Popular Post

দ্য আনসিঙ্কেব্‌ল্‌ / এক

By : Sayantari Ghosh

আজকে একটা অন্যরকম গপ্পো শোনাই তবে...

বিলিতি গপ্পো... তবে গল্প হলেও খাঁটি সত্যি... হাতেনাতে প্রমাণ আছে...
গল্প মানে আসলে এক সাহেবের কথা। আর একটা জাহাজের... খোলসা করেই বলি বরং...

সাহেবের নাম মরগ্যান রবার্টসন। আমেরিকার মানুষ।
সমুদ্র ভালোবাসতেন তখন থেকে যখন তাঁর বয়স আট কি দশ...! ক্যাবিনবয়ের চাকরি নিয়ে কোন ছোট্টবেলায় জাহাজে উঠে পরা আর দীর্ঘদিন ধরে ভেসে চলা...এই নিয়েই কাটিয়েছিলেন প্রায় সারাটা জীবন... দেখতে দেখতে ক্যাবিনবয় জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে গেল অভিজ্ঞতার জোরে...শেষকালে, ১৮৭৭ সালে, সমুদ্র আলতো হাতে ক্লান্তি এঁকে দিল তাঁর চোখে... কূল টানলো... ফিরে এলেন দেশে...

পাঁচমেশালি কাজে আরো কিছুদিন কাটলো... কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই দেখতেন মন জুড়ে আছে সমুদ্র, শ্বাসজুড়ে নোনা হাওয়া আর বুক ভর্তি হাজার একটা গল্প ওই নীল জলের রহস্য ছোঁয়ানো...

মরগ্যান সাহেব কলম ধরলেন। সাল'টা ১৮৯৮। গল্প লিখলেন... বেশ বড় গল্প...
একটা জাহাজের গল্প... নাম 'টাইটান'; সে তো জাহাজ নয়, ভাসমান শহর যেন...! লোকে বলত অত বড় জাহাজ ডুবতে পারে না...৮০০ ফুট লম্বা, পঁচাত্তর হাজার টন তার ওজন... সে সময়কার প্রযুক্তিবিদ্যার বিস্ময়কন্যা...!
সমুদ্রে ভাসল টাইটান... রুমাল উড়িয়ে বিদায় জানাল ৩০০০ যাত্রীর আত্মীয়-পরিজন...যাত্রীরাও যে সে লোক নয়...! রাজসিক ওই জাহাজে যাওয়ার খরচ-খরচা কম নাকি...? জাহাজে যারা ছিলেন সবাই ইউরোপ আর আমেরিকার অতি উচ্চবিত্ত...!

তখন এপ্রিল মাস। রাতের অন্ধকার বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে তখন। আনন্দে উল্লাসে, হাসির লহরায় আতলান্তিকের জল আর আকাশ ধুইয়ে তরতর করে ছুটে চলেছে টাইটান... ক্যাপ্টেন দেখেনিলেন, আকাশে আলতো কুয়াশা, জাহাজের গতিবেগ ২৫ নট/ঘন্টা। যাত্রীরা অত হুঁশে নেই অবশ্য তখন... অনেকেই নেশায় একটু বেসামাল...
জায়গাটা টেরানোভার থেকে চারশো মাইল মত দূরে...
হঠাত্‌ খুব জোরে কেঁপে উঠল গোটা জাহাজ... আর সঙ্গে একটা প্রচন্ড শব্দ... অনেকেই ছুটে বেরিয়ে এলেন জাহাজের ডেকে...
একটা শব্দ মুখে মুখে প্রতিধ্বনির মত ঘুরে ঘুরে বেড়াল কিছুক্ষণ... আইসবার্গ...!!
তারপর কিছু টুকরো আর্তনাদ, বেপরোয়া চেষ্টা, আর যুদ্ধ... বাঁচার...!!!

টাইটান কূলে ভেড়েনি আর কখনও... ৩০০০ যাত্রীর জাহাজে লাইফবোট ছিল মাত্র ২৪টা... তাও বিপর্যয়ের সময় কাজে লাগানো যায় নি সেভাবে...
১৩জন বেঁচেছিল...
সমুদ্র গিলে খেয়েছিল বাকি সমস্তক'টা প্রাণ আর 'দ্য আনসিঙ্কেব্‌ল্‌' টাইটানকে...!!

................................................

মরগ্যান সাহেব লেখাটির নাম দেন 'দ্য রেক অফ দ্য টাইটান'...

পড়া হল তো...?গল্পটা কি কোনোভাবে চেনা চেনা লাগে...? নাম... জায়গা... পরিস্থিতি... সংখ্যা... সব...?

হ্যাঁ... আমাদের চেনা লাগা'টা স্বাভাবিক... 'টাইটানিক' আমাদের কাছে ইতিহাসের মত... বহুপঠিত...
আর সিনেমাটি তো চোখে এঁকে দিয়ে গেছে টাইটানিকের আটলান্টিকে তলিয়ে যাবার দৃশ্য...!

তাই এ গল্প'টা আমরা জানি... ঘটা করে এ গল্প লিখে ছাপাতে গেলে কোন প্রকাশকই রাজী হবেন না...

মরগ্যান সাহেবের গল্পটিও সেভাবে কেউ ছাপেনি...!
তবে কারণ'টা অন্য ছিল।
প্রকাশক'রা বলেছিলেন, এ'সব সমুদ্রনাবিকের কষ্টকল্পনা...! ও রকম জাহাজ তৈরী হতেই পারেনা; আর তৈরী হলেও ডুবে যেতে...?? কিছুতে কিছুতে পারেনা...!!

.................................................

মরগ্যান রবার্টসন এ গল্প লিখেছিলেন ১৮৯৮-এ...
১৯১২র চোদ্দ'ই এপ্রিল টাইটানিক আতলান্টিকে তলিয়ে যাবার চোদ্দ বছর আগে...!

তিন ফোঁটা বৃষ্টি

By : Sayantari Ghosh


এক/মেঘদূত

ন’তলা লাইব্রেরী বিল্ডিং টার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললাম, “...আর এই হল জে.এন.ইউ. এর সেই বিখ্যাত লাইব্রেরী... হল দ্যাখা? তুই ফর্ম তুলতে এসেছিস না জে.এন.ইউ. ঘুরতে বল তো?”

ইন্দ্র অনেকক্ষন লাইব্রেরীটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল; তারপর বলল, “...আর এই পুরো ন’তলা খালি বইয়ে ঠাসা... ভাবতে কি ব্যাপক লাগে, তাই না?”

বই নিয়ে আদিখ্যেতা ব্যাপার'টা আমি কোনোদিনই বুঝি না, তাই তেমন ‘ব্যাপক’ কিছু অনুভব করতে পারলাম না বটে, কিন্তু নতুন আলাপী ছেলে, তদুপরি যদি সে এক ভালো বন্ধুর ভালো বন্ধু হয়, দুম করে তার কথায় বাধ সাধা যায় না... তাই আমার সেই ল্যান্ডমার্ক হাসিটা হেসে দিলাম যেটার কোনো মানে হয় না... তারপর বললাম, “বাঁদিকের রাস্তাটা ধরি...? তোকে বাসে তুলে দেব টি-পয়েন্ট থেকে... সোজা আই.আই.টির গেটে নামাবে তোকে...”

“ওকে! দ্যাটস গ্রেট...! একটা কথা বলি রিনি, তোর হাসিটা কিন্তু দারুন... আর... আই সোয়্যার, আমার মাথার যা অবস্থা, তুই এখানে আমায় ছেড়ে গেলে আমি বেমালুম হারিয়ে যাবো...”

কথাটার আদৌ কোন অন্তর্নিহিত অর্থ আছে কিনা ভাবতে যাবো, এ সময় আলতো করে যোগ করল ইন্দ্র, “সো কনফিউসিং... দীস জে.এন.ইউ. রোডস আর...”

দুজনে লাইব্রেরীর পিছনের আঁকাবাঁকা রাস্তাটা ধরলাম... এ সময়টায় গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে হলুদ রঙের একটা ফুল ফোটে... বড় বড় গাছে থোকা থোকা ফুল... নাম জানিনা সেগুলোর... তবে ভারি ভাল লাগে... একটা আলাদা স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে যায় আমার জংলা ইউনিভার্সিটি জুড়ে...

“এ ফুলগুলো বেশ, তাই না?” ইন্দ্র বলল, “আমাদের ক্যাম্পাসে লাগায় না কেন.......”

ওর কথা শেষ হল না... একটা বাজ পড়ল... বোধহয় খুব কাছেই কোথাও... আকাশে ছায়া ছিল সকাল থেকেই আজ...

“সর্বনাশ! বৃষ্টি নামাবে নাকি?” একরাশ বিরক্তি নিয়ে আকাশের দিকে তাকাল ইন্দ্র...
“সর্বনাশের কি আছে রে? হোক, হোক... কতদিন ভিজিনি... বৃষ্টি হয় এ দেশে...? হচ্ছে, তো তাতে এত বিরক্তি কিসের শুনি?!” আমার তিনমাসের জমা অভিমান ওর ওপরেই গিয়ে পড়ল, তারপর সামলে নিয়ে বললাম, “ইয়ে... তুই ছাতা এনেছিস? না হলে আমারটা নে... আই.আই.টি গেট থেকে তোর হস্টেল তো অনেকটা...”

“না না, ঠিক আছে...” মাথা নেড়ে বলল ও।

“এনেছিস কি ছাতা?” জোরালো প্রশ্ন!

“নাহ্‌!” এবার স্বীকারোক্তি।

তেরছা জলের ফোঁটাগুলো একে একে ছুঁতে শুরু করেছে তখন... ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে দিলাম ওকে,  “নে ধর!”

হাত বাড়িয়ে ছাতাটা নিয়ে বলল, “পরশু দেবু যাবেই তো আমার ওখানে... ওকে দিয়ে দেব... আর ইয়ে, থ্যাঙ্কস!”

