ফ্রুটকেক
By : Sayantari Ghoshখচখচানি’টার শুরু সেই পরশু দিন... অর্থাত তেইশ তারিখ।
তেইশ তারিখ সন্ধ্যেবেলা যখন অফিস থেকে বেরোলাম পার্কস্ট্রিট যাবো বলে তখনও কেক কেনার ব্যাপার’টা “আজ সন্ধ্যের কাজ”এর লিস্টে জ্বলজ্বল করছে মাথার ভেতরে। অথচঃ ঘন্টাদুয়েক মিতের সাথে বকবক করে তিনবার পার্কস্ট্রিট চক্কর দেওয়ার পর হিজিবিজি ভাবতে ভাবতে যখন মেট্রোয় উঠে পড়লাম, তখন ফ্রুটকেক চাপা পড়ে গেছে দেশ ও জাতির উন্নতি ও পিছিয়ে পড়া বিষয়ক সুদীর্ঘ আলোচনার নিচে!
পরদিন বাড়ি ফেরা! ভাবলুম পার্কস্ট্রিট হল না, কিছু একটা অফিসের পাশ থেকেই কিনে নেবো, ট্রেন ধরার তাড়াহুড়োয় সেটায় ভুলে গেলাম বেমালুম। সন্ধ্যে রাত্তিরে যখন বাড়ি ঢুকছি, মন খারাপ হয়ে গেল এক্কেবারে! এত করে ভেবে রেখেও বড়দিনের আগে একটা কেক আনতে পারলাম না!? মার্কামারা স্মৃতিশক্তি বটে!!
যা হোক গে, আমি ভুললেও মা ভুলে যায় নি মোটেই! এখন আমি আর বোন দু’জনেই হপ্তাবাবু হয়ে গেছি, মাসে বা সেমেস্টারে বাড়ি ফেরে যারা হপ্তাবাবু’দের দর তাদের থেকে কম যদিও, তবু মা উইকএন্ড উত্সবগুলো’কে চট করে মিস করেন না। দেখলাম, চার-পাঁচ রকমের বিভিন্ন স্বাদের কেক জড়ো করা হয়েছে বাজার ঘুরে। নানারকম রঙিন বাক্স, জড়ির ফিতে... বাড়ি ঢুকেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম একরকম!গপাগপ মুখে পুরে ফেললাম অনেকখানি। কিন্তু কেমন যেন একটা খচখচানি... কে জানে কেন, মনে হল, “কি যেন নেই-নেই... কেমন ”... সে’কথা আর মা’কে বললাম না!
পরদিন বোনের সাথে বাজার বেরিয়েছি। আরো কতগুলো “দ্য রিয়েল ফ্রুটকেক” ইত্যাদি লেখা, নামী কোম্পানীর সিল-মারা বাক্স কিনে বাড়ি ফিরলাম! মা চোখ পাকালেন, আমি অপরাধীর মত মুখ করে নতুন আনা বাক্সগুলো থেকে কোণা ভেঙ্গে মুখে দিলাম...
দুত্তেরি!! এ কি রে বাবা? রিয়েল ফ্রুটকেক?! রাশি রাশি টাকা নিলে এরজন্যে?! মাথা গরম হয়ে গেল!
বোন সেই কেক দু'খানা ঝপাঝপ সাবাড় করে ঘোষনা করল যে আমার কেকটেস্টিং’এর কাজ ছেড়ে ইমিডিয়েটলি তেলেভাজায় শিফট করা উচিত, আমার কিছু একটা সিভিয়ার প্রবলেম হয়েছে!
মন খারাপ করে বেরিয়ে পড়লাম। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে, আমাদের পাড়ার মোড় থেকে মিশনারি গার্লস স্কুলের চার্চ’টা দ্যাখা যায়, ইচ্ছে করলো ও’দিক থেকে ঘুরে আসি। গলি’র মুখের স্ট্রিটলাইট’টা ক’দিন থেকে খালি দপদপ করছে... আলোছায়া, ছায়া আলো... আমি কিছু একটা ভাবছিলাম, তবে খুব নিটোল কিছু নয়, অন্যমনস্ক’ই ছিলাম হয়তঃ... হঠাত একটা আচমকা ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ শব্দ শুনে বিচ্ছিরি রকম চমকে গেলাম! তাকিয়ে দেখি, আমাদের নয়ন পাউরুটিওয়ালা।
নয়ন পাউরুটিওয়ালার খালি নাম বললে পুরো’টা বলা হয় না। ওর সাথে আমার আলাপ তখন, যখন আমি ক্লাস ওয়ান। তখন এই পাড়া’টা নতুন, আমাদের বাড়ি’টা নতুন; পাউরুটিওয়ালার ঠেলাগাড়িটাও নতুন ছিল তখন। আমি আর বোন তখন একই রকম ফ্রক পরতাম দু’সাইজ ছোট-বড়। স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির সামনের খোলা চত্ত্বর’টায় ছোঁয়াছুয়ি... কুমীরডাঙা... তখন পাউরুটিওয়ালা আসতো। আমাদের প্রতিদিনের টিফিনের বরাদ্দ পাউরুটি নেওয়া হত তার কাছ থেকে। বাপি স্কুল থেকে ফিরে তিন টাকা রেখে দিত টি.ভি.’র টেবিলে। পাউরুটিওয়ালা ডোরবেল বাজালেই আমি আর বোন ছুট ছুট! কে আগে টাকা নিতে পারে, কে আগে দাম দিতে পারে, কারণ আড়াই টাকার পাউরুটি’র পর বাকি আট আনার প্রজাপতি বিস্কুট বা কাপ কেক প্রাথমিকভাবে তার পাওনা হত। সে দয়া করে অন্যজন’কে দিতে পারে (দয়া অবশ্য রোজ’ই করা হত, পরেরদিন যে কেউ জিততে পারে সেইটে মাথায় রেখে)! নয়ন পাউরুটিওয়ালা হাসতো আমাদের দেখে। ছোটখাটো চেহারা লোকটা’র, ভেবে অবাক লাগতো কি ভাবে ওই একটা গাড়ি ঠেলে ঠেলে গোটা শহর চক্কর মারে সে! জিগেস করতাম মাঝে মাঝে,
“তোমার খিদে পায় না? এত যে হাঁটো?”
“পাবে না কেন? তখন খেয়ে নি!”
“কি খাও? পাউরুটি? কেক?”
“না না!!” হো হো করে হাসতো নয়ন পাউরুটিওয়ালা, “ভাত খাই, দোকানে গিয়ে...”
“এত কেক থাকতেও ভাত খাও?”
“ওটা তো বেচার কেক, খেলে হবে?”
….
“আচ্ছা, তুমি চান করলে কোথায়?”
“পুকুরে!”
“জামা কই? গামছা কই?”
“গাড়ির ভেতর বাক্স আছে, তাতে জামা আছে, গামছা আছে, তেল সাবান সব আছে...”
“কোন পুকুরটার চান করো? সরকার কাকুদের পুকুরে?”
“ওখানে আমায় ঢুকতেই দিবে না...”
“ও... তাহলে?”
“কত পুকুর আছে...”
পাউরুটির দাম আড়াই থেকে তিন, সাড়ে তিন, চার, সাড়ে চার, পাঁচ, ছয়, সাত হয়ে গেল। আমিও পাউরুটিওয়ালার থেকে অনেক ছোট থেকে তার সমান হয়ে তার চেয়েও লম্বা হয়ে গেলাম! প্রথমে যখন পাউরুটিওয়ালা আসত আমরা কুমীরডাঙা খেলতাম... তারপর খেলতাম ব্যাডমিন্টন... তারপর কলেজ থেকে ফেরার পথে শুনতাম ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ অন্য পাড়ায় পাউরুটিওয়ালার গাড়ি ঘুরছে। আমি তখন ক্যান্টিনে লাঞ্চ করি, বোন কলকাতায় চলে এসেছে, টিফিনে আর আমাদের বাড়িতে পাউরুটি খায় না কেউ।
লোকটার সাথে আমার পরিচয় বছর পনেরো’র। অবাক লাগতো ভেবে যে ওর নামটাও জানতাম না! নয়ন পাউরুটিওয়ালার নাম’টা হল বেকারির নাম... নয়ন বেকারি... পাউরুটিওয়ালার নাম’টা মো্টেই জানতাম না। ওর ব্যাপারে ব্যাক্তিগত খবর জানতাম দু’টো। এক, লোকটা মুসলমান, ঈদ আর মুহাররমে আসতো না, ঈদের আগের দিন “আমি তো কাল আসবো না” বলে দুটো পাউরুটি দিয়ে যেত... আর দুই, লোকটার একটা মেয়ে ছিল, আমাদের চেয়ে অনেক ছোট, তার জন্যে আমাদের পুরোনো বই, পুরোনো সোয়েটার মা দিত ওকে মাঝে মাঝে, দেখেছি। আর কিছু জানতাম না ওর ব্যাপারে, আর কে জানে কেন, জানার তাগিদও অনুভব করিনি কখনও...
