ফেরা / দুই
By : Sayantari Ghosh
দুই
“ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?"
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?"
দখিনদুয়োরী বড় ঘরটার মেঝের ঠিক মাঝখানে বড় করে আলপনা দিচ্ছে টুপুর—চারদিক কেমন ধোঁয়াটে—আর একটানা কেউ যেন পাঁচালি পড়ছে—
"....আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর......”
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর......”
কোথায় যেন শোনা এই ছড়াটা? খুব,খুউব চেনা...তবু যেন ঠিক ঠিক চিনে নিতে অসুবিধে হচ্ছে—ওই তো দিদুন...খাটের ওপর বসে...এক্ষুনি স্নান সেরে এসেছে...এই অ্যাত্তো লম্বা ভেজা চুল গোটা পিঠে এলো হয়ে আছে...ছোট্টো কপালে ছোট্টো সিদুঁরের টিপ...
-“ম্যাডাম...!”
আচমকা তন্দ্রাটা কেটে গেল ডাকটায়—চোখ খুলতে হাসপাতালের রিসেপশনের মেয়েটির ব্যাতিব্যস্ত মুখটা পরিষ্কার হয়ে এল আস্তে আস্তে—বুকের ধুকপুকুনিটা অজান্তেই বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে ততক্ষণে...
-“আপনি কি ICU-এর ছয় নম্বর পেশেন্টের বাড়ির লোক?”
মাথার বাঁ-দিকটা দপদপ করছে ক্রমাগত—কথাটা শোনার পর বুঝতে একটু সময় লাগল টুপুরের—তারপর ধীরে ধীরে উত্তর দিল ও—
-“না...না,আমার পেশেন্ট CCU-তে আছেন...বারো নম্বর...”
-“ওহ...সরি!” আর কথা না বাড়িয়ে মেয়েটি চলে গেল।
-“ওহ...সরি!” আর কথা না বাড়িয়ে মেয়েটি চলে গেল।
ঘুম এসে গেছিল একটুখানি—মাথাটা ভীষণ ব্যাথা করছে—একটু চা খেতে হবে—হাসপাতালের ক্যান্টিন এই রাত আড়াইটের সময় খোলা থাকবে না—রাস্তার মোড়ের দোকানটা ছাড়া গতি নেই...
পায়ে পায়ে লাউঞ্জটা থেকে বেরিয়ে এল টুপুর—ভীষণ গুমোট করেছে আজ—আকাশে একটাও তারা নেই—খুউব হালকা হাওয়া দিচ্ছে একটা—আলগোছে ছুঁয়ে যাচ্ছে—জোর করে বুঝতে চাইলে তবে বোঝা যায়—!
দাদুমনি নাকি এখন একটু ভাল—সাড়ে ন’টায় ডাক্তারের সাথে শেষ কথা হয়েছে—ব্লাড প্রেশার অনেকটা স্টেবল—কিন্তু হার্টবিট নাকি খুব উইক—কে জানে...? এদের কথায় আজকাল আর ভরসা করতেও সাহস হয় না—
আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আগুন ছুটে গেল—বৃষ্টি হবে কি...?
চা-টা হাতে নিয়ে হাসপাতালের সিঁড়িতে বসল টুপুর—কি যেন একটা স্বপ্ন দেখছিল ও এখুনি? কি যেন...? যত ধরার চেষ্টা করছে,তত যেন পিছলে পালিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নে-দেখা দৃশ্যগুলো...দিদুন ছিল এটুকু মনে আসছে...আর......
‘ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?’
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?’
-“না না...শ্রবণকুমারেরটা নয়...ওটা বিচ্ছিরি...আজ পুণ্যিপুকুরের গল্পটা বল না,দিদুন...!”
-“আআ মল যা...পুণ্যিপুকুরেরটা আবার গল্প নাকি? কতবার শুনিচিস ওটা...সেই যে চারকোনা পুকুর কেটে...”
-“না না...অম্নি করে না...ভালো করে বলো না...!”
-“আআ মল যা...পুণ্যিপুকুরেরটা আবার গল্প নাকি? কতবার শুনিচিস ওটা...সেই যে চারকোনা পুকুর কেটে...”
-“না না...অম্নি করে না...ভালো করে বলো না...!”
প্রতিদিন প্রাইমারি স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে যাবার পর দিদুনের খাটটায় পাশাপাশি শুয়ে পড়তো ওরা দুইবোন...টানটান উত্তেজনায়...নতুন গল্পের দুরন্ত আকর্ষনে...বা সাতপুরোনো গল্পের কানাঘুঁজিতে একটু নতুন আবিষ্কারের আশায়...
-“ভালো করে আবার কি? সব মনে আছে তোদের...এই ত সেদিন শুনলি...”
-“না,না...বলো না দিদুন... ‘ভাটি-খালকুলায় বোশেখ মাসটা জুড়ে...’...বলো না...!”
-“বেশ,বেশ..শোন তবে....তা আমাদের গ্রাম ভাটি-খালকুলায় গোটা বোশেখ মাসটা জুড়ে নানাআআন রকম উত্সব-মচ্ছব লেগেই থাকত...গ্রামটার পাশ দিয়ে গোল করে বাঁক নেওয়া চন্দনা তখন এই প্যাকাটির মতন শুকিয়ে যেত...অথচ বর্ষায় তার সে কি আস্ফালন...! জলে আর মাছে থৈ থৈ করত তখন!
যা হোক বোশেখের কথা বলছিলাম...পয়লায় দয়ালের আসন থেকে একখানা নগরকীত্তন বার হত...সারা গ্রাম ঘুরে তারা সংক্রান্তির মেলার জন্য দান-দক্ষিণে নিত...সে কীত্তন ভাটি-খালকুলা আর মাদুলি-খালকুলার সব দরজায় ঘুরতো...
তারপর বোশেখের পত্থম ব্রত করতাম আমরা...পুণ্যিপুকুরের ব্রত...ঘর-লাগোয়া বিশাল দীঘি ছিল আমাদের...তার পাড়েই চারকোণা পুকুর গড়তাম...”
-“কত বড় পুকুর দিদুন...?”
-“ছোট্ট...! এই ধর এইটুকুনি...”, খাটের ওপর আঙ্গুল দিয়ে দাগ টেনে পুকুরের আয়তনটা বুঝিয়ে দিত দিদুন, “সেই পুকুরভর্তি করে জল দিতাম আর পুকুরের মাঝখানে একখানা বেলের ডাল লাগিয়ে দিতাম...”
-“বেলের ডাল কোত্থেকে নিতে...? দয়াল আসনের পাশের বোধন-বেলগাছটা থেকে বুঝি...?”
-“সে অত মনে নেই...বেলের কি আর অভাব ছিল নাকি...?”
-“তারপর...?”
-“তারপর পুজো করতাম...! হাত জোড় করে, কোষাকুষিতে সব সাজিয়ে নিয়ে...”
-“মন্ত্র বলতে না...?”
-“হ্যাঁ...বলতাম বই কি...সব্বাই মিলে বলতাম,
-“না,না...বলো না দিদুন... ‘ভাটি-খালকুলায় বোশেখ মাসটা জুড়ে...’...বলো না...!”
-“বেশ,বেশ..শোন তবে....তা আমাদের গ্রাম ভাটি-খালকুলায় গোটা বোশেখ মাসটা জুড়ে নানাআআন রকম উত্সব-মচ্ছব লেগেই থাকত...গ্রামটার পাশ দিয়ে গোল করে বাঁক নেওয়া চন্দনা তখন এই প্যাকাটির মতন শুকিয়ে যেত...অথচ বর্ষায় তার সে কি আস্ফালন...! জলে আর মাছে থৈ থৈ করত তখন!
যা হোক বোশেখের কথা বলছিলাম...পয়লায় দয়ালের আসন থেকে একখানা নগরকীত্তন বার হত...সারা গ্রাম ঘুরে তারা সংক্রান্তির মেলার জন্য দান-দক্ষিণে নিত...সে কীত্তন ভাটি-খালকুলা আর মাদুলি-খালকুলার সব দরজায় ঘুরতো...
তারপর বোশেখের পত্থম ব্রত করতাম আমরা...পুণ্যিপুকুরের ব্রত...ঘর-লাগোয়া বিশাল দীঘি ছিল আমাদের...তার পাড়েই চারকোণা পুকুর গড়তাম...”
-“কত বড় পুকুর দিদুন...?”
-“ছোট্ট...! এই ধর এইটুকুনি...”, খাটের ওপর আঙ্গুল দিয়ে দাগ টেনে পুকুরের আয়তনটা বুঝিয়ে দিত দিদুন, “সেই পুকুরভর্তি করে জল দিতাম আর পুকুরের মাঝখানে একখানা বেলের ডাল লাগিয়ে দিতাম...”
-“বেলের ডাল কোত্থেকে নিতে...? দয়াল আসনের পাশের বোধন-বেলগাছটা থেকে বুঝি...?”
-“সে অত মনে নেই...বেলের কি আর অভাব ছিল নাকি...?”
-“তারপর...?”
-“তারপর পুজো করতাম...! হাত জোড় করে, কোষাকুষিতে সব সাজিয়ে নিয়ে...”
-“মন্ত্র বলতে না...?”
-“হ্যাঁ...বলতাম বই কি...সব্বাই মিলে বলতাম,
‘পুণ্যিপুকুর ব্রতমালা/কে করে গো সকালবেলা
আমি সতী,লীলাবতী/সাতভায়ের বোন,ভাগ্যবতী
হবে পুত্র,মরবে না/ধান সে গোলায় ধরবে না
পুত্র তুলে স্বামীর কোলে/আমার মরণ হয় যেন এক গলা গঙ্গাজলে...’...”
আমি সতী,লীলাবতী/সাতভায়ের বোন,ভাগ্যবতী
হবে পুত্র,মরবে না/ধান সে গোলায় ধরবে না
পুত্র তুলে স্বামীর কোলে/আমার মরণ হয় যেন এক গলা গঙ্গাজলে...’...”
ছড়াটা শেষ হতেই হাততালি দিয়ে উঠত নুপূর...দিদুনের কোল ঘেঁষে বসে বলত, “আর শিবরাত্রির মন্ত্রটা......?”
-“ শিল-শিলাটন শিলাবাটন শিলা আছেন ঘরে
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?
আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর।
আসনং পাশনং পাত সিংহাসন
হরগৌরী ব্রত করে শিব হরধন
কালো ফুল তুলতে গেলাম শুধু লতাপাতা
শিব-চরনে দেখা হল, শিবের মাথায় জটা...”
স্বর্গ থেকে মহাদেব বলেন হরগৌরী কি ব্রত করে?
আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা-গঙ্গার জল
এই পেয়ে তুষ্ট হন ভোলা মহেশ্বর।
আসনং পাশনং পাত সিংহাসন
হরগৌরী ব্রত করে শিব হরধন
কালো ফুল তুলতে গেলাম শুধু লতাপাতা
শিব-চরনে দেখা হল, শিবের মাথায় জটা...”
-“তারপর...?”
-“তারপর আর কি? চেয়ে নিবি...”
-“কি চেয়ে নেব...?”
-“বর...! এই টকটকে ফরসা রং, টানাটানা চোখ, টলটলে হাসি...রাজপুত্তুরের মতন বর চেয়ে নিবি...”
-“চাইলেই পাওয়া যাবে।তাই না দিদুন...?”, নুপূর জিগেস করত অনেক আগ্রহ নিয়ে...
-“কিন্তু এতো একেবারে দাদুমণির মতন...”, বলত টুপুর, “আমার তো দাদুমনি আছে...আমি আর চাইবো কি করতে...?”
-“তারপর আর কি? চেয়ে নিবি...”
-“কি চেয়ে নেব...?”
-“বর...! এই টকটকে ফরসা রং, টানাটানা চোখ, টলটলে হাসি...রাজপুত্তুরের মতন বর চেয়ে নিবি...”
-“চাইলেই পাওয়া যাবে।তাই না দিদুন...?”, নুপূর জিগেস করত অনেক আগ্রহ নিয়ে...
-“কিন্তু এতো একেবারে দাদুমণির মতন...”, বলত টুপুর, “আমার তো দাদুমনি আছে...আমি আর চাইবো কি করতে...?”
আকাশে আরেকখানা বিদ্যুতের ঝলক...শুধু আলো...কোনো শব্দ হলনা...দিদুন বুঝি মুচকি হাসল ওই ওপরে বসে বসে...আর তক্ষুনি টুপুর হঠাত্ খেয়াল করলো দু-গাল ভিজিয়ে দিয়েছে বাধ-না-মানা চোখের জল...দুহাতে মুখ ঢাকলো ও...সেইদিন থেকে সব্বাই কেঁদেছে...সব্বাই...শুধু ও ছাড়া...সুযোগ পেয়ে সবটুকু কান্না উছলে পড়তে চাইছে এখন...অঝোরে...
এই একা-রাত গুলো এরকমই অবাধ্য হয়...একগুঁয়ে...জেদি...কাঁদিয়ে তবে ছাড়ে...!
Tag :
একটু বড় গল্প,
স্বীকারোক্তি, আমি আর একরাশ বাজে-বকা
By : Sayantari Ghosh
একখানা সিরিয়াস স্বীকারোক্তি করা নাকি আজকের দিনে যাকে বলে একেবারে মাস্ট! “সিরিয়াস স্বীকারোক্তি” বুঝলেন না? মানে ওই ধরুন “ছোটবেলায় আমি ধুলোবালি, মাটি, ছাই এসব হাতে পেলেই বেমালুম খেয়ে ফেলতাম” বা “গতকাল আমি ২১৫ নয়,৭১ নম্বর বাসে উঠেছিলাম আসলে” কিম্বা “ওই কাঁচের ফুলদানিটা... মানে আমারই হাত থেকে পড়ে...” এই জাতীয় অ-সিরিয়াস স্বীকারোক্তি সব বাতিলের খাতায়... বুঝলেন এইবারে?
এখন আপনারা ত জানেন (?) এসব দিনক্ষণ আমি কি নিষ্ঠার সাথে মেনে চলি! অনেক ভেবে দেখলাম, কাজটা যখন করতেই হবে তখন ব্লগটাই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা... আমার ভ্যাজর-ভ্যাজরে চূড়ান্ত বিরক্ত হলেও কেউ আমায় চাঁদা তুলে গণপিটুনি অন্ততঃ দিতে পারবে না এখানে!
অতএব......শুরু করি তাহলে...!