পায়ে পায়ে টি পয়েন্ট বাসস্টপে এসে পড়লাম... একে উইক ডে, দুপুর দুটো, তায় বৃষ্টি আসছে... বাসস্টপ একেবারে খালি...

“তুই যাবি কি করে?” হাওয়া আর জল দুয়ের তেজ বাড়ছে দেখে ধীরে ধীরে জিগেস করল ইন্দ্র, “হস্টেল ঢোকার আগেই নেমে যাবে মনে হচ্ছে তো... ভিজে যাবি যে...!”

আমি একগাল হেসে বললাম, “ভিজবোই তো! আমি তোকে বাসে তুলে, চটি খুলে হাতে নিয়ে, চন্দ্রভাগা হয়ে ঘুরে ঘুরে হস্টেলে ফিরবো... আজ নামুক বৃষ্টি... খুব ভিজবো...!!”

“ওফ্‌! আবার সেই সব্বোনেশে হাসি!”
“ধুর!” হেসে বললাম আমি।
“ওই তো আবার!”
“এ্যাই! চুপ কর তো...! যা, হাসবো না আর...”

কড়কড় করে আরেকটা বাজ পড়ল।
“এই রিনি, তুই চলে যা... আমি বাস এলে চলে যাবো...” আকাশের দিকে তাকিয়ে ভীষণ ভুরু কুঁচকে বল ইন্দ্র।
“মানে? এরপর যদি তুই হারিয়ে যাস, বা একা পেয়ে কেউ তোকে কিডন্এযাপ করে ফ্যালে, তখন দেবু বাবাজি যে এসে আমাকে চেপে ধরবে, তার বেলা? "
"যা না বাবা... চলে যা..." 
একটু কড়া করেই বলল যেন। আচমকা এমন কথা শুনে একটু অবাকই হয়ে গেলাম, "এমন কি বললাম বাবা, যে তুই এত্ত রেগে গেলি... ওকে, চলে যাচ্ছি, টা টা...”
“রেগে? রাগতে যাবো কেন? রিকোয়েস্ট করছি... এমন কাজলা দিন, বৃষ্টি'টা জমিয়ে নেমেছে, রাস্তা'টা হলুদ ফুলের পাপড়ি মেখে একটা দারুণ রোম্যান্টিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডি করে বসে আছে... এর মাঝখান দিয়ে  তুই ভিজতে ভিজতে যা না...! আমি একটু দেখি...”
“ধ্যাত্‌!!”
........................................................................................

সেদিন সত্যিই চূড়ান্ত ভিজে ফিরেছিলাম হস্টেল... অতসী ঘরের দরজা খুলে রেগে গিয়ে চিত্কার করে উঠেছিল, “আবার সখ করে ভিজেছিস?! হাজার বার বলেছি না অসুখ করলে আমি তোকে দেখতে পারব না... কথা কানে...”

ওর কথা কানে না নিয়েই ওর গলা জড়িয়ে ধরেছিলাম... খুব খুব হেসেছিলাম ওকে জড়িয়ে ধরে... ও প্রাণপণে চেঁচাচ্ছিল, মনে আছে, “ছাড় ছাড়! দিলো রে, আমাকেও ভিজিয়ে দিলো...!!”

আমিও মনে মনে বলেছিলাম... আমাকেও ভিজিয়ে দিলো... আমাকেও ভিজিয়ে দিলো...



দুই/বৃষ্টিনেশা


রাত হলে শ্রীরাম সেন্টর থেকে ফেরা এত মুশকিল হতে পারে, ভাবিনি...!

ফোক ডান্স-এর শো ছিল একটা, আমার থিয়েটার পেপারের প্রজেক্টের পার্ট ছিল এটার রিভিউ সাবমিশন... শো শেষ হয়েছে পৌনে এগারোটায়; বারোটা বাজতে চলল, একটা ফিরতি অটো নেই কোত্থাও...!! আর তার কারণ বোধহয় এই ছিপছিপ বৃষ্টিটা...! ধুর! আজকেই নামতে হল...!? দিল্লি শহরে অগুনতি দিন অসংখ্য বার আকুল প্রার্থনা করেছি এক পশলা বৃষ্টির... তখন কোথায় কি? আর আজ... এই অক্টোবরে, রাতদুপুরে... নাহ্‌! জ্বালালে...!

“ছটফট করছিস কেন?” দোকানটার বন্ধ শাটারে হেলান দিয়ে বলল ইন্দ্র, “আর একটু ওয়েট কর... বৃষ্টিটা থামলেই পেয়ে যাবো কিছু একটা...”

“আরো ওয়েট??!” আমার বিচ্ছিরি লাগছিল, শীতও লাগছিল খুব, “বারোটা বাজল... হস্টেলে ইনটাইম নেই মানে কি যা খুশি তাই...? রাত বারোটা, ইন্দ্র...! ধ্যাত্‌ ! আমার ভাবতেই কেমন লাগছে... অতসী খুব বকা লাগাবে আমায়... দেবু'টা যখন আসতে পারল না আজ, তখন থেকেই কেমন একটা যেন লাগছে আমার...”

“আররে! দেবু আসতে পারে নি সেটা খচখচ করছে এখনও... আর আমি যে এলাম? তার বেলা?”

গলার স্বরে ও কি? অভিমান মনে হল? একটু হাসি এম্নিই চলে এল ঠোঁটে, “তুই যে আসবি, আমি জানতাম...”, বললাম থেমে থেমে।

“তাই? সত্যি? আগে বলিস নি তো?”

এর কোন উত্তর হয় কি? ভাবছি... এমন সময় অটো-গোছের একটা কিছুকে দেখে সব ভাবনা গুলিয়ে গেল... দরদামের পথে না গিয়ে উঠে পড়লাম দুজনে। বৃষ্টিও ততক্ষনে জোর এসেছে... অটোর দু’পাশ দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে আসছে অতি উত্‌সাহী হিম-ছোঁয়ানো জল... মাঝখানের একটু শুকনোতে ঠাঁই নিলাম দুজনে...
দুজনেই ভিজে যাচ্ছি, বেশ বুঝছিলাম, কিন্তু বাঁচার বা বাঁচানোর উপায় জানা নেই যে...!

কোন কথা হল না! একটা কথাও না! শুধু বৃষ্টির মাতাল-মল্লার আর অটোওয়ালার এফ.এম-এ খুব নিচু স্বরে রাতজাগা মিঠে গান... একটার পর একটা...

অটো জে.এন.ইউ. এলো প্রথমে। তাপ্তী হস্টেলের গেটে আমার পিছু পিছু ইন্দ্রও নেমে এল। বৃষ্টি একটু ধরেছে ততক্ষনে...

“এই দ্যাখ! এসে গেলাম তো তাহলে... তখনই বলছিলাম ছটফট করিস না... ক’টা বাজে দেখি?” মোবাইলে সময় দেখে একটু হাসল ইন্দ্র, “শোন, অতসী কে বলিস যে আমি এসেছিলাম তোকে ছাড়তে... আর বলিস একটু কম চেঁচাতে... বুঝলি?”

হাসলাম আমি। বললাম, “বেশ! তাই বলে দেবো ওকে...”
“চলি তাহলে? ঘুমিয়ে পড় গে যা... গুড নাইট...”
“সাবধানে যাস... গুড নাইট!”

অটোটা তাপ্তীর সামনে থেকে শার্প টার্ন নিয়ে রিং রোড ধরা অব্দি সিঁড়িতেই দাঁড়ালাম আমি। তারপর পা বাড়ালাম রুমের দিকে... তখুনি মোবাইলে ছোট্ট কাঁপুনি... মেসেজ... হ্যাঁ... তারই বটে...
........................................................................................................
Not everything should be said clearly...
Not everything could be touched distinctly...
Many of them are better felt than told...
Like Faith.
Like Love.
Like God.
........................................................................................................
আচ্ছা, মাঝেমধ্যেই রাতবিরেতে এরকম বৃষ্টি হতে পারে তো...! দিব্বি হয় তাহলে...!


তিন/একদা নিদ্রাহীন রাতে 

ন’টা বেজে যাওয়ার পরও আমি রাতের খাবার খেতে গেলাম না দেখে অতসী উঠে এসে কপালে হাত ছোঁয়াল, “কই রে? জ্বর-টর নেই তো দেখছি... খাবি না? একটু কিছু এনে দিই মেস থেকে...? খেয়ে নে...?”

আমি শুয়ে শুয়ে চোখ না খুলেই মাথা নাড়ালাম। খাবো না।

“কেন?”, কারন খুঁজে বেড়ানোটা ফিজিক্সের লোকেদের বদ অভ্যাস, “কি হয়েছেটা কি?”
“কিছু না” এবার মুখ খুলতেই হল, “মাঝে মাঝে উপোস দেওয়া ভাল... তুইই তো বলছিলি সেদিন...”
“হ্যাঁ, তা ভাল... কিন্তু এরকম পাংশুটে মুখ করে, উপুড় হয়ে খাটে শুয়ে উপোস দিতে বলেছি বলে তো মনে পড়ছে না...”

ওহ্‌! অতসীটা না... খুব তাড়াতাড়ি রেগে যায়...! আসলে ভালবাসে খুব... তাই... ওকে শান্ত করতে গেলে আবার উলটে রেগে গেলে চলে না...

“আচ্ছা বেশ, তাহলে উঠে বসে গল্পের বই পড়ি... তাহলে চলবে তো?” হেসে জিগেস করলাম।
“যা খুশি কর গে যা... আমি পেরিয়ার চললাম, কাল অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করতে হবে আমায়... খিদে পেলে ফোন করিস, কিছু কিনে নিয়ে ফিরব তাহলে...”