আলোআঁধারির ভেতর হঠাত সেই খুব চেনা ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’ শুনে নস্টালজিয়ায় ভেসে গেছিলাম ক’টা মুহুর্ত, নয়ন পাউরুটিওয়ালা একগাল হেসে বলল, “ভালো আছো? তোমাকে তো দেখিইনা আজকাল... অনেক দিন দেখি না...”
আমিও হাসলাম, “হ্যাঁ, এখন কলকাতা চলে গেছি গো... বছরতিনেক হল... চাকরি... তুমি ভালো আছো?”
হেসে ঘাড় হেলালো নয়ন পাউরুটিওয়ালা, ভালো আছে। আলো দপদপ করছে যদিও, তবু মনে হল যেন অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছে এক ঝটকায়, হয়তঃ অনেকদিন দেখিনি, তাই এরকম লাগছে... হতে পারে...
“কেক নেবে? বড়দিনের ভালো ফ্রুটকেক আছে...” জিগেস করল ও।
“দাও”, কতকটা ভদ্রতা রাখতেই বললাম... তেইশ তারিখ থেকে পাগলামি করে চলা খচখচানি’টা আবার হাত গোটাল যেন... কেক নিয়ে যা কান্ড চলছে কাল থেকে... নেব আবার?!
“ছোট একটা দাও...” যোগ করে দিলাম আমি।
“ছোট নেবে? বোন, মা... সবার হবে ছোট’তে?... এইটা নাও...” আমার হয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সে, “এটা ভালো হবে...”
দাম দিতে দিতে বললাম, “তোমার মেয়ে কেমন আছে?” এখন তো আর ছোটবেলার সেই অর্থহীন প্রশ্নগুলো করতে পারি না, তাই সামান্য যে ব্যাক্তিগত অংশটুকু তার জানি, তার থেকেই আদ্ধেকটা সম্বল করে জিগেস করলাম, “ভালো?”
একগাল হাসল নয়ন পাউরুটিওয়ালা, “ভালো আছে... ওকে বারাসতের কাছে একটা ইস্কুলে দিলাম, মাসে ন’শো টাকা লাগে, থাকা, খাওয়া, পড়া, টিউশনি... ইলেবেনে উঠলো তো... ভালো পাশ করেছে আগের বার...”
“বাহ্!!” আমিও হাসলাম, “ভালো হবে, দেখো...”
ঘাড় হেলিয়ে আরেকবার হেসে হাঁটা লাগালো লোকটা। মোড় ঘুরে গেল গাড়ি। খানিকবাদে শোনা গেল একবার, ‘ভোঁওওপুউ! ভোঁওওপুউ!’
গার্লস স্কুলের দিকে আর গেলাম না। উলটো পথ ধরলাম বাড়ি ফেরার। নানারকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ডোরবেল বাজালাম। দরজা খুলেই আঁতকে উঠল বোন, “আবাআআআর...!?!”
বুঝলাম, হাতে কেকের বাক্স, ও নিঃসন্দেহে আমায় পাগল ভাবছে। কি আর বলবো! বিড়বিড় করে বললাম, “নয়ন পাউরুটিওয়ালা ধরিয়ে দিল...”
বোন গজগজ করে বলল, “কিনছো কেনো, তু্মি খাবে সব...!”
তুই থেকে তুমি... মানে বোন সিরিয়াস!
আর কথা বাড়ালাম না। পড়ার টেবিলে বসলাম বই খুলে। ঝামেলার সময় এটাই আমার বাড়ির যাকে বলে 'সেফেস্ট কর্ণার', আমার একুশ বছরের অভিজ্ঞতা তাই বলে!
খানিক বাদে মা “জলখাবার!” বলে ঠকাস করে এক ডিশ ভর্তি আমার সদ্য কেনা কেকের টুকরো রেখে গেল। আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে বলতে একটুকরো কেক মুখে ঢুকিয়েছি আর...
আর... কিছু বলতেই ইচ্ছে করল না! আমেজে চোখ বুজে এল যেন! আরেকখানা টুকরো মুখে ঢোকালাম তক্ষুনি... আহা...
মুখে যা ঢুকিয়েছি সেটা হল একটা টিপিক্যাল ফ্রুটকেক... সেটা প্রাথমিকভাবে একটা হলদেটে প্যাকেটে মোড়ানো ছিল, ‘নয়ন বেকারি’ লেখা একটা কাগজ প্যাকেটের গায়ে সাঁটা ছিল... কেকের ওপরটা শক্ত শক্ত, ভেতরে কালো কালো কিসমিস, বড় বড় মোরব্বা, একখানা কাজু আর খুব কপাল ভালো থাকলে নিচের কোণার দিকে আধখানা চেরি পাওয়া গেলেও যেতে পারে। কিন্তু সেই মূহুর্তে সেটা আমার কাছে অমৃতের বাড়া মনে হল আর প্যারালেলি মনে হল, এতক্ষণে ক্রিসমাস’টা বেশ ‘মেরি’ ক্রিসমাস হল!
Tag :
প্রতিদিনের গল্প,
মৌন দিয়ে ছোঁয়া / দুই
By : Sayantari Ghosh
অপব্যয়
এখনও কাগজ দিয়ে যায়নি...!
অন্যদিন হলে এক্ষুনি মেজাজটা খিঁচড়ে যেত দীপ্তাভ'র... কিন্তু আজ কিছু হল না... এম্নিই... অকারণে... আজ যেন কাগজ না দেখলেও চলে... দুনিয়ার খবরাখবর না জানলেও... অকারণে... অকারণে আজ ছুটি নেওয়া যায়...
অন্যদিন হলে এক্ষুনি মেজাজটা খিঁচড়ে যেত দীপ্তাভ'র... কিন্তু আজ কিছু হল না... এম্নিই... অকারণে... আজ যেন কাগজ না দেখলেও চলে... দুনিয়ার খবরাখবর না জানলেও... অকারণে... অকারণে আজ ছুটি নেওয়া যায়...
এখুনি করা চা কাপে ঢেলে নিয়ে ব্যালকনিতে চলে এল ও... পাঁচতলার ওপর থেকে খুব বেপরোয়া লাগে নিচের রাস্তাটাকে... এটা চিরকালই লাগে ওর... এই ফ্ল্যাটে আসা থেকে... নিচের রাস্তাটা যেন সারাক্ষণ “আয় আয়” করে ডাকে... ঝাঁপিয়ে কোলে চলে আসতে বলে... আজও বলছে...আরও যেন বেশি করে বলছে... ভোরটা আজকে কেমন যেন অন্যরকম... ঝিম্ম্ ধরানো... ভোর বলে মনেই হয়না... যেন এখনও অনেএএক দেরি রাত্তিরের ঘুম ভাঙতে। ব্যালকনির বেতের চেয়ারে হিম-হিম ছোপ... কাল রাত্তিরে বৃষ্টি হয়েছে...? নাকি হবে... এখন......
চায়ের কাপের প্রথম চুমুকই জানান দিয়ে দিল, চিনি কম! ভালো... বয়স হচ্ছে না? চিনি কম খাওয়া ভালো... তনু কি ঘ্যানঘ্যান করতো এই নিয়ে...!! এলেই মিতাকে জড়িয়ে ধরে বলতো, “মণি, তেল মশলা মিষ্টি সবেতে রেস্ট্রিক্শন করে দাও দীপের... আররে বয়েস হচ্ছেনা না কি?”
একটা হাসি টুপ করে ছুঁয়ে গেল সকালের রাশভারি মেঘ সরিয়ে...
একটা হাসি টুপ করে ছুঁয়ে গেল সকালের রাশভারি মেঘ সরিয়ে...
তনু...
রীতিমত যুদ্ধ করেও কোনোদিন 'দাদা' হতে পারা যায়নি ওর... 'দীপ' হয়ে গেছে দীপ্তাভ... “ছয়মাসের বড়, তায় আবার ক্লাসমেট... দাদা কিসের রে?” বলতো তনু... বললেই রাগারাগি... হাত ধরে মোচড়... কলাবেণীতে টান..... ওদের থামাতে না পেরে দিদু সিধে গিয়ে নালিশ ঠুকতো মামিমার দপ্তরে, “আরে অ তনুর মা... তর মাইয়ার একগাসি সুল রইবো না আর... কথা সনে না মুখপুড়ি...! বলি কি করে কি অ দুইটায় মিইল্যা সারাখন?!”
রীতিমত যুদ্ধ করেও কোনোদিন 'দাদা' হতে পারা যায়নি ওর... 'দীপ' হয়ে গেছে দীপ্তাভ... “ছয়মাসের বড়, তায় আবার ক্লাসমেট... দাদা কিসের রে?” বলতো তনু... বললেই রাগারাগি... হাত ধরে মোচড়... কলাবেণীতে টান..... ওদের থামাতে না পেরে দিদু সিধে গিয়ে নালিশ ঠুকতো মামিমার দপ্তরে, “আরে অ তনুর মা... তর মাইয়ার একগাসি সুল রইবো না আর... কথা সনে না মুখপুড়ি...! বলি কি করে কি অ দুইটায় মিইল্যা সারাখন?!”
তনু...
