ফাইভ থার্টি অর সিক্স... কেন...?”

টেবিলের ওপর থেকে হাতঘড়িটা তুলে দেখলাম। চারটে। বললাম, “তাহলে... তাহলে আমি আর বেরোবো না...”
“ওকে দেন... আমি বেরোই, কেমন...? কিছু নিয়ে আসব? কিছু চাই...?”

বলতে ইচ্ছে করল, “রিদ্‌ম্‌... আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে... আমি চন্ডীগড় ফিরতে চাই...”

বলা গেল না।

........................................................................................................

রিদ্‌ম্‌ বেরিয়ে যাবার পর সোফায় বসে বসে চেরিটাকে জড়িয়ে ধরে কখন জানি চোখ লেগে গেছিল। চোখ খুললাম যখন, আলো কমে এসেছে ঘরটায়। এত তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে হয়ে গেল বুঝি? ক'টা বাজছে...? চোখ রগড়ে টেবিলের উপরটা হাতড়ালাম অন্ধকারেই...

খুব ঠান্ডা কি একটা হাতে ঠেকলো... চমকে উঠে বসলাম... একটা জলের বোতল...! কেউ এক্ষুণি ফ্রিজ থেকে বের করে রেখেছে... এতটুকু জল গড়ায় নি সেটা থেকে এখনও... আর গোটা টেবিলে কোথাও রিস্টওয়াচ'টা নেই...!

ঝট করে উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল... পা টলছে... চেরি কোথায় গেল...?
“চেরি...!” ডাকলাম...

সাড়া নেই...

সোফার নিচেটা দেখলাম উঁকি দিয়ে... ঘর'টা বেশ অগোছালো, টের পাচ্ছি রীতিমতো... ডায়নিং টেবিলের ওপর আমার শেষ-করা কফির কাপ'টা ধুয়ে উলটে রাখা, ওয়াশ বেসিনের পাশে জল ছড়িয়ে আছে, একটা চেয়ার টেনে একটু বেঁকিয়ে রাখা... যেন কেউ বসেছিল সোফাটার দিকে তাকিয়ে...

চেরি নেই কোত্থাও!

“চেরি...?” ডাকলাম আরেকবার... পাত্তা নেই কারো...

আস্তে আস্তে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম.....উইন্ডচিমারটা সেরকমই বাজছে এখনও... ওকগাছটাকে কেমন ডাইনিবুড়ির মতন দেখতে লাগল একবার তাকিয়ে...

ঘরে ফিরে এলাম; এক গ্লাস জল খাবো... টেবিলে রাখা বোতল'টা নিতে গেলাম আর রক্ত হিম হয়ে গেল মূহুর্তে...

সোফাটার কোল জুড়ে অন্ধকার বেশ গাঢ় হয়েছে ততক্ষনে... দেখলাম, চেরি সোফার কুশনে গা ঘষছে আনমনে... যেন খুব করে আদর খাচ্ছে কারো কাছে...

“কে...???? কে ওখানে...?” চেঁচিয়ে উঠলাম খুব জোরে...

একঝাঁক হাওয়া ঢুকলো খালি জানলার পর্দাটা উড়িয়ে দিয়ে...

“কে...??? কেন ভয় দ্যাখাচ্ছো...? জেন...? জেন ফিরে এসেছো বুঝি...? না কি... না কি তুই রিদ্‌ম্‌...? প্লিজ আমায় আর ভয় দেখাস না তোরা, ভাল্লাগছেনা আমার, প্লিজ...”

গলা ভেঙে গেল আমার কথা'কটা বলতে গিয়ে... বুকের ভেতর কেউ যেন ভয়ে চোখ বন্ধ করে বলছিল যে ঘরে কেউ আছে... নিশ্চিত আছে... কিন্তু সে রিদ্‌ম্‌ নয়... জেনও নয়... তাকে আমি চিনি না...!!
আরেকবার পর্দাটা উড়ল... এবার খুব জোর হাওয়া... টেবিলের নিচের তাক থেকে খবরের কাগজগুলো উড়ে ঘরময় হয়ে গেল একেবারে... চেরি এবার আমার দিকে তাকাল অবাক হয়ে...