শুরু'টা করবো একটা প্রশ্ন দিয়ে। আচ্ছা, মনে করুন, আপনাকে জিগেস করলুম যে একখানা এরকম টপিক বলুন দেখি, যেটা নিয়ে আপনার বেসিকালি কিচ্ছু এসে যায় না, কিন্তু তবু কেউ সেই নিয়ে গল্প শোনাতে চাইলে আপনি নন্দলালের মালাই চমচম খাওয়ার অফার'ও হেলায় উপেক্ষা করে বসে পড়বেন? নিশ্চয়ই এরকম পছন্দের বিষয় কিছু আছে... যেমন ধরুন ভূত? বা ভিন গ্রহের প্রাণী...? বা ধরুন, দাম্পত্য-কলহ? আছে নিশ্চয়ই...? আমার তেমনই বহুদিনের আকর্ষণ একটি শব্দের প্রতি ... শব্দটি হল “ক্রাশ”! এই সব গল্পের চুম্বকে আমি এক্কেবারে বাঁধা, সে মায়া বোধহয় এ-জন্মে আর কাটিয়ে উঠতে পারব না!!! আমি ক্রাশের আড্ডা বড্ড ভালোবাসি, আর সে সব আড্ডা বসলেই আমার মনের অন্ধকার আউটহাউসের বাসিন্দা আমারই অংশবিশেষ কোনো এক দুরাত্মা (তার কদমছাঁট চুল, মারাত্মক লালচে চোখ আর মাথায় দুখানা ছোট্ট ছোট্ট শিং!! তাকে আমি মাঝেমধ্যেই মানসচক্ষে দেখতে পাই!) বসে বসে বিচ্ছিরিভাবে দাঁত বের করে হাসে আর বলে, “ভাবছিস কি?? সবাই এখানে ক্রাশের গল্প শোনাবে...?! খুব মজা, না? খ্যাঁক খ্যাঁক, খোঁক খোঁক...”
আজ বড় ভালো দিন— মিথ্যে বলব না— ওই শিংওয়ালা শয়তানটার কথার পুরোপরি সত্যি— ক্রাশ-টাশের গল্প আমার ভাই বেজায় ভাল লাগে— আপনারা হয়তঃ বিশ্বাস করবেন না, ভাববেন বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছি, কিন্তু সেরকম গল্প বলার লোক পেলে আমি সারাজীবনটা খাটের ওপর এলিয়ে বসে, বাদামভাজা খেয়ে আর ক্রাশের গল্প শুনে মজাসে কাটিয়ে দিতে পারি— এসব রোমাঞ্চকর কাহিনীর আমি চিরন্তন একনিষ্ঠ শ্রোতা!
কিন্তু ভাল শ্রোতা হওয়ার একটা গুরুতর অসুবিধা আছে। তাতে আপনি চিরকাল শুনতেই থাকেন, কেউ আর আপনার কাছে কখনো কিচ্ছুটি শুনতে চায় না!
আমারও সেই একই ঝামেলা! রাজ্যের লোকজন এসে আমাকে রকমারি গল্প শুনিয়ে যায়, আমিও শোনার আনন্দে সেসব গোগ্রাসে গিলে ফেলি... কিন্তু তাই বলে বুঝি আমার বলার মত কিছু থাকেনা? আমার বুঝি এক-দুটো ক্রাশের গল্প থাকতে নেই? যাচ্ছেতাই একেবারে...!
সে যাই হোক, আজ তাই আমার সিরিয়াস স্বীকারোক্তিটি আমার প্রথম ক্রাশ বিষয়ক একখানি দূর্লভ কাহিনী। দীর্ঘকাল যাবত্ পুরনো গল্পের বস্তায় পড়ে থাকার দরুন পচে-টচে গেলে অবিশ্যি জানিনে...!(শুনেছি স্বীকারোক্তি ব্যাপারটা নাকি বেশ কষ্টকর; আমার এরকম ভয়ানক আনন্দ হচ্ছে কেন, কে জানে!)
প্রথম ক্রাশ জিনিসটা আমার বান্ধবীদের মধ্যে ঘটে গেছিল ওই ক্লাস সেভেন-টেভেন নাগাদ। আমি সেই সময় ঠিক কি করছিলাম অনেক চেষ্টা করেও কখনও সেটা মনে পড়েনা! ওই সবার গপ্পোগাছা শুনতে গিয়েই কাল হয়েছিল হয়তঃ...
আমার বাবার ইস্কুলের ছাত্র'রা সকাল-বিকেল দঙ্গল বেঁধে আমাদের বাড়ি আসত মাঝে মাঝেই। সেদিকেও আমার তেমন উত্সাহ ছিল না। কিন্তু...... ব্যাতিক্রমী ঘটনাটি ঘটল! তখন আমি ক্লাস নাইন। এক শনিবারে স্কুলের পর ঘন্টাদেড়েক গানের রিহার্সাল করে, খিঁচড়ানো মেজাজে, স্কুলড্রেসের হলুদ শাড়িতে হোঁচট খেতে খেতে বাড়ি ফিরছি। মাথায় তখন খালি ঘুরছে পরদিনের টিউশনের পরীক্ষাটার কথা...
হঠাত্ রাস্তার পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, “আচ্ছা, সুজনস্যারের বাড়িটা কোনদিকে?”
গলার স্বরের মালিকের দিকে চোখ পড়তেই আমি থ! বুকের মধ্যে একসাথে হাজারখানা কাঁসর-ঘন্টা বাজতে শুরু করল হঠাত্! একি দেবদূত নাকি রে বাবা? কিছুক্ষন হাঁ করে তাকিয়ে থাকার পর বুঝলাম যে, না, এ দেবদূত নয়; দেবদূতরা CBZ বাইক চালায় না!
সে আমার এই বিহ্বলতা লক্ষ্য করেছিল কিনা জানিনা। সে আবার বলল, “আমি সুজনস্যারের বাড়িটা খুঁজছিলাম; আপনি চেনেন?”
কোনোক্রমে হাত উঠিয়ে বাড়ির দরজাটা দেখিয়ে দিলাম। এটুকুও বলা গেল না যে সেতো আমাদেরই বাড়ি..! যাকে বলে একেবারে দর্শন এবং সম্মোহন... কয়েক ন্যানোসেকেন্ড সময় লেগেছিল হয়তঃ...
পরে জেনেছিলাম বাপির কোন এক চেনা ডাক্তারবাবু তাঁর তনয়রতনটির জয়েন্টের স্পেশাল কোচিং-এর জন্য বাপিকে রিকোয়েস্ট করেছেন। বাপিকে সাধারণতঃ এ ধরনের অনুরোধের ফাঁদে ফেলা যায় না; এবারেই কি করে না জানি অঘটনটা ঘটে গেছে। ব্যাপারটা শোনামাত্র আমার উত্তেজিত প্রাণের মধ্যে একটা দৈব-নির্দেশিত ঘটনার ইঙ্গিত আরো স্পষ্ট হয়ে গেল এক্কেবারে! আর তার ওপরে যখন শুনলাম যে প্রতি শনিবারই সাড়ে তিনটে নাগাদ তার আগমন ঘটবে, তখন এত আনন্দ রাখব কোথায়, এই নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম!
এরপর থেকে শুরু হল এক অদ্ভুত রুটিন! বাড়ির সবাইকে দিবানিদ্রার সুযোগ দিয়ে স্বার্থত্যাগী (?) আমি শনিবারের ভর দুপুরগুলো অঙ্ক খাতা নিয়ে দিন-জাগা শুরু করলাম! মা তো মহাখুশি! মাধ্যমিকের বছর মেয়ে দুপুরে টানটান পাঁচঘন্টা না ঘুমিয়ে অঙ্ক খাতা নিয়ে বসলে মায়ের খুশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর আমি? সেই “পাপা কেহতে হ্যায়...” গানের স্টাইলে সারা দুপুর “চমকিত মন, চকিত শ্রবণ, তৃষিত আকুল আঁখি” নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে বসে থাকতাম— অপেক্ষা— কখন সে আসবে আর আমি দরজাটা খুলে দেব! সে রোমাঞ্চ ভাষায় বলার মতন অত বাংলা আমি শিখিনি এখনও...!
এতদূর শুনে যদি আপনি একটা দারুন প্রেমের গল্পের গন্ধ পাচ্ছেন, তাহলে মহাভুল করছেন মশাই! গল্পের মুখ্য পাত্রীটি যে আমি সেটা বুঝি নির্ঘাত ভুলে মেরে দিয়েছেন? মাসছয়েক ধরে আমি ওই দরজা খোলার কাজটি বড় দায়িত্ব নিয়ে, ভীষণ নিপুণতার সাথে করে গেলাম আর তারপর...?
তারপর আর কি? জয়েন্ট পেয়ে গিয়ে সে যথারীতি বিদায় নিল!
সেই দুঃখে মাসখানেক মুহ্যমান হয়ে ছিলাম। আমার বন্ধুরা বলে সেসময় নাকি আমার মধ্যে বেশ একটা বৈরাগ্য-গোছের ভাব এসছিল; ওদের নাকি ভয় হয়েছিল যে তার নামের মালা জপ করেই বোধহয় আমার বাকি জীবনটা কেটে যাবে... যাই হোক, ঘাড়ের ওপর হুড়মুড়িয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষাটা এসে গিয়ে আমার বৈরাগ্য-টৈরাগ্যের সব্বোনাশ করে দিলে... নইলে আমায় নিয়েও কত্তো কবিতা-উপন্যাস লেখা হত, দেখতেন!
শেষমেশ আর একটা কথা বলি। মাধ্যমিকে অঙ্কে সঅঅব ঠিক করে এসছিলাম; তবু একশ হয়নি। প্রথমে দুঃখ পেলেও পরে বুঝেছিলাম এ আমারই পাপের ফল বই আর কিছু নয়। শনিবারের ওই দুপুরগুলো অঙ্ক করার ব্যাপারটা যে শুধুই গল্প, সে ত আর মা-বাপি কোনোদিন জানতে পারেনি! রীতিমত ভয় করত মাঝেমাঝে, যে কোনদিন মা এসে ক্যাঁক করে চেপে ধরবে, “প্রতি শনিবার অত্তো অত্তো অঙ্ক করলে তো দশ-বিশ কিলো খাতা জমে যাবার কথা! কোথায় সে সব? দেখি...” ইত্যাদি! যা হোক, সে দুর্দিন আমার আসেনি কখনও।
তা এই হল গিয়ে আমার আজকের স্বীকারোক্তি! আপনার কিন্তু অসাধারণ ‘ইয়ে’.... এখনো পড়ে যাচ্ছেন!! তো এতটা যখন পড়লেনই, আর একটা কাজও করে ফেলুন না! আজ দিনটা সত্যিই খুব ভালো। আপনিও একটা এই জাতের স্বীকারোক্তি করেই ফেলুন না বুকের সমস্ত সাহস একজোট করে...! বলছি শুনুন, কিউপিডের নেকনজরে থাকবেন! বিশ্বাস করুন...
Tag :
প্রতিদিনের গল্প,
ফেরা / এক
By : Sayantari Ghoshএক
হাসপাতালটার একটা দিকের দেওয়ালের জায়গায় সাততলা-জোড়া কাঁচ— তার মধ্যে দিয়ে দেখলে বাইরের উত্তপ্ত জ্যৈষ্ঠের দুপুরটাকেও সবজে ছায়ায় ঢাকা মনে হয়। তিনতলার সেইরকম একটা কাঁচের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল টুপুর। বাইরের গাছপালা,বাড়িঘর— নির্জন রাস্তায় মাঝেমাঝে হুশ করে ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া এক-একটা গাড়ি— সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা জড়তা— সময়টা খারাপ ক্যাসেটের রিলের মত জড়িয়ে গেছে যেন! এখান থেকে বোঝাই যায় না এটা ভোর, দুপুর নাকি বিকেল গড়িয়ে গেছে— ইচ্ছে করে এরকম কাঁচ লাগিয়েছে এরা— জোর করে সময়টাকে আটকে দিতে চায়। ভীষণ একটা ভাঁওতার মধ্যে রেখে দিতে চায়— একটা ধাঁধার মধ্যে।
এভাবেই তিনটে দিন কেটে গেল— দিনরাতের হিসেবটাও গোলমাল হয়ে যাচ্ছে এবারে—
একটু দূরে ওয়েটিং হলের বেঞ্চিতে মা-কে জড়িয়ে ধরে, চোখ বন্ধ করে নূপুরটা বসে আছে— মায়ের চোখ ফোলা, মুখ লাল— বাপি আর কাক্কা অনেকখন ধরে কথা বলছিল; এখন চুপ— বাপির চোখ বন্ধ; চোখের পাতাটা তিরতির করে কাঁপছে— কথা আর কান্না তে কিই বা আসে-যায়? হিসেব তো মনেমনে সব্বাই করছে!
টুপুর আবার রাস্তার দিকে তাকালো—গলার কাছটায় কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে—
দাদুমণির এই ভাবে অসুখে পড়াটা ঠিক মেনেই নেওয়া যাচ্ছে না। সেদিনও তো বিকেলে হাঁটতে বেরোলো— টুপুর স্কুল থেকে ফিরেছে তক্ষুনি— M.A.-এর রেসান্টটা বেরোয়নি—এই ফাঁকে একটু হাত পাকানো আর কি!
সদরের কাছটাতে দাদুমণির সাথে দেখা, বলল, “কি বড়দি? মুখ গোমড়া কেন? ছাত্তররা কথা শুনছে না বুঝি?”
-“কি যে বল,দাদুমনি? আমার কথা শুনবে না?জানো, আমি সারাক্ষণ হাতে বেত রাখি!”,হেসে জবাব দিয়েছিল টুপুর, “দু-মিনিট দাঁড়াও না গো! এক কাপ চা খেয়ে নিই— দিয়ে আমিও তোমার সাথে ঘুরে আসি একটু...”
-“না ভাই, তুই বড় দেরি করে দিস!” মাথা নেড়ে বলেছিল দাদুমনি, “তোর সাথে আরেকদিন ঘুরতে যাব... যেদিন ব্যাগপত্তর কিনতে নিয়ে যাবি, সেইদিন... কবে যাবি বল তো?”
-“ইইইস!! ব্যাগপত্তর কেনার আর তর সইছে না,বলো?! রোববার যাব, দাদুমনি... পাক্কা...!”
আজ রোববার! ভাবতেই বুকের ভেতর'টা যেন দুলে উঠল একেবারে... বৃহস্পতিবার থেকে আজ রোববার— দাদুমনি কথাই বলছে না— সেইরাত থেকে আজ তিনদিন টানা এখানেই টুপুর— বাড়িমুখো হয়নি সে— মা আজ সকালে বলছিল,"বাড়ি গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নে মামনি, এবার শরীর খারাপ করবে কিন্তু...”