একটা ছিমছাম একতারার সুরের মত... খালি ভালোবাসতে জানত... তার মানে আসলে তনু সঅঅব জানত..!! খুব আনন্দে আদরে ভাসিয়ে দেওয়া যায় এমন বোন হতে জানত... মনখারাপে স্বপ্ন-স্বপ্ন আলো-আলো রূপকথা হতে জানত... গোপন খবরের জাদুআয়না, বেস্টফ্রেন্ড হতে জানত... আর... আর অদ্ভূতভাবে, খুব অদ্ভূতভাবে দারুণ অন্ধকারে তনু একেবারে মায়ের মতন হয়ে যেতে জানত...
তনু খালি ভালোবাসতে জানত...
একটা ছিমছাম একতারার সুরের মত... খালি ভালোবাসতে জানত... তার মানে আসলে তনু সঅঅব জানত..!! খুব আনন্দে আদরে ভাসিয়ে দেওয়া যায় এমন বোন হতে জানত... মনখারাপে স্বপ্ন-স্বপ্ন আলো-আলো রূপকথা হতে জানত... গোপন খবরের জাদুআয়না, বেস্টফ্রেন্ড হতে জানত... আর... আর অদ্ভূতভাবে, খুব অদ্ভূতভাবে দারুণ অন্ধকারে তনু একেবারে মায়ের মতন হয়ে যেতে জানত...
তনু খালি ভালোবাসতে জানত...
হাসির গায়ে জড়িয়ে জড়িয়ে স্বর্ণলতার মত দীর্ঘশ্বাস বাড়তে লাগল...
এককণা ভরসা হতে পারেনি দীপ্তাভ... বিশ্ব ওভাবে চলে গেল... হঠাত্...
কি বলতে হয়...?? কি বলতে হত তনুকে...? ঠিক কি দিলে ভালো রাখা যেতো ওকে? সব সঅঅব গুলিয়ে গেছিল মূহুর্তে...
দেরি হয়ে গেছিল খুব ডাকতে... সে বেচারি চেয়ে চেয়ে থেকে শেষকালে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল পথ থেকে...
কি বলতে হয়...?? কি বলতে হত তনুকে...? ঠিক কি দিলে ভালো রাখা যেতো ওকে? সব সঅঅব গুলিয়ে গেছিল মূহুর্তে...
দেরি হয়ে গেছিল খুব ডাকতে... সে বেচারি চেয়ে চেয়ে থেকে শেষকালে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল পথ থেকে...
“অপব্যয়...! তোর সময়ের অপব্যয়, দীপ...! আমি একেবারে ঠিক আছি রে...”
বুকের ঠিক মাঝখানে ঠং করে কাচ ভাঙলো একটা... কাচ না, আয়না ভাঙলো... কে জানে বাইরে শোনা গেল কি না... এখানে, ওখানে, ওইখানে... ওই মেঘ-অব্দি শোনা গেল? মেঘের ওপাশে...? গেল শোনা? একটা কি যেন পাখি টেনে টেনে সুর করে কত কি অভিযোগ করতে লাগলো চোখের আড়ালে থেকে... তারপর হঠাত থেমে গেল... শব্দ নেই...... কোনো শব্দ নেই...... শব্দ বলে কিচ্ছু হয়না এ সকালে......
দীপও হতে পারেনি দীপ্তাভ...
..................................................................
..................................................................
মৌনতা অপরাধ...?
মৌনতা শাস্তি।
মৌনতা শাস্তি।
[ক্রমশঃ]
Tag :
মৌন দিয়ে ছোঁয়া,
মৌন দিয়ে ছোঁয়া... / এক
By : Sayantari Ghoshশঙ্খলতা
.....................................................
........ তারপরে মনে হল যেন ছাদ থেকে নীলকালি ঢেলে দেওয়া হল এক শিশি... পরীক্ষার হলটা তাতে গুলে গুলে একটা রাস্তা হয়ে গেল... কোন রাস্তা? চেনা... সন্দেহ নেই, কিন্তু... কোন রাস্তা... মনে পড়ছে না...
“এই! চ ফুচকা খাবি...?” চমকে পিছন ফিরল তনু...
দীপ...!
“হ্যাঁ...” মাথা নাড়ালো তনু... “কিন্তু বিশ্ব...?”
“বিশ্ব তো চলে গেছে...”
“কোথায়...?” খুব অবাক হয়ে গেল তনু, “আমায় না বলে... এভাবে চলে গেল...?”
কেমন একটা হাসলো দীপ... আর ঝুপ্সি অন্ধকার হয়ে গেল চারদিকে... শিরশিরে ছায়াগুলো নড়তে লাগল কেমন... ভয় করছে... খুব ভয়... বিশ্ব কই...? কোথায় গেল ও...?
“বিশ্ব্...!!!” খুব জোরে ডাকতে গেল তনু... কিন্তু ডাকা যাচ্ছেনা কেন??
“বিশ্ব...!!!” আবার... আবার...
দলাদলা অন্ধকার হাতড়াতে লাগল তনু... একদিন কেটে গেল যেন... একযুগ... গলা শুকিয়ে আসছে... বিশ্ব কোথায়?... ওকে ছাড়া যে এক’পা হাঁটার অভ্যেস নেই তনুর... ওকে ছাড়া...
“বিশ্ব...!!!”
“খুঁজছিলি...?” খুব চেনা একটা হাত আঙ্গুল ছোঁয়ালো কনুইয়ে...
আর পিছন ফিরতেই...
“বৌদি গো!!! দাদা আর ফিরবে না... দাদা চলে গেছে...”
এক ঝটকায় ঘুম ভেঙে গেল তনুর... চোখে লেগে আছে ওর হাত ধরে থাকা দীপের মুখটা... বুকের ভিতর তিরতির করে কাঁপছে সুমির কান্নাডোবানো চিত্কার...
স্বপ্ন...!?! স্বপ্নই তো...?
হ্যাঁ...তাই। সব দিব্বি চেনা যাচ্ছে এখন। চেনা বালিশ, চেনা বিছানার চাদর, চেনা নীল নাইটল্যাম্প... ওর খুব চেনা শোবার ঘর ঝিমাচ্ছে... জানলার কাছে রাতের হাওয়া দুলে দুলে নতুন সুর বাঁধছে উইন্ডচিমারে... পাশে তুতাই অঘোরে ঘুমাচ্ছে... মাথার কাছের টেবিলে ঘড়িটা রাত্রি দু’টোর কাছাকাছি তিনখানা কাঁটার জটিল সমস্ত হিসেব সামলাচ্ছে... আর তার পাশে ওরই দিকে তাকিয়ে সেই দুষ্টু হাসিটা হাসছে বিশ্ব... জুঁইফুলের মালাটা আজ সন্ধ্যেতেই পরানো... সাদা ফুল ওর বড্ড প্রিয় তো...! এতরাতেও, কাঁচের ফ্রেমের ওপাশের দুনিয়া থেকেও ওর চোখদুটো ঠিক তেম্নিই ঝকঝক করছে... যেন এক্ষুনি কিছু বলবে...
“কিছু বলবে?” আপন মনেই খুব চাপাস্বরে বলল তনু
ওভাবেই ওর দিকে তাকিয়ে রইল বিশ্ব...
জানলার পর্দাটা খামখেয়ালে উড়ল একবার... জুঁইয়ের জমাট গন্ধ গোল করে ঘুরে নিল খাটের চারপাশ... আর উইন্ডচিমারের সাথে খুনসুটি করে নিল হাওয়া এই ফাঁকে... রিনরিন্ রিনরিন্...
Tag :
মৌন দিয়ে ছোঁয়া,
হাওয়াঘন্টি / ২
By : Sayantari Ghosh
ভয় করল ভীষণ! গলা
শুকিয়ে গেল মূহুর্তে... এই ভরদুপুরে, দিনের আলোয় এ কিরকম পাগলামিতে পেয়ে বসল আমাকে...?
“কি রে?” চমকে পিছনে ফিরলাম রিদ্মের ডাকে, “রেস্ট নিতে বললাম তোকে... আর তুই...... এইইই,
এরকমভাবে ঘেমেছিস কেন
রে...? কি হল'টা কি তোর...? শরীর খারাপ করছে না কি?”
“না না, আয়াম ফাইন... আমি... আমি ঠিক আছি... জাস্ট
টায়ার্ড...” বললাম, কিন্তু নিজের গলাটাই চিনতে পারলাম না নিজের
বলে... গলার কাছে কি যেন দলা পাকিয়ে আটকে গেছে...!!
সারা দুপুর চুপটি
করে বসে রইলাম... জেনের জার্মান স্পিত্জ্ চেরি আমার কোলে উঠে বসেছিল... আস্তে
আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম ওর মাথায়... ঠুন্ন্-ঠুন্ন্ করে উইন্ডচিমার বাজছে
বারান্দায়... ফালি ফালি পড়ন্ত রোদ ঢুকে পড়ছে বাগানের ওক গাছটার ফাঁক দিয়ে... ঘরের
হাওয়াটা কেমন যেন ভারি ঠেকছে আমার... যেন পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো হয়েছে
হাওয়াটাকে... একটা ছায়া যেন ঘিরে ধরে আছে...