ওর সেই ধুমসো নীল ব্যাগটা ঘাড়ে ফেলে দরজা টেনে বেরিয়ে গেল অতসী। পরক্ষনেই আবার দরজা ঠেলে ঢুকলো, বলল, “বাব্বা! কি গুমোট করেছে রে... খুব মেঘ করেছে... ছাতা নিয়ে বেরোই, বুঝলি?”
“হুঁ...” কতকটা না শুনেই সায় দিলাম আমি।

অতসী বেরিয়ে গেল সব গুছিয়ে নিয়ে। আমি শুয়েই রইলাম খানিকক্ষণ। একবার মনে হল আলোটা নিভিয়ে দিই উঠে... আর তারপরই সন্ধ্যেবেলার ফোনটার টুকরো-টুকরো ক’টা লাইন ঘুরপাক খেতে লাগল গোটা ঘরটা জুড়ে... আলো নেভানোর কথাটা ভুলেই গেলাম নিমেষে...

এরকম কেন হল? কেন হল এরকম?

ইন্দ্র আগেই বলে দিতে পারত পিয়ালীর কথা। প্রথমেই বলে দিতে পারত... এতদিন বাদে... এভাবে বলার কি মানে হয়?

আমি নাকি ওর কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ...
আমি নাকি ওর সবচে' কাছের  বন্ধু...
আমাকে নাকি ও ভরসা করে, অসুবিধায় পড়লে আমার কথাই নাকি মনে হয় ওর...
ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ আমি...!! ওর নভেলের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় অধ্যায়...!

নিজেকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে ইচ্ছে করল যেন... এত গুরুত্ব চাই না, ইন্দ্র... রেখে দে তোর বইয়ের তাকে সাজিয়ে, অন্য কাউকে দিস বরং, সে হয়তঃ মাথায় করে রাখবে... এ গুরুত্বের মানে বোঝার মতন অত বুদ্ধি আমি ধরি না রে... একটা তল-না-পাওয়া কুয়োর মধ্যে পড়ে যাচ্ছি মনে হল... দমবন্ধ করা অন্ধকার... শ্বাস নিতে চাইছি, আর কেউ যেন মুখ চেপে ধরছে প্রতিবার...

তখুনি জানলার পর্দাটা আলতো করে হাত বোলালো হাতে... একমুঠো স্বস্তির মতন একটা ঠান্ডা হাওয়া ছুট্টে বুকের ভিতর ঢুকে পড়ল ফাঁক পেয়ে... চন্দ্রভাগার ওপাশের জঙ্গল থেকে কি একটা নাম-নেই ফুল বেহিসেবী গন্ধ বিলিয়েছে আজ হাওয়াতে...

ঘড়ি দেখলাম। রাত সাড়ে এগারোটা... ঘর বন্ধ করে লনে চলে এলাম পায়ে পায়ে... দোতলার কার্ণিশে একটানা ‘কেয়া কেয়া’ বলে ডাকছে একটা ময়ুরী... অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে... কারো ওপরে চরম অভিমানে মেঘের আদুরে মেয়ে রাত্রিবেলায় কাঁদতে বসেছে পা ছড়িয়ে... কি সুন্দর কাঁদতে পারে ও, তাই না? মনখারাপে, যন্ত্রণায় অবিশ্রান্ত কান্নায় সারা পৃথিবী ভাসাতে পারে ও...

আর আমি? আমি খালি হেসে উড়িয়ে দিতে পারি। আমার সব্বোনেশে হাসি ...!!
আমি খালি বলতে পারি, “ওভাবে বলিস না... নিজেকে কষ্ট দিস না...”
খালি বলতে পারি, “তোর কোনো ভুল হয় নি রে... দায় আমার... শুধু আমারই..”

ফাঁকা লনে একা দাঁড়িয়ে রইলাম... মনে হল হাতে-চোখে-বুকে যত কালি জমেছিল, সব ধুয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে... চোখের পাতায় আঙ্গুল ছুঁইয়ে, খোলা চুল ভিজিয়ে দিয়ে, ওড়না খসিয়ে দিয়ে আরো জোরে, ভীষণ জোরে বৃষ্টি নামল...

আমায় খেলা নে বৃষ্টি...! আজকে খেলা নে...! আজকে খেলা নে...!

নষ্টনীড়

By : Sayantari Ghosh


রবীন্দ্রনাথ ‘নষ্টনীড়’ লিখেছিলেন ১৯০১ সালে। সত্যজিত রায়ের ‘চারুলতা’ রিলিজ করে ১৯৬৪’র এপ্রিলে। ‘চারুলতা ২০১১’ এল ২০১১’তে,‘আমি চারুলতা’ আসতে চলেছে ২০১৩ তে। অর্থাৎ হিসেব অনুযায়ী দেখতে গেলে আমরা এক শতাব্দীকাল ধরে বার বার চারুলতার কাছে ফিরেছি। বার বার নানাভাবে আমরা চিনতে চেয়েছি সেই চারু কে ‘কাগজের আবরণ ভেদ করিয়া স্বামীকে অধিকার করা’ যার পক্ষে ‘দুরূহ’ হয়েছিল। ভূপতি,অমল আর চারু,এই তিনটি চরিত্রের হাত ধরে মনের আলো-অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে বেড়ানোটাকে বোধহয় ভালোবেসে ফেলেছি আমরা সকলেই। আরেকবার সেই একই অভিজ্ঞতা’কে অন্যভাবে অনুভব করতে গিয়েছিলাম স্টার থিয়েটার;‘যোজক’ সপ্তাহশেষের এক জমজমাট আসর বসিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মসার্ধশতবর্ষ উদ্‌যাপনে। আর সেই আসরের শেষ নাটক ছিল ‘নষ্টনীড়’। অবশ্য নাটক না বলে ‘যোজক’ তাদের পরিবেশনার নাম দিয়েছিল সিনে-প্লে,সিনেম্যাটিক থিয়েটার।



গৌতম হালদার নিজে সিনেমা ও নাট্যজগতের একজন সফল পরিচালক। এবং উনি ভীষণ ভার্সেটাইল। ওনার আরেকটি সাঙ্ঘাতিক গুণ হল,প্রিয় লেখকদের প্রিয়তম কাহিনীগুলি নিয়ে নাটকের ফাটাফাটি এক্সিকিউশনে উনি অনবদ্য। নান্দীকারের সফল নাটক ‘বড়দা’(মুন্সি প্রেমচন্দ),‘চোখ-গেল’ (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়),‘বাপ্পাদিত্য’ (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর),‘দুলিয়া’ (লীলা মজুমদার),‘সজন বাদিয়ার ঘাট’ (জসীমুদ্দিন) এবং আরো অনেক নাটক তাঁর এই দক্ষতার জলজ্যান্ত প্রমাণ। এবার ‘যোজক’এর সাথে উনি হাত দিয়েছেন শহর কোলকাতার প্রথম সিনে-প্লে নির্মানে;প্রথম পছন্দের কাহিনীকার অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ আর কাহিনী ‘নষ্টনীড়’। খবরটা কানে যেতেই প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলুম। অপেক্ষা ছিল সপ্তাহান্তের,প্রস্তুত ছিলাম চমকে যাওয়ার জন্য। একটা ভিন্ন জাতের আনন্দের জন্য যেটা মেলে পুরোনো চিঠির ভেতর বছর কুড়ি পরে নতুন কোন সংকেত আবিষ্কারে।

কিন্তু নাটকের দিন সকাল থেকে সব কেমন গোলমাল হয়ে গেল। কাজ মিলল না,তার ওপরে তুমুল বর্ষণ। বৃষ্টি মাথায় করে,কাদায় সালোয়ার লেপ্টে ফেলে,আধঘন্টা স্টার থিয়েটারের দরজার লাইন দিয়ে ঢুকতে পেলুম। চেনাশোনা নামের আনাগোনা চারদিকে,গৌতম হালদার,দুলাল লাহিরী,রীতাভরী,শুভ্রজিত... তবু কেন জানি না,কাজের চাপেই হয়তঃ,মনে মনে বেশ ভারাক্রান্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিল,সারাদিনের মত নাটকটাও ঝুলিয়ে দেবে নিশ্চয়ই। মুঠোফোনগুলি’কে নীরবতায় স্থান দেওয়ার হাল্কা কিছু পরিচিত অনুরোধ যখন চলছে,তখনও আমি নিজের আসনে একটু যেন অস্বস্তিতে। কিন্তু তারপর... তারপর যেন ডুবে গেলাম একটা যাদুমন্তরের ভেতরে। হুঁশ ফিরলো সমবেত হাততালির শব্দে। দু’ঘন্টা কোথা দিয়ে যেন পেরিয়ে গেছে। মনের ভেতর তখন শুধুই উথাল-পাথাল করছে হাজার’টা সংলাপ,হাজার’টা অনুভব।

‘নষ্টনীড়’এর কাহিনী নিয়ে তো আর নতুন করে কিছু বলার নেই। কাহিনী আমাদের চারু’র,যার অযথা-কাজে-আটকে-থাকা স্বামীর সময় হয় না তার দিকে তাকানোর। কেউ সে কথা মনে করিয়ে দিলেও তিনি চারুর সঙ্গী হিসেবে এনে দেন ‘শ্যালকজায়া মন্দাকিনীকে’। এ এক এমন গৃহস্থালীর গল্প যেখানে বিবাহিত জীবনের প্রাথমিক উচ্ছ্বলতাটাই নেই,যেখানে চারুলতা আর ভূপতি ‘নূতনত্বের স্বাদ না পাইয়াই উভয়ে উভয়ের কাছে পুরাতন পরিচিত অভ্যস্ত হইয়া গেল’। নিতান্ত একাকীত্বে,ঔদাসীন্যে স্থির হয়ে থাকা চারুর জীবনে একমাত্র নতুনত্ব যদি কিছু থেকে থাকে,তবে তা হল  ভূপতির পিসতুতো ভাই অমলের দৌরাত্ম,তার আবদার,তার নিত্যনতুন চাই-চাই। চারু’র সমস্যা ছিল এই যে ‘তাহার কাছে কেহ কিছু চায় না,অমল চায়-- সংসারে সেই একমাত্র প্রার্থীর রক্ষা না করিয়া সে থাকিতে পারে না।... প্রত্যেক বারেই চারুলতা আপত্তি প্রকাশ করিয়া কলহ করে এবং প্রত্যেক বারেই বহু যত্নে ও স্নেহে শৌখিন অমলের শখ মিটাইয়া দেয়...’ শুধু তাই নয়,চারুর পড়াশোনার সখ,তার বাগান করার গল্প,অমলের কাব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা,তার পান থেকে শুরু করে কার্পেটের জুতোর আবদার... সব মিলিয়ে এই সম্পর্কে লাগে এক খুব কাছের,বড় নিজের বন্ধুতার রঙ। কিন্তু অমল তো চারুর জীবনের চিরস্থায়ী সত্য নয়,সেই সত্যের নাম ভূপতি। সম্পর্কের এই দোলাচলের নাম’ই ‘নষ্টনীড়’।