ঘুমিয়ে?! এই তিনদিনে বসে বসে মাঝেমাঝে ঝিমুনি এলেও একটা দারুণ ঝটকা দিয়ে উঠেছে ভিতর থেকে— ঘুমের মধ্যে মারাত্মক দুঃস্বপ্ন দেখে যেমন ঘুম ভেঙে যায়, সেইরকম— চমকে সোজা হয়ে উঠে বসেছে টুপুর প্রতিবার!
-“না ভাই, তুই বড় দেরি করে দিস!” বলেছিল বটে দাদুমনি— খুব দেরি হয়ে গেল কি? কে জানে... বেশী কিছু তো নয়— শুধু একবার ঘরে ফিরতে চায় মানুষটা—তারও কি অনুমতি মিলবে না?? ভগবান...!
ঘরে ফেরা। এই একটা ইচ্ছে নিয়ে প্রতিটি রাত স্বপ্ন দেখত দাদুমনি; প্রতিটা দিন স্বপ্ন লিখত! দু'বছর আগে সেপ্টেম্বরে যখন হুঠ করে দিদুন চলে গেল, তার পর থেকেই আস্তে আস্তে এই ছেলেমানুষিটা পেয়ে বসেছে দাদুমনিকে... ঘরে ফিরবে! একবার! সেই গ্রাম, সেই মাটি, সেই ঘাস, সেই নদী, সেই সঅঅব কিছু একবার, শুধু একবার আলতো করে ছুঁয়ে আসবে! একটিবারের জন্য বাংলাদেশ ফিরবে! “ছানি পড়া চোখ, তবু দেখবো রে... কালা কান, তবু যেটুক শোনা যায়!” যেটা বলেনি সেটা হল,এখনও জীবন্ত প্রাণ... তাই বাঁচবো রে, যেটুক বাঁচা যায়!!
হুজুগ?! বলা যায়। অনেকে বলেও ছিল— তোতোনপিসি, দীপ্তিবউদি এমনকি মিতুলদা অবদি!দাদুমনির বাংলাদেশে যাওয়ার এই পাগলপারা ইচ্ছেটাকে আশকারা দিতে মানাও করেছিল বাপিকে। বাপি কোনোদিন কারো কথায় কান দেয় না; এবারও দেয় নি। বলেছিল, “যেতে ইচ্ছে তো যাক না!”
সেই দেশভাগের সময় থেকে মাটিছাড়া দাদুমনি। তারপর কোনোদিন, কখখনো ফিরে যায় নি। ফিরতে চায়ও নি। কিন্তু স্মৃতিজুড়ে ছিল সেই মাটির সোঁদা গন্ধ। এখনও মনে পড়ে— সে কবেকার কথা— টুপুর তখন স্কুলে পড়ে— শীতকালে ওপরের বারান্দার রোদে-ভেজা খাটটায় বসে বসে কত গল্প বলে যেত দাদুমনি আর দিদুন— টুপুরের আপাদমস্তক শহুরে মনটার কাছে রূপকথার থেকেও অবিশ্বাস্য লাগত সেসব কথা— দেখতে দেখতে ওর মনটাও ছুটতে শুরু করত সবুজ ধানের শিষে হাত ছুঁইয়ে— সরু আল বেয়ে— নীল আকাশটা নুইয়ে পড়ছে ওকে দেখতে— দূরে একদল সাদাকাশ একসাথে হৈ হৈ করছে— ছুট, ছুট, ছুট— “রুপুউউউ...!! ওওওওওই বুড়ো অর্জুনতলা অবদি কিন্তু— আজ আবাআআআর তুই হেরে যাবি...!!!” —আআআর এই যে গাছ ছুঁয়ে দিয়েছি— জিতে গিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠত টুপুর— শুনতে শুনতে ভুলেই যেত যে স্মৃতিটা আসলে কার...! মনে হত কবেকার সেই জোড়া-বাংলার অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেমেয়ে রুপু, মদন, গীতা, নাজিম, সুজয়... এরা যেন ওরই ক্লাসে পড়ে, ওরই অভিন্নহৃদয় বন্ধু...
তাই যেচেই দায়িত্বটা নিয়েছিল ও। আর সবাই যখন সময়-সুযোগের অভাব-টভাব নিয়ে সাতপাঁচ ভাবছে, নিজেই বলেছিল, “আহা!কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে? আমিই যাবো সাথে...!”
মনে মনে হেসেছিল তখন। দিদুন টুপুরকে “সতীন” বলতো আদিখ্যেতা করে... দিদুন নেই, দায়িত্বটা ওরই ওপর বর্তায় বইকি!!
সেই ঘরে ফেরা। তার কত আয়োজন! রীতিমত পাগল হয়ে উঠেছিল দাদুমনি। কত কিছু গোছগাছ, কেনাকাটা... আজ রোববার... আজ বড় দেখে একটা ব্যাগ কিনে দেবে বলেছিল টুপুর... আর আজ...
-“মামনি!”
চমকে উঠল টুপুর! মা কখন কে জানে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
-“ চল, আজ বাড়ি ফিরে চল তুই! টানা তিনদিন হল। মিতুল বলছে, ও না'হয় থেকে যাবে আজ রাতটা...!”
-“কি দরকার মা? আমিই থাকছি— মিতুল'দার আর কষ্ট করার দরকার নেই... বাড়ি গিয়ে আমার লাভ কিছুই হবে না”, কবজি উলটে ঘড়িটা দেখল টুপুর, “সাড়ে সাতটা বাজল। তোমরা বরং বেরিয়ে পড়ো!”
[চলবে]
Tag :
একটু বড় গল্প,
আবার যদি ইচ্ছে কর...
By : Sayantari Ghoshএক
অনেকদিন বাদে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ফিরলাম। জীবনের হিসেবে ফেললে ‘অনেক’ শব্দ’টা ভুল হয়ে যাবে অবশ্যই... তবে দূরত্ব আর গুরুত্বের হিসেবে কিন্তু একশ’ভাগ ঠিক! সেই যে অঝোর বৃষ্টি’তে চোখভর্তি ছেলেমানুষী জল নিয়ে শহর ছেড়েছিলাম... সে পাক্কা আড়াই বছর হল!
এবারেও ট্রেন থেকে নেমেছি ঝমঝমে বৃষ্টি’তে। ভাবা যায়? এই ফেব্রুয়ারির শেষে... ওই শুকনো দেশে...!? আসলে এ শহর জানে আমি বৃষ্টি ভালোবাসি। কারণে অকারণে সেই দু’বছরে কত যে বৃষ্টি নামিয়েছে আমায় অবাক করে দিয়ে, সে হিসেব ডায়েরিতে রাখতাম তখন... প্রতিবার নিখুঁত টাইমিং, নির্ভুল নিশানা!
হাঁটতে ইচ্ছে করছে... নর্থ গেটের সামনেটাতেই ছ’শো পনেরো থেকে নেমে পড়লাম... এখানে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি গাছ... একেবারে সবুজে সবুজ... দিন’টা মঙ্গলবার, উইক’ডে... সব্বাই ক্লাসে, বা হস্টেলে এই অসময় বৃষ্টি’তে নির্ঘাত... রিংরোড প্রায় শুনশান...
গঙ্গা হস্টেলের সামনের বাস স্টপ’টা পেরোলো... সেই ধূ ধূ গরম’টা ছুঁয়ে গেল যেন হলকা দিয়ে... মনে পড়ে গেল বাহান্ন না তিপ্পান্ন’র তর্ক আর মনে এল অজ্ঞান হয়ে গেলে মানুষের শরীর’টা ঠিক কত’টা ভারি হয়ে যায়...
নর্মদার সামনের সেই পাথর’টার ফাঁকে উঁকি দিলাম পেরোতে পেরোতে... ‘ইয়ং গান্স্ অফ ইন্ডিয়া’ জ্বলজ্বল করে উঠল আমাকে চমকে দিয়ে... আধ সেকেন্ড বাদে টের পেলাম হেসে ফেলেছি অজান্তেই...
নর্মদা আর সাবরমতির মাঝের শুঁড়িপথ ধরলাম... এই আলো’টা বুঝি এখনও রাতে দপদপ করে? কাবেরির দিকে যাওয়ার চোরারাস্তা’টার সামনে কারা যেন পাঁচিল তুলে দিয়েছে... এখানে সেই ঝামরঝুলোর মত নিচু হয়ে ঝুঁকে আসা জঙলা লতাগুলো আরো গাঢ় করে দিয়েছে অন্ধকার... হঠাত্ হাতের খুব কাছে মনে হল আর কারো হাত... ছিটকে সরে এলাম... গলার কাছে ভয় না কান্না কি যেন একটা ধাক্কা দিচ্ছে ক্রমাগত...
তাপ্তীর সামনের ওপেন এয়ার ক্যান্টিন’টা দ্যাখা যাচ্ছে। সবক’টা চেয়ার নিশ্চয়ই ভিজে সপসপে, ভাবতে ভাবতে যেই না ঢোকা, দুটি খুব পরিচিত কন্ঠ সমস্বরে ঘোষণা করল, “লেট! অ্যাস ইউসুয়াল...!” ইউসুয়াল’ই বটে। আড্ডায়, ওয়ার্কশপে, ক্লাসে বা অ্যাসাইনমেন্ট করার তলবে দেরি করে পৌঁছানোর কত বিশ্বরেকর্ড আমি করেছি, সে খবর ওরা ছাড়া আর কে’ই বা রাখে...?
হেম আর পারো!
পরের পঁচিশ’টা মিনিট পাগলামি’তে ভেসে গেল একেবারে। যা বলছিলাম তার মধ্যে আদৌ কোন বক্তব্য ছিল না। ছিল খালি নিখাদ উচ্ছ্বাস... এতদিন বাদে এত কাছ থেকে এই চেনা মুখগুলো চোখের সামনে দ্যাখার উন্মাদ উচ্ছ্বাস! ছবি নয়, ওয়েবক্যাম নয়... একেবারে লাইভ আর এক্সক্লুসিভ!!
রাজুদা’র বহুচর্চিত ম্যাগি (বহু-আস্বাদিত’ও বটে) অর্ডার দেওয়া হল, যা কিনা জমাটি আড্ডার শাশ্বত সঙ্গী!
“মিসিং রুদ্র, না?” পারো বলল, “চারজনের গ্রুপ’টা ইস সামহাউ ইনকমপ্লিট উইদাউট দ্য ওনলি গাই...”
“ওকে ছাড়... ও চিরকালের ব্যস্ত মানুষ”, আমি বললাম।
“শোন শোন, তুই বল আগে...”, পারোর দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়ে হেম বলল, “দুম করে এমন সাঙ্ঘাতিক কাজ’টা এক্সিকিউট করে ফেলার ডিসিশন নিয়েই ফেললি তাহলে? বিয়ে, হ্যাঁ? কান্ড করলি বটে মিস্...”
“দুম করে?!”, রে রে করে উঠল পারো, “কাম অন মিস হেমাক্সি আইয়ার... যে গল্প’টা গত পাঁচ বছর ধরে দিল্লি, হরিয়ানা, অসম আর বেঙ্গল চারটে স্টেট জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, যে’টা সল্ভ্ করতে গিয়ে আই ইউস্ড্ দ্য লাস্ট ড্রপ অফ মাই ইন্টেলিজেন্স আর টলারেন্স, সেটা ‘দুম করে’?! ইট অলমোস্ট রিচ্ড্ মাই ইলাস্টিক লিমিট ইয়ার... অন্য কেউ না লিখে থাকলে আমি পাক্কা একটা বই লিখে ফেলতাম...”
আমি আর হেম হো হো করে হাসছিলাম ওর ছটফটানি দেখে।
“আচ্ছা, তোর ব্যাপার’টা কি বলত হেম?”, পারো রেগে গিয়ে কথা ঘোরাতে চাইল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড উইথ ইয়োর ‘পোস্টম্যান’ গাই? জিগেস করলে বলিসও না ঠিক করে ফোনে... হোয়াট ইস দ্য প্রবলেম আকচুয়ালি, হাঁ? কি হয়েছে... এই রিনি, চেপে ধর তো ওকে...”
“কি হবে? নাথিং! উই আর ফ্রেন্ডস্...”, ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল হেম।
“স্টিল...” দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম, “ওই শব্দটা’ও বল্ সাথে করে... নইলে হয়?”
এবারেও ট্রেন থেকে নেমেছি ঝমঝমে বৃষ্টি’তে। ভাবা যায়? এই ফেব্রুয়ারির শেষে... ওই শুকনো দেশে...!? আসলে এ শহর জানে আমি বৃষ্টি ভালোবাসি। কারণে অকারণে সেই দু’বছরে কত যে বৃষ্টি নামিয়েছে আমায় অবাক করে দিয়ে, সে হিসেব ডায়েরিতে রাখতাম তখন... প্রতিবার নিখুঁত টাইমিং, নির্ভুল নিশানা!
হাঁটতে ইচ্ছে করছে... নর্থ গেটের সামনেটাতেই ছ’শো পনেরো থেকে নেমে পড়লাম... এখানে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি গাছ... একেবারে সবুজে সবুজ... দিন’টা মঙ্গলবার, উইক’ডে... সব্বাই ক্লাসে, বা হস্টেলে এই অসময় বৃষ্টি’তে নির্ঘাত... রিংরোড প্রায় শুনশান...
গঙ্গা হস্টেলের সামনের বাস স্টপ’টা পেরোলো... সেই ধূ ধূ গরম’টা ছুঁয়ে গেল যেন হলকা দিয়ে... মনে পড়ে গেল বাহান্ন না তিপ্পান্ন’র তর্ক আর মনে এল অজ্ঞান হয়ে গেলে মানুষের শরীর’টা ঠিক কত’টা ভারি হয়ে যায়...
নর্মদার সামনের সেই পাথর’টার ফাঁকে উঁকি দিলাম পেরোতে পেরোতে... ‘ইয়ং গান্স্ অফ ইন্ডিয়া’ জ্বলজ্বল করে উঠল আমাকে চমকে দিয়ে... আধ সেকেন্ড বাদে টের পেলাম হেসে ফেলেছি অজান্তেই...
নর্মদা আর সাবরমতির মাঝের শুঁড়িপথ ধরলাম... এই আলো’টা বুঝি এখনও রাতে দপদপ করে? কাবেরির দিকে যাওয়ার চোরারাস্তা’টার সামনে কারা যেন পাঁচিল তুলে দিয়েছে... এখানে সেই ঝামরঝুলোর মত নিচু হয়ে ঝুঁকে আসা জঙলা লতাগুলো আরো গাঢ় করে দিয়েছে অন্ধকার... হঠাত্ হাতের খুব কাছে মনে হল আর কারো হাত... ছিটকে সরে এলাম... গলার কাছে ভয় না কান্না কি যেন একটা ধাক্কা দিচ্ছে ক্রমাগত...