“কেন...? কেন...? কি চাও...? কি.........” বলতে বলতে চোখ জল এসে গেল আমার... নড়তে পারছি না এতটুকু... গলার স্বর তলিয়ে যাচ্ছে যেন চিরকালের জন্যে...

..........আরেকজনও কিছু বলতে চায়... ভীষণ ভাবে বলতে চায়... ঘরজোড়া টানটান অন্ধকার সেটা জানান দিইয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত...

আরেকবার হাওয়া দিল... আর পাক খেয়ে খবরের কাগজের একটা পাতা আমার পায়ে জড়িয়ে গেল...
আর সাথে সাথে হাওয়া থেমে গেল একেবারে...

সব চুপ... সব শান্ত... যেন ত্রিভুবনে শব্দ বলে কিছু হয়'ই না এ'রকম নীরবতা... উত্‌কন্ঠায় উপচে যাওয়া নীরবতা... সব্বাই যেন অপেক্ষা করছে আকুল হয়ে...

আঙুল হিম... হাত কাঁপছে... কোনোরকমে কাগজটা কুড়িয়ে নিলাম...

গত চোদ্দ'ই ফেব্রুয়ারির খবরের কাগজ...

পাতাজোড়া গোলাপি রঙের বিজ্ঞাপন কোনো এক গ্রিটিংস্‌ কার্ড কোম্পানির... বড় বড় অক্ষরে লেখা...

“Some day, when I'm awfully low
When the world is cold
I will feel a glow just thinking of you
And the way you look tonight
”

পড়া শেষ... আস্তে আস্তে মাথা তুললাম... হাঁটুর আশেপাশে জোরালো কাঁপুনি... শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা ঝিমুনি... ঘরের আলোআঁধারের মধ্যে কাউকে খুঁজে চলেছে আমার দু’চোখের মণি... স্ট্যাচু হয়ে তাকিয়ে রইলাম সামনের দিকে...

চেরি আবদারি জুলুজুলু চোখে তাকালো আমার দিকে...

নরম আকুতির মতন খুব আলতো একটা হাওয়া দিল ঘরটায়...

[শেষ]


হাওয়াঘন্টি

By : Sayantari Ghosh


“মেজর চার্লস ক্রস্‌বি...? তাই তো...?” আরেকবার জিগেস করলাম আমি।

“ইয়াপ্‌, তাই...” বলে কবরগুলো থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকালো রিদ্‌ম্‌, “ফিলিং টায়ার্ড, না?”

আসলে তাই! সকাল সাতটায় ঢুকেছি সঞ্জৌলি গোরস্থানে;  এখন মাথায় ওপর চনচন করছে রোদ... ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়ে গেছে...

কাল এসেছি সিমলায়। চন্ডীগড়-সিমলা যাতায়াত'টা আমি আর রিদ্‌ম্‌ ইচ্ছে হলেই করে থাকি... উইকএন্ড, অফিসে ছুটি, সেলিব্রেশন বা মনখারাপ... গাড়ি বের করে সোজা সিমলা! তবে হুজুগটা বেড়েছে রিসেন্টলি... যবে থেকে এই জিনিওলজির ভূত'টি এসে রিদ্‌মের মাথায় চেপেছে! বোধহয় একটা পুরোনো ডায়েরি থেকে শুরু হয়েছিল ব্যাপারটা... তারপর এখন নিজের পরিবারের ইতিহাস ঘেঁটে দ্যাখাটা শখ হয়ে গেছে রিদ্‌মের; আর পুরোনো জায়গায় ঘুরঘুর করতে চাইলে আমার ঝুলে পড়তে আপত্তি থাকেনা কখনই.....