কিন্তু এখানেই কি শেষ?তা নয়। সত্যজিত রায়ের চারুলতা আর রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড়ের একটা বড় তফাত শেষ দৃশ্যে। অমলের চলে যাওয়ায় চারুলতার ভেঙে পড়াতেই কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গল্পটাকে শেষ করে দেন নি। শেষ পর্যায়ে ভূপতির স্বগতোক্তি’তে বুঝতে পারি,এ কাহিনীর সারমর্ম শুধু ত্রিকোণ-প্রেম আর একাকীত্বেই শেষ হয়ে যায় না। দেখতে পাই,চারু অমল কে ভালোবাসে বুঝতে পেরে ভূপতি খুব সহজে ভাবতে পারে,‘আমার কথা সে একবার ভাবিয়া দেখিল না?... নির্জন বন্ধুহীন প্রবাসে প্রত্যহ তাহাকে সঙ্গদান করিতে হইবে?সমস্ত দিন পরিশ্রম করিয়া সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফিরিব তখন নিস্তব্ধ শোকপরায়ণা নারীকে লইয়া সেই সন্ধ্যা কী ভয়ানক হইয়া উঠিবে। ... যে আশ্রয় চূর্ণ হইয়া ভাঙিয়া গেছে তাহার ভাঙা ইঁটকাঠগুলা ফেলিয়া যাইতে পারিব না,কাঁধে করিয়া বহিয়া বেড়াইতে হইবে?’ চারু অমল কে ভালোবাসে বলে ভূপতি খুব সহজে বলতে পারে,তোমাকে সঙ্গে নিয়ে চলা?‘না,সে আমি পারিব না...’
এ তো খুব সহজ স্বাভাবিক বক্তব্য স্বামীর ক্ষেত্রে,তাই না?বিবাহিতা স্ত্রী পরপুরুষে সমর্পিত-প্রাণ বোঝার পরে এই মনোভাবই তো হওয়া উচিত পতিদেবের...! আজকের দিনেও অজস্র মানুষ ভূপতির সঙ্গে একমত হয়ে যাবেন। এর প্রতিবাদ করতে গেলে ফেমিনিস্ট আখ্যা জুটতে বাধ্য। কিন্তু একশ বছরেরও বেশি আগে রবীন্দ্রনাথের চারুলতা ভূপতির দয়াপরবশতা কে প্রত্যাখ্যান করেছে,দৃঢ়কন্ঠে বলেছে,‘না থাক্...!’ এই একবিংশ শতকেও ক’জন সহধর্মিনী চারুলতার মত বলতে পারে,‘না থাক্’...?

রবীন্দ্রনাথের চারুলতার এই কাহিনীকে জীবন্ত হতে দেখলাম সেদিন স্টারে। গৌতমবাবু গল্পের আধুনিকীকরনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেন নি। নাটকের সময় তাই ১৮৭০-৮০ তেই বাঁধা। কিন্তু শতাব্দীপ্রাচীন গল্পে এই শতকের রঙ লাগিয়েছে টেকনোলজি। আগে শুটিং হয়ে যাওয়া প্রি-এডিটেড কিছু দৃশ্য অসাধারণ আলো-শব্দের কারসাজিতে একাত্ম হয়ে গেছে স্টেজের লাইভ পারফর্মান্সের সাথে। চারুর জানলার বাইরে উন্মত্ত ঝড়,ছাদ থেকে চারুর ছুটতে ছুটতে ঘরে ফিরে আসা,জানলা দিয়ে দ্যাখা বাগানের দৃশ্য আর আয়নায় টিপ পরতে পরতে ‘বৌঠান’ ডাকের সাড়া দেওয়ার দৃশ্যগুলি রোমাঞ্চকর লাগে রীতিমত। Computer-Generated Imagery,যেটা মূলতঃ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ব্যবহার্য,তার তুলনাহীন ব্যবহারে তাক লেগে যায়। একাঙ্ক থিয়েটারের সীমা’কে ছাড়িয়ে স্ক্রিন আর সিনক্রোনাইজেশনের দূর্দান্ত নমুনা রেখে ‘যোজক’এর শিল্পীরা কার্যতঃ অবাক করে দেন দর্শককে। আর উপরি-পাওনা হিসেবে জুটে যায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্ঠের ভাষ্যপাঠ!
আগেই বলছিলাম,আমি যখন স্টার থেকে বেরোলাম সে দিন,মনের ভেতর সংলাপের ভিড়,অনুভবের আনাগোনা। একশ রকম যেন একসাথে খেলা করছে বুকের ভেতরে,কিন্তু তবু তার মধ্যে হলে ঢোকার আগের সেই মন-ভার’টা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে দেখলাম। তখন স্বপ্নের মত কতকিছু মনে হতে লাগল,মনে হল বাসা বাঁধতে গেলে যে খড়কুটোগুলো লাগে সেগুলোর নাম ভালোবাসা-ভালোবাসা... সেগুলোর রঙ নীল,সবুজ,গোলাপী,আকাশি,কমলা... এই যে ছুটছি,রোজ হাঁপাতে হাঁপাতে ডেলিরুটিনের কাজগুলো সামলে ফেলছি রোজ,যদি এক মূহুর্ত সময় দি নিজেকে ভাবার এ সবের মাঝে,‘আমি সেই রঙগুলো হারিয়ে ফেলিনি তো...?’ যদি ওটুকু সময় নষ্টই করি,খুব কি ক্ষতি হয়ে যাবে?

দেরি হয়ে গেছিল একটু। সাড়ে ন’টার সময় যখন হাতিবাগানের মোড়ে হাত দেখিয়ে বাস’টাকে দাঁড় করিয়ে উঠে পড়লাম,তখন একটা কথাই মনে হয়ে গায়ে কাঁটা দিল হঠাৎ,‘ভদ্রলোক আজও কি সাঙ্ঘাতিক ভাবে রেলেভেন্ট... উফফ...’

মুখোমুখি

By : Sayantari Ghosh





দীপনের কথা

অফিস থেকে ফিরে নিয়মমত ব্রিফকেস’টা টেবিলে নামিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয় দীপন। গত ছয়বছরে এটাই প্রতিদিন নিয়মিত দেখে আসছে তৃপ্তি। ও’ভাবে বসে পড়ার মানেই কাজের মেয়েটিকে ইশারা আসলে... আদা-দেওয়া বেশ কড়া একটা চায়ের না-বলা ফরমায়েস। চা শেষ করে একবার মিঠির ঘরে উঁকি দেবে দীপন... এটাও রোজ’ই। মিঠি তখন ঘুমায়; স্কুল থেকে ফিরে একটু ঘুমানোর অভ্যেস’টা তৃপ্তিই করিয়েছে ছোটো থেকে... তাহলে সন্ধ্যেটায় ফ্রেশ থাকে... হোমওয়ার্কগুলো করার সময় কম ঘ্যানঘ্যান করে। মিঠিকে ঘুমাতে দেখে স্নান সেরে এসে কম্পিউটারের সামনে বসে পড়বে দীপন... এই যে বসলো, সাড়ে ন’টায় তৃপ্তি খেতে ডাকার আগে সে উঠবে না... অফিসের কাজ, খানিক ফেসবুক, খানিক জি-টক... বন্ধুদের সাথে আড্ডা... কিছু পড়াশুনো, কিছু ফোটোব্লগ হাতড়ানো, কিছু নতুন বাজারে আসা ছবি-তোলার সরঞ্জাম নিয়ে জ্ঞানঅর্জন... শেষটায় স্রেফ গান শোনা... এই নিয়মের সাধারণভাবে কোন নড়চড় নেই।

দীপনের মাথায় এ সময়টায় হয়তঃ আরো কিছু ঘুরপাক খায় যে’সবের টের তৃপ্তি পায় না সেভাবে... অফিসের খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজের টুকরোটাকরা বাড়ি বয়ে এসে মুখ দেখিয়ে যায় রোজই... তবুও... বিষয়গুলি গড়পরতা... অন্ততঃ দীপনের কাছে তাদের আদল খুব পরিচিত। অফ-টপিক কিছু বড় একটা ঘটে না, তাই রুটিনের অন্যথাও হয় না বড় একটা।

কিন্তু সেদিনটা অন্যরকম ছিল।

ঘরে ঢুকে ব্রিফকেসটা নামিয়েই বেসিনের সামনে গিয়ে মুখে জলের ঝাপটা দিল দীপন। তারপর তোয়ালে আর ইস্ত্রি করে রাখা ধবধবে পায়জামা পাঞ্জাবী নিয়ে সটান স্নানে ঢুকে গেল। কাজের মেয়েটির থেকেও অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো আদা-দেওয়া চায়ের কাপখানা।

বাথরুমের দরজায় আলতো করে টোকা দিল তৃপ্তি, “শুনছো...? শরীর খারাপ লাগছে নাকি গো?”

দরজার ওপারে শাওয়ার চালিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঠায় ভিজছিল দীপন... তৃপ্তির কন্ঠস্বরের একটু সময় লাগলো চিন্তার জাল ছিঁড়ে ওর কাছ অব্দি পৌঁছতে, “কিছু হয় নি, ঠিক আছি,” উত্তর এল, “জাস্ট আ বিট টায়ার্ড...”