রিদ্ম বলল
বিকেলে সেন্ট এডওয়ার্ড স্কুলের পাশের চার্চে যাবে। ওর লাগোয়া গোরস্থানটাও বেশ
পুরোনো... এখন আর লোকজনের সেরকম যাতায়াতও নেই সেখানে...
“তুই যাবি...?
না কি...... আই থিঙ্ক ইউ
শুড টেক রেস্ট... ঘোরাঘুরি করতে হবে না আর...” বলল ও...
বুঝতে পারছিলাম
না! বেরোতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু একা থাকার
কথা ভাবতেই কেমন একটা বোকাবোকা ভয় চেপে ধরছে যেন। বললাম, “জেন কখন ফিরবে রে...?”
“আজ তাড়াতাড়ি
ট্রাই করবে... মে বি ফাইভ থার্টি অর সিক্স... কেন...?”
টেবিলের ওপর থেকে
হাতঘড়িটা তুলে দেখলাম। চারটে। বললাম, “তাহলে... তাহলে আমি আর বেরোবো না...”
“ওকে দেন... আমি
বেরোই, কেমন...? কিছু নিয়ে আসব? কিছু চাই...?”
বলতে ইচ্ছে করল,
“রিদ্ম্... আমার দম বন্ধ
হয়ে আসছে... আমি চন্ডীগড় ফিরতে চাই...”
বলা গেল না।
........................................................................................................
রিদ্ম্ বেরিয়ে
যাবার পর সোফায় বসে বসে চেরিটাকে জড়িয়ে ধরে কখন জানি চোখ লেগে গেছিল। চোখ খুললাম
যখন, আলো কমে এসেছে ঘরটায়। এত
তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে হয়ে গেল বুঝি? ক'টা বাজছে...? চোখ রগড়ে টেবিলের উপরটা হাতড়ালাম অন্ধকারেই...
খুব ঠান্ডা কি
একটা হাতে ঠেকলো... চমকে উঠে বসলাম... একটা জলের বোতল...! কেউ এক্ষুণি ফ্রিজ থেকে
বের করে রেখেছে... এতটুকু জল গড়ায় নি সেটা থেকে এখনও... আর গোটা টেবিলে কোথাও
রিস্টওয়াচ'টা নেই...!
ঝট করে উঠে
দাঁড়াতেই মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল... পা টলছে... চেরি কোথায়
গেল...?
“চেরি...!”
ডাকলাম...
সাড়া নেই...
সোফার নিচেটা
দেখলাম উঁকি দিয়ে... ঘর'টা বেশ অগোছালো,
টের পাচ্ছি রীতিমতো... ডায়নিং
টেবিলের ওপর আমার শেষ-করা কফির কাপ'টা ধুয়ে উলটে
রাখা, ওয়াশ বেসিনের পাশে জল
ছড়িয়ে আছে, একটা চেয়ার টেনে
একটু বেঁকিয়ে রাখা... যেন কেউ বসেছিল সোফাটার দিকে তাকিয়ে...
চেরি নেই কোত্থাও!
“চেরি...?”
ডাকলাম আরেকবার... পাত্তা
নেই কারো...
আস্তে আস্তে
বারান্দায় বেরিয়ে এলাম.....উইন্ডচিমারটা সেরকমই বাজছে এখনও... ওকগাছটাকে কেমন
ডাইনিবুড়ির মতন দেখতে লাগল একবার তাকিয়ে...
ঘরে ফিরে এলাম; এক গ্লাস জল
খাবো... টেবিলে রাখা বোতল'টা নিতে গেলাম আর
রক্ত হিম হয়ে গেল মূহুর্তে...
সোফাটার কোল জুড়ে
অন্ধকার বেশ গাঢ় হয়েছে ততক্ষনে... দেখলাম, চেরি সোফার কুশনে গা ঘষছে আনমনে... যেন খুব করে আদর খাচ্ছে কারো কাছে...
“কে...????
কে ওখানে...?” চেঁচিয়ে উঠলাম খুব জোরে...
একঝাঁক হাওয়া
ঢুকলো খালি জানলার পর্দাটা উড়িয়ে দিয়ে...
“কে...??? কেন ভয় দ্যাখাচ্ছো...? জেন...? জেন ফিরে এসেছো বুঝি...? না কি... না কি
তুই রিদ্ম্...? প্লিজ আমায় আর ভয় দেখাস না তোরা, ভাল্লাগছেনা আমার, প্লিজ...”
গলা ভেঙে গেল
আমার কথা'কটা বলতে গিয়ে...
বুকের ভেতর কেউ যেন ভয়ে চোখ বন্ধ করে বলছিল যে ঘরে কেউ আছে... নিশ্চিত আছে...
কিন্তু সে রিদ্ম্ নয়... জেনও নয়... তাকে আমি চিনি না...!!
আরেকবার পর্দাটা
উড়ল... এবার খুব জোর হাওয়া... টেবিলের নিচের তাক থেকে খবরের কাগজগুলো উড়ে ঘরময় হয়ে
গেল একেবারে... চেরি এবার আমার দিকে তাকাল অবাক হয়ে...
“কেন...? কেন...? কি চাও...? কি.........”
বলতে বলতে চোখ জল এসে গেল
আমার... নড়তে পারছি না এতটুকু... গলার স্বর তলিয়ে যাচ্ছে যেন চিরকালের জন্যে...
..........আরেকজনও কিছু
বলতে চায়... ভীষণ ভাবে বলতে চায়... ঘরজোড়া টানটান অন্ধকার সেটা জানান দিইয়ে যাচ্ছে
ক্রমাগত...
আরেকবার হাওয়া
দিল... আর পাক খেয়ে খবরের কাগজের একটা পাতা আমার পায়ে জড়িয়ে গেল...
আর সাথে সাথে
হাওয়া থেমে গেল একেবারে...
সব চুপ... সব শান্ত... যেন ত্রিভুবনে শব্দ বলে কিছু হয়'ই না এ'রকম নীরবতা... উত্কন্ঠায় উপচে যাওয়া নীরবতা... সব্বাই যেন অপেক্ষা করছে আকুল হয়ে...
আঙুল হিম... হাত
কাঁপছে... কোনোরকমে কাগজটা কুড়িয়ে নিলাম...
গত চোদ্দ'ই ফেব্রুয়ারির খবরের কাগজ...
পাতাজোড়া গোলাপি রঙের
বিজ্ঞাপন কোনো এক গ্রিটিংস্ কার্ড কোম্পানির... বড় বড় অক্ষরে লেখা...
“Some day, when I'm awfully
low
When the world is cold
I will feel a glow just thinking of you
And the way you look tonight”
When the world is cold
I will feel a glow just thinking of you
And the way you look tonight”
পড়া শেষ... আস্তে
আস্তে মাথা তুললাম... হাঁটুর আশেপাশে জোরালো কাঁপুনি... শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা ঝিমুনি...
ঘরের আলোআঁধারের মধ্যে কাউকে খুঁজে চলেছে আমার দু’চোখের মণি... স্ট্যাচু হয়ে তাকিয়ে
রইলাম সামনের দিকে...
চেরি আবদারি
জুলুজুলু চোখে তাকালো আমার দিকে...
নরম আকুতির মতন খুব
আলতো একটা হাওয়া দিল ঘরটায়...
[শেষ]
Tag :
গা-ছমছম-গল্প,
হাওয়াঘন্টি
By : Sayantari Ghosh
“মেজর চার্লস ক্রস্বি...? তাই তো...?” আরেকবার জিগেস করলাম আমি।
“ইয়াপ্, তাই...” বলে কবরগুলো থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকালো
রিদ্ম্, “ফিলিং টায়ার্ড,
না?”
আসলে তাই! সকাল
সাতটায় ঢুকেছি সঞ্জৌলি গোরস্থানে; এখন মাথায় ওপর চনচন করছে রোদ... ঘড়ির কাঁটা
বারোটা পেরিয়ে গেছে...
কাল এসেছি
সিমলায়। চন্ডীগড়-সিমলা যাতায়াত'টা আমি আর রিদ্ম্
ইচ্ছে হলেই করে থাকি... উইকএন্ড, অফিসে ছুটি,
সেলিব্রেশন বা মনখারাপ...
গাড়ি বের করে সোজা সিমলা! তবে হুজুগটা বেড়েছে রিসেন্টলি... যবে থেকে এই জিনিওলজির
ভূত'টি এসে রিদ্মের মাথায়
চেপেছে! বোধহয় একটা পুরোনো ডায়েরি থেকে শুরু হয়েছিল ব্যাপারটা... তারপর এখন নিজের
পরিবারের ইতিহাস ঘেঁটে দ্যাখাটা শখ হয়ে গেছে রিদ্মের; আর পুরোনো জায়গায় ঘুরঘুর করতে চাইলে আমার ঝুলে
পড়তে আপত্তি থাকেনা কখনই.....