তিনদিন আগে থেকে এই চার্লস ক্রস্‌বির নামটি মাথায় ঢুকেছে ওর। বুধবার রিসেস আওয়ারে দুম করে আমার ক্যাবিনে ঢুকে এক গাল হেসে বলল, “তোর বর পাওয়া গেছে রে...!” সত্যি বলতে কি, শোনামাত্র আমার বুকের ভেতর ধুকপুকুনি বেড়ে গেছিল! বলে কি ছেলেটা? প্রপোস'টা এভাবে করবে বুঝি? মাথা'টা কি খারাপ হয়ে গেল একেবারেই ওর? এক মিনিট পরে থতমত ভাবটা কাটিয়ে উঠলাম যখন রিদ্‌ম্‌ খোলসা করে বলল গল্প'টা। পুরো'টা শুনে মজা পেলাম ঠিক'ই, কিন্তু ভেতর ভেতর নিজেকে বড্ড বোকা মনে হচ্ছিল। হপ্তাখানেক আগে ভ্যালেন্টাইনস ডে'র দিনও এই একই রকম পাগলামি করছিল মন'টা! নিজেকে একটা আস্ত হাঁদাগঙ্গারাম মনে হল।  প্রপোস-টোপোস কত কি ভেবে ফেলেছিলাম, ধূর! 

রিদমের গল্পের মুখ্য ভূমিকায় আছেন এই চার্লস ক্রস্‌বি বলে ভদ্রলোক'টি। সম্পর্কে ওর ঠাকুর্দার মাসতুতো ভাই... প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সিমলায় পোস্টিং ছিল তাঁর... সারা সিমলায় ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর হত্তাকত্তাদের মধ্যে মেজর ক্রস্‌বির নামযশ ছিল নাকি খুব... বাড়ির বাতিল কাগজের স্তূপের কোত্থেকে জানি রিদ্‌ম্‌ একখানা ঘষে যাওয়া হলদেটে ছবি পেয়েছে... চাড়া-দেওয়া গোঁফের ক্রস্‌বি সাহেব আর তাঁর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী'র... রিদ্‌মের চাপাচাপি’তে মানতে বাধ্য হলাম মেজর সাহেব যতই জাঁদরেল চেহারার হোন না কেন, ভদ্রমহিলাকে সত্যি সত্যি অনেকটাই আমার মতন দেখতে... ব্যাস, ছেলে খেপে উঠলো একেবারে, “চল না এই উইকএন্ডে ঘুরে আসি একবার, জাস্ট দ্য সেমেটারিস্‌... উই উইল লুক ফর এ হোয়াইল অ্যান্ড কাম ব্যাক...”

ঘ্যানঘ্যান করলে ওকে 'না' বলতে পারিনা কখনও... কে জানে কেন... মোক্ষম ব্যাপারটা হল, রিদ্‌ম্‌ ডাকলে আপত্তি করার ক্ষমতাই থাকেনা আমার... মনে হয় সারাটা জীবন যদি এভাবে হুঠহাঠ ওর সাথে বেরিয়ে পড়া যেত...... ধুর! সেসব কথা ওকে বলাই হয়না আমার... ডিয়ারেস্ট কলিগ, বেস্ট ফ্রেন্ড এই বেশ ভালো আছি... কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে...

যাগগে সেসব কথা... উইকএন্ড এসে পড়তেই তাই কাল বেরিয়ে পড়েছিলাম... আর আজ অভিযান সঞ্জৌলি...

“লেট্‌স্‌ গো ব্যাক দেন ফর নাও,” আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রিদ্‌ম্‌ বলল, “তোকে খুব ক্লান্ত দ্যাখাচ্ছে...”
“ওক্কে...” আমি হেসে বললাম, “একটু বসে নিই? এক্কেবারে হাঁফিয়ে গেছি...”

একটা বিশাল রডোডেন্ড্রনের নিচে বসলাম পা ছড়িয়ে। জায়গাটা এম্নিতে বেশ চুপচাপ, তারসাথে গলাজড়াজড়ি করে রয়েছে একটা পুরোনো গন্ধ... সারসার পুরোনো পাথর আর আদ্যিকালের পাহাড়ি গাছেদের ভিড়... মানুষগুলো ঘুমোচ্ছে কে জানে কবে থেকে... ডরোথি ড্যালি, ১৯২৯... ব্যারনাবি মারফি, ১৯৩৪... উইলিয়ম ক্যাহিল, ১৯৩৮... সবাই অঘোর ঘুমে... আগে হয়তঃ প্রতি সপ্তাহে কেউ দেখা করতে আসত... একটা গোলাপ ফুল রেখে যেত ঘুমিয়ে পড়া বুকের ওপর... ছুঁয়ে বসে থাকত... কেঁদে যেত অঝোরে... তারপর কতযুগ, কতযুগ পেরিয়ে গেছে... আর কেউ আসেনা... কেউ আসে না...