মোহরের মুখ’টা একটা ধোঁয়াটে সাইনবোর্ডের মত চোখের সামনে আটকে রয়েছে। সব দ্যাখা যাচ্ছে এ’পাশ থেকে ও’পাশ, কিন্তু সবের ভেতর সারমর্ম হয়ে বেরিয়ে আসছে ওই একটাই মুখ। কি ক্যাজুয়াল ছিল মোহর! কি আশ্চর্য্য! কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে আজ ওকে দ্যাখা-মাত্র কেমন যেন বোকা হয়ে গেল দীপন... একটা মূহুর্তের জন্য লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছে করলো ওর... ইচ্ছে হল এক্ষুণি ভিড়ের একটা যে কোন মুখ হয়ে যেতে... নিজেকে হারিয়ে ফেলে ভিড়ের ফাঁক থেকে উঁকি দিয়ে মোহরকে দেখতে ইচ্ছে হল... সত্যি, মোহর’ই...  শাড়ি, খোঁপা, চশমা, সিঁদূর... তবু, মোহর’ই।

তখুনি কি করে কে জানে মোহরের চোখ ঘুরলো এদিকে... আর এক সেকেন্ডের ভেতরে অজস্র ভয় এসে গলা টিপে ধরলো দীপনের... অগুনতি প্রশ্নের উত্তর হাতড়াতে লাগলো মাথার ভেতরে ও... “বম্বে পড়তে তুই একা যাস দীপ?”... “একটা চিঠি লিখতে ইচ্ছে হল না তোর?”... “আট’টা বছর... জাস্ট ভ্যানিশ হয়ে রইলি?” “আমি কি আদৌ ছিলামই না কখনো কোথাও?”... ... “কি করে পারলি রে?”...
চাপা পড়ে যাচ্ছিলো দীপন নিজের কল্পনাতেই... হাবুডুবু খাচ্ছিলো রীতিমত...

মোহর’টা অথচ...

কেমন পাগলিই রয়ে গেছে... চোখদুটোয় একটা অবাক-হাসি নিয়ে ছুটে এল... “দীপ...!! কেমন আছিস রে??” হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল কফি হাউসে, “আজ কোনো কথা শুনছি না... বউকে ফোন করে দে, বল আধ ঘন্টা দেরী হবে... আরে ধূর, জিগেসই করিনি... বিয়ে থা করেছিস তো?”

কত কথা বলল... জিগেস করলো আরো কত কি... কলেজের চাকরি, ছয় বছরের ছেলে, লেখালিখিতে ছেদ, নতুন করে রিসার্চের প্ল্যানিং... কত কত কথা।

শুধু বলল না কেন চিঠি লিখিস নি...

স্নান সেরে কম্পিউটারে বসলো দীপন... পনের মিনিট পরে উঠে পড়লো... শুলো খানিক... তাক থেকে একটা উপন্যাস নামিয়ে পড়তে নিয়ে দ্বিতীয় পাতায় আটকে গেল... একবার ভীষণ ইচ্ছে করলো একটা ফোন করতে; কিন্তু করা গেল না... তারপর ইচ্ছে করলো মিঠির ঘরে গিয়ে তৃপ্তিকে বলতে, যে আজ ওকে আর হোমওয়ার্ক করিও না, আজ ও একটু খেলুক আমার সাথে, আজ ওকে একটা গল্প শোনাই বরং... একটুবাদে সে ইচ্ছেটাও তেতো হয়ে গেল... তারপর আর কিছু ইচ্ছেই করল না।

বরের কথা জিজ্ঞাসাই করা হল না মেয়েটাকে... “হিংসে হল নাকি দীপন?” বুকের ভেতরের আয়নাটা বাঁকা হেসে বলল, “জেলাস! জেলাস! নাকি ইনসিকিউরিটি? না কি স্রেফ ভয়??”

জানি না জানি না... উফফফ...

কেন যে বলল না কেন চিঠি লিখিস নি...


মোহরের কথা


মোহর বাইরের গ্রিলের দরজাটা ঠেলতেই দোতলার জানলা থেকে বুয়ান উঁকি দিল, “এনেছো...? মা?”

একগাল হেসে হাতের আনন্দ পাবলিশার্সের প্যাকেটটা উঁচু করে দ্যাখালো মোহর। ঘরে ঢুকতেই ওই প্যাকেট আর তার ভেতরের টিনটিনের কমিকস খুলে মেঝেতেই বসে পড়লো বুয়ান; মোহর ওকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে ওর পাশ’টাতেই বসলো শাড়িটা এলিয়ে, হাঁক পাড়লো ভেতর ঘরের দিকে, “কাজু...! আজ ফুলকপি কাটবি রাত্তিরের জন্য! বৃষ্টি হয়েছে এদিকে দুপুরে? জামাকাপড়গুলো তুলেছিস?

-“হ্যাঁ বৌদি,” ঘাড় হেলিয়ে সায় দেয় কাজু; হাঁক শোনামাত্র সে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল, “কিন্তু বৌদি, মা-মনি আজ আমায় এমনি এম্নিই বকেছে... একটুখন কথা বলতে গেসলাম পাশের বাড়ির নমিতার সাথে, তাতে কি এমন মহাভারত’টা অসুদ্দ হয় বল ত?”

ছ’টা নাগাদ অনিন্দ্য ফিরল অফিস থেকে। তার আগের সময়টা কাজুর সাথে চেঁচামেচি করতে করতেই চলে গেল মোহরের। শাশুড়ি’মাকে বোঝালেও বুঝবেন না, তাই রোজদিন তাকে কাজুর সাথে চেঁচিয়েই গলা ফাটাতে হয় এ’সব সমস্যার সালিশি করতে এসে। অনিন্দ্য ঢুকেই হইচই শুরু করে দিল, “আজ বাইরে ডিনার!!!” কবে থেকে কি একটা এরিয়ার আটকে ছিল, সেটা নাকি আজ এসেছে।

-- “সাউথ সিটি যাই চলো...” মোহরের কোমর জড়িয়ে ধরে অনিন্দ্য বলল, “বুয়ান ওখানে বেশ এনজয় করে... আর ওদের ফুডকোর্ট’টা জাস্ট অস্যম!”
-- “চলো,” হাসিমুখে বলল মোহর, পরক্ষণেই চিন্তায় পড়ে গেল হঠাত, “এতগুলো আটা মাখালাম গো কাজুকে দিয়ে... আর গুচ্ছের ফুলকপি...”
-- “আরে দূর... ফ্রিজে রেখে দাও...”

সাউথসিটি থেকে ফিরতে রাত হল। ঘরে ঢুকেই আঁচল কোমরে গুঁজে বিছানা করতে লাগলো মোহর; বুয়ানটা তখন প্রায় ঘুমিয়েই গেছে।

পৌনে বারোটা বাজলো মোহরের বিছানায় আসতে। ছাড়া জামাকাপড়গুলো ভাঁজ করে, বুয়ানের স্কুলের ব্যাগ আর ইউনিফর্ম গুছিয়ে, কাল সকালের রান্নার সবজি, ভাতের চাল, চায়ের পাতা, চিনি-হলুদ-তেল-নুনের কৌটোর সরেজমিনে করে, জলের বোতলগুলো ভরে শুতে শুতে একটু তো দেরী হয়’ই। এ’সব সকালের জন্যে ফেলে রাখলে মুশকিল। সাড়ে ন’টার ট্রেন, বাড়ি থেকে বেরোনো সাড়ে আটটায়... তাতেই কলেজ ঢুকতে ঢুকতে পৌনে এগারোটা বেজে যায়... তার আগে রান্না, অনিন্দ্যর টিফিন, বুয়ানের স্কুলবাস...

-- “আহ্‌...” বিছানায় শুয়েই সারাদিনের ক্লান্তিতে শিরদাঁড়া’টা টনটন করে ওঠে মোহরের। পাশে অনিন্দ্য প্রায় ঘুমন্ত। একটু যেন ইতস্ততঃ করলো মোহর, তারপর হাত বাড়িয়ে অনিন্দ্যর হাত’টা ধরলো।

--“হুম...?” অনিন্দ্য ঘুমায়নি, “কি? কিছু বলবে?”
--“হু... আজ... আজ জানো... কলেজস্ট্রিট গেছিলাম বুয়ানের একটা বই কিনতে...” ক’টা মূহুর্ত থামলো মোহর, “হঠাৎ দীপনের সাথে দ্যাখা হয়ে গেল, জানো?”

একটু নড়ে ওঠে অনিন্দ্য, হাতে ধরা হাত একটু শক্ত হয়, তারপর আলতো হেসে বলে, “আরেব্বাবা... তা, কেমন আছে সে? বহুদিন পরে দেখা তো...”

--“... আট বছর... পুরো আট বছর... বম্বে থেকে ফিরেছে সেটাই জানতাম না...”
--“হুমম...” একটুখানি চুপ করে গেল অনিন্দ্য, তারপর গলা আরো নামিয়ে বলল “ঝগড়া করলে?”
--“নাহ্‌,” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল মোহর, “ইচ্ছেই করলো না... আর ও খুব আনকম্ফোর্টেবল ছিল...”

কিছুক্ষণ আবার নিস্তব্ধতা। বাইরের বারান্দায় ঘড়িটাই খালি একা-একা প্রলাপ বকছে টিক টিক করে। কম্পিউটারের স্ক্রিনসেভারে চাপা আলোয় ঘুরপাক খাচ্ছে একটা বেগুনি রঙের চতুর্ভূজ।

অনিন্দ্য মোহরের চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দেয় কপালের ওপর থেকে, “এই... মনখারাপ করে না, লক্ষ্মীটি...”

মোহর আস্তে আস্তে সেঁধিয়ে যায় অনিন্দ্যর বুকের ভেতরে, থেমে থেমে বলে, “না গো... মন খারাপ করলোই না একটুও... আশ্চর্য্য ব্যাপার...”