তাপ্তীর সামনের ওপেন এয়ার ক্যান্টিন’টা দ্যাখা যাচ্ছে। সবক’টা চেয়ার নিশ্চয়ই ভিজে সপসপে, ভাবতে ভাবতে যেই না ঢোকা, দুটি খুব পরিচিত কন্ঠ সমস্বরে ঘোষণা করল, “লেট! অ্যাস ইউসুয়াল...!” ইউসুয়াল’ই বটে। আড্ডায়, ওয়ার্কশপে, ক্লাসে বা অ্যাসাইনমেন্ট করার তলবে দেরি করে পৌঁছানোর কত বিশ্বরেকর্ড আমি করেছি, সে খবর ওরা ছাড়া আর কে’ই বা রাখে...?
হেম আর পারো!
পরের পঁচিশ’টা মিনিট পাগলামি’তে ভেসে গেল একেবারে। যা বলছিলাম তার মধ্যে আদৌ কোন বক্তব্য ছিল না। ছিল খালি নিখাদ উচ্ছ্বাস... এতদিন বাদে এত কাছ থেকে এই চেনা মুখগুলো চোখের সামনে দ্যাখার উন্মাদ উচ্ছ্বাস! ছবি নয়, ওয়েবক্যাম নয়... একেবারে লাইভ আর এক্সক্লুসিভ!!
রাজুদা’র বহুচর্চিত ম্যাগি (বহু-আস্বাদিত’ও বটে) অর্ডার দেওয়া হল, যা কিনা জমাটি আড্ডার শাশ্বত সঙ্গী!
“মিসিং রুদ্র, না?” পারো বলল, “চারজনের গ্রুপ’টা ইস সামহাউ ইনকমপ্লিট উইদাউট দ্য ওনলি গাই...”
“ওকে ছাড়... ও চিরকালের ব্যস্ত মানুষ”, আমি বললাম।
“শোন শোন, তুই বল আগে...”, পারোর দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়ে হেম বলল, “দুম করে এমন সাঙ্ঘাতিক কাজ’টা এক্সিকিউট করে ফেলার ডিসিশন নিয়েই ফেললি তাহলে? বিয়ে, হ্যাঁ? কান্ড করলি বটে মিস্...”
“দুম করে?!”, রে রে করে উঠল পারো, “কাম অন মিস হেমাক্সি আইয়ার... যে গল্প’টা গত পাঁচ বছর ধরে দিল্লি, হরিয়ানা, অসম আর বেঙ্গল চারটে স্টেট জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, যে’টা সল্ভ্ করতে গিয়ে আই ইউস্ড্ দ্য লাস্ট ড্রপ অফ মাই ইন্টেলিজেন্স আর টলারেন্স, সেটা ‘দুম করে’?! ইট অলমোস্ট রিচ্ড্ মাই ইলাস্টিক লিমিট ইয়ার... অন্য কেউ না লিখে থাকলে আমি পাক্কা একটা বই লিখে ফেলতাম...”
আমি আর হেম হো হো করে হাসছিলাম ওর ছটফটানি দেখে।
“আচ্ছা, তোর ব্যাপার’টা কি বলত হেম?”, পারো রেগে গিয়ে কথা ঘোরাতে চাইল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড উইথ ইয়োর ‘পোস্টম্যান’ গাই? জিগেস করলে বলিসও না ঠিক করে ফোনে... হোয়াট ইস দ্য প্রবলেম আকচুয়ালি, হাঁ? কি হয়েছে... এই রিনি, চেপে ধর তো ওকে...”
“কি হবে? নাথিং! উই আর ফ্রেন্ডস্...”, ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল হেম।
“স্টিল...” দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম, “ওই শব্দটা’ও বল্ সাথে করে... নইলে হয়?”
(ক্রমশঃ)
Tag :
একটু বড় গল্প,
অন্যরকম
By : Sayantari Ghosh
কলেজের পর সেই যে শহর ছেড়েছি, তারপর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলিয়ে অন্ততঃ খান তিরিশেক বিয়েবাড়ি মিস্ করেছি। তারজন্য অন্তরটিপুনিও খেয়েছি ঢের! খারাপও লেগেছে অনেকবার, ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারিনি অনেকের বিয়েতে নানা কারণে। কিন্তু, চূর্ণির বিয়েতে কে জানে কি করে ছুটি’টা ম্যানেজ হয়ে গেল।
চূর্ণি আমার আজন্মকালের ক্লাসমেট। আমাদের ঠিক প্রিয়তম বান্ধবী বলা যায় না, তবে বয়সের হিসেবে আমাদের বন্ধুত্ব প্রায় আমাদেরই সমবয়সী। আমি চিরকালীন বইমুখো, মুখচোরা আর চূর্ণি দূর্ধর্ষ ডাকাবুকো, সুন্দরীও বটে। আর বিজ্ঞানে তো বলেই যে ‘বিপরীতে বন্ধুত্ব অবশ্যম্ভাবী...!’ আসলে সত্যি বলতে আমি ছিলাম চূর্ণির গুণপণায় মুগ্ধ। ওর বিশেষত্ব ছিল সব্বার থেকে আলাদা হয়ে থাকায়, মানে যাকে বলে অন্যরকম... ‘হট্কে!’
তখন আমরা স্কুলে। যে বয়েস’টা থেকে ছেলেদের সাইকেলগুলো ভিড় জমাতে শুরু করে গার্লস স্কুলের বাসস্টপে, সেই তেরো-চোদ্দ’র কাছাকাছি। ওইসময়টায় মেয়েদের আড্ডাতেও কিন্তু চুপিসারে ঢুকে পড়ে কিছু আপাত-সেন্সর্ড্ প্রশ্ন... “কেমন ছেলে ভালো লাগে?” “কেমন বর চাই?” “ফর্সা?” “টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম?”
পঁচিশ-ছাব্বিশ আসতে আসতে এইসব প্রশ্নের উত্তরে পালিশ পড়ে যায় প্রচুর, চোদ্দ’র সেই আনকোরা, ছিমছাম, টাটকা ভাব’টা থাকে না তখন আর। বছর এগারো বারো পেরিয়েও কারো উত্তর একতারার মত একসুরে বাজে চিরকাল, কারো উত্তর মাঝপথে আঘাত খেয়ে বিপ্রতীপ হয়ে দাঁড়ায় হঠাত্ কখনো, কারো উত্তরে আবার বয়েসের ছাপ পড়ে; ছেলেমানুষী কাটিয়ে ‘ম্যাচিউওর্ড্’ হয় সেগুলো। খুব হাতেগোনা কেউ কেউ এরকমও থাকে যাদের উত্তর’টা প্রথমদিন থেকেই পাকাপোক্ত, তাদের ম্যাচিউরিটির আর কিছু বাকি নেই! চূর্ণি ছিল এরকম একজন। প্রেমবিষয়ে তার এ’সব চোস্ত উত্তরের সৃষ্টিরহস্য কোনোকালেই আবিষ্কার করে উঠতে পারিনি বলেই বোধহয় ওর প্রতি মুগ্ধতা’টাও কাটিয়ে উঠতে পারিনি কখনও। স্কুল কিম্বা কলেজ, চিরকাল ওর “কেমন বর চাই” এর উত্তর ছিল ঝরঝরে, চাঁচাছোলা আর সাঙ্ঘাতিক ‘ম্যাচিউওর্ড্’, “ওসব লম্বা, ফর্সা, কোঁকড়ানো চুল নিয়ে কি চলবে সারাজীবন? চিরদিন থাকবে নাকি ওসব? আমি তো বলবো আমার বর কালো হোক, ভূঁড়িওয়ালা হোক, একমাথা টাক হোক... এমন হোক যাতে তোদের কারোর পছন্দ না হয়... কিছু পেটে কিছু বিদ্যে থাক, বুদ্ধি থাক কিছু ঘটে, একটা ঠিকঠাক চাকরি আর একটা ভালো মন... ব্যাস, আর কিচ্ছু চাই না!” ক্লাস এইটে ওর এইসব ধারালো জবাব শুনে শুধু আমি নই (আমি তো না হয় ক্লাসের চিরকালীন শ্রীমতি হাঁদাগঙ্গারাম) অনেক চোখা-বাক্যবাগীশও বেশ খানিকটা থমকে যেত বই কি!
সেভেন-এইটে ‘বর’ সংক্রান্ত আলোচনার বসবাস ছিল কানাঘুষোয় আর ফিস্ফিসানিতে; বছর তিনেক পেরোতে না পেরোতেই সে সব আড্ডা ‘রে রে’ করে ফ্রন্ট পেজে এসে পড়লো। টিউশনের খাতা দেওয়া-নেওয়ার গল্পগুলোই তখন হল মুখ্য সমাচার! অনেকেই সগৌরবে প্রেমে পড়ার খবর দিল, দু’একজন মনের আনন্দে চকোলেটও খাওয়ালো! আর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে কোচিং সেন্টারের মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলার, যাকে দেখে ক্লাসের অনেকেই “কী ভীষওওওণ কিউউউট...!!” বলতে গিয়ে দম আটকে ফেলত, কে জানে কি করে, চূর্ণির সাইকেল জুড়ি বেঁধেছে সেই শাহনওয়াজ হুসেনের সাইকেলের সাথে। এক্কেরে অবাক হয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, শাহনওয়াজের বিদ্যেবুদ্ধির বহর, কই, নজরে তো পড়ে নি আমার সে ভাবে... ইলেভেনে একবার ফেল করে আমাদের সাথে পড়েছে যদ্দূর জানি... হ্যাঁ, সে লম্বা বটে, ফর্সাও বটে, খানিকটা ‘কিউট্’ও হয়তো... কিন্তু... চূর্ণির পছন্দ তো অন্যরকম!
একদিন আর থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলেছিলাম চূর্ণি’কে। শুনে সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, “আর বলিস না, ভালোবাসি না বলতেই ব্লেড দিয়ে হাতের পাতায় কেটে কেটে আমার নাম লিখেছে...”
-“অ্যাঁ...! সে কি রে?” আমি বরাবরই ভীতু, দৃশ্য’টা কল্পনা করেই আঁতকে উঠেছিলাম!
-“তাহলে আর বলছি কি? ‘হ্যাঁ’ বলতেই হয়েছে বাধ্য হয়ে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।
বছর দুয়েকের মধ্যে স্কুলের ব্যাকড্রপ বদলে হল কলেজ। প্রেমের ছবিও বদলালো আরো। আমি যথারীতি দর্শকের ভূমিকায়। প্র্যাক্টিকালের রীডিং আর ক্লাসনোটের খাতা থেকে মুখ তোলার সুযোগ হলেই চলমান লাভস্টোরি’গুলোর খবর নিই। ব্যাপারটা অনেকটা মেগাসিরিয়াল দ্যাখার মত। সাধারণতঃ দিন সাতেকের এপিসোড মিস করে গেলেও বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয় না।
চূর্ণি-শাহনওয়াজের কাহিনী খুব ‘প্রেডিক্টেবল টার্নিং’ নিল যখন চূর্ণি ফিলোসফি অনার্স নিয়ে আমার সাথেই কলেজে ঢুকলো আর শাহনওয়াজ দ্বিতীয়বার উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘এ তো হওয়ারই ছিল... চূর্ণির তো পছন্দ’টাই অন্যরকম!’
সুতরাং এমনটা যে হবে আমি খানিকটা আশা’ই করেছিলাম। তবে যেটা মোটেই আশা করিনি সেটা হল চূর্ণি এতজন প্রতিযোগিনীকে টেক্কা দিয়ে মিলন আগরওয়ালের ঝাঁ-চকচকে স্পোর্টস বাইকের পিছনের সিট’টা দখল করে ফেলবে! অনেক মেয়ে দুঃখ পেল, অনেকে চোখ টাটালো, সন্দেহ নেই। অনেকে অবাকও হল, কিন্তু আমি যে কারণে অবাক হলাম, সেটি ছিল সক্কলের চেয়ে আলাদা। আমার মনে মনে আশা ছিল, শাহনওয়াজের ফাঁড়া কাটানোর পর গোলগাল, চশমাপরা, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট সিনিয়র রূপক সান্যালের সাথেই বোধহয় চূর্ণি পাকাপাকিভাবে সব বন্দোবস্ত করে ফেলবে। রূপকের সাথে চূর্ণির ভাব’ও খুব... বই নেওয়া, খাতা নেওয়া… তবে? মিলন কোত্থেকে ঢুকে পড়ে মাঝখান থেকে?
কৌতূহলের তাড়নায় একদিন চূর্ণিকে পাকড়াও করা গেল। সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো, “মাইরি! সব্বাই ভাবছে ভাবুক... তুইও?!”
ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম, “ম্ম্... মানে?”
-“মধু, উই আর জাস্ট গুড ফ্রেন্ডস্... মি অ্যান্ড মিলন... দু’দিন আমাকে বাসস্টপে কি ড্রপ করেছে, সব্বাই ভাবছে যেন... ... এরকম কিচ্ছু নয়”, শেষ শব্দক’টায় বাড়তি জোর দিয়ে বলল চূর্ণি, “আর আমি এনগেজ হলে তোকে বলবো না মধু? আশ্চর্য্য, তুই তো জানিস আমার কেমন ছেলে পছন্দ...”
মনে মনে বলেছিলাম, “জানি হে জানি, রূপক সান্যাল”, মুখে কিছু বলিনি, হেসেছিলাম খালি।
কলেজের পর খাপছাড়া অরকুট-চিরকুট ছাড়া চূর্ণির সাথে যোগাযোগ তেমন ছিল না। তারপর একদিন হঠাত্ ই-মেলে ওর বিয়ের চিঠি পেলাম। মন’টা ভালো হয়ে গেল যখন শুনলাম ছেলে সেরা কলেজের ইঞ্জিনিয়ার, সেরা সরকারি সংস্থার উঁচুপদে ভালো চাকরি করে। রূপক সান্যালের নাম’টা মনে পড়ে হাসি পেল খানিকটা; যাক গে, সে না হোক, মনের মত ছেলে পেয়েছে শেষ অব্দি চূর্ণি।
বহুদিন বাদে শহরে ফেরা, তাও বন্ধুর বিয়েতে। স্কুল কলেজের বন্ধুদের সাথে দ্যাখা, রাতজাগা, ধুন্ধুমার আনন্দ- খুনসুটি-ছেলেমানুষি ঠাট্টায় আর আড্ডায় সন্ধ্যেটা চমত্কার কাটলো। চূর্ণিকে দারুণ দেখাচ্ছিল মেরুন বেনারসী’তে। একটা অদ্ভূত আলগা-বিষন্নতা, আলগা-কৌতূহলে, খানিক ক্লান্তি, খানিক টেনশনে আর কনের সাজে মিশ খেয়েছিল বেশ। মনে হচ্ছিল, সে রকম কোনো ফোটোগ্রাফার থাকলে চিরকালীন-বাঙালী-বধূ’র কনসেপ্টে কয়েকটা দূর্দান্ত ছবি তুলতে পারতো!