তিনদিন আগে থেকে
এই চার্লস ক্রস্বির নামটি মাথায় ঢুকেছে ওর। বুধবার রিসেস আওয়ারে দুম করে আমার
ক্যাবিনে ঢুকে এক গাল হেসে বলল, “তোর বর পাওয়া
গেছে রে...!” সত্যি বলতে কি, শোনামাত্র আমার বুকের ভেতর ধুকপুকুনি বেড়ে গেছিল! বলে কি ছেলেটা? প্রপোস'টা এভাবে করবে বুঝি? মাথা'টা কি খারাপ হয়ে গেল একেবারেই ওর? এক মিনিট পরে থতমত ভাবটা কাটিয়ে উঠলাম যখন রিদ্ম্ খোলসা করে বলল গল্প'টা। পুরো'টা শুনে মজা পেলাম ঠিক'ই, কিন্তু ভেতর ভেতর নিজেকে বড্ড বোকা মনে হচ্ছিল। হপ্তাখানেক আগে ভ্যালেন্টাইনস ডে'র দিনও এই একই রকম পাগলামি করছিল মন'টা! নিজেকে একটা আস্ত হাঁদাগঙ্গারাম মনে হল। প্রপোস-টোপোস কত কি ভেবে ফেলেছিলাম, ধূর!
রিদমের গল্পের মুখ্য ভূমিকায় আছেন এই চার্লস ক্রস্বি বলে ভদ্রলোক'টি। সম্পর্কে ওর ঠাকুর্দার মাসতুতো ভাই... প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সিমলায় পোস্টিং ছিল তাঁর... সারা
সিমলায় ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর হত্তাকত্তাদের মধ্যে মেজর ক্রস্বির নামযশ ছিল নাকি
খুব... বাড়ির বাতিল কাগজের স্তূপের কোত্থেকে জানি রিদ্ম্ একখানা ঘষে যাওয়া হলদেটে ছবি পেয়েছে... চাড়া-দেওয়া
গোঁফের ক্রস্বি সাহেব আর তাঁর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী'র... রিদ্মের চাপাচাপি’তে মানতে বাধ্য হলাম মেজর সাহেব যতই জাঁদরেল চেহারার হোন না কেন, ভদ্রমহিলাকে সত্যি সত্যি অনেকটাই আমার মতন দেখতে... ব্যাস, ছেলে খেপে উঠলো একেবারে, “চল না এই উইকএন্ডে ঘুরে আসি একবার, জাস্ট দ্য সেমেটারিস্... উই উইল লুক ফর এ
হোয়াইল অ্যান্ড কাম ব্যাক...”
ঘ্যানঘ্যান করলে
ওকে 'না' বলতে পারিনা কখনও... কে জানে কেন... মোক্ষম
ব্যাপারটা হল, রিদ্ম্ ডাকলে
আপত্তি করার ক্ষমতাই থাকেনা আমার... মনে হয় সারাটা জীবন যদি এভাবে হুঠহাঠ ওর সাথে
বেরিয়ে পড়া যেত...... ধুর! সেসব কথা ওকে বলাই হয়না আমার... ডিয়ারেস্ট কলিগ,
বেস্ট ফ্রেন্ড এই বেশ
ভালো আছি... কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে...
যাগগে সেসব
কথা... উইকএন্ড এসে পড়তেই তাই কাল বেরিয়ে পড়েছিলাম... আর আজ অভিযান সঞ্জৌলি...
“লেট্স্ গো
ব্যাক দেন ফর নাও,” আমার মুখের দিকে
তাকিয়ে রিদ্ম্ বলল, “তোকে খুব ক্লান্ত
দ্যাখাচ্ছে...”
“ওক্কে...” আমি হেসে বললাম, “একটু বসে নিই? এক্কেবারে হাঁফিয়ে গেছি...”
একটা বিশাল
রডোডেন্ড্রনের নিচে বসলাম পা ছড়িয়ে। জায়গাটা এম্নিতে বেশ চুপচাপ, তারসাথে গলাজড়াজড়ি করে রয়েছে একটা পুরোনো
গন্ধ... সারসার পুরোনো পাথর আর আদ্যিকালের পাহাড়ি গাছেদের ভিড়... মানুষগুলো
ঘুমোচ্ছে কে জানে কবে থেকে... ডরোথি ড্যালি, ১৯২৯... ব্যারনাবি মারফি, ১৯৩৪... উইলিয়ম ক্যাহিল, ১৯৩৮... সবাই অঘোর ঘুমে... আগে হয়তঃ প্রতি
সপ্তাহে কেউ দেখা করতে আসত... একটা গোলাপ ফুল রেখে যেত ঘুমিয়ে পড়া বুকের ওপর...
ছুঁয়ে বসে থাকত... কেঁদে যেত অঝোরে... তারপর কতযুগ, কতযুগ পেরিয়ে গেছে... আর কেউ আসেনা... কেউ আসে
না...
ঝুপ করে আচমকা একটা
শব্দ হল আমার ঠিক পিছনে! খেয়ালে এমন ডুবেছিলাম যে ভেতর অব্দি কেঁপে গেল আওয়াজ'টায়... উঠে
দাঁড়িয়ে পড়লাম হুট করে...
“হেই... হোয়াট
হ্যাপেন্ড্?” রিদ্ম অবাক হয়ে
বলল, “এনিথিং রং?”
জানিনা...!
পিছনের ঝোপটার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ... অন্ধকার করে রয়েছে সাদা ফুল ফোটানো
একটা বুনো লতা... আর... আর যেন তার ওপাশ থেকে কেউ দেখছে আমাকে... মনে হল ঝুপসি হয়ে
নেমে আসা পাতাগুলো সরানোর অপেক্ষা... কেউ আছে ওখানে...
“মিলি...? কি হয়েছে...? বলবি তো...?”
“নাথিং!” একটা ঢোঁক গিলে বললাম, “বেরিয়ে পড়ি, চ... দেরি হচ্ছে...”
সিমলা এলে আমাদের
ঠিকানা হয় জেনের বাড়ি। তার দুটি পরিচয়... রিদ্মের খুড়তুতো দিদি; আর সোনায় বাঁধানো মনের একজন মানুষ। সারাটাদিন
মনিপাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে পড়ে থাকে; আর সন্ধ্যেয় ফিরে দারুণ দারুণ সব গল্প আর
তারচেয়েও ভাল ভাল রান্না দিয়ে আড্ডা জমিয়ে দিতে পারে...
বাড়ির সামনে
পৌঁছাতেই পাশের দোকানের মেয়েটা দৌড়ে এসে চাবি ধরিয়ে দিল রিদ্মের হাতে; সঙ্গে একটা ছোট্ট চিঠি...
“খিদে-টিদে পেয়ে
গেছে নিশ্চয়ই... রান্নাঘর এবং ফ্রিজ তোমাদেরই... আগুন-টাগুন ধরিয়ে দমকল ডাকা ছাড়া
যা খুশি করতে পারো... :)”
এই হল জেন... মন'টা ভালো হয়ে গেল এক মিনিটেই...
“ঘরে ঢুকে সোফায়
এলিয়ে বোস...” তালা-চাবি আমার হাতে ধরিয়ে রিদ্ম বলল, “আমি একটা দারুণ করে কফি করছি...”
সদর দরজায় ছিটকিনি
দিয়ে বাগান পেরিয়ে ঘরে ঢুকলাম; বাগান’টা মরসুমি ফুলের ভিড়ে
রংরঙিন। বিশাল ওকে গাছটায় ঝিকিয়ে উঠেছে রোদ। বারান্দায় সেই চেনা উইন্ডচিমার'টা হাওয়ায় দুলছে। মন'টা জুড়িয়ে আসছিল। বসার ঘরের সোফায় এলিয়ে থাকবো এখন খানিক, তাহলেই ফ্রেশ হয়ে যাবো। হয়তঃ সত্যিই খুব ধকল হয়ে গেছে, তাই অস্বস্তি হচ্ছিল তখন।
টেবিলে তালাটা রাখতে গিয়েই জানলার বাইরে চোখ চলে গেল...
টেবিলে তালাটা রাখতে গিয়েই জানলার বাইরে চোখ চলে গেল...
একি! সদর'টা হাট করে খোলা...! সঞ্জৌলির
ধুকপুকুনিটা হুড়মুড়িয়ে ফিরে এল বুকের মধ্যে... আমি যে... আমি যে এখুনি লাগিয়ে এলাম
দরজাটা...!! কে খুলে দিল তাহলে?
হুশ করে জানলার
পর্দাটা উড়ে চোখ ঢেকে দিল আমার... আর সঙ্গে সঙ্গে কিরকম একটা অস্বস্তি পাক দিয়ে
উঠল সারা শরীরে... মনে হল যেন ঠিক আমার পিছনে দাঁড়িয়ে কেউ দেখছে আমায়...!!