ঝুপ করে আচমকা একটা শব্দ হল আমার ঠিক পিছনে! খেয়ালে এমন ডুবেছিলাম যে ভেতর অব্দি কেঁপে গেল আওয়াজ'টায়... উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম হুট করে...

“হেই... হোয়াট হ্যাপেন্‌ড্‌?” রিদ্‌ম অবাক হয়ে বলল, “এনিথিং রং?”

জানিনা...! পিছনের ঝোপটার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ... অন্ধকার করে রয়েছে সাদা ফুল ফোটানো একটা বুনো লতা... আর... আর যেন তার ওপাশ থেকে কেউ দেখছে আমাকে... মনে হল ঝুপসি হয়ে নেমে আসা পাতাগুলো সরানোর অপেক্ষা... কেউ আছে ওখানে...

“মিলি...? কি হয়েছে...? বলবি তো...?”
“নাথিং!” একটা ঢোঁক গিলে বললাম, “বেরিয়ে পড়ি, চ... দেরি হচ্ছে...”

সিমলা এলে আমাদের ঠিকানা হয় জেনের বাড়ি। তার দুটি পরিচয়... রিদ্‌মের খুড়তুতো দিদি; আর সোনায় বাঁধানো মনের একজন মানুষ। সারাটাদিন মনিপাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে পড়ে থাকে; আর সন্ধ্যেয় ফিরে দারুণ দারুণ সব গল্প আর তারচেয়েও ভাল ভাল রান্না দিয়ে আড্ডা জমিয়ে দিতে পারে...
বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই পাশের দোকানের মেয়েটা দৌড়ে এসে চাবি ধরিয়ে দিল রিদ্‌মের হাতে; সঙ্গে একটা ছোট্ট চিঠি...
“খিদে-টিদে পেয়ে গেছে নিশ্চয়ই... রান্নাঘর এবং ফ্রিজ তোমাদেরই... আগুন-টাগুন ধরিয়ে দমকল ডাকা ছাড়া যা খুশি করতে পারো... :)”

এই হল জেন... মন'টা ভালো হয়ে গেল এক মিনিটেই...

“ঘরে ঢুকে সোফায় এলিয়ে বোস...” তালা-চাবি আমার হাতে ধরিয়ে রিদ্‌ম বলল, “আমি একটা দারুণ করে কফি করছি...”

সদর দরজায় ছিটকিনি দিয়ে বাগান পেরিয়ে ঘরে ঢুকলাম; বাগান’টা মরসুমি ফুলের ভিড়ে রংরঙিন। বিশাল ওকে গাছটায় ঝিকিয়ে উঠেছে রোদ। বারান্দায় সেই চেনা উইন্ডচিমার'টা হাওয়ায় দুলছে। মন'টা জুড়িয়ে আসছিল। বসার ঘরের সোফায় এলিয়ে থাকবো এখন খানিক, তাহলেই ফ্রেশ হয়ে যাবো। হয়তঃ সত্যিই খুব ধকল হয়ে গেছে, তাই অস্বস্তি হচ্ছিল তখন। 

টেবিলে তালাটা রাখতে গিয়েই জানলার বাইরে চোখ চলে গেল...

একি! সদর'টা হাট করে খোলা...! সঞ্জৌলির ধুকপুকুনিটা হুড়মুড়িয়ে ফিরে এল বুকের মধ্যে... আমি যে... আমি যে এখুনি লাগিয়ে এলাম দরজাটা...!! কে খুলে দিল তাহলে?


হুশ করে জানলার পর্দাটা উড়ে চোখ ঢেকে দিল আমার... আর সঙ্গে সঙ্গে কিরকম একটা অস্বস্তি পাক দিয়ে উঠল সারা শরীরে... মনে হল যেন ঠিক আমার পিছনে দাঁড়িয়ে কেউ দেখছে আমায়...!!

[পরের কিস্তি'তে শেষ]

- Copyright © পাঁচমিশেলি - - Powered by Blogger - Designed by সায়ংতরী -