“আশ্চর্য্য কি আর?” বললো স্ক্রিনসেভারের বেগুনি আলোর ট্রাপিজিয়মটা... তার চারটে হাত নিজেদের দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে গড়ে তখনো চেষ্টা করে চলেছে আপ্রাণ... যদি ওপারের জন’কে একটু ছোঁয়া যায় কোনোভাবে...

সেই তখন...

By : Sayantari Ghosh


তখন আমরা ক্লাস ইলেভন! আমার পালকের মতন হাল্কা নীল রঙের সাইকেলটা তখন ঝাঁ-চকচকে। আমার সবুজ রঙের প্রাণটাও! আজকাল দুটোতেই ভারী ঝুল পড়েছে... কতবার মুছে দিয়ে আসি... দু’দিনে আবার ধুলোয় ঢেকে যায়! নিজেকে বড় অসহায় লাগে তখন!

কিন্তু আজকালের কথা বাদ দাও... সেই তখনকার কথা বলছিলাম... তখন আমরা খালি ভিজতাম আর ভিজিয়ে দিতাম... ভাসতাম আর ভাসিয়ে নিতাম... আমরা পাঁচজন... খালি হাসতাম আর হাসিয়ে দিতাম!

বহু কথা, বহু সুর অগোছালো, এলোমেলো করে স্কুলচত্বর জুড়ে ফেলে রেখে এসেছি তখন... একশ রঙের রঙিন সুতো একসাথে খুলে ফেলে জট পাকিয়ে ফেলেছি... মাজিয়ারার মাঠে সাইকেল কাত করে শুইয়ে বুকের হাপরটাকে শান্ত করেছি গোলাপি রঙের মেঘজড়ানো স্বপ্ন দিয়ে... পাশাপাশি গোল হয়ে বসে হাঁ করে আকাশ দেখেছি... আর হিসেব করেছি, যেদিন আকাশ আমাদের হবে, কোনখানটার ভাগ কে নেবে?

আর তবুও কারা যেন বলে যে আমরা নাকি হিসেব-টিসেব বুঝতাম না তখন? তাদের কথা বিশ্বাস কোরো না গো...! ভুলভাল বকার আর জায়গা পায় না তারা! সবটুকুই তো হিসেববাঁধা ছিল... নেওয়া আর দেওয়ার রুটিনকরা গল্প... তবে যে বস্তুটির লেনদেন চলত, তার হিসেবী বোধবুদ্ধি বড়ই কম... সেটা বলতে পারো... বন্ধুত্ব ভালোবাসা যা খুশি নামে ডাকতে পারো সেটাকে...

সেদিক থেকে দেখলে অবিশ্যি তখন আমরা ভারি বোকা ছিলাম...!!

তখন প্রায় প্রতিদিন বিকেলে, পাহাড়ের যে দিকটায় ঝুপ করে খাদ নেমে গেছে, সেইদিকে পা ঝুলিয়ে সার বেঁধে বসে থাকতাম আমরা! সুয্যিটা কেন জানিনা আমাদের দেখে ভীষণ লজ্জা পেত; চুপটি করে মুখ লুকিয়ে আকাশ জুড়ে প্যাস্টেল নিয়ে হিজিবিজি কাটত... দক্ষিনের গাঢ় নীল শালবনটা থেকে একটা হাওয়া দিত তখন... কিরকম যেন একটা মিষ্টি গন্ধ ছিল তাতে... তখন আধচেনা লাগত... এখন সেটা একেবারে অচেনা হয়ে গেছে...!

হাওয়ার আর দোষ কি...? এখন তো অনেক অনেক কিছুই বদলে গেছে! ভোরের শিশির বদলায় নি, বলো? সাঁঝবেলার হিম বদলায় নি? কথা, সুর, সুতো, মাঠ, আকাশ... এমনকি আমরা অব্দি এত্ত বদলে গেছি, আর হাওয়া বদলালেই বুঝি দোষ??

ঠিক কবে থেকে এই বদলাবদলি খেয়াল করিনি, জানো! হঠাত্ একদিন দেখলাম, খাদের ধারে আমি একাই বসে আছি!! আমার সোনালি পঞ্চভূজ ভেঙে খানখান... একখানা আধমরা সরলরেখাও খুঁজে পেলাম না কোত্থাও!! সত্যি মানতে সাহস হল না... তাই একটা মিঠে ভ্রমকে মনের ঘরে আশ্রয় দিলাম...
সে ভাঙা ভাঙা ভীতু ভীতু গলায় বলতে থাকল, “ভরসা রাখ! সবকিছু তেমনিই আছে... খালি একটিবার দেখা হবার অপেক্ষা... ঠিক সেরকমই হাসি-গান-মজা-খুনসুটি করে কেটে যাবে বিকেলের পর বিকেল... দিনেরা ছুটি চাইবে... তোরাই দিতে পারবি না!!”

...আর ভ্রমের বউ চোরাপ্রার্থনা দমবন্ধ করে বিড়বিড় করত তখন, “ভগবান! সেভাবে যেন দেখাই না হয় এদের কোনদিন!!”

এভাবে চলল কিছুদিন! তারপর হাঁটা লাগালাম! হাঁটতে হাঁটতে আমার রাস্তা শুকিয়ে, পাকিয়ে, রোগা হয়ে, আস্তে আস্তে হারিয়েই গেল...

তারই মাঝে নুইয়ে পড়া তালগাছ আর ধুইয়ে দেওয়া বৃষ্টি জিগেস করে গেল হঠাত্ একদিন...
“...স্কুলচত্বরে আগে সুর খেলা করত বুঝি? কই? দেখলাম না ত...”

থেমে থেমে বললাম, “নিশ্চয়ই কেউ গুছিয়ে রাখে নি...আমরা ফেলে এসেছিলাম...”

এই-নিকানো উঠোন আর ঝিকঝিকানো দিঘিরা জানিয়ে গেল...
“...আজকে আমরা অনেকখানি জটপড়া রঙচঙে সুতো দেখলাম, জানো...?”
মাথা নিচু করে জবাব দিলাম, “ভুল হয়েছিল, ভাই... সেসব জট খোলাই হয়নি...”

এসব শুনে একদিন কেমন জানি লাগল... আবার খুঁজতে গেলাম চিলেকোঠার ঘরটা অনেক ঝক্কি করে... গিয়ে দেখি যা যেটুকু ছিল তাও মিলিয়ে যাচ্ছে যেন... সেই যে আমাদের এককথায় সব কথা উড়িয়ে দেবার ক্ষমতাটা, সেটা মরে গেছে... হলদে ঘাসফুল গুলো যে বইটার পাতার ভাঁজে শুকাতে দিয়েছিলাম, এত্ত ভার চাপানো ছিল তার ওপরে যে কিচ্ছুটি বাকি নেই ফুলের...

চোখে জল আসতে যাবে... ঠিক তখুনি সেই যে সেই বদলে-যাওয়া-হাওয়া খবর নিয়ে এল...

দেবী কোন এক উঁচু পাহাড়ের শুনশান পাকদন্ডিতে একা বসে কাঁদে আজকাল...
সাগর রঙিন কাঁচ নিয়ে খুব খেলেছিল ক’দিন... এখন তার হাতে দারুন চোট লেগেছে...
রূপসা নদী হয়ে গেছে... ভুলে যাওয়াটা ওর কাছে শিখে নিতে পারিনি কোনোদিনও...
আর
সই একগলা বাড়বাড়ন্ত বানের জলে দাঁড়িয়ে বাঁকা হেসে বলেছে যে সে ভাল আছে... আমি ত জানি যে সই সাঁতার জানেনা!

সব শুনে চুপ করে বসে আছি, তখন হাওয়া বলল, “আর তুমি? তুমি কেমন আছ?”
কি আর বলবো? সত্যিটাই বলে দিলাম...

বললাম, “আমি এখানেই আছি! চারদিকে তো দেখছই খালি বালি আর বালি... ঠিক জানিনা এটা মরুভূমি নাকি কোথাও বিশাল সমুদ্র আছে ওপারে...! আমি প্রতিদিন হাঁটি... প্রতিদিন এমন রোদের ঘা পড়ে যে আর বলার নয়... এই রোদই নাকি লাজুক হয়ে মুখ লুকাতো আমাদের দেখে... বিশ্বাস হয় না...!! যা হোক, আমায় পার হতে হবে...ব্যাস! এইটুকু জানি... আপাততঃ হাতে আর কিছু নেই...
শুধু একখানা বালি-ঘড়ি... মাঝেমাঝে তার বালি কম-বেশি করে সময়ের হিসেবটা ইচ্ছে করে গোলমাল করে দিই...”

আমার কথা শুনে হো হো করে খানিক হেসে নিল হাওয়া... তারপর বলল, “ওদেরকে বলে দেবো এসব?”

ভাবলাম খানিক... তারপর বললাম, “ হ্যাঁ... বলে দিও... সব বলে দিও... বোলো যে আমি ভালো নেই... আর বোলো যে আমি জিগেস করেছি যে ... সেই আগের মতন বোকা হয়ে যাওয়া যায় না??”

কথাক’টা বলতেই হাওয়া মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল... আর আমার বালিছোঁয়া আকাশটাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেল পাহাড়-সাগর-নদী-বানের পাঁচমেশালি গন্ধে...

আপাততঃ একা আমিই রইলাম... সেইটুকু আঁকড়ে ধরে...!!