বিয়ের আসরও ভালো করেই মিটলো। তবে বন্ধুদের অনেকেই যে ঠোঁট টিপে হাসছিল, তা খেয়াল করলাম। খারাপ লাগলো। হ্যাঁ, মানছি, চূর্ণির বর তেমন রাজপুত্তুরটির মত দেখতে হয় নি। গায়ের রঙ হয়তঃ বা একটু বেশিই কালো, মাথার চুল না হয় একটু বেশিই পাতলা, চোখের চশমার কাঁচ না হয় একটু বেশিই পুরু... কিন্তু তাতে কি? চূর্ণির পছন্দ’টা তো অন্যরকম বরাবরই... সব্বাই জানে সেটা।
আজ ফিরছি আমার প্রাণের শহর ছেড়ে আমার কাজের শহরে। চূর্ণির ছোঁয়া লেগে থাকা স্মৃতিগুলো তাই একসাথে মনে আসছে কোলাজের মত। খুব ভালো লাগছিল ভেবে... ওই শাহনওয়াজ, ওই মিলন আগরওয়াল... কোনোভাবেই ওরা চূর্ণির মনোমত ছিল না। সুন্দরী মেয়ে মানেই কি তার ‘সুন্দর বর চাই’ হতে হবে না কি? ভালো লাগছিল, ওর ওই ক্লাস এইট থেকে চলে আসা ধারালো, স্মার্ট, হবু-বরের সংজ্ঞা’টার শেষ অব্দি মানরক্ষা হল বলে। মনে পড়ে গেল, বিয়ের চিঠি পেয়ে যেদিন ওকে ফোন করেছিলাম চূর্ণিকে, হাসতে হাসতে বলেছিল, “বিদ্যে-বুদ্ধি, চাকরি-বাকরির কথাটা যদি বাদ’ও দিই, মানুষটাও কিন্তু খুব ভালো, জানিস তো?”
আমিও হাসিমুখে বলেছিলাম, “কেমন এক্স্যাক্টলি মিলে গেছে... বল্?”
ভেবে ভালো লাগলো আবার; আর তখুনি একটা অদ্ভূত ব্যাপারও মনে পড়ে গেল। কথাক’টা শুনেই কে জানে কেন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল চূর্ণি... চুপ করাতে গেছিলাম, কিছুতেই চুপ করেই নি, কতবার জিগেস করেছিলাম, “কেন কাঁদছিস, চূর্ণি?" "কি হয়েছে?" "মন খারাপ করছে কিছু নিয়ে?”
কিচ্ছু বলে নি, কোনো কিচ্ছু বলে নি, শুধু অঝোরে কেঁদেছিল মিনিট তিনেক... তারপর হঠাত্ কান্না থামিয়ে ফেলেছিল নিজের থেকেই, থেমে থেমে বলেছিল, “সত্যি, এক্স্যাক্টলি মিলে গেল কেমন... বলা-কথা এভাবেও সত্যি হয়? ভাবতেই পারছি না জানিস... আনন্দে জল এসে গেছে চোখে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।
চূর্ণি আমার আজন্মকালের ক্লাসমেট। আমাদের ঠিক প্রিয়তম বান্ধবী বলা যায় না, তবে বয়সের হিসেবে আমাদের বন্ধুত্ব প্রায় আমাদেরই সমবয়সী। আমি চিরকালীন বইমুখো, মুখচোরা আর চূর্ণি দূর্ধর্ষ ডাকাবুকো, সুন্দরীও বটে। আর বিজ্ঞানে তো বলেই যে ‘বিপরীতে বন্ধুত্ব অবশ্যম্ভাবী...!’ আসলে সত্যি বলতে আমি ছিলাম চূর্ণির গুণপণায় মুগ্ধ। ওর বিশেষত্ব ছিল সব্বার থেকে আলাদা হয়ে থাকায়, মানে যাকে বলে অন্যরকম... ‘হট্কে!’
তখন আমরা স্কুলে। যে বয়েস’টা থেকে ছেলেদের সাইকেলগুলো ভিড় জমাতে শুরু করে গার্লস স্কুলের বাসস্টপে, সেই তেরো-চোদ্দ’র কাছাকাছি। ওইসময়টায় মেয়েদের আড্ডাতেও কিন্তু চুপিসারে ঢুকে পড়ে কিছু আপাত-সেন্সর্ড্ প্রশ্ন... “কেমন ছেলে ভালো লাগে?” “কেমন বর চাই?” “ফর্সা?” “টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম?”
পঁচিশ-ছাব্বিশ আসতে আসতে এইসব প্রশ্নের উত্তরে পালিশ পড়ে যায় প্রচুর, চোদ্দ’র সেই আনকোরা, ছিমছাম, টাটকা ভাব’টা থাকে না তখন আর। বছর এগারো বারো পেরিয়েও কারো উত্তর একতারার মত একসুরে বাজে চিরকাল, কারো উত্তর মাঝপথে আঘাত খেয়ে বিপ্রতীপ হয়ে দাঁড়ায় হঠাত্ কখনো, কারো উত্তরে আবার বয়েসের ছাপ পড়ে; ছেলেমানুষী কাটিয়ে ‘ম্যাচিউওর্ড্’ হয় সেগুলো। খুব হাতেগোনা কেউ কেউ এরকমও থাকে যাদের উত্তর’টা প্রথমদিন থেকেই পাকাপোক্ত, তাদের ম্যাচিউরিটির আর কিছু বাকি নেই! চূর্ণি ছিল এরকম একজন। প্রেমবিষয়ে তার এ’সব চোস্ত উত্তরের সৃষ্টিরহস্য কোনোকালেই আবিষ্কার করে উঠতে পারিনি বলেই বোধহয় ওর প্রতি মুগ্ধতা’টাও কাটিয়ে উঠতে পারিনি কখনও। স্কুল কিম্বা কলেজ, চিরকাল ওর “কেমন বর চাই” এর উত্তর ছিল ঝরঝরে, চাঁচাছোলা আর সাঙ্ঘাতিক ‘ম্যাচিউওর্ড্’, “ওসব লম্বা, ফর্সা, কোঁকড়ানো চুল নিয়ে কি চলবে সারাজীবন? চিরদিন থাকবে নাকি ওসব? আমি তো বলবো আমার বর কালো হোক, ভূঁড়িওয়ালা হোক, একমাথা টাক হোক... এমন হোক যাতে তোদের কারোর পছন্দ না হয়... কিছু পেটে কিছু বিদ্যে থাক, বুদ্ধি থাক কিছু ঘটে, একটা ঠিকঠাক চাকরি আর একটা ভালো মন... ব্যাস, আর কিচ্ছু চাই না!” ক্লাস এইটে ওর এইসব ধারালো জবাব শুনে শুধু আমি নই (আমি তো না হয় ক্লাসের চিরকালীন শ্রীমতি হাঁদাগঙ্গারাম) অনেক চোখা-বাক্যবাগীশও বেশ খানিকটা থমকে যেত বই কি!
সেভেন-এইটে ‘বর’ সংক্রান্ত আলোচনার বসবাস ছিল কানাঘুষোয় আর ফিস্ফিসানিতে; বছর তিনেক পেরোতে না পেরোতেই সে সব আড্ডা ‘রে রে’ করে ফ্রন্ট পেজে এসে পড়লো। টিউশনের খাতা দেওয়া-নেওয়ার গল্পগুলোই তখন হল মুখ্য সমাচার! অনেকেই সগৌরবে প্রেমে পড়ার খবর দিল, দু’একজন মনের আনন্দে চকোলেটও খাওয়ালো! আর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে কোচিং সেন্টারের মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলার, যাকে দেখে ক্লাসের অনেকেই “কী ভীষওওওণ কিউউউট...!!” বলতে গিয়ে দম আটকে ফেলত, কে জানে কি করে, চূর্ণির সাইকেল জুড়ি বেঁধেছে সেই শাহনওয়াজ হুসেনের সাইকেলের সাথে। এক্কেরে অবাক হয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম, শাহনওয়াজের বিদ্যেবুদ্ধির বহর, কই, নজরে তো পড়ে নি আমার সে ভাবে... ইলেভেনে একবার ফেল করে আমাদের সাথে পড়েছে যদ্দূর জানি... হ্যাঁ, সে লম্বা বটে, ফর্সাও বটে, খানিকটা ‘কিউট্’ও হয়তো... কিন্তু... চূর্ণির পছন্দ তো অন্যরকম!
একদিন আর থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলেছিলাম চূর্ণি’কে। শুনে সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, “আর বলিস না, ভালোবাসি না বলতেই ব্লেড দিয়ে হাতের পাতায় কেটে কেটে আমার নাম লিখেছে...”
-“অ্যাঁ...! সে কি রে?” আমি বরাবরই ভীতু, দৃশ্য’টা কল্পনা করেই আঁতকে উঠেছিলাম!
-“তাহলে আর বলছি কি? ‘হ্যাঁ’ বলতেই হয়েছে বাধ্য হয়ে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।
বছর দুয়েকের মধ্যে স্কুলের ব্যাকড্রপ বদলে হল কলেজ। প্রেমের ছবিও বদলালো আরো। আমি যথারীতি দর্শকের ভূমিকায়। প্র্যাক্টিকালের রীডিং আর ক্লাসনোটের খাতা থেকে মুখ তোলার সুযোগ হলেই চলমান লাভস্টোরি’গুলোর খবর নিই। ব্যাপারটা অনেকটা মেগাসিরিয়াল দ্যাখার মত। সাধারণতঃ দিন সাতেকের এপিসোড মিস করে গেলেও বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয় না।
চূর্ণি-শাহনওয়াজের কাহিনী খুব ‘প্রেডিক্টেবল টার্নিং’ নিল যখন চূর্ণি ফিলোসফি অনার্স নিয়ে আমার সাথেই কলেজে ঢুকলো আর শাহনওয়াজ দ্বিতীয়বার উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘এ তো হওয়ারই ছিল... চূর্ণির তো পছন্দ’টাই অন্যরকম!’
সুতরাং এমনটা যে হবে আমি খানিকটা আশা’ই করেছিলাম। তবে যেটা মোটেই আশা করিনি সেটা হল চূর্ণি এতজন প্রতিযোগিনীকে টেক্কা দিয়ে মিলন আগরওয়ালের ঝাঁ-চকচকে স্পোর্টস বাইকের পিছনের সিট’টা দখল করে ফেলবে! অনেক মেয়ে দুঃখ পেল, অনেকে চোখ টাটালো, সন্দেহ নেই। অনেকে অবাকও হল, কিন্তু আমি যে কারণে অবাক হলাম, সেটি ছিল সক্কলের চেয়ে আলাদা। আমার মনে মনে আশা ছিল, শাহনওয়াজের ফাঁড়া কাটানোর পর গোলগাল, চশমাপরা, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট সিনিয়র রূপক সান্যালের সাথেই বোধহয় চূর্ণি পাকাপাকিভাবে সব বন্দোবস্ত করে ফেলবে। রূপকের সাথে চূর্ণির ভাব’ও খুব... বই নেওয়া, খাতা নেওয়া… তবে? মিলন কোত্থেকে ঢুকে পড়ে মাঝখান থেকে?
কৌতূহলের তাড়নায় একদিন চূর্ণিকে পাকড়াও করা গেল। সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো, “মাইরি! সব্বাই ভাবছে ভাবুক... তুইও?!”
ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম, “ম্ম্... মানে?”
-“মধু, উই আর জাস্ট গুড ফ্রেন্ডস্... মি অ্যান্ড মিলন... দু’দিন আমাকে বাসস্টপে কি ড্রপ করেছে, সব্বাই ভাবছে যেন... ... এরকম কিচ্ছু নয়”, শেষ শব্দক’টায় বাড়তি জোর দিয়ে বলল চূর্ণি, “আর আমি এনগেজ হলে তোকে বলবো না মধু? আশ্চর্য্য, তুই তো জানিস আমার কেমন ছেলে পছন্দ...”
মনে মনে বলেছিলাম, “জানি হে জানি, রূপক সান্যাল”, মুখে কিছু বলিনি, হেসেছিলাম খালি।
কলেজের পর খাপছাড়া অরকুট-চিরকুট ছাড়া চূর্ণির সাথে যোগাযোগ তেমন ছিল না। তারপর একদিন হঠাত্ ই-মেলে ওর বিয়ের চিঠি পেলাম। মন’টা ভালো হয়ে গেল যখন শুনলাম ছেলে সেরা কলেজের ইঞ্জিনিয়ার, সেরা সরকারি সংস্থার উঁচুপদে ভালো চাকরি করে। রূপক সান্যালের নাম’টা মনে পড়ে হাসি পেল খানিকটা; যাক গে, সে না হোক, মনের মত ছেলে পেয়েছে শেষ অব্দি চূর্ণি।
বহুদিন বাদে শহরে ফেরা, তাও বন্ধুর বিয়েতে। স্কুল কলেজের বন্ধুদের সাথে দ্যাখা, রাতজাগা, ধুন্ধুমার আনন্দ- খুনসুটি-ছেলেমানুষি ঠাট্টায় আর আড্ডায় সন্ধ্যেটা চমত্কার কাটলো। চূর্ণিকে দারুণ দেখাচ্ছিল মেরুন বেনারসী’তে। একটা অদ্ভূত আলগা-বিষন্নতা, আলগা-কৌতূহলে, খানিক ক্লান্তি, খানিক টেনশনে আর কনের সাজে মিশ খেয়েছিল বেশ। মনে হচ্ছিল, সে রকম কোনো ফোটোগ্রাফার থাকলে চিরকালীন-বাঙালী-বধূ’র কনসেপ্টে কয়েকটা দূর্দান্ত ছবি তুলতে পারতো!