[পরের কিস্তি'তে শেষ]
Tag :
গা-ছমছম-গল্প,
দ্য আনসিঙ্কেবল / দুই
By : Sayantari Ghoshটাইটানিকের গল্পটা তো সক্কলের জানা। অনেকে হয়ত এটাও জানেন যে টাইটানিক'রা আসলে তিন বোন। অলিম্পিক,টাইটানিক আর ব্রিটানিক ছিল হোয়াইট ষ্টার লাইনের গর্বের তিন কন্যা;সিস্টার শিপ'স। সে সময়কার প্রযুক্তি, বিজ্ঞান আর শিল্পের সেরাটুকু দিয়ে জাহাজ তিনটিকে বানিয়েছিল হোয়াইট ষ্টার লাইন। ঘটনাচক্রে এমনি দাঁড়ায় যে দূর্ঘটনা প্রথম থেকে শেষ অব্দি পিছু ছাড়েনি এই তিন বোনের।
১৯১১'র জুন মাসে প্রথম জলে নামে অলিম্পিক। ৮০০ ফিটের চেয়েও বেশি দৈর্ঘ্যের প্রথম জাহাজ।সে বছরের'ই সেপ্টেম্বর মাসে সাউদাম্পটনে ধাক্কা খায় এইচ.এম.এস. হক জাহাজের সাথে। সাঙ্ঘাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুটি জাহাজই,তবে প্রাণে বেঁচে যান দুই জাহাজের সকল যাত্রীই;খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত দেহে বন্দরে নোঙর করে বিশালবপু অলিম্পিক।
পাক্কা দু'মাস লেগেছিল অলিম্পিকের সেরে উঠে আবার জলে নামতে। সেই ধাক্কা সামলে নিতে টাইটানিকের প্রথম যাত্রা এক মাস পিছিয়ে দেয় হোয়াইট ষ্টার লাইন। মার্চ ২০'র বদলে টাইটানিক সাউদাম্পটন বন্দর ছাড়লো এপ্রিল ১০,১৯১২;কে বলতে পারে, এক মাস আগে হলে হয়তঃ নিউ ইয়র্কে নোঙর'ও করত টাইটানিক? পাঁচ দিন পর এপ্রিল ১৫'তে আইসবার্গের ধাক্কায় ১৫০০ টি প্রাণ সঙ্গে করে আতলান্তিকের তলিয়ে যায় টাইটানিক।
আসলে ব্রিটানিকের নাম হওয়ার কথা ছিল জাইগান্টিক। আকারে,আয়তনে সে ছিল বড় দুই বোনের বাড়া।কিন্তু টাইটানিকের মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় হোয়াইট ষ্টার লাইন আর ওই দূর্ধর্ষ নামের দুঃসাহস দ্যাখাতে পারেনি। এম্নিতেও ততদিনে আকাশে উঁকি দিয়েছে বিশ্বযুদ্ধের মেঘ,অনেক স্লথ হয়ে গেছে জাইগান্টিকের জলে নামার প্রস্তুতি। সেপ্টেম্বর ১৯১৪'র বদলে ডিসেম্বর ১৯১৫ তে প্রথম যাত্রায় পাড়ি দিল সে,ততদিনে ব্রিটিশ জলবাহিনী অধিগ্রহন করে নিয়েছে তাকে,তার কাজ হয়েছে জলযুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবা,নাম বদলে হয়ে গেছে এইচ.এম.এইচ.এস. ব্রিটানিক, হিস ম্যাজেস্টিস হস্পিটাল শিপ ।
প্রায় ১৫০০০ আহত যোদ্ধা'কে ঘরে পৌঁছেছিল ব্রিটানিক মাত্র পাঁচটি সমুদ্রযাত্রায়। ষষ্ঠ বার আর ঘরে ফেরে নি সে। নভেম্বর ২১,১৯১৬'র সকালে একটি মাইন'এর সাথে হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে মাত্র ৫৫ মিনিটের মধ্যে তলিয়ে যায় বিশাল ব্রিটানিক। সেদিন আরোহীদের মধ্যে কোন আহত বা অসুস্থ কেউ ছিলেন না। ১১০০ জনের ভেতর ৩০ জন প্রাণ হারান, আর সঙ্গে হারিয়ে যায় অলিম্পিক-পরিবারের শেষ সদস্য'টি।
এই গল্পের সাথে একজনের কথা না বললে অনুচিত কাজ করা হয়। ভায়োলেট জেসপ। ইনি হোয়াইট ষ্টার লাইনে কর্মরতা ছিলেন জাহাজের পরিচারিকা হিসেবে। কাকতালীয় হলেও সত্যি কথা যে অলিম্পিক, টাইটানিক আর ব্রিটানিকের দূর্ভাগ্যের দিনগুলিতে জেসপ জাহাজে ছিলেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, তিনটি দূর্ঘটনার'ই তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী! এবং প্রতিবার'ই চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি,অব্যবস্থা আর প্রাণহানির মধ্যেও তিনি দিব্বি বেঁচে ঘরে ফিরে আসেন! হয়তঃ সমুদ্রের লোনা জলে ফুসফুস ভরে ফেলে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া কপালে ছিল না জেসপের,দীর্ঘ সুস্থ জীবন লেখা হয়েছিল বিধাতার দপ্তরে তার জন্যে। কথায় বলে না, রাখে হরি মারে কে?
হরির রক্ষা করার প্রসঙ্গ উঠলো যখন,তখন আরেকটা অদ্ভূত গল্প বলে আজকের মত শেষ করি।
ওয়েলসের কাছে প্রায় ২৫ কিলোমিটার লম্বা একটি জোয়ার জলের নদীখাতের স্থানীয় নাম দ্য মেনাই স্ট্রেইট।ডিসেম্বর ৫, ১৬৬৪, মেনাই স্ট্রেইটে একটি জাহাজডুবি হয়। মারা যান একজন আরোহী বাদে বাকি ৮১ জন মানুষ। আবার একই তারিখ। ডিসেম্বর ৫, সাল ১৭৮৫; মেনাই স্ট্রেইটে ডুবে যায় আরো একটি যাত্রীবাহী জাহাজ।ষাটজন মারা যান, জীবিত উদ্ধার করা যায় আবারও মাত্র একজন'কে। ডিসেম্বর ৫, ১৮২০, একই জায়গায় আরো একটি জাহাজ দূর্ঘটনা। মৃতের সংখ্যা এবার ২৫, অদ্ভূত ভাবে এবারেও প্রাণে বেঁচে যান একজন মাত্র যাত্রী।
স্থান আর কালের তথ্যটুকু তো দিলাম,পাত্র বিষয়ক সেরা তথ্য'টা এবার বলি।
যারা বেঁচে যান,ঘটনাচক্রে তাঁদের প্রত্যেকের নাম ছিল হিউ উইলিয়মস!
অবাক কান্ড না? টাইটানিক'কে আনসিঙ্কেবল বলে দাবী করেছিল হোয়াইট ষ্টার লাইন; এই গল্প তবে কি দাবী করবে? হিউ উইলিয়মস... দ্য আনসিঙ্কেবল...?
Tag :
সত্যিকারের গল্প,
ভোর-রাত্রের স্বপ্ন
By : Sayantari Ghoshট্রেনের দরজার কাছে জমে থাকা ভিড়ের ফাঁক গলে কোনোক্রমে স্টেশনটায় নেমে পড়লো অর্ক; আর ট্রেনটাও ছেড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। অর্ক হাঁফাচ্ছিলো। হাত দশেক দূরে প্ল্যাটফর্ম ধরে সোজা হেঁটে চলে যাচ্ছে ঊর্মি। ও কি পাগল হয়ে গেছে? কি চাইছে ও? এখানে নেমে পড়লো কেন হঠাৎ? অর্ক ছুটতে শুরু করলো ঊর্মির পিছনে।
-“ঊর্মি-ই-ই... পাগল হলি কি? দাঁড়া...!”
ঘুরে দাঁড়ালো ঊর্মি। চোখদু’টো জ্বলছে যেন ওর, “তুই নেমেছিস কেন??” আঙুল তুলে জোর গলায় বললো ও, “তোকে কে আসতে বলেছে আমার পিছু পিছু? ক্যাচ আ ট্রেন আর গেট লস্ট...”
অর্ক ততক্ষণে পৌঁছে গেছে ঊর্মির কাছে, ওর হাত’টা ধরার চেষ্টা করে অর্ক বলতে গেল, “কি হয়েছে সোনা? কেন রাগ...”
-“ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু টাচ মি...!” গর্জে উঠলো ঊর্মি, হাত ছাড়িয়ে একটা ধাক্কা দিল অর্ক’কে, “বলছি না আমার তোকে দরকার নেই... কোনো সম্পর্ক নেই আর আমার তোর সাথে...”