ফান টু সি

By : Sayantari Ghosh



আজ আতস কাচটাকে তাক থেকে পাড়ার আগে আসুন ভাবা যাক কয়েকজনের কথা;তাদের আমরা দৈনন্দিনে দেখি বটে, কিন্তু খুব যে একটা খেয়াল করি, খুব যে একটা ভাবতে বসি তাদের কথা, খুব যে কিছু করতে চাই তাদের জন্যে, তা নয়।ঘটনাচক্রে, আজ যাদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি, তারা সকলেই নারী, প্রত্যেকেই বিবাহিতা, তবে না, আপনি যা ভাবছেন তা নয়, তারা শ্বশুরবাড়িতে লাঞ্ছিতা নন, কেউ তাদের গায়ে হাত তোলে নি, কেউ তাদের খাদ্য-বস্ত্রের সংস্থান নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ দেন নি, মা-বাবা পণ দিতে পারেনি বলে কেউ তাদের গায়ে আগুন দিতে আসে নি বা পরপর তিনবার কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার অপরাধে তারা অপরাধীও নন।অর্থাৎ সেদিক দিয়ে ভাবতে গেলে তারা নিগৃহিতা বা অত্যাচারিতা নন, এমন একটা ধারণাই আপনি-আমি পোষণ করে থাকি।আসুন, একবার দেখি তারা কেমন আছেন?

১   প্রথমে কল্পনা করুন এমন একটা ছবি, যেখানে রয়েছেন এক পঞ্চাশোর্ধ দম্পতি।স্ত্রী তার স্বামীর হাতে তুলে দিচ্ছেন নিজের সাধের গয়নার বাক্সখানা আর স্বামীও গদগদ আপ্লুত মুখে বলছেন, “দাও, দাও, এ’সব আর তোমায় তেমন মানায়ও না...” মজার ব্যাপার হল, যে আপনার সাধারণ ভাবে মনে হবে,গয়নার বাক্স স্বামীর কোনো জরুরী দরকারে কোথাও বন্ধক রাখার কাজে দিচ্ছেন হয়তঃ ভদ্রমহিলা, কিন্তু সে রকম কিছু মোটেও না, উনি ওগুলো দিচ্ছেন স্বামীর বছর পঁচিশেকের নতুন প্রেমিকার জন্যে...!......কেন বলুন তো?......শুধু এই আশায় যে যদি এই সুযোগে, তাঁর এতবড় স্বার্থত্যাগের নজির দেখে স্বামী তাকে একটুখানি ভালো আবার করে বেসে ফেলেন কোনো ফাঁকে......কোনোভাবে যদি...

২  এবার, ভাবুন এ’রকম একটা দৃশ্য, যেখানে স্বামী যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান কাজে, তখন সারাদিনের জন্য একটা হিংস্র, মানুষখেকো পাখি’কে রেখে যান সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী এর পাহারায়...!‘ভালোবাসি, তাই সুরক্ষা দিতে চাই’ এই হয় এই দৈনন্দিন পাহারার অজুহাত।পাখিটা মাথার ওপর গন্ডি কাটে, হাড়-হিম-করা চিতকার করে ডাকে আর গন্ডির বাইরে পা বাড়ালেই মাংস খুবলে খেতে চায়......স্বামী কিন্তু তখনও বলেন, ‘ভালোবাসি, তাই সুরক্ষা দিতে চাই’...

৩  তৃতীয় দৃশ্যে চলে আসি, আসুন।ছবিটায় আছেন এক আধুনিকা অর্ধাঙ্গিনী।সে স্বাধীনচেতা, শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, স্বাবলম্বী।যেহেতু সে কথায় কথায় স্বামীর পায়ে লুটিয়ে পড়তে পারে না, যেহেতু সে পায়ের কাছে কাদা হয়ে পড়ে থাকতে শেখে নি, তাই বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তার এই কোমলতাহীন সৌন্দর্য্য স্বামীকে টানে না আর।যুদ্ধে তছনছ হয়ে যাওয়া দেশ ছেড়ে আত্মরক্ষার আশ্রয় খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে পড়ার সময় স্বামীর মনেই থাকে না মেয়েটির কথা!তিনি ভুলেই গেছেন তখন সাগ্নিক সপ্তপদীর শপথগুলো।মেয়েটি বেপরোয়া হয়ে পড়ে।কখনও অস্ত্র হাতে তুলে দুনিয়ার কাছে প্রমাণ করতে চায় নিজের যোগ্যতা, কখনো বা অযোগ্য কারো সাথে প্রেমের ভনিতায় প্রমাণ করতে চায় স্বামীর কাছে যে তার প্রেমে এখনও কেউ পড়তে পারে...এ কি খালি স্বামীর কাছে প্রমাণ করার চেষ্টা?জগত সংসারের কাছে প্রমাণ করার বাসনা?না কি নিজের কাছেও......

৪  শেষ দৃশ্য।ভয়ানক দৃশ্য।ভাবুন, জাস্ট ভাবার চেষ্টা করুন একটি এমন মেয়ের কথা, যার স্বামী ঘুমিয়ে আছে...!জীবিত, শ্বাস প্রশ্বাস চলছে, জেগে ওঠে এক বছরে একবার...উঠে স্বামীসুলভ সব অধিকার সব জোরজুলুম একবার ফলিয়ে নেয় স্ত্রী’র ওপরে।একদিন জেগে থাকে।একটা দিন।তারপর আবার কালঘুম...এক বছর আবার সব চুপচাপ.........

চরিত্রগুলোকে চিনতে পারলেন?চেনা-চেনা লাগলো, ভালোবাসার নামে, ‘বিবাহ’ নামক প্রহসনের নামে, ‘পতি পরম গুরু’ স্লোগানের আস্ফালনে অন্ধকুঠুরিতে বন্দিনী এই মেয়েগুলোকে?কি বললেন?আমাদের আশেপাশেই দেখেছেন মনে হল?ঠিক বলেছেন!তবে কি জানেন, আমার সাথে এদের দ্যাখা হল অন্যভাবে।

দেখতে গেছিলাম ‘সুন্দরম’এর নাটক ‘আশ্চৌর্য ফান্টুসি’।আর ওই দু’ঘন্টায় খুচরো হাসির ফাঁকতালে ভীষণ ভাবে খেয়াল করতে বাধ্য হলাম যে, মহাকাব্যের আড়ালে, যাকে বলে টাইম ইম্মেমোরিয়াল, সেই তবে থেকে ওরা ছিল আমাদের পাশেই।আমরাই কে জানে কি করে এতদিন খেয়াল করি নি।রাবণের স্ত্রী মন্দোদরী, মহাকাব্যের নায়িকা সীতা, বিভীষণের স্ত্রী সরমা আর কুম্ভকর্ণের স্ত্রী বজ্রমালা।ওরা ছিল।আমরা দেখি নি।আর তাইই হয়তঃ ওরা আজো রয়ে গেছে।

তবে এখানেই থামেন নি নাট্যকার।ওদের এই ভালো-থাকার সমস্যার একটা বিহীত করতে টেনে এনেছেন হনুমতী’কে!আজ্ঞে না, একে পাবেন না মহাকাব্যে।কিন্তু সেদিনের নাটকের বক্তদ্যটাই ছিল এ’রকম।যদি ধরুন, হনুমানের বদলে কোনো এক হনুমতী যেত সীতার কাছে রামের অঙ্গুরীয় নিয়ে?তা’হলে?তা’হলে কি রামায়ন লেখা হত একই ভাবে?

এই বদলটুকুর কারণে নাটকের নাম, ‘আশ্চৌর্য ফান্টুসি’।ভেঙে ভাবতে গেলে দাঁড়ায় আশ্চর্য চৌর্য আর ফান্টুসির সন্ধি-বিচ্ছেদে ফান-টু-সি।অর্থাৎ কি না যে অবাক করা চৌর্যবৃত্তি দেখতে ভারী মজা।বাল্মীকি রামায়নের গল্পের এমন সার্থক চৌর্যবৃত্তিকে স্বাগত!দু-ঘন্টার জমজমাট গানে গানে ভরা চিত্রনাট্য।‘ও আকাশ’, ‘আমি কবে হবো আমার’ এই গানগুলো নাটক শেষ হওয়ার অনেক পর পর্যন্ত কানে লেগে থাকে।নাটকটির চিত্রায়ণ গ্রামবাংলার পালাগানের সাথে মিল রেখে।এই বাঙালিয়ানা আর folk-মেজাজ আপাদমস্তক দূর্ধর্ষ।জয় সেনের পাপেট আর আলোর কাজ অনবদ্য।গানের সুর করেছেন ভূমি’র সৌমিত্র রায়।আর গানের কথা স্বয়ং নাট্যকার-কাম-নির্দেশকের।

সেদিন আকাদেমি থেকে মন ভর্তি করে রঙীন বুদবুদ সামলে আনতে আনতে তুলট কাগজের ধূলোটে মহাকাব্যটিকে নতুন করে চিনলাম যেন।সত্যি করে ভাবতে গেলে, হনুমানের পক্ষে খেয়াল করা সত্যিই মুশকিল যে আপাতসুখী সোনার লঙ্কা জুড়ে এতগুলো মেয়ে মোটেই ভালো নেই।খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অভাব না থাকলেও তাদের জীবনে কতগুলো অতি প্রয়োজনীয় জিনিসের হাহাকার চলছে।যেমন, যথাযোগ্য সম্মান, খানিকটা মর্যাদা, একটুখানি ভালোবাসা।এই সত্য আবিষ্কারের জন্য একটি হনুমতীরই প্রয়োজন।যে কোনো বাধা মানে না।পাহাড়ী ঝর্ণার মত যে মুক্ত।যে কারো দাসী হতে শেখে নি।যা ঠিক বলে বোঝে, তাই করে।এমন একটি লক্ষ্মীছাড়া, বিশ্ববখাটে, অবাধ্য মেয়েই পারে ওদের’কে নিয়ে নতুন দেশের দিকে নাও ভাসাতে।

মনোজ মিত্র যে কেন বাংলা নাটকের লেজেন্ড, তা এতদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।