বিয়ের আসরও ভালো করেই মিটলো। তবে বন্ধুদের অনেকেই যে ঠোঁট টিপে হাসছিল, তা খেয়াল করলাম। খারাপ লাগলো। হ্যাঁ, মানছি, চূর্ণির বর তেমন রাজপুত্তুরটির মত দেখতে হয় নি। গায়ের রঙ হয়তঃ বা একটু বেশিই কালো, মাথার চুল না হয় একটু বেশিই পাতলা, চোখের চশমার কাঁচ না হয় একটু বেশিই পুরু... কিন্তু তাতে কি? চূর্ণির পছন্দ’টা তো অন্যরকম বরাবরই... সব্বাই জানে সেটা।
আজ ফিরছি আমার প্রাণের শহর ছেড়ে আমার কাজের শহরে। চূর্ণির ছোঁয়া লেগে থাকা স্মৃতিগুলো তাই একসাথে মনে আসছে কোলাজের মত। খুব ভালো লাগছিল ভেবে... ওই শাহনওয়াজ, ওই মিলন আগরওয়াল... কোনোভাবেই ওরা চূর্ণির মনোমত ছিল না। সুন্দরী মেয়ে মানেই কি তার ‘সুন্দর বর চাই’ হতে হবে না কি? ভালো লাগছিল, ওর ওই ক্লাস এইট থেকে চলে আসা ধারালো, স্মার্ট, হবু-বরের সংজ্ঞা’টার শেষ অব্দি মানরক্ষা হল বলে। মনে পড়ে গেল, বিয়ের চিঠি পেয়ে যেদিন ওকে ফোন করেছিলাম চূর্ণিকে, হাসতে হাসতে বলেছিল, “বিদ্যে-বুদ্ধি, চাকরি-বাকরির কথাটা যদি বাদ’ও দিই, মানুষটাও কিন্তু খুব ভালো, জানিস তো?”
আমিও হাসিমুখে বলেছিলাম, “কেমন এক্স্যাক্টলি মিলে গেছে... বল্?”
ভেবে ভালো লাগলো আবার; আর তখুনি একটা অদ্ভূত ব্যাপারও মনে পড়ে গেল। কথাক’টা শুনেই কে জানে কেন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল চূর্ণি... চুপ করাতে গেছিলাম, কিছুতেই চুপ করেই নি, কতবার জিগেস করেছিলাম, “কেন কাঁদছিস, চূর্ণি?" "কি হয়েছে?" "মন খারাপ করছে কিছু নিয়ে?”
কিচ্ছু বলে নি, কোনো কিচ্ছু বলে নি, শুধু অঝোরে কেঁদেছিল মিনিট তিনেক... তারপর হঠাত্ কান্না থামিয়ে ফেলেছিল নিজের থেকেই, থেমে থেমে বলেছিল, “সত্যি, এক্স্যাক্টলি মিলে গেল কেমন... বলা-কথা এভাবেও সত্যি হয়? ভাবতেই পারছি না জানিস... আনন্দে জল এসে গেছে চোখে, বিশ্বাস কর...”
ওকে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করেছিলাম।
Tag :
এমনি গল্প,
পথচলতি / এক
By : Sayantari Ghoshতখন দিল্লীতে থাকি। চাকরির খোঁজে এদিকওদিক উঁকিঝুঁকি মারছি। এমন সময় একদিন চিঠি এসে পৌঁছালো যে গুজরাতের এক শিল্পশহরে চাকরির খোঁজ পাওয়া গেছে, ডাক পড়েছে ইন্টারভিউয়ের। তখন ক্যাম্পাসে থাকতাম; এসব জায়গায় দরখাস্ত পাঠানো হত সব বন্ধু’রা মিলে দল বেঁধে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, চিঠি এসেছে তিনজনের নামে। সবচে’ মজা হল এইটে দেখে যে আসা-যাওয়ার খরচখরচাও সব নাকি তাঁদের। থাকার ব্যবস্থাটুকু খালি নিজেদের করতে হবে! আনন্দে উত্ফুল্ল হয়ে উঠলাম। চাকরি যে সক্কলে পাবো না তা দিব্বি বোঝা গেলেও অন্যের খরচায় সদলবলে দেশভ্রমণের সুযোগ কি আর সবসময় মেলে? সাত্তাড়াতাড়ি ট্রেনে টিকিট বুক করে ফেললাম।
দিল্লী সরাই থেকে ট্রেন ছাড়ার দিন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সবাই বলে দিল্লী নাকি এম্নিতে বৃষ্টির দেশ নয়, কিন্তু এখন কলকাতায় যা বৃষ্টি হয়, তারচে’ ঢের বেশী বৃষ্টি হত দিল্লীতে তখন, এখনও হয় নিশ্চয়ই। ভূগোলের মানুষেরা তার কি কারণ দেখাবেন জানিনা, তবে ঘটনাটি শতকরা একশভাগ সত্যি। সে যা হোক গে, কোনরকমে ইন্টারভিউয়ের চিঠি আর সার্টিফিকেটের গোছাটিকে ছাতায় আড়াল করে আপাদমস্তক ভিজে ট্রেনে উঠলাম। বৃষ্টির চোটে যাত্রীদের সাথে সাথে তাদের সঙ্গে আসা যাত্রীপিছু চারজন করে আত্মীয়স্বজনও ট্রেনে উঠে পড়ায় পোরবন্দর এক্সপ্রেস পৃথিবীর সর্বাধিক ঘন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিনত হয়েছে ততক্ষণে! মানুষজনের হাতের নিচ দিয়ে, ঘাড়ের ওপর দিয়ে একহাত গলা বাড়িয়ে দিয়ে আমরা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স নিজেদের বার্থ খোঁজার চেষ্টা করছি প্রাণপণে... তখনই... পাশের লোয়ার বার্থটি থেকে এক অতি মোলায়েম আদুরে গলায় কে যেন বলে উঠল, “হুইচ্ বার্থ...?”
আমি কন্ঠস্বরের উত্সটিকে ঠিকমত খুঁজে ওঠার আগেই সিধু মরিয়ার মত চেঁচাল পিছন থেকে, “থার্টি টু টু থার্টি ফোর...!!”
“দিস ওয়ে দেন... নেক্সট টু মি...”
আমি কন্ঠস্বরের উত্সটিকে ঠিকমত খুঁজে ওঠার আগেই সিধু মরিয়ার মত চেঁচাল পিছন থেকে, “থার্টি টু টু থার্টি ফোর...!!”
“দিস ওয়ে দেন... নেক্সট টু মি...”
ফাইলপত্রদের বুকে আগলে আদুরে গলার ভদ্রলোকের পাশের বার্থে গুছিয়ে বসতে আরো মিনিট দশেক লাগল।
“থ্যাঙ্কস...” রুমাল দিয়ে চুলের জল মোছার বৃথা চেষ্টা করতে করতে মিত বলল।
“বাঙালি...?” একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন!
আমরা তো অবাক! সমস্ত বাঙালিই বাঙলার বাইরে জাতভাই দেখলে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। ট্রেন ছাড়ার আগেই দিল্লীর বৃষ্টি, আত্মীয়দের ভালোবাসা আর সুটকেসে চেন লাগিয়ে রাখা নিয়ে আড্ডা শুরু হয়ে গেল।
“থ্যাঙ্কস...” রুমাল দিয়ে চুলের জল মোছার বৃথা চেষ্টা করতে করতে মিত বলল।
“বাঙালি...?” একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন!
আমরা তো অবাক! সমস্ত বাঙালিই বাঙলার বাইরে জাতভাই দেখলে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। ট্রেন ছাড়ার আগেই দিল্লীর বৃষ্টি, আত্মীয়দের ভালোবাসা আর সুটকেসে চেন লাগিয়ে রাখা নিয়ে আড্ডা শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু ট্রেন ছাড়ার পর, ব্যাপারটা ঠিক অত সহজ রইল না আর। একঘন্টার মধ্যে আমরা বেশ বুঝতে পারলাম যে এই ভদ্রলোকের সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলার মত ক্ষমতায় পৌঁছাতে আমাদের অন্ততঃ সাড়ে পাঁচবছর একনিষ্ঠভাবে চেষ্টা করতে হবে!! ভদ্রলোকের নাম গোপাল বাগচি, থাকেন বেরসরাইয়ের কাছে, বইয়ের দোকান আছে, তাঁর দুই মেয়ে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গোয়ালিয়রে, কিন্তু তিনি যাচ্ছেন আমেদাবাদে... কেন? কারণ আহমেদাবাদে তাঁর দিদির বাড়ি, দিদির মেয়ের এইবারে বিয়ে দেওয়া উচিত, সেজন্যে সে স্পোকেন ইংলিশের কোর্স করছে, ইংরেজি ভাষাটাকে আমাদের দেশে অতিরিক্ত পাত্তা দেওয়া হয়, দেশের ভবিষ্যত্ একেবারেই সুবিধের নয় ইত্যাদি এবং প্রভৃতি এবং ইত্যাদি... ভয় পাওয়ার মত কথা হল যে এই প্রতিটি ব্যাপার নিয়ে বেশ বিস্তারিতভাবেই বলতে উনি ঘন্টাখানেকের কিছু বেশি সময় নিয়েছিলেন! ভদ্রলোক অন্ততঃ জাপানিজ বুলেট ট্রেনের গতিবেগে কথা বলতে পারেন, শব্দের তীব্রতা ১০০ ডেসিবেলের কাছাকাছি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল যে এত শক্তিব্যয়েও উনি মোট্টেই ক্লান্ত হন না, বরং এই কাজটিকে দিব্বি উপভোগ করেন!
ফলতঃ দুপুরনাগাদ আমরা যখন যে যার বার্থে কোনোরকমে একটু ঘুমিয়ে কানদুটিকে রেহাই দেওয়ার কথা ভাবছি তখন “রাত্তিরে নামা কিন্তু... রাত’টা বরং আজ আমরা আড্ডা মেরেই পার করে দেবো, কি বল?” এই প্রস্তাব শুনে আমার অন্ততঃ বুকের ভেতর অব্দি কেঁপে গেছিল স্বীকার করতে আপত্তি নেই! ততক্ষণে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেছে যে ইন্টারভিউয়ের একটি প্রশ্নও আমি আর শুনতে পাবোনা আর শুনতে পেলেও তার উত্তর দিতে গিয়ে হয়তঃ গোপালবাবুর কাজের লোক বা পড়শির নিন্দে করে ফেলব!
টাইমটেবিল বলছে আমাদের স্টেশন আসবে সাড়ে বারোটায়, আর রাত দুটোয় ট্রেন আহমেদাবাদ পৌঁছানোর কথা। কিন্তু ইতিমধ্যে ট্রেন প্রায় ঘন্টাদেড়েক লেট করে গেছে। ঘুমানো একটু যেত, কিন্তু গোপালবাবু দায়িত্ব নিয়ে আমাদের পৌনে বারোটায় উঠিয়ে দিলেন। আমরা থম মেরে বসে আছি পাশাপাশি, ঘুম ভালো কাটেনি, তখন হঠাত বলে উঠলেন, “আহমেদাবাদে তো আমি মাঝেমধ্যেই যাতায়াত করি, আমার এক-দুটো চেনা হোটেল আছে, তোমরা বরং আহমেদাবাদ'ই চল, এই তো সোয়া ঘন্টার রাস্তা... ওখানে তোমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবো বরং... আমার দিদির বাড়ির কাছাকাছিই কত হোটেল...! তোমরা তো দু’দিন থাকবে বলছ... এইটুকুনি রাস্তা এসে ইন্টারভিউ দিয়ে যাবে না হয়... আহমেদাবাদে থাকলে দেখাসাক্ষাত্ হবে আবার... দিদির বাড়িতে বসে জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে...”
‘আড্ডা’ শব্দ’টা শুনলেই তখন মাথা ঘুরে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন সাঙ্ঘাতিক লো-প্রেসার হয়ে গেছে! ইনারশিয়ার বশে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “না না...”
মিত আমার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “না... মানে আমাদের বুকিং হয়ে গেছে... আমরা... মানে...”
“বুকিং করেই এসেছি আমরা... হ্যাঁ...” মিথ্যে কথাটায় বেমালুম সায় দিল সিধু। এই ব্যাপারটায় আমরা এককাট্টা দেখে মন’টা ভালো হয়ে গেল। আসলে সবাই নিজের কানদুটিকে ভালোবাসে...
মিত আমার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “না... মানে আমাদের বুকিং হয়ে গেছে... আমরা... মানে...”
“বুকিং করেই এসেছি আমরা... হ্যাঁ...” মিথ্যে কথাটায় বেমালুম সায় দিল সিধু। এই ব্যাপারটায় আমরা এককাট্টা দেখে মন’টা ভালো হয়ে গেল। আসলে সবাই নিজের কানদুটিকে ভালোবাসে...
গোপালবাবু আড্ডার সম্ভাবনা ভেস্তে যাওয়ায় দুঃখ পেলেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের তো হাত পা (কান?) বাঁধা... তাই স্টেশনে নেমে গোপালবাবুকে ‘বাই বাই’ করে আমরা নিঝ্ঝুম স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ধরে পা বাড়ালাম। তখন ভোররাত, মিটমিটে আলো দপদপ করছে প্ল্যাটফর্মে, দোকানগুলোর সব ঝাঁপ বন্ধ, হালকা শীতের আমেজে জড়সড় হয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে কয়েকটা কুকুর, কোনো মানুষের হদিস কোথাও নেই।
স্টেশনচত্বরেই আমাদের তিনজনের ব্যাগগুলোকে জড়ো করা হল এক জায়গায়... আমাদের ইন্টারভিউ দুপুর একটায়, ইচ্ছে ছিল হোটেলে উঠে একরাউন্ড ঘুম দিয়ে বেরিয়ে পড়ব... ঠিক হল সিধু মালপত্র পাহারা দেবে, আর আমি মিতের সাথে যাবো হোটেলের খোঁজে। সিধুর টাকাপয়সার ব্যাপারে খুঁতখুঁতুনিটা পুরোনো। সে পইপই করে বলে দিল যে দালালের খপ্পরে পড়া চলবে না কোনোমতে, তাতে হোটেলে ডবল ভাড়া লেগে যাবে!!