-“ও’সব তোর রাগের কথা,” নরম গলায় অর্ক বলল, “এর আগেও এক’শ বার বলেছিস... কি হয়েছে রে? বল আমাকে... আমিই কিছু গোলমাল করেছি নির্ঘাত...” হাসার চেষ্টা করলো অর্ক।
-“শোন, বেকার এ’সব ঝুটামুটা এ্যাক্টিং বাদ দে তো”, ঊর্মি আরও গলা চড়ালো, “আমি তোকে নিয়ে বিরক্ত... ক্লান্ত... এমব্যারাস্ড্... আমি জানি না কেন, কি ভেবে, কি থেকে আমার মনে হয়েছিল যে তোর মত একটা মোস্ট অর্ডিনারি ক্যাবলা ছেলে আমার লাইফ পার্টনার হতে পারে... আয়াম সরি... মাই ফল্ট... এবার আমায় ছাড়ন দে,” শব্দ করে হাত জোড় করলো ঊর্মি, “গুড বাই...” বলে পিছন ফিরে জোরকদমে হাঁটা লাগালো সে।
-“আরেহ্...!!” অর্কও পা চালালো তাল মিলিয়ে। ঊর্মি কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে সাংঘাতিক রেগে গেছে কে জানে কেন... ওর এইসব অদ্ভূত রাগের কোনো ব্যাখ্যা অর্ক খুঁজে পায় না কখনও… অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পড়তে এখন আর খোঁজ করাটাও ছেড়ে দিয়েছে ও... রাগ হয়েছে, এটাই গুরুত্বপূর্ণ; ক্ষমা চাইতে হবে, এটাই জরুরী... কার্যকারণ ব্যাখ্যা খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন। তাতে শক্তিক্ষয়। তাতে সময় নষ্ট।
হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে ছোট্ট স্টেশনের ঘাসে-ঢাকা নামমাত্র প্ল্যাটফর্ম’টা থেকে বেরিয়ে এসেছে ততক্ষণে ওরা। কি আশ্চর্য পাগলামি করে মাঝপথে ট্রেন থেকে নেমে পড়লো আজ ঊর্মি...! হয়েছে রাগ, হয়েছে কথা কাটাকাটি, হয়তঃ দুটো কড়া কথাও বলে ফেলেছে অর্ক রাগের মাথায়, কিন্তু তা বলে কথা নেই, বার্তা নেই অজানা অচেনা স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে পড়বে? আশ্চর্য্য তো! কিন্তু এসব নিয়ে তর্ক করতে যাওয়াটা নিতান্ত বোকামী, তা জানে অর্ক খুব ভালো করে। ঘাড় ঘুরিয়ে স্টেশনের হলুদ-কালো বোর্ড’টার দিকে তাকিয়ে জায়গাটার নাম দেখে নিল সে একবার... ‘তালজোড়া’ লেখা আছে ইংরেজি, বাংলায়। যত গ্রাম্য নাম, তত অপ্রস্তুত দশা, মনে মনে এইরকম একটা হিসেব করেই যেন দীর্ঘশ্বাস পড়ল অর্ক’র...
-“ঊর্মি-ই-ই... লক্ষ্মী’টি... দাঁড়া, একটিবার...” আবার হাঁক দিল অর্ক।
ঊর্মি কিন্তু এবার তাকালোও না পিছন ফিরে। বাঁদিকের লাল রাস্তা’টা ধরে হাঁটতে লাগলো সোজা। ঊর্মির বরাবরই অর্ক’র এইসব ন্যাকামোগুলো ভীষণ বোরিং লাগে। আজ মাথা গরমের চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্টেশনের বাইরে নামমাত্র ক’টা দোকান... বিড়ি, সিগারেট, পানমশলা... চারটে আধবুড়ো লোক মেঠো কায়দায় হাঁটুর ওপর ধুতি গুটিয়ে বসে... তারা দাঁত বের করে হাসছে অর্ক’র দিকে তাকিয়ে... ‘শহুরে প্রেমের এমন নজারা টিভি সিনেমার বাইরে দ্যাখা তো এদের জোটে না, এনজয় করছে ব্যাটারা’... ভাবতে ভাবতে বাঁদিকের রাস্তাটা ধরলো অর্ক...
ঊর্মি অনেকটা এগিয়ে গেছিল। রাস্তা থেকে ধানক্ষেতের আলে নেমে পড়লো সে। ধানক্ষেত বলা’টা অবশ্য উচিত নয়... শীতকাল, মাঠ একেবারে ফাঁকা... যতদূর চোখ যায়, মনে হয় যেন একরাশ শূণ্যতার মধ্যে আল বরাবর সোজা সোজা দাগ টেনে কি একটা কঠিন জ্যামিতির আঁক কষা হয়েছে। ডানদিক-বাঁদিকে, সামনে-পিছনে, কোথাও কোনো তফাত নেই... কোনো এক সোনালি স্মৃতির দগদগে ধ্বংসস্তূপের মত অসমতল মাঠ জুড়ে ধানের গোড়াগুলো পড়ে আছে... শূণ্যতাই এখানে সব... মাথার ভেতরের ভারী ভাব’টা কেটে যাচ্ছিল যেন... কেমন উদাসীন হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল ঊর্মির...
-“ঊর্মি-ই-ই...!” অর্ক ডাকছে।
পিছন ফিরে চিৎকার করে উঠলো ঊর্মি, “কেন আসছিস এখনো? আমি বললাম তো আমি কোনো কথা বলতে চাই না...! আমার আর সহ্য হচ্ছে না তোকে...! আমায় একা থাকতে দে না একটু...! আমি একাই ভালো আছি... লিভ মি আলোন, প্লিজ...!”
অর্ক এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো খানিক দূরে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর থেমে থেমে বলল, “বেশ, একাই থাকিস... বাড়ি ফিরে যাই, তারপরে একা থাকিস? কেমন? জায়গাটা অচেনা, কোথায় কি বিপদ হয়, চল... প্লিজ...”
একটা আকুতির মত শোনালো অর্ক’র গলা’টা। আর শোনা মাত্রই একটা ছটফটে বিতৃষ্ণায় ভেতর’টা চিড়বিড়িয়ে উঠলো ঊর্মির। এই এক ভয়-পাওয়া কন্ঠস্বর, এই এক কাঁদো-কাঁদো চাইল্ডিশ ভাব... আগে মিষ্টি লাগতো ঊর্মির, এখন অসহ্য লাগে! কে বাধ্য করেছে ঊর্মি’কে এই ছেলেটাকে যাবতীয় অস্বস্তি সত্ত্বেও সহ্য করতে? কেউ না! তাহলে? ভাবামাত্র ইচ্ছে করলো অর্ক’কে সরিয়ে দিতে... নিজের সামনে থেকে, নিজের জীবন থেকে... ইচ্ছে করলো এমন ভাবে আঘাত করতে যাতে আর ও মুখ তুলে না চাইতে পারে... ইচ্ছে করলো এমন একটা ব্যবস্থা করতে যাতে “ঊর্মি” বলে যেন কক্ষনো ওকে পিছু না ডাকতে পারে অর্ক।
শান্ত ভাবে শব্দগুলোয় শান দিল ঊর্মি, “তুই থাকলেই আমার বিপদ, অর্ক... তুই আমার জীবন থেকে ভালো-থাকাটুকুকেই মুছে দিয়েছিস যেন... যেদিকে তাকাই খালি ফ্রাস্ট্রেশন, ভয়, প্যানিক... যেন জীবনটাই ফুরিয়ে গেছে আমার... তুই না থাকলে আমি খুশি... আমি নিশ্চিন্ত... আর আমার মনে হবে আমি বেঁচে আছি অন্ততঃ। সো স্টপ ফলোইং মি, ওকে? আমার ব্যাপার, আমি বুঝে নেবো... তোর ভাবার দরকার নেই... ইউ আর আ নো’বডি ফর মি...”
অর্ক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল; মাঘ মাসের পড়ন্ত বিকেল... খুব ঠান্ডা একটা হাওয়া বইতে শুরু করেছে মাঠটায়... কয়েকটা মূহুর্ত কেটে গেল শীতল নিস্তব্ধতায়। অর্ক শেষ শক্তিটুকু একজোট করে বলল তারপর, “যাবি না... বাড়ি...?”
-“তোর ভাবার দরকার নেই”, প্রতিটি শব্দে আলাদা করে জোর দিল ঊর্মি।
অর্ক আর দাঁড়ালো না। পিছন ফিরে হাঁটা লাগালো। ঊর্মি তাকিয়ে রইল। ওকে চলে যেতে দেখে ভালো লাগছিল। আর ওই ক্যাবলা, ভীতু, সাধারণস্য সাধারণ ছেলেটাকে বয়ে বেড়াতে হবে না ওকে। যার সাথে জীবনের প্রতিটি বিশেষ মূহুর্ত সাধারণ হয়ে যায়। যার সাথে প্রতিটি এ্যাডভেঞ্চার তেতো হয়ে যায় বিরক্তি আর লজ্জায়। ঊর্মি এখন স্বাধীন! বুক ভরে একবার শ্বাস নিল ঊর্মি। তারপর ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করলো। একটু রিল্যাক্স করা দরকার। জায়গাটা অসাধারণ ফোটোজেনিক। কতগুলো দুরন্ত ছবি তোলা যাবে সূর্যাস্তের এফেক্ট’টাকে সাথে রেখে... ম্যাজিক লাইটে রঙিন হয়ে থাকা আজকের স্বাধীনতার দিন... পায়ে পায়ে এগোতে লাগলো ঊর্মি...
একটা ঝুড়িওয়ালা ঝুপসি বটগাছ... ক্লিক্...! ছবি উঠলো...!
আরেকটু এগিয়ে একটা আধপোড়ো মন্দির... ক্লিক্...! ক্লিক্...! আরো ছবি উঠলো...
এভাবে কতক্ষণ পেরোলো কে জানে! ঊর্মির খেয়াল হল তখন, যখন আলো কমে গেছে বলে আর ছবি উঠছে না ভালো... খেয়াল হল এমন করে যেন হঠাৎ নেশা কেটে গেছে এক ঝলক জলের ঝাপটায়... খেয়াল হল, ফিরতে হবে...