পুষ্পপুরাণঃ পারিজাত

By : Sayantari Ghosh


পারিজাত...
সে তো মর্ত্যের নয়। স্বর্গের ফুল... গোলোকে বিষ্ণুর সোনার সিংহাসনের আকাশ সুগন্ধে মাতিয়ে রাখে... আর কারণে-অকারণে পায়ের কাছে ঝরে পড়ে পড়ে ধবধবে গালিচা বিছিয়ে দেয়... তাই তো অমন নাম... পারিজাত...!
পারিজাতকে মর্ত্যে আনার কাজটি করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ... করেছিলেন বললে ভুল হবে... একরকম করতে বাধ্য হয়েছিলেন...!!
শুনেই চমক লাগল বুঝি...? ভাবছো,শ্রীকৃষ্ণ তো স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার... কত কি কঠিন কঠিন কাজই না করে গেছেন তিনি... তাঁকে বাধ্য হতে হল... এ অসম্ভব কাজটি করল কে???
কে আবার...? তাঁর দুই রাণী... রুক্মিনী আর সত্যভামা...!
সে গল্পটির শুরুও ঝগড়াঝাঁটি দিয়ে... সেই একই ঝগড়া... কে বড়...? যার আসল মানে হল, শ্রীকৃষ্ণের সকল রাণীর মধ্যে প্রিয়তমা কে? সত্যভামা? না কি রুক্মিনী?
দুজনেই জোর গলায় রাজ্যের সব রকমারী দাবী করতে লাগলেন...
একজন বলেন,তাঁর বলার অপেক্ষা... কৃষ্ণ গজদন্তের প্রাসাদ গড়িয়ে দেবেন একরাত্তিরের মধ্যে...
আর একজন বলেন,তাঁর মুখের কথা খসলেই কৃষ্ণ একশ পক্ষীরাজে টানা রথ এনে দাঁড় করিয়ে দেবেন দুয়োরের পাশে...
এমনি করে কথায় কথায় কথা বেড়ে বেড়ে পাহাড়প্রমাণ হয়ে গেল...
খবর পেয়ে কৃষ্ণ যখন এসে পৌঁছোলেন,তখন সেসব দাবীর বহর মর্ত্যলোক ছাড়িয়ে দেবলোকে উঁকিঝুঁকি মারছে...!
দুজনেই এসে চোখে কাজলজল উজাড় করে,মুখভার করে বললেন,
যদি ওকে চাও ওর কাছে থাকো,আমি তবে ছাড়ি হাত...
আর,
যদি ভালোবাসো তবে এনে দাও স্বর্গের পারিজাত...
সব্বোনাশ!! শুনেই তো শ্রীকৃষ্ণের চক্ষু চড়কগাছ! স্বর্গের পারিজাত!!! তাকে পৃথিবীতে আনাই তো মহাশক্ত কাজ! এনে দাও বললেই তো আর তার এনে দেওয়া যায়না... তার উপর এনে দেবেনই বা কাকে? রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে তো আরেকদিকে... আর তার চেয়েও বড় কথা, প্রাণের ভয় বলেও তো একটা বস্তু আছে কৃষ্ণঠাকুরের...!
ভাবনায় ঘুম উড়ে গেল শ্রীকৃষ্ণের চোখের পাতা থেকে... রাতভর ঘুম আসেনা... কি করেন... কি করেন... কি করে সামলানো যায় দুজনকে...
শেষমেশ অনেক ভেবে ভোররাতের দিকে এক দারুণ ভাবনা ঝিলিক দিয়ে উঠল... একগাল হেসে শ্রীকৃষ্ণ চললেন পারিজাত আনতে।
**********************************************************************
ভোরবেলা, ঘুম ভেঙে সত্যভামা দেখলেন যে তাঁর আঙিনার দক্ষিণকোণের পাঁচিলধার আলো করে রয়েছে অ-পূ-র্ব এক অজানা ফুলের গাছ... সারা প্রাসাদ ম ম করছে স্বর্গীয় সুরভিতে...
আর পাঁচিলের ও'ধারে, রুক্মিনীর উঠোনের উত্তরকোণের শিশিরভেজা ঘাস জুড়ে বিছিয়ে আছে সাদার উপর ছোট্ট ছোট্ট কমলা ফুটকি দেওয়া একখান নরম গালিচা...

পুষ্পপুরাণঃ কেতকী

By : Sayantari Ghosh

আচ্ছাবল দেখিনিকেতকী ফুলে পুজো হতে দেখেছো কখনও...? অথচ অমন গন্ধ কটা ফুলের আছে বল তো? তবুও কেন এরকম...?  হু হু... বাবা... গল্প আছে, গল্প... বসেই তো আছো দেখচি... শুনবে না কি...?
তাহলে বলি...?
ব্যাপারটা হল গিয়ে সে একবারের কথা... হঠাএকদিন সকালে মহাদেবের ঘুম ভাঙল মহা-চিত্কার চেঁচামেচিতে... চোখ রগড়ে দ্যাখেন কি,না,ব্রহ্মাঠাকুর আর বিষ্ণুঠাকুরের মধ্যে সাঙ্ঘাতিক ঝামেলা বেঁধেছে... দিনের কাজকর্ম কিচ্ছু শুরু হয়নি... ঝগড়ায় বিশ্বদুনিয়া সব তোলপাড়,তটস্থ...!!

কি হয়েছে?  না, সেই পুরোনো সমস্যা... কে বড়,কার দরকার বেশি,সেই নিয়ে মনকষাকষি... তারপর একদুটো রাগারাগির কথা... বাড়তে বাড়তে সমস্যা এখন তুঙ্গে...!!
মহাদেব বুঝলেন তাঁকে ছাড়া গতি নেই... দুজনেই মরিয়া হয়ে উঠেছেন,যুক্তির থেকে উপরে গলা তুলেছে অযৌক্তিক সব কথা... একটা তুলনা করে দুজনকে বুঝিয়ে দিতে হবে,দুজনেই সমান... এ’ছাড়া উপায় নেই...
যেই ভাবা সেই কাজ। সটান গিয়ে দাঁড়ালেন দুজনের মাঝে...বললেন শান্ত হোন আপনারা...পরীক্ষা করেই দেখা যাক না,কে বড়...
মূহুর্তের মধ্যে দুই দেবতার মাঝে দাঁড়ানো মহাদেব একখানা বি-শা-আ-আ-ল আলোর স্তম্ভ হয়ে গেলেন... আকাশ জুড়ে গমগম করে উঠল তাঁর কন্ঠস্বর...
একজন উর্ধ্বপানে,একজন অধোপানে যান,
যে আগে পাবেন শেষ, তার জয় ... করুন প্রস্থান...
ব্যাস... আর পায় কোথায়...?  তক্ষুনি দু’জনে দু’দিকে লাগালেন ছুট...!!!

বিষ্ণু যাচ্ছিলেন পাতালের দিকে... আলোর স্তম্ভের পাশে পাশে চললেন,চললেন আর চললেন... কিন্তু শেষ কোথায়...? যতদূর চোখ যায় সে আলো আগে, আরো আগে এগিয়ে গেছে... বিষ্ণুর জোরে জোরে শ্বাস পড়তে লাগল... হাঁফিয়ে গেলেন একেবারে... নাঃ! আর পারা যায় না... এ আলেয়ার পিছু করার চেফিরে যাওয়াই ভালো... এ নির্ঘাত্‌ মহাদেব কিছু ফন্দি ফেঁদেছেন...! আর দেরী না করে ফেরার পথা পা বাড়ালেন বিষ্ণু।
দিকে ব্রহ্মার অবস্থাও তথৈবচ! হাঁফিয়ে-ঝাঁপিয়ে ঘেমে-নেয়ে গেছেন... কি করবেন ভাবছেন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে,হঠাৎ দ্যাখেন ফুলের রানী কেতকী উপর থেকে হাওয়ায় ভেসে ভেসে নেমে আসছে। ব্রহ্মার মাথায় এক দুষ্টুবুদ্ধি চাপলো। কেতকীকে খপ করে ধরে বললেন, “চল আমার সাথে,বিষ্ণুকে বলবে যে তোমায় আমি এই আলোর স্তাম্ভের শিখর থেকে নিয়ে এসেছি...
ভয় পেয়ে কেতকী বলতে গেল বাধা দিয়ে, “ওমা,সে কি??!  কিন্তু...
চুউউপ! যা বলছি বলবে, নাহলে না...গর্জে ওঠেন ব্রহ্মা! ভয় পেয়ে একেবারে সিঁটিয়ে গেল কেতকী।
ছুটে ছুটে বিষ্ণুর কাছে ফিরে এলেন ব্রহ্মা। তাঁর চোখের সামনে কেতকী কে ধরে বললেন, “হেঃ হেঃ,এই যে... দ্যাখো দ্যাখো,প্রমাণ দ্যাখো,আমি শেষ ছুঁয়ে ফিরে এসেছি... কেতকী তো সেখানেই থাকে... কি হে, বল?” বলে কেতকীর দিকে তাকান তিনি...

বেচারী কেতকী! কি আর করে...! হ্যাঁ...বলে যেই না মাথা নেড়েছে,অম্নি মহাদেব রেগে আগুন হয়ে মূর্তিমান হলেন... এমন মিথ্যাচার...! তাও আবার স্বয়ং মহাদেবের সামনে...!!
তত্ক্ষণাৎ শাপ দিলেন মহাদেব,
সব সুরভী মরবে কেঁদে আমার পরশ বিনে,
পুজোর ঘরের দুয়োর’টি তুই কক্ষনো ছুঁবি নে...
ব্যাস...! মহাদেবের কথা,এক কথা...! কেতকী অনেক কেঁদেছিল,কোন ফল হয় নি... সেই লঘুপাপের গুরুদন্ড মাথায় নিয়ে কেতকী আজও পুজোর ঘরের দুয়োর ছোঁয় না...।
এইরকমের একটা গপ্পো পারিজাতেরও আছে...
পারিজাত... মানে আদর করে যাকে শিউলি নামে ডাক দাও,সেই ফুল... সে নাহয় আরেকদিন শোনাবো...

- Copyright © পাঁচমিশেলি - - Powered by Blogger - Designed by সায়ংতরী -