আমার এসব ব্যাপারে অনেক অভিজ্ঞতা... প্রচুর বেড়িয়েছি বাড়ির সবাইকে নিয়ে... চারটে বেজে গেছে দেখে আমরা দুইমূর্তি আত্মবিশ্বাসী পা রাখলাম স্টেশনের বাইরে। হোটেল ঠিক করে আধঘন্টার ভেতর ফিরব, সিধুকে এই আশ্বাস দিয়ে গেলাম যাবার আগে।
আমার এসব ব্যাপারে অনেক অভিজ্ঞতা... প্রচুর বেড়িয়েছি বাড়ির সবাইকে নিয়ে... চারটে বেজে গেছে দেখে আমরা দুইমূর্তি আত্মবিশ্বাসী পা রাখলাম স্টেশনের বাইরে। হোটেল ঠিক করে আধঘন্টার ভেতর ফিরব, সিধুকে এই আশ্বাস দিয়ে গেলাম যাবার আগে।
আমি ভুল ভাবিনি। হোটেল ঠিক করার অভিজ্ঞতা আমার কম না। কিন্তু এবারটায় কে জানে কেমন সব গোলমাল হয়ে গেল! যে হোটেলেই গিয়ে আমি আর মিত জিগেস করতে যাই, “রুম আছে নাকি দাদা...?” দেখি যে তারা ভয়ানক সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়... আমাদের আপাদমস্তক দেখে এবং গম্ভীরভাবে মাথা নিচু করে ঘাড় নেড়ে দেয়... এক জায়গায় এক বয়স্ক হোটেলমালিক তো আরেককাঠি ওপরে উঠে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে গুজরাটিতে চেঁচামেচি (গালাগালিও হতে পারে) করতে লাগলেন... মনে হল হাতের কাছে সের’ম কিছু পেলে ছুঁড়ে মারতেও বাধতো না ওনার...
মুশকিল’টা হয়েছিল অন্য জায়গায়। আমি হোটেল ঠিক করেছি দিনের বেলায়, ভদ্রস্থ সময়ে, বোন কিম্বা বাবার সাথে গিয়ে... বর্তমান পরিস্থিতি যে তারচে’ কত আলাদা সে আর ভাবিনি... ভোর চারটে বাজে... কিন্তু জায়গাটা তো গুজরাত...! আলো ফোটেইনি প্রায়... স্টেশনের বাইরেটা এম্নিতেই যথেষ্ট ঘিঞ্জি... খুপরি খুপরি ছোট ছোট দোকান... ফুটপাথে ছড়ানো গৃহস্থালি... আমাদের শিয়ালদার আশপাশের মত কতক’টা... তখনও রাতের স্ট্রিটলাইট জ্বলছে... রাস্তায় এখানে সেখানে সারাদিন সারারাতের ধকলে ক্লান্ত মাতাল রিক্সাওয়ালা আর কুলিরা মনমৌজি হয়ে গান ধরেছে... হোটেলওয়ালারাও ব্যাতিক্রম না... তারা হয় ঘুমন্ত, না হয় রাতজাগা... পরে সিধু বলেছিল, যে এই রকম পরিস্থিতিতে মালপত্রহীন দুটি ছেলেমেয়ে'কে হোটেলের খোঁজ করতে দেখে অজস্র গোলমেলে কথা ভাবার অগাধ সুযোগ ছিল (ও আসলে যে শব্দ’টা বলেছিল সেটা হল ‘রসালো’, আরো অনেককিছুই বলেছিল সে’সব আমি আর লিখলুম না)...
হোটেল পেতে পেতে সেদিন ঘন্টাদুয়েক লেগেছিল প্রায়। শেষ অব্দি আমাদের জে.এন.ইউএর আই-কার্ড আর ইণ্টারভিউএর চিঠি নিয়ে হোটেলের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়েছিল, মনে আছে। আর ততক্ষণে সিধুর ‘প্রাণের ধন’ দালালের দল ওর কানের কাছে শ'খানেক হোটেলের খবর আর ভাড়ার ফিরিস্তি শুনিয়ে গেছে। দালালবিদ্বেষের চূড়ান্ত প্রমাণ রেখে সে হতচ্ছাড়া একবারও আমাদের ফোন করে ডাকেনি... আর আমরা পাগলের মত হোটেলমালিকদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে আমরা ‘খালি’ ইন্টারভিউ দিতেই এসেছি...
সত্যি বলতে কি, সেইসময়টাতে গোপালবাবুকে খুব মিস করছিলাম... মনে হচ্ছিল, ভদ্রলোকের চেনা হোটেলে গেলে মন্দ হত না, তাই না...? এতক্ষণে বেশ আরাম করে ঘুমিয়ে পড়তাম... আর বিকেলে, ইন্টারভিউ থেকে ফিরে... আড্ডা...?
Tag :
পথচলতি গল্প,
ফ্রুটকেক
By : Sayantari Ghoshখচখচানি’টার শুরু সেই পরশু দিন... অর্থাত তেইশ তারিখ।
তেইশ তারিখ সন্ধ্যেবেলা যখন অফিস থেকে বেরোলাম পার্কস্ট্রিট যাবো বলে তখনও কেক কেনার ব্যাপার’টা “আজ সন্ধ্যের কাজ”এর লিস্টে জ্বলজ্বল করছে মাথার ভেতরে। অথচঃ ঘন্টাদুয়েক মিতের সাথে বকবক করে তিনবার পার্কস্ট্রিট চক্কর দেওয়ার পর হিজিবিজি ভাবতে ভাবতে যখন মেট্রোয় উঠে পড়লাম, তখন ফ্রুটকেক চাপা পড়ে গেছে দেশ ও জাতির উন্নতি ও পিছিয়ে পড়া বিষয়ক সুদীর্ঘ আলোচনার নিচে!
পরদিন বাড়ি ফেরা! ভাবলুম পার্কস্ট্রিট হল না, কিছু একটা অফিসের পাশ থেকেই কিনে নেবো, ট্রেন ধরার তাড়াহুড়োয় সেটায় ভুলে গেলাম বেমালুম। সন্ধ্যে রাত্তিরে যখন বাড়ি ঢুকছি, মন খারাপ হয়ে গেল এক্কেবারে! এত করে ভেবে রেখেও বড়দিনের আগে একটা কেক আনতে পারলাম না!? মার্কামারা স্মৃতিশক্তি বটে!!
যা হোক গে, আমি ভুললেও মা ভুলে যায় নি মোটেই! এখন আমি আর বোন দু’জনেই হপ্তাবাবু হয়ে গেছি, মাসে বা সেমেস্টারে বাড়ি ফেরে যারা হপ্তাবাবু’দের দর তাদের থেকে কম যদিও, তবু মা উইকএন্ড উত্সবগুলো’কে চট করে মিস করেন না। দেখলাম, চার-পাঁচ রকমের বিভিন্ন স্বাদের কেক জড়ো করা হয়েছে বাজার ঘুরে। নানারকম রঙিন বাক্স, জড়ির ফিতে... বাড়ি ঢুকেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম একরকম!গপাগপ মুখে পুরে ফেললাম অনেকখানি। কিন্তু কেমন যেন একটা খচখচানি... কে জানে কেন, মনে হল, “কি যেন নেই-নেই... কেমন ”... সে’কথা আর মা’কে বললাম না!
পরদিন বোনের সাথে বাজার বেরিয়েছি। আরো কতগুলো “দ্য রিয়েল ফ্রুটকেক” ইত্যাদি লেখা, নামী কোম্পানীর সিল-মারা বাক্স কিনে বাড়ি ফিরলাম! মা চোখ পাকালেন, আমি অপরাধীর মত মুখ করে নতুন আনা বাক্সগুলো থেকে কোণা ভেঙ্গে মুখে দিলাম...
দুত্তেরি!! এ কি রে বাবা? রিয়েল ফ্রুটকেক?! রাশি রাশি টাকা নিলে এরজন্যে?! মাথা গরম হয়ে গেল!
বোন সেই কেক দু'খানা ঝপাঝপ সাবাড় করে ঘোষনা করল যে আমার কেকটেস্টিং’এর কাজ ছেড়ে ইমিডিয়েটলি তেলেভাজায় শিফট করা উচিত, আমার কিছু একটা সিভিয়ার প্রবলেম হয়েছে!
মন খারাপ করে বেরিয়ে পড়লাম। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে, আমাদের পাড়ার মোড় থেকে মিশনারি গার্লস স্কুলের চার্চ’টা দ্যাখা যায়, ইচ্ছে করলো ও’দিক থেকে ঘুরে আসি। গলি’র মুখের স্ট্রিটলাইট’টা ক’দিন থেকে খালি দপদপ করছে... আলোছায়া, ছায়া আলো... আমি কিছু একটা ভাবছিলাম, তবে খুব নিটোল কিছু নয়, অন্যমনস্ক’ই ছিলাম হয়তঃ... হঠাত একটা আচমকা ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ শব্দ শুনে বিচ্ছিরি রকম চমকে গেলাম! তাকিয়ে দেখি, আমাদের নয়ন পাউরুটিওয়ালা।
নয়ন পাউরুটিওয়ালার খালি নাম বললে পুরো’টা বলা হয় না। ওর সাথে আমার আলাপ তখন, যখন আমি ক্লাস ওয়ান। তখন এই পাড়া’টা নতুন, আমাদের বাড়ি’টা নতুন; পাউরুটিওয়ালার ঠেলাগাড়িটাও নতুন ছিল তখন। আমি আর বোন তখন একই রকম ফ্রক পরতাম দু’সাইজ ছোট-বড়। স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির সামনের খোলা চত্ত্বর’টায় ছোঁয়াছুয়ি... কুমীরডাঙা... তখন পাউরুটিওয়ালা আসতো। আমাদের প্রতিদিনের টিফিনের বরাদ্দ পাউরুটি নেওয়া হত তার কাছ থেকে। বাপি স্কুল থেকে ফিরে তিন টাকা রেখে দিত টি.ভি.’র টেবিলে। পাউরুটিওয়ালা ডোরবেল বাজালেই আমি আর বোন ছুট ছুট! কে আগে টাকা নিতে পারে, কে আগে দাম দিতে পারে, কারণ আড়াই টাকার পাউরুটি’র পর বাকি আট আনার প্রজাপতি বিস্কুট বা কাপ কেক প্রাথমিকভাবে তার পাওনা হত। সে দয়া করে অন্যজন’কে দিতে পারে (দয়া অবশ্য রোজ’ই করা হত, পরেরদিন যে কেউ জিততে পারে সেইটে মাথায় রেখে)! নয়ন পাউরুটিওয়ালা হাসতো আমাদের দেখে। ছোটখাটো চেহারা লোকটা’র, ভেবে অবাক লাগতো কি ভাবে ওই একটা গাড়ি ঠেলে ঠেলে গোটা শহর চক্কর মারে সে! জিগেস করতাম মাঝে মাঝে,
“তোমার খিদে পায় না? এত যে হাঁটো?”
“পাবে না কেন? তখন খেয়ে নি!”
“কি খাও? পাউরুটি? কেক?”
“না না!!” হো হো করে হাসতো নয়ন পাউরুটিওয়ালা, “ভাত খাই, দোকানে গিয়ে...”
“এত কেক থাকতেও ভাত খাও?”
“ওটা তো বেচার কেক, খেলে হবে?”
….
“আচ্ছা, তুমি চান করলে কোথায়?”
“পুকুরে!”
“জামা কই? গামছা কই?”
“গাড়ির ভেতর বাক্স আছে, তাতে জামা আছে, গামছা আছে, তেল সাবান সব আছে...”
“কোন পুকুরটার চান করো? সরকার কাকুদের পুকুরে?”
“ওখানে আমায় ঢুকতেই দিবে না...”
“ও... তাহলে?”
“কত পুকুর আছে...”
পাউরুটির দাম আড়াই থেকে তিন, সাড়ে তিন, চার, সাড়ে চার, পাঁচ, ছয়, সাত হয়ে গেল। আমিও পাউরুটিওয়ালার থেকে অনেক ছোট থেকে তার সমান হয়ে তার চেয়েও লম্বা হয়ে গেলাম! প্রথমে যখন পাউরুটিওয়ালা আসত আমরা কুমীরডাঙা খেলতাম... তারপর খেলতাম ব্যাডমিন্টন... তারপর কলেজ থেকে ফেরার পথে শুনতাম ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ অন্য পাড়ায় পাউরুটিওয়ালার গাড়ি ঘুরছে। আমি তখন ক্যান্টিনে লাঞ্চ করি, বোন কলকাতায় চলে এসেছে, টিফিনে আর আমাদের বাড়িতে পাউরুটি খায় না কেউ।
লোকটার সাথে আমার পরিচয় বছর পনেরো’র। অবাক লাগতো ভেবে যে ওর নামটাও জানতাম না! নয়ন পাউরুটিওয়ালার নাম’টা হল বেকারির নাম... নয়ন বেকারি... পাউরুটিওয়ালার নাম’টা মো্টেই জানতাম না। ওর ব্যাপারে ব্যাক্তিগত খবর জানতাম দু’টো। এক, লোকটা মুসলমান, ঈদ আর মুহাররমে আসতো না, ঈদের আগের দিন “আমি তো কাল আসবো না” বলে দুটো পাউরুটি দিয়ে যেত... আর দুই, লোকটার একটা মেয়ে ছিল, আমাদের চেয়ে অনেক ছোট, তার জন্যে আমাদের পুরোনো বই, পুরোনো সোয়েটার মা দিত ওকে মাঝে মাঝে, দেখেছি। আর কিছু জানতাম না ওর ব্যাপারে, আর কে জানে কেন, জানার তাগিদও অনুভব করিনি কখনও...
আলোআঁধারির ভেতর হঠাত সেই খুব চেনা ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ শুনে নস্টালজিয়ায় ভেসে গেছিলাম ক’টা মুহুর্ত, নয়ন পাউরুটিওয়ালা একগাল হেসে বলল, “ভালো আছো? তোমাকে তো দেখিইনা আজকাল... অনেক দিন দেখি না...”
আমিও হাসলাম, “হ্যাঁ, এখন কলকাতা চলে গেছি গো... বছরতিনেক হল... চাকরি... তুমি ভালো আছো?”
হেসে ঘাড় হেলালো নয়ন পাউরুটিওয়ালা, ভালো আছে। আলো দপদপ করছে যদিও, তবু মনে হল যেন অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছে এক ঝটকায়, হয়তঃ অনেকদিন দেখিনি, তাই এরকম লাগছে... হতে পারে...
“কেক নেবে? বড়দিনের ভালো ফ্রুটকেক আছে...” জিগেস করল ও।
“দাও”, কতকটা ভদ্রতা রাখতেই বললাম... তেইশ তারিখ থেকে পাগলামি করে চলা খচখচানি’টা আবার হাত গোটাল যেন... কেক নিয়ে যা কান্ড চলছে কাল থেকে... নেব আবার?!
“ছোট একটা দাও...” যোগ করে দিলাম আমি।
“ছোট নেবে? বোন, মা... সবার হবে ছোট’তে?... এইটা নাও...” আমার হয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সে, “এটা ভালো হবে...”
দাম দিতে দিতে বললাম, “তোমার মেয়ে কেমন আছে?” এখন তো আর ছোটবেলার সেই অর্থহীন প্রশ্নগুলো করতে পারি না, তাই সামান্য যে ব্যাক্তিগত অংশটুকু তার জানি, তার থেকেই আদ্ধেকটা সম্বল করে জিগেস করলাম, “ভালো?”