ফেরার পথ ধরলো ঊর্মি। কিন্তু খানিক বাদেই মনে হল, এ যেন ঠিক পথ নয়... কই, এ জায়গাটা তো পেরিয়ে আসে নি ও... আলরাস্তার প্রতিটি চৌমাথায় মনে হতে লাগলো কম্পাস যেন ঘুরছে বনবন করে... ডানদিক-বাঁদিকে, সামনে-পিছনে, কোথাও কোনো তফাত নেই... মনে হতে লাগলো এ সব ব্ল্যাক ম্যাজিক... গোটা পৃথিবীটাই যেন জ্যামিতির ছবি হয়ে গেছে... ক্ষতবিক্ষত, ক্ষুধার্ত, অসংখ্য নানামাপের চতুর্ভূজ ছাড়া আর সব মিথ্যে... সব মিথ্যে...
সন্ধ্যা গাঢ় হল... শীতের উত্তুরে হাওয়া নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে লাগলো প্রতি মূহুর্তে... পুরোনো মন্দিরটা দু’বার পেরোলো, কিন্তু বটগাছ’টা কে জানে কেন কিছুতেই পাচ্ছে না খুঁজে... ব্যাগের ভেতর জল খুঁজলো ঊর্মি... গলা শুকিয়ে আসছে বারবার... মাথা ঘুরছে না কি? কেমন যেন মনে হচ্ছে, যেন একটা প্রতিধ্বনি দৌড়ে বেড়াচ্ছে আদিগন্ত শূণ্যতা জুড়ে, “আমি একাই ভালো আছি... লিভ মি আলোন, প্লিজ...!”
দম আটকে আসতে লাগলো। চিৎকার করতে গিয়ে একটা অদ্ভূত, বিকৃত স্বর বের হল গলা থেকে... তখনই, হঠাৎ, বিদ্যুৎচমকের মত মনে পড়লো মোবাইল’টার কথা! একটা ফোন, ব্যাস, তাহলেই তো আর কোনো চিন্তা করতে হবে না। কেউ না কেউ এসে পৌঁছাবেই ওকে নিতে!
কোনোক্রমে ব্যাগ হাতড়ে মোবাইল’টা বের করল ঊর্মি... আর বুকের ভেতর’টা যেন ফাঁকা হয়ে গেল তক্ষুনি... নেটওয়ার্কের ঘরে জ্বলজ্বল করছে শূণ্য... ঊর্মি ধপ করে বসে পড়লো মাটিতে... ...
আচ্ছা, অর্ক কি চলে গেছে? না কি... না কি স্টেশনে বসে এখনও অপেক্ষা করছে ওর জন্য? আধোঅন্ধকারে মরীচিকার মত একটা ছবি যেন দেখতে পেল ঊর্মি... যেন অর্ক একা বসে আছে ফাঁকা স্টেশনের একটা বেঞ্চে... বারবার ঘড়ি দেখছে... ঘুরে ঘুরে চাইছে লাল মাটির রাস্তাটার দিকে... ভাবছে, ‘কি করছে ঊর্মি’টা? এখনও ফিরল না?’
অন্ধকার হয়ে গেছে... এইবার কি ওকে খুঁজতে আসবে না অর্ক একবার?
অর্ক...? চলে গেছিস রে…?
Tag :
এমনি গল্প,
দ্য আনসিঙ্কেব্ল্ / এক
By : Sayantari Ghoshআজকে একটা অন্যরকম গপ্পো শোনাই তবে...
বিলিতি গপ্পো... তবে গল্প হলেও খাঁটি সত্যি... হাতেনাতে প্রমাণ আছে...
গল্প মানে আসলে এক সাহেবের কথা। আর একটা জাহাজের... খোলসা করেই বলি বরং...
সাহেবের নাম মরগ্যান রবার্টসন। আমেরিকার মানুষ।
সমুদ্র ভালোবাসতেন তখন থেকে যখন তাঁর বয়স আট কি দশ...! ক্যাবিনবয়ের চাকরি নিয়ে কোন ছোট্টবেলায় জাহাজে উঠে পরা আর দীর্ঘদিন ধরে ভেসে চলা...এই নিয়েই কাটিয়েছিলেন প্রায় সারাটা জীবন... দেখতে দেখতে ক্যাবিনবয় জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে গেল অভিজ্ঞতার জোরে...শেষকালে, ১৮৭৭ সালে, সমুদ্র আলতো হাতে ক্লান্তি এঁকে দিল তাঁর চোখে... কূল টানলো... ফিরে এলেন দেশে...
পাঁচমেশালি কাজে আরো কিছুদিন কাটলো... কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই দেখতেন মন জুড়ে আছে সমুদ্র, শ্বাসজুড়ে নোনা হাওয়া আর বুক ভর্তি হাজার একটা গল্প ওই নীল জলের রহস্য ছোঁয়ানো...
মরগ্যান সাহেব কলম ধরলেন। সাল'টা ১৮৯৮। গল্প লিখলেন... বেশ বড় গল্প...
একটা জাহাজের গল্প... নাম 'টাইটান'; সে তো জাহাজ নয়, ভাসমান শহর যেন...! লোকে বলত অত বড় জাহাজ ডুবতে পারে না...৮০০ ফুট লম্বা, পঁচাত্তর হাজার টন তার ওজন... সে সময়কার প্রযুক্তিবিদ্যার বিস্ময়কন্যা...!
সমুদ্রে ভাসল টাইটান... রুমাল উড়িয়ে বিদায় জানাল ৩০০০ যাত্রীর আত্মীয়-পরিজন...যাত্রীরাও যে সে লোক নয়...! রাজসিক ওই জাহাজে যাওয়ার খরচ-খরচা কম নাকি...? জাহাজে যারা ছিলেন সবাই ইউরোপ আর আমেরিকার অতি উচ্চবিত্ত...!
তখন এপ্রিল মাস। রাতের অন্ধকার বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে তখন। আনন্দে উল্লাসে, হাসির লহরায় আতলান্তিকের জল আর আকাশ ধুইয়ে তরতর করে ছুটে চলেছে টাইটান... ক্যাপ্টেন দেখেনিলেন, আকাশে আলতো কুয়াশা, জাহাজের গতিবেগ ২৫ নট/ঘন্টা। যাত্রীরা অত হুঁশে নেই অবশ্য তখন... অনেকেই নেশায় একটু বেসামাল...
জায়গাটা টেরানোভার থেকে চারশো মাইল মত দূরে...
হঠাত্ খুব জোরে কেঁপে উঠল গোটা জাহাজ... আর সঙ্গে একটা প্রচন্ড শব্দ... অনেকেই ছুটে বেরিয়ে এলেন জাহাজের ডেকে...
একটা শব্দ মুখে মুখে প্রতিধ্বনির মত ঘুরে ঘুরে বেড়াল কিছুক্ষণ... আইসবার্গ...!!
তারপর কিছু টুকরো আর্তনাদ, বেপরোয়া চেষ্টা, আর যুদ্ধ... বাঁচার...!!!
টাইটান কূলে ভেড়েনি আর কখনও... ৩০০০ যাত্রীর জাহাজে লাইফবোট ছিল মাত্র ২৪টা... তাও বিপর্যয়ের সময় কাজে লাগানো যায় নি সেভাবে...
১৩জন বেঁচেছিল...
সমুদ্র গিলে খেয়েছিল বাকি সমস্তক'টা প্রাণ আর 'দ্য আনসিঙ্কেব্ল্' টাইটানকে...!!
................................................
মরগ্যান সাহেব লেখাটির নাম দেন 'দ্য রেক অফ দ্য টাইটান'...
পড়া হল তো...?গল্পটা কি কোনোভাবে চেনা চেনা লাগে...? নাম... জায়গা... পরিস্থিতি... সংখ্যা... সব...?
হ্যাঁ... আমাদের চেনা লাগা'টা স্বাভাবিক... 'টাইটানিক' আমাদের কাছে ইতিহাসের মত... বহুপঠিত...
আর সিনেমাটি তো চোখে এঁকে দিয়ে গেছে টাইটানিকের আটলান্টিকে তলিয়ে যাবার দৃশ্য...!
তাই এ গল্প'টা আমরা জানি... ঘটা করে এ গল্প লিখে ছাপাতে গেলে কোন প্রকাশকই রাজী হবেন না...
মরগ্যান সাহেবের গল্পটিও সেভাবে কেউ ছাপেনি...!
তবে কারণ'টা অন্য ছিল।
প্রকাশক'রা বলেছিলেন, এ'সব সমুদ্রনাবিকের কষ্টকল্পনা...! ও রকম জাহাজ তৈরী হতেই পারেনা; আর তৈরী হলেও ডুবে যেতে...?? কিছুতে কিছুতে পারেনা...!!
.................................................
মরগ্যান রবার্টসন এ গল্প লিখেছিলেন ১৮৯৮-এ...
১৯১২র চোদ্দ'ই এপ্রিল টাইটানিক আতলান্টিকে তলিয়ে যাবার চোদ্দ বছর আগে...!
Tag :
সত্যিকারের গল্প,