একগাল হাসল নয়ন পাউরুটিওয়ালা, “ভালো আছে... ওকে বারাসতের কাছে একটা ইস্কুলে দিলাম, মাসে ন’শো টাকা লাগে, থাকা, খাওয়া, পড়া, টিউশনি... ইলেবেনে উঠলো তো... ভালো পাশ করেছে আগের বার...”
“বাহ্!!” আমিও হাসলাম, “ভালো হবে, দেখো...”
ঘাড় হেলিয়ে আরেকবার হেসে হাঁটা লাগালো লোকটা। মোড় ঘুরে গেল গাড়ি। খানিকবাদে শোনা গেল একবার, ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’
গার্লস স্কুলের দিকে আর গেলাম না। উলটো পথ ধরলাম বাড়ি ফেরার। নানারকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ডোরবেল বাজালাম। দরজা খুলেই আঁতকে উঠল বোন, “আবাআআআর...!?!”
বুঝলাম, হাতে কেকের বাক্স, ও নিঃসন্দেহে আমায় পাগল ভাবছে। কি আর বলবো! বিড়বিড় করে বললাম, “নয়ন পাউরুটিওয়ালা ধরিয়ে দিল...”
বোন গজগজ করে বলল, “কিনছো কেনো, তু্মি খাবে সব...!”
তুই থেকে তুমি... মানে বোন সিরিয়াস!
আর কথা বাড়ালাম না। পড়ার টেবিলে বসলাম বই খুলে। ঝামেলার সময় এটাই আমার বাড়ির যাকে বলে 'সেফেস্ট কর্ণার', আমার একুশ বছরের অভিজ্ঞতা তাই বলে!
খানিক বাদে মা “জলখাবার!” বলে ঠকাস করে এক ডিশ ভর্তি আমার সদ্য কেনা কেকের টুকরো রেখে গেল। আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে বলতে একটুকরো কেক মুখে ঢুকিয়েছি আর...
আর... কিছু বলতেই ইচ্ছে করল না! আমেজে চোখ বুজে এল যেন! আরেকখানা টুকরো মুখে ঢোকালাম তক্ষুনি... আহা...
মুখে যা ঢুকিয়েছি সেটা হল একটা টিপিক্যাল ফ্রুটকেক... সেটা প্রাথমিকভাবে একটা হলদেটে প্যাকেটে মোড়ানো ছিল, ‘নয়ন বেকারি’ লেখা একটা কাগজ প্যাকেটের গায়ে সাঁটা ছিল... কেকের ওপরটা শক্ত শক্ত, ভেতরে কালো কালো কিসমিস, বড় বড় মোরব্বা, একখানা কাজু আর খুব কপাল ভালো থাকলে নিচের কোণার দিকে আধখানা চেরি পাওয়া গেলেও যেতে পারে। কিন্তু সেই মূহুর্তে সেটা আমার কাছে অমৃতের বাড়া মনে হল আর প্যারালেলি মনে হল, এতক্ষণে ক্রিসমাস’টা বেশ ‘মেরি’ ক্রিসমাস হল!
Tag :
প্রতিদিনের গল্প,
মৌন দিয়ে ছোঁয়া / দুই
By : Sayantari Ghosh
অপব্যয়
এখনও কাগজ দিয়ে যায়নি...!
অন্যদিন হলে এক্ষুনি মেজাজটা খিঁচড়ে যেত দীপ্তাভ'র... কিন্তু আজ কিছু হল না... এম্নিই... অকারণে... আজ যেন কাগজ না দেখলেও চলে... দুনিয়ার খবরাখবর না জানলেও... অকারণে... অকারণে আজ ছুটি নেওয়া যায়...
অন্যদিন হলে এক্ষুনি মেজাজটা খিঁচড়ে যেত দীপ্তাভ'র... কিন্তু আজ কিছু হল না... এম্নিই... অকারণে... আজ যেন কাগজ না দেখলেও চলে... দুনিয়ার খবরাখবর না জানলেও... অকারণে... অকারণে আজ ছুটি নেওয়া যায়...
এখুনি করা চা কাপে ঢেলে নিয়ে ব্যালকনিতে চলে এল ও... পাঁচতলার ওপর থেকে খুব বেপরোয়া লাগে নিচের রাস্তাটাকে... এটা চিরকালই লাগে ওর... এই ফ্ল্যাটে আসা থেকে... নিচের রাস্তাটা যেন সারাক্ষণ “আয় আয়” করে ডাকে... ঝাঁপিয়ে কোলে চলে আসতে বলে... আজও বলছে...আরও যেন বেশি করে বলছে... ভোরটা আজকে কেমন যেন অন্যরকম... ঝিম্ম্ ধরানো... ভোর বলে মনেই হয়না... যেন এখনও অনেএএক দেরি রাত্তিরের ঘুম ভাঙতে। ব্যালকনির বেতের চেয়ারে হিম-হিম ছোপ... কাল রাত্তিরে বৃষ্টি হয়েছে...? নাকি হবে... এখন......
চায়ের কাপের প্রথম চুমুকই জানান দিয়ে দিল, চিনি কম! ভালো... বয়স হচ্ছে না? চিনি কম খাওয়া ভালো... তনু কি ঘ্যানঘ্যান করতো এই নিয়ে...!! এলেই মিতাকে জড়িয়ে ধরে বলতো, “মণি, তেল মশলা মিষ্টি সবেতে রেস্ট্রিক্শন করে দাও দীপের... আররে বয়েস হচ্ছেনা না কি?”
একটা হাসি টুপ করে ছুঁয়ে গেল সকালের রাশভারি মেঘ সরিয়ে...
একটা হাসি টুপ করে ছুঁয়ে গেল সকালের রাশভারি মেঘ সরিয়ে...
তনু...
রীতিমত যুদ্ধ করেও কোনোদিন 'দাদা' হতে পারা যায়নি ওর... 'দীপ' হয়ে গেছে দীপ্তাভ... “ছয়মাসের বড়, তায় আবার ক্লাসমেট... দাদা কিসের রে?” বলতো তনু... বললেই রাগারাগি... হাত ধরে মোচড়... কলাবেণীতে টান..... ওদের থামাতে না পেরে দিদু সিধে গিয়ে নালিশ ঠুকতো মামিমার দপ্তরে, “আরে অ তনুর মা... তর মাইয়ার একগাসি সুল রইবো না আর... কথা সনে না মুখপুড়ি...! বলি কি করে কি অ দুইটায় মিইল্যা সারাখন?!”
রীতিমত যুদ্ধ করেও কোনোদিন 'দাদা' হতে পারা যায়নি ওর... 'দীপ' হয়ে গেছে দীপ্তাভ... “ছয়মাসের বড়, তায় আবার ক্লাসমেট... দাদা কিসের রে?” বলতো তনু... বললেই রাগারাগি... হাত ধরে মোচড়... কলাবেণীতে টান..... ওদের থামাতে না পেরে দিদু সিধে গিয়ে নালিশ ঠুকতো মামিমার দপ্তরে, “আরে অ তনুর মা... তর মাইয়ার একগাসি সুল রইবো না আর... কথা সনে না মুখপুড়ি...! বলি কি করে কি অ দুইটায় মিইল্যা সারাখন?!”
তনু...
একটা ছিমছাম একতারার সুরের মত... খালি ভালোবাসতে জানত... তার মানে আসলে তনু সঅঅব জানত..!! খুব আনন্দে আদরে ভাসিয়ে দেওয়া যায় এমন বোন হতে জানত... মনখারাপে স্বপ্ন-স্বপ্ন আলো-আলো রূপকথা হতে জানত... গোপন খবরের জাদুআয়না, বেস্টফ্রেন্ড হতে জানত... আর... আর অদ্ভূতভাবে, খুব অদ্ভূতভাবে দারুণ অন্ধকারে তনু একেবারে মায়ের মতন হয়ে যেতে জানত...
তনু খালি ভালোবাসতে জানত...
একটা ছিমছাম একতারার সুরের মত... খালি ভালোবাসতে জানত... তার মানে আসলে তনু সঅঅব জানত..!! খুব আনন্দে আদরে ভাসিয়ে দেওয়া যায় এমন বোন হতে জানত... মনখারাপে স্বপ্ন-স্বপ্ন আলো-আলো রূপকথা হতে জানত... গোপন খবরের জাদুআয়না, বেস্টফ্রেন্ড হতে জানত... আর... আর অদ্ভূতভাবে, খুব অদ্ভূতভাবে দারুণ অন্ধকারে তনু একেবারে মায়ের মতন হয়ে যেতে জানত...
তনু খালি ভালোবাসতে জানত...
হাসির গায়ে জড়িয়ে জড়িয়ে স্বর্ণলতার মত দীর্ঘশ্বাস বাড়তে লাগল...
এককণা ভরসা হতে পারেনি দীপ্তাভ... বিশ্ব ওভাবে চলে গেল... হঠাত্...
কি বলতে হয়...?? কি বলতে হত তনুকে...? ঠিক কি দিলে ভালো রাখা যেতো ওকে? সব সঅঅব গুলিয়ে গেছিল মূহুর্তে...
দেরি হয়ে গেছিল খুব ডাকতে... সে বেচারি চেয়ে চেয়ে থেকে শেষকালে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল পথ থেকে...
কি বলতে হয়...?? কি বলতে হত তনুকে...? ঠিক কি দিলে ভালো রাখা যেতো ওকে? সব সঅঅব গুলিয়ে গেছিল মূহুর্তে...
দেরি হয়ে গেছিল খুব ডাকতে... সে বেচারি চেয়ে চেয়ে থেকে শেষকালে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল পথ থেকে...
“অপব্যয়...! তোর সময়ের অপব্যয়, দীপ...! আমি একেবারে ঠিক আছি রে...”
বুকের ঠিক মাঝখানে ঠং করে কাচ ভাঙলো একটা... কাচ না, আয়না ভাঙলো... কে জানে বাইরে শোনা গেল কি না... এখানে, ওখানে, ওইখানে... ওই মেঘ-অব্দি শোনা গেল? মেঘের ওপাশে...? গেল শোনা? একটা কি যেন পাখি টেনে টেনে সুর করে কত কি অভিযোগ করতে লাগলো চোখের আড়ালে থেকে... তারপর হঠাত থেমে গেল... শব্দ নেই...... কোনো শব্দ নেই...... শব্দ বলে কিচ্ছু হয়না এ সকালে......
দীপও হতে পারেনি দীপ্তাভ...
..................................................................
..................................................................
মৌনতা অপরাধ...?
মৌনতা শাস্তি।
মৌনতা শাস্তি।
[ক্রমশঃ]
Tag :
মৌন দিয়ে ছোঁয়া,
মৌন দিয়ে ছোঁয়া... / এক
By : Sayantari Ghoshশঙ্খলতা
.....................................................
........ তারপরে মনে হল যেন ছাদ থেকে নীলকালি ঢেলে দেওয়া হল এক শিশি... পরীক্ষার হলটা তাতে গুলে গুলে একটা রাস্তা হয়ে গেল... কোন রাস্তা? চেনা... সন্দেহ নেই, কিন্তু... কোন রাস্তা... মনে পড়ছে না...
“এই! চ ফুচকা খাবি...?” চমকে পিছন ফিরল তনু...
দীপ...!
“হ্যাঁ...” মাথা নাড়ালো তনু... “কিন্তু বিশ্ব...?”
“বিশ্ব তো চলে গেছে...”
“কোথায়...?” খুব অবাক হয়ে গেল তনু, “আমায় না বলে... এভাবে চলে গেল...?”
কেমন একটা হাসলো দীপ... আর ঝুপ্সি অন্ধকার হয়ে গেল চারদিকে... শিরশিরে ছায়াগুলো নড়তে লাগল কেমন... ভয় করছে... খুব ভয়... বিশ্ব কই...? কোথায় গেল ও...?
“বিশ্ব্...!!!” খুব জোরে ডাকতে গেল তনু... কিন্তু ডাকা যাচ্ছেনা কেন??
“বিশ্ব...!!!” আবার... আবার...
দলাদলা অন্ধকার হাতড়াতে লাগল তনু... একদিন কেটে গেল যেন... একযুগ... গলা শুকিয়ে আসছে... বিশ্ব কোথায়?... ওকে ছাড়া যে এক’পা হাঁটার অভ্যেস নেই তনুর... ওকে ছাড়া...
“বিশ্ব...!!!”
“খুঁজছিলি...?” খুব চেনা একটা হাত আঙ্গুল ছোঁয়ালো কনুইয়ে...
আর পিছন ফিরতেই...
“বৌদি গো!!! দাদা আর ফিরবে না... দাদা চলে গেছে...”
এক ঝটকায় ঘুম ভেঙে গেল তনুর... চোখে লেগে আছে ওর হাত ধরে থাকা দীপের মুখটা... বুকের ভিতর তিরতির করে কাঁপছে সুমির কান্নাডোবানো চিত্কার...
স্বপ্ন...!?! স্বপ্নই তো...?
হ্যাঁ...তাই। সব দিব্বি চেনা যাচ্ছে এখন। চেনা বালিশ, চেনা বিছানার চাদর, চেনা নীল নাইটল্যাম্প... ওর খুব চেনা শোবার ঘর ঝিমাচ্ছে... জানলার কাছে রাতের হাওয়া দুলে দুলে নতুন সুর বাঁধছে উইন্ডচিমারে... পাশে তুতাই অঘোরে ঘুমাচ্ছে... মাথার কাছের টেবিলে ঘড়িটা রাত্রি দু’টোর কাছাকাছি তিনখানা কাঁটার জটিল সমস্ত হিসেব সামলাচ্ছে... আর তার পাশে ওরই দিকে তাকিয়ে সেই দুষ্টু হাসিটা হাসছে বিশ্ব... জুঁইফুলের মালাটা আজ সন্ধ্যেতেই পরানো... সাদা ফুল ওর বড্ড প্রিয় তো...! এতরাতেও, কাঁচের ফ্রেমের ওপাশের দুনিয়া থেকেও ওর চোখদুটো ঠিক তেম্নিই ঝকঝক করছে... যেন এক্ষুনি কিছু বলবে...
“কিছু বলবে?” আপন মনেই খুব চাপাস্বরে বলল তনু
ওভাবেই ওর দিকে তাকিয়ে রইল বিশ্ব...
জানলার পর্দাটা খামখেয়ালে উড়ল একবার... জুঁইয়ের জমাট গন্ধ গোল করে ঘুরে নিল খাটের চারপাশ... আর উইন্ডচিমারের সাথে খুনসুটি করে নিল হাওয়া এই ফাঁকে... রিনরিন্ রিনরিন্...
Tag :
মৌন দিয়ে ছোঁয়া